parbattanews

চীনের বিরুদ্ধে নির্বাচনী তথ্য চুরির গুরুতর অভিযোগ ট্রাম্পের

চীনের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী তথ্য চুরির গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে একই সময়ে দুই মাস পর চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য রাষ্ট্রীয় সফরের প্রস্তুতিও আগের পরিকল্পনা অনুযায়ী চালিয়ে যাচ্ছে হোয়াইট হাউস। ফলে ওয়াশিংটন-বেইজিং সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসের ইস্ট রুমে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প দাবি করেন, চীন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় নির্বাচনী তথ্যভাণ্ডারে অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছে।

তিনি বলেন, “চীন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় নির্বাচনী তথ্য নিরাপত্তা ভঙ্গ ঘটিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তারা চেয়েছিল, আমি যেন ২০২০ সালের নির্বাচনে পরাজিত হই।”

ট্রাম্পের দাবি, বেইজিং তাকে হারাতে আগ্রহী ছিল, কারণ তিনি চীনের বিরুদ্ধে কঠোর নীতি গ্রহণ করেছিলেন। তিনি বলেন, “আমি তাদের ওপর শত শত বিলিয়ন ডলারের শুল্ক আরোপ করেছি এবং বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী গড়ে তুলেছি।”

তবে এত গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করলেও ট্রাম্প চীনের বিরুদ্ধে নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক পদক্ষেপ বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ঘোষণা করেননি।

শি জিনপিংয়ের সফর প্রস্তুতি অব্যাহত

ভাষণের পরদিন হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানান, আগামী দুই মাসের মধ্যে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ওয়াশিংটন সফরের প্রস্তুতি পরিকল্পনা অনুযায়ী চলছে। চীনের বিরুদ্ধে অভিযোগের পর কোনো প্রতিক্রিয়ামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না—এ বিষয়ে স্পষ্ট কিছু জানায়নি হোয়াইট হাউস।

এদিকে নিউইয়র্কে বিশ্বকাপ উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্প বলেন, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র যদি আবার বিশ্বকাপ আয়োজন করে, তাহলে উত্তর আমেরিকার বর্তমান সহ-আয়োজকদের পরিবর্তে চীনের সঙ্গে যৌথভাবে আয়োজনের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।

তার ভাষায়, “যুক্তরাষ্ট্র ও চীন একসঙ্গে আয়োজন করলে ম্যাচগুলোর মধ্যে যাতায়াতের সময় কম লাগবে। খেলোয়াড়রাও এটি পছন্দ করবে।” তিনি জানান, এ ধারণাটি তাকে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো দিয়েছেন। তবে ওই অনুষ্ঠানে তিনি নির্বাচনী তথ্য চুরির অভিযোগের প্রসঙ্গ তোলেননি।

গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ

চীনের বিরুদ্ধে সরাসরি ব্যবস্থা না নিলেও ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ভূমিকার সমালোচনা করেন। তার অভিযোগ, প্রথম মেয়াদে দায়িত্বে থাকা গোয়েন্দা কর্মকর্তারা চীনের তথ্য সংগ্রহের বিষয়টি তার কাছ থেকে গোপন রেখেছিলেন।

এ ঘটনায় চারটি ফেডারেল সংস্থাকে তদন্তের নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, তথ্য গোপনের সঙ্গে জড়িতদের চাকরি থেকে বরখাস্ত করতে হবে এবং প্রয়োজন হলে তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থাও নিতে হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপে আবারও স্পষ্ট হয়েছে যে ট্রাম্প এখনও ২০২০ সালের নির্বাচনের ফলাফল ঘিরে রাজনৈতিক অবস্থান বজায় রেখেছেন।

শি জিনপিংকে নিয়ে ইতিবাচক মন্তব্য

সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্পের বক্তব্যে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের প্রতি তুলনামূলক ইতিবাচক মনোভাবও দেখা গেছে। গত সপ্তাহে তুরস্কে ন্যাটো সম্মেলনে তিনি বলেন, “আমি প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বড় ভক্ত।”

