
পেকুয়া প্রতিনিধি :
চরম অব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে চলছে কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। স্বাস্থ্য সেবা নিয়ে চরম হুমকির মুখে পতিত হচ্ছে পেকুয়া উপজেলার হতদরিদ্র জনগোষ্ঠি। পেকুয়া উপজেলাবাসীর এক মাত্র চিকিৎসা সেবা কেন্দ্র পেকুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। আর এ হাসপাতালের ডাক্তাররা সরকারি অফিস সময়ে দায়িত্ব-কর্তব্য পালন না করে চৌমুহুনী সেবা প্যাথলজি ও আল হেরা ফার্মেসীসহ উপজেলার বিভিন্নস্থানের ঔষধের দোকান এবং প্রাইভেট চেম্বার নিয়ে বড় বড় সাইন বোর্ড টাঙিয়ে প্রাইভেট চেম্বারে রোগী দেখতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। এদিকে হাসপাতালে দায়িত্ব-কর্তব্য পালন না করলেও নিয়মিত তুলছেন বেতন। পেকুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ব্যবস্থাপনা করুণ অবস্থায় পরিণত হয়েছে। দেখার কেউ নেই বললে চলে। আর এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডাক্তররা ঔষধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের সাথে আঁতাত করে টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন নিম্ন মানের ঔষধ দিচ্ছে।
পেকুয়া উপজেলাবাসীর চিকিৎসা সেবার কথা চিন্তা করে ১৯৯৮ সালে কক্সবাজারের সূর্য সন্তান বর্তমান বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির যুগ্ম মহাসচিব সাবেক সফল যোগাযোগ মন্ত্রী আলহাজ্ব সালাহউদ্দিন আহমদ সৌদি সরকারের অর্থায়নে পেকুয়ায় একটি ২০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। এর পর থেকে প্রকল্পের অধিনে ডা: মজিবুর রহমান, ডা: নুরুল আলম, ডা: শাহ আলমসহ ৪৬ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী দিয়ে এ হাসপাতাল পরিচালনা করে আসলেও ২০১১ সালে বর্তমান আ’লীগ সরকারের স্বাস্থ্য সচিব পেকুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পরিদর্শনে এসে পেকুয়াবাসীর স্বাস্থ্য সেবার এক মাত্র কেন্দ্র ২০ শয্যা হাসপাতালকে ৩১ শয্যা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং সরকারিকরণ (রাজস্ব) করার সিদ্ধান্ত নেন। পরে বিষয়টি স্বাস্থ্য মন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করে পেকুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ৩১ শয্যায় উন্নীত হয়।
পরে স্বাস্থ্য বিভাগ কর্তিক রাজস্ব খাতের ডাক্তার ও জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়। সেই রাজস্ব খাতের টি এইচ ইউ ডা: পূণ্য বর্ধণ বড়ুয়া, ডা: আরিফ, ডা: মনির উল্লাহ, ডা: সোহেল ছিদ্দিকী, ডা: সৌমন বড়ুয়া, ডা: রানা চৌধুরীসহ ৮ জন এবং উপসহকারী মেডিকেল অফিসার হিসাবে জিয়া উদ্দিন, শামীম, স্টাফ নার্স ২ জন ও একজন ডেন্টালও রয়েছে এবং প্রকল্পের অধিনে দায়িত্বে থাকা আর এম ও ডা: মজিবুর রহমান, ডা: নুরুল আলম, ডা: শাহ আলম কর্মরত রয়েছেন। প্রকল্পের অধিনে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাদের বেতন সরকারিকরণের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রাণালয়ের বিরুদ্ধে মামলা করে। পরে মন্ত্রাণালয় ৩৯ জন কে সরকারিকরণ করলেও বাকী ৭ জনকে জটিলতার কারণে সরকারিকরণ করে নি। আর এ ফাঁকা কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সংখ্যা বৃদ্ধি ও হাসপাতালের শয্যা বৃদ্ধি হলেও বৃদ্ধি পায় নি চিকিৎসা সেবার মান।
