বিশ্বের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় ইতিহাসের পরিক্রমায় এমন কিছু মহামানবের দেখা মেলে সময় যাদেরকে সৃষ্টি করেছে। ইতিহাসের প্রয়োজনে, সময়ের প্রয়োজনে ইতিহাস ও সময় তাদেরকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও কর্তব্যের সামনে এসে দাঁড় করিয়েছে। তারা সে সকল দায়িত্ব সুচারু রূপে পালন করে মহাকালের নায়ক ও ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে নিজেদের নাম লিপিবদ্ধ করেছেন। বাংলাদেশের কালপঞ্জিতে ও ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা এমনই একটি নাম শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। হাজার বছরের বাঙালি জাতির কালচক্র ও ইতিহাস তাকে বারবার জাতীয় দায়িত্ব পালনের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। এবং প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সেসব দায়িত্ব সম্পূর্ণরূপে দেশপ্রেম, সততা ও নিষ্ঠার সাথে পালন করায় এ জাতির সময় ও ইতিহাস তাকে মহানায়কের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে।
১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে ভারতীয় সেনাবাহিনীর আক্রমণের মুখে যখন পাকিস্তানের বাঘা বাঘা সেনা কর্মকর্তারা যখন টিকতে না পেরে পলায়নপর তখন ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমান নামে একজন তরুণ বাঙালি অফিসার এগিয়ে এসে দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিলেন। তার ইউনিটের বাঙালি সৈনিকদের নিয়ে তিনি ভারতীয় ট্যাঙ্ক ক বাহিনীকে রুখে দেন। একটি কোম্পানির কমান্ডার হিসেবে খেমকারান সেক্টরে তিনি অসীম বীরত্বের পরিচয় দেন। এই যুদ্ধে বীরত্বের জন্য পাকিস্তান সরকার জিয়াউর রহমানকে হিলাল-ই-জুরাত খেতাবে ভূষিত করে। এ সময় পাকিস্তানের বিভিন্ন গণমাধ্যমে জিয়াউর রহমানের এই বীরত্বের ভুয়সী প্রশংসা করা হয়। পাকিস্তানি কবিরা এই বীরত্বের প্রশংসায় কবিতা রচনা করেন। পাকিস্তানি জেনারেলরা এতদিন যে বাঙালি সৈন্যদের ‘ভেতো বাঙালি’ বলে অবজ্ঞা করে এসেছিলেন, খেমকারান সেক্টরে জিয়াউর রহমানের এই বীরত্বের কারণে তাদের সেই ভুল ভাঙ্গে এবং পরবর্তী সময়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে বাঙালি অফিসার ও সৈন্য নিয়োগ বৃদ্ধি পায়। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে আরো একবার বাংলার মহাকাল ও ইতিহাস জিয়াউর রহমানকে কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও দায়িত্ব পালনের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। তরুণ মেজর জিয়াউর রহমান দেশপ্রেমের চরম পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে স্ত্রী ও সন্তানের নিরাপত্তার কথা না ভেবেই সেই সেই দায়িত্বও কাঁধে তুলে নেন।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে মেজর জিয়াউর রহমানকে পাকিস্তানি কমান্ডারের নির্দেশে চট্টগ্রাম বন্দরে যাওয়ার পূর্বে তৎকালীন ক্যাপ্টেন অলিকে বলে যান তিনি যেন সতর্ক থাকেন এবং চোখ কান খোলা রাখেন চারদিকে। যেকোনো কিছু অস্বাভাবিক খবর পেলে তাকে যেন সাথে সাথে জানানো হয়। সে মোতাবেক, ব্যাংক কর্মকর্তা আব্দুল কাদের সাহেবের টেলিফোনে ঢাকায় সামরিক বাহিনী নেমে যাওয়ার খবর শুনে ক্যাপ্টেন অলি তাৎক্ষণিকভাবে এই খবর দেয়ার জন্য ক্যাপ্টেন খালিকুজ্জামানকে জিয়াউর রহমানের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন। পথে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ এলাকায় প্রথম থামিয়েছিলেন ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান চৌধুরী। আগ্রাবাদে একটি বড় ব্যারিকেডের কারণে জিয়াউর রহমানের ট্রাকটি দাঁড়িয়ে পড়লে, ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান পেছন থেকে ডজ গাড়িতে এসে জিয়াকে রাস্তার পাশে ডেকে নেন এবং ঢাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর বাঙালি নিধনের ভয়াবহ খবর জানান। এরপরই জিয়াউর রহমান তাকে বলেন, ‘উই রিভোল্ট’। তুমি ব্যাটালিয়ন সদরে ফিরে গিয়ে আমার এ সিদ্ধান্তের কথা সবাইকে জানাও। অলিকে বলো, সবাইকে এক জায়গায় জড়ো করতে।