ইরান যুদ্ধের সময় চীনের সংযত অবস্থানেরও প্রশংসা করেন ট্রাম্প। তার মতে, শুরুতে বেইজিং তেহরানকে সামরিক সহায়তা দিতে পারে বলে আশঙ্কা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তারা সরাসরি সেই পথে যায়নি।

অভিযোগ প্রত্যাখ্যান চীনের

ট্রাম্পের অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছে চীন। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান বলেন, “এই অভিযোগের কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই।”

তিনি বলেন, চীন সবসময় অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতি অনুসরণ করে এবং যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করার কোনো আগ্রহ তাদের নেই। একই সঙ্গে তিনি ওয়াশিংটনকে চীনের বিরুদ্ধে ‘ভিত্তিহীন অপপ্রচার’ বন্ধের আহ্বান জানান।

সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা

এক বছরের বেশি সময় ধরে শুল্কযুদ্ধ ও বাণিজ্যিক উত্তেজনার পর সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশই সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে।

গত মে মাসে ট্রাম্প বেইজিং সফরে গেলে শি জিনপিং তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় স্বাগত জানান। আগামী সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ওয়াশিংটনে দুই নেতার বৈঠকের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া নভেম্বরে চীনের শেনজেনে অনুষ্ঠিত এপেক সম্মেলনে ট্রাম্পের অংশ নেওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। একই সময়ে মিয়ামিতে অনুষ্ঠেয় জি-২০ সম্মেলনে শি জিনপিং অংশ নিতে পারেন।

গোয়েন্দা নথিতে কী পাওয়া গেছে?

ট্রাম্প প্রশাসনের প্রকাশ করা গোপন নথিতে ব্যাপক নির্বাচনী জালিয়াতি বা ভোট পরিবর্তনের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

তবে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, চীনের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিপুলসংখ্যক মার্কিন নাগরিকের তথ্য সংগ্রহ করেছে এবং ২০২০ সালের নির্বাচনে জো বাইডেনের প্রচার শিবিরের কর্মকর্তাদের ই-মেইল নজরদারির চেষ্টা চালিয়েছিল।

একটি অবমুক্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের একটি হ্যাকার গ্রুপ বাইডেন প্রচার শিবিরের ই-মেইল অ্যাকাউন্ট পর্যবেক্ষণ করছিল, যাতে ভবিষ্যতে আরও গোয়েন্দা তৎপরতা চালানো সম্ভব হয়।

এ ছাড়া কয়েকটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, চীনা রাষ্ট্র-সমর্থিত হ্যাকাররা বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের ভোটার নিবন্ধনসংক্রান্ত তথ্য ডাউনলোড করেছিল। তবে এসব তথ্যের বড় অংশ আগেই সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত ছিল।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রকাশিত নথিতে এমন কোনো প্রমাণ নেই যে চীন ভোট পরিবর্তন করতে পেরেছিল বা ভোটিং ব্যবস্থায় এমনভাবে প্রবেশ করেছিল, যাতে নির্বাচনের ফলাফল বদলে দেওয়া সম্ভব হতো।

দীর্ঘদিনের সাইবার গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ

মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছে, চীন সরকারি প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা খাত এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তথ্য চুরির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অফিস অব পার্সোনেল ম্যানেজমেন্টে বড় ধরনের সাইবার হামলার পর ওয়াশিংটনের দাবি, চীনা গোয়েন্দারা কোটি কোটি মার্কিন নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করেছে।

২০২৪ সালে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেনও বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র আসন্ন নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের জন্য চীনের প্রচেষ্টার প্রমাণ পেয়েছে, যদিও শি জিনপিং আগে এমন কর্মকাণ্ডে জড়িত না থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

অতীতে যুক্তরাষ্ট্র চীনা রাষ্ট্র-সমর্থিত হ্যাকারদের বিরুদ্ধে আর্থিক নিষেধাজ্ঞা ও ফৌজদারি অভিযোগ এনেছিল। তবে এবার ট্রাম্প দাবি করেছেন, চীন ২২ কোটি মার্কিন ভোটারের তথ্য সংগ্রহ করেছে এবং এটি যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী নিরাপত্তার জন্য নজিরবিহীন হুমকি। তবুও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে নতুন কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ঘোষণা করা হয়নি।

সূত্র: সিএনএন

Exit mobile version