হাসতালের কর্মকর্তাদের চরম অবহেলার কারণে একমাত্র অ্যাম্বুলেন্সটি দীর্ঘদিন ধরে অকেজো হয়ে আছে। ড্রাইভার থাকলেও সে বর্তমানে হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করছে না। সে সিএস অফিসে দায়িত্ব পালন করছে বলে জানা গেছে একটি সূত্রে।
এদিকে গত ৪ ফেব্রুয়ারী দুপুর ১২ টায় পেকুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সরেজমিনে গেলে প্রথমে দেখা যায় পুরো হাসপাতালে কোন ডাক্তার নেই। দীর্ঘলাইন ধরে রোগীরা দাঁড়িয়ে আছে। তারা গুণছে কখন ডাক্তারের দেখা পাবে ঔষধ নিয়ে বাড়ি ফিরবে। রোগীদের ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায় ভর্তিকৃত রোগীরা সকাল থেকে ডাক্তার দেখার অপেক্ষায় রয়েছে।
সূত্রে জানা যায়, সকাল ১০ টায় ওয়ার্ডের দায়িত্বে থাকা কথিত ডা: রানা চৌধুরীর নির্ধারিত সময়ে না এসে ঠিক দুপুর ১ টায় হাসপাতালের ভর্তিকৃত রোগী দেখার জন্য আসে। তখন হাসপাতালের ওয়ার্ডে সাংবাদিক আসছে এমন খবর পেয়ে রেগে উঠে কথিত ডা: রানা। সে সাংবাদিককে বলে হাসপাতালে আসার অধিকার কে দিয়েছে আপনাকে। এক পর্যায়ে সাংবাদিকের সাথে কথা কাটাকাটিও হয় কথিত ডা: রানার সাথে। তখন সে দ্রুত হাসপাতাল ত্যাগ করে পেকুয়া চৌমুহুনী আল হেরা ফার্মেসীতে প্রাইভেট চেম্বারে এসে রোগী দেখে।
এদিকে ডা: নুরুল আলম কক্সবাজার সি এস অফিসে গেলে হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত টি এইচ ইউ ডা: মজিবুর রহমান কে দেখা যায় নি। সে তার নিজস্ব নুর ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগী দেখেন। নিয়মিত অফিসে আসেন না। তারপরও মাস হলেই সরকারি টাকা তুলে নেন।
এদিকে ডা: সোহেল ছিদ্দিকী পেকুয়া চৌমুহুনীর একটি মার্কেটে প্রাইভেট চেম্বারে বসেন। ডা: আরিফ পেকুয়া বাজারের একটি মার্কেটে প্রাইভেট চেম্বারে বসেন। সরকারি অফিস সময়ে তাদের কোন দিনও দেখা যায় নি। সরকারি অফিস সময়কে ফাঁকি দিয়ে প্রাইভেট চেম্বার বাণিজ্য চালাচ্ছেন তারা। এসময় রোগীদের দুর্ভোগের কথা গোয়াখালী এলাকার দুলাল আহমদ ও আনোয়ার হোসেন কক্সবাজার সিভিল সার্জন মোখলেছুর রহমানকে মোবাইল ফোনে জানায়। তখন শুরু হয় হাসপাতালে কর্মকর্তা-কমচারীদের মধ্যে তোলপাড়।
এ সময় বেশ কয়েকজন রোগী দুলাল আহমদ, আনোয়ার হোসেন, মনোয়ারা বেগমের সাথে কথা বলে জানা যায়, তারা সকাল সাড়ে ১০ টা থেকে টিকেট নিয়ে বসে আছে। এ থেকে আর কোন ডাক্তারের দেখা পায় নি। শেষ পর্যন্ত ঔষধ না পেয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে বলে জানান। ওয়ার্ডের রোগীদের আর্তনাদ চলছে হাসপাতালের টয়লেটগুলো অপরিস্কার হয়ে গেছে। হাসপাতালে রোগীরা সুস্থ্য হওয়ার জন্য এসে আরো বেশি অসুস্থ্য হয়ে যাবে বলে জানায় ভর্তিকৃত এক রোগী। হাসপাতালে রেজিস্টার খাতায় নামে বেনামে রোগী দেখিয়ে সরকারি রাজস্ব হাতিয়ে দিচ্ছে এ হাসপাতালের কর্মকর্তারা। এদিকে নাইট গার্ড জসিম ও কুকু নেজাম দু’জনই পারিবারিক একটি মামলার আসামী। তারা দু’জনই হাসপাতালে এক মাস ধরে অনুপস্থিত রয়েছে। তারপরও মাস শেষে বেতন তুলে নিয়েছে।