এরপর তিনি ব্যাটালিয়নে ফিরে গিয়ে তার সাথে থাকা পাকিস্তানী সৈন্যদের নিকট থেকে এসএমজি কেড়ে নিয়ে তাদের বন্দী করেন। তিনি কর্ণেল অলিকে মেজর শওকতকে খবর দিতে বলে নিজে যান সিও লে. কর্নেল জানজুয়ার বাসায়। সেখানে গিয়ে তিনি তাকে আটক করে নিয়ে আসেন। এসময় মেজর শওকত এলে তিনি তার কাছে নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে বলেন, ‘শওকত উই রিভোল্ট! তুমি কি আমাদের সাথে থাকবে?’ মেজর শওকত ব্যাটেলিয়ানে জিয়াউর রহমানের ইমিডিয়েট জুনিয়র ছিলেন। তিনিও ঐকমত্য পোষণ করেন। ইতোমধ্যেই ক্যাপ্টেন অলি জিয়ার নির্দেষে ব্যাটালিয়নের সকল বাঙালি অফিসার ও সৈন্যদের একস্থানে জড়ো করলে তিনি সেখানে তাদের উদ্দেশ্যে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এবং সবাইকে স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানান। তখন সময় ২৫ মার্চ দিবাগত রাত ২.৩০ মিনিট, অর্থাৎ ২৬ মার্চের প্রথম প্রহর। এ কারণেই ২৬ মার্চ আমাদের স্বাধীনতা দিবস।
একই সাথে তিনি তার এ সিদ্ধান্তের কথা স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের জানিয়ে দেয়ার জন্য ক্যাপ্টেন অলিকে নির্দেশ দিলেও তিনি স্থানীয় আওয়ামী লীগের কোনো নেতাকে পাননি। কেননা ইতোমধ্যেই তারা নিরাপত্তার কারণে সরে গিয়েছিল। এরপর ভাষণের পর জিয়াউর রহমান জানান, তাদের কাছে থাকা সীমিত অস্ত্র দিয়ে পাক বাহিনীকে ঠেকিয়ে রাখা যাবে না। তাই তাদের এখান থেকে বের হয়ে বাইরে গিয়ে গেরিলা কায়দায় যুদ্ধ পরিচালনা করতে হবে। সিদ্ধান্ত মোতাবেক ব্যাটালিয়নে সকল পাকিস্তানী অফিসার ও সৈন্যদের হত্যা করে সকল অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে জিয়াউর রহমান বেরিয়ে পড়লেন দেশের স্বাধীনতার লড়াইয়ের এক অনিশ্চিত পথে। বাসায় পড়ে রইলো তার স্ত্রী ও দুই শিশু সন্তান। দেশের মহান মুক্তির স্বার্থে তাদের নিরাপত্তার চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে সম্পূর্ণ অনিরাপদ অবস্থায় রেখেই তিনি বেরিয়ে পড়েন। ক্যান্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে গিয়ে তিনি পটিয়ায় অবস্থানগ্রহণ করেন।
সেখানে অবস্থানকালে তিনি অনুধাবন করেন যে, তারা যে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন এবং যুদ্ধ করছেন এটা দেশবাসী ও বিশ্ববাসীকে জানানো প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে তিনি ২৭ মার্চ কালুরঘাটে স্থাপিত অস্থায়ী বেতারকেন্দ্রে যান এবং নিজেকে অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট ও provisional commander in chief of Bangladesh liberation army ঘোষণা করে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। জিয়াউর রহমান নিজের রচিত ‘একটি জাতির জন্ম’ প্রবন্ধে তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন প্রথম ঘোষণায় তিনি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্বভার নিয়েছেন সে কথা উল্লেখ ছিল। তার এই ঘোষণা সারাদেশে বিদ্যুতের মতো ছড়িয়ে পড়ে এবং পাকিস্তানী আক্রমণের মুখে দিশেহারা সাধারণ মানুষ ও পলায়নপর আওয়ামী লীগের নেতাদের মনে সাহস যোগায়। তারা বুঝতে পারে, জিয়াউর রহমান নাম জনৈক মেজরের নেতৃত্বে তারা বাঙালি সেনা অফিসার ও কর্মকর্তারা ইতোমধ্যেই স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে যুদ্ধ শুরু করেছে। জনগণেরও তাদের পাশে দাঁড়ানো দরকার। জিয়াউর রহমানের এই ঘোষণার ফলে আওয়ামী লীগ ও সাধারণ জনগণ বুকে বল ফিরে পেয়ে বিভিন্ন স্থানে সংগঠিত হতে শুরু করে।
এদিকে চট্টগ্রামের স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ জিয়াউর রহমানের এই ঘোষণায় জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে সন্দেহ করে তাকে শেখ মুজিবুর রহমানের নামে স্বাধীনতার ঘোষণা দ্বিতীয় বার দেয়ার জন্য করার অনুরোধ করেন। দেