চরম অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার পার্বত্য খিয়াং সম্প্রদায়

পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবারত বিভিন্ন পাহাড়ি জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে খিয়াং সম্প্রদায় চরম অবহেলিত ও বঞ্চিত। যাদের বসবাস পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটির রাজস্থলী ও কাপ্তাই উপজেলায়। তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, উন্নত যোগাযোগের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র তথা স্থানীয় সরকার ব্যর্থ এবং উদাসীন- অভিযোগ খিয়াং সম্প্রদায়ের।
সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে খিয়াংদের সংখ্যা দুই হাজারের অধিক। রাজস্থলী উপজেলার ৪টি পাড়ায় ৬০০টি খিয়াং পরিবার বসবাস করে। খিয়াং জনসংখ্যার ২১ দশমিক ২২ ভাগ পুরুষ এবং ১২ দশমিক ৭৮ ভাগ নারী। সাক্ষরতার হার শতকরা ১০ দশমিক ২০। বাকি ৯০ দশমিক ৮০ ভাগই নিরক্ষর।
জীবীকার তাগিদে তারা প্রায় সবাই কৃষি কাজের সাথে যুক্ত। যা স্থানীয়ভাবে ‘জুম চাষ’ নামে অধিক পরিচিত। তারা শিক্ষা-দীক্ষায় ও আর্থ-সামাজিক দিক থেকে অত্যন্ত প্রান্তিক।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের ৫৫ বছর পরও অত্যন্ত প্রান্তিক এই জাতিগোষ্ঠী যুগ যুগ ধরে অবহেলিত ও বঞ্চনার শিকার। প্রাতিষ্ঠানিক জনপ্রতিনিধিত্বের সুযোগ না থাকাই তাদের অনগ্রসরতার অন্যতম কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পার্বত্য জেলা পরিষদ কিংবা আঞ্চলিক পরিষদ- কোথাও তাদের সম্প্রদায় থেকে জনপ্রতিনিধি কিংবা প্রতিনিধিত্ব করার মতো কেউ নেই। এসব প্রতিষ্ঠানে খিয়াংদের প্রতিনিধি না থাকার কারণে সরকারি-বেসরকারি উন্নয়ন পরিকল্পনা বা প্রকল্প প্রণয়নে তারা তাদের ন্যায্য অধিকারের কথা তুলে ধরতে পারছে না। তাই জীবন ধারণের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে যুগের পর যুগ। আর যারা তাদের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত তারা কখনো এই অবহেলিত খিয়াং সম্প্রদায়ের উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ নেননি। ফলে এই অধিকতর সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীর মানুষেরা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান, যোগাযোগ ব্যবস্থা কিংবা আর্থ-সামাজিক দিক থেকে যুগের পর যুগ পিছিয়ে রয়েছে এবং দেশের চলমান উন্নয়নে অংশীদার হতে পারছে না। অথচ এসব সুযোগ-সুবিধা পাওয়াটা তাদেরই নাগরিক অধিকার। করুণার বিষয় নয়।
পার্বত্য চট্টগ্রামে নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে যারা রয়েছেন, অধিকতর সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীদের উন্নয়নের প্রতি তাদের বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তা না হলে এই অবহেলিত খিয়াংরা সমাজ ও দেশের মূল ধারায় যুক্ত হয়ে দেশ গঠনে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখার সুযোগ পাবে না। যে তিমিরে ছিল, সেই তিমিরেই থেকে যাবে।
সচেতন মহলের দাবি, বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশে বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামে কিংবা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসরত অধিকতর জাতিগত সংখ্যা লঘুদের উন্নয়নে তাদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে ‘বিশেষ পরিকল্পনা’ প্রণয়ন করে তা-বাস্তবায়ন করা এখন সময়ের দাবি । যে পরিকল্পনায় এই অধিকতর অবহেলিত জাতিগোষ্ঠীদের প্রতিনিধিত্বসহ আর্থ-সামাজিক এবং শিক্ষার উন্নয়নে সুনির্দিষ্ট রূপকল্প তৈরি করে স্বল্প, মধ্য এবং দীর্ঘমেয়াদী বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করে তা বাস্তবায়ন করা গেলে জাতি, সমাজ ও দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।
স্থানীয়রা আরো বলছেন, খিয়াংদের বেঁচে থাকা, টিকে থাকা এবং উত্তরণের স্বপ্ন দেখা নাগরিক অধিকার। জাতি, সমাজ ও দেশ গঠনে তাদের ভূমিকা রাখা, উন্নয়নে অংশ নেয়া, স্বপ্ন বাস্তবায়নে জাত, ধর্ম-বর্ণ এবং রাজনৈতিক মতাদর্শের ঊর্ধ্বে থেকে সব ক্ষেত্রে নীতি নির্ধারকদের এগিয়ে আসতে হবে। অবহেলিতদের প্রতি ‘বিশেষ দৃষ্টি’ দিয়ে ‘বিশেষ পরিকল্পনা’ প্রণয়ন করে তাদের উন্নয়ন অংশীদার করে দেওয়ার দায়িত্ব যতটুকু না সেই জাতিগোষ্ঠীর, তার চেয়েও বেশি উদার মনে সহানুভুতিশীল হয়ে অগ্রসর জাতি গোষ্ঠীদেরই এগিয়ে আসতে হবে। তবেই বঞ্চনা, বৈষম্য ও শোষণ দূর হবে সমাজ থেকে, এগিয়ে যাবে জাতি ও দেশ।
সরেজমিনে বড় কুইক্যাছড়ি পাড়ার অংছা খিয়াং এই প্রতিবেদকের কাছে বলেন, আমরা খুবই অবহেলিত খিয়াং জনগোষ্ঠী। শিক্ষা স্বাস্থ্য যোগাযোগ ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছি। আমার ৫টি মেয়ে, ৩টি ছেলে সন্তান রয়েছে। এর মধ্যে একটি মেয়ে বোবা ও প্রতিবন্ধী। দীর্ঘদিন ধরে কাজ না থাকায় পরিবার-পরিজন নিয়ে খুবই কষ্ট করে দিন কাটাচ্ছি। এক বেলা খেয়ে দু বেলা উপবাস থেকে সংসারের হাল ধরে আছি। সরকার আমাদের সাহায্য সহযোগিতা করে তাহলে আমরা দারিদ্রতা থেকে বাহির হব।
পাড়ার সাবেক আট বারের নির্বাচিত ইউপি সদস্য চিংচামং খিয়াং বলেন, আমি আট বার ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ছিলাম। কিন্তু সরকারের উদাসীনতার কারণে এ এলাকায় তেমন উন্নয়ন করতে পারিনি। আমি এ এলাকার অবহেলীত খিয়াং সম্প্রদায়ের উন্নয়নে নজর দেয়ার জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি।

