এদিকে কথিত ডা: রানা চৌধুরী তার সাইন বোর্ডে এমবিবিএস (সিইউ) বিসিএস (স্বাস্থ্য) মেডিসিন, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, বাত ব্যাধি, শিশু ও চক্ষু রোগের অভিজ্ঞ চিকিৎসক উল্লেখ করেন। সূত্রে জানা গেছে, তিনি একজন মেডিসিনের চিকিৎসক। তিনি কোন ধরণের হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, বাত ব্যাধি, শিশু ও চক্ষু রোগের অভিজ্ঞ চিকিৎসক নন। এলাকার হতদরিদ্র জনগোষ্ঠির সাথে প্রতারণা করে রোগী দেখার নাম করে সে দরিদ্র লোকজনের কষ্টের উপার্জিত টাকা হাতিয়ে নেওয়ার কৌশলে নেমেছে। তিনি শিশু ও চক্ষু বিষয়ের উপর ডিগ্রী গ্রহণ করেন নি। শুধু প্রতারণা করার জন্য এ কৌশলে নেমেছেন। সবে মাত্র এমবিবিএস পাস করার পর বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে পেকুয়ায় যোগদান করেছেন। ইতিমধ্যে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপকর্মের অভিযোগ উঠেছে।
তার সাথে নানা অপকর্মে যোগ দিয়েছেন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উপ-সহকারী মেডিকেল অফিসার জিয়া উদ্দিন। সে শুধু রাত্রে ঘুমাতে যায় হাসপাতালের ডরমেটরিতে আর বাকী সময় কাটায় পেকুয়া চৌমুহুনী সেবা প্যাথলজি ও শীলখালী একটি ফার্মেসীতে চেম্বার করতে। হাসপাতালে দায়িত্ব আছে কিনা তার জানা নেই বললেই চলে। নিজেকে শুধু বড় মানের ডাক্তার পরিচয় করে নিতে চায়। এভাবে হাতিয়ে নিচ্ছে গরীবদের কষ্টের টাকা।
এমনও হয় চৌমুহুনী সেবা প্যাথলজিতে ডা: জিয়া উদ্দিন চেম্বার করছে বলে একটি বড় সাইন বোর্ড টাঙিয়ে দেয়। কিন্তু এদিকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে দায়িত্ব আছে কিনা সে খবর সে রাখেই না। তার বিরুদ্ধে হাসপাতালের সার্টিফিকেট দেওয়ার সময় টাকা আদায়সহ নানা দুর্নীতির অভিযোগও রয়েছে। জরুরি বিভাগে বসে রোগীদের কাছ থেকে টাকা নিয়েছে বলে প্রমাণ রয়েছে।
এদিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রী নাসিম গ্রাম-গঞ্জের ডাক্তাররা গ্রামের মানুষের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে না পারলে চাকুরী ছেড়ে দিতে এবং যথাযথ দায়িত্ব পালন করার জন্য নিদের্শ দিলেও সেই নির্দেশ কে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখাচ্ছে পেকুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দায়িত্বরত ডাক্তাররা।
টি এইচ ইউ ডা: পূণ্য বর্ধণ বড়ুয়ার সরলতাকে কাজে লাগিয়ে এসব অসাধু ডাক্তাররা তাদের দায়িত্ব অবহেলা করে যাচ্ছে। টি এইচ ইউ ডা: পূণ্য বর্ধণ বড়ুয়া কোথায় জানতে চাইলে একজন পিয়ন এসে জানায়, স্যার অফিসের কাজে বাইরে ব্যস্ত আছেন।
এ ব্যাপারে কক্সবাজার জেলা সিভিল সার্জেন ডা: মোখলেছুর রহমান সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন যেসব ডাক্তার অফিস করে না ঐ সব ডাক্তারদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিবেন এবং হাসপাতাল পরিদর্শন করতে আসবেন বলে জানান। তিনি আরো জানান, ডাক্তাররা হাসপাতালে উপস্থিত নেই বলে বেশ কয়েকজন রোগী আমাকে ফোন করে বিষয়টি জানিয়েছেন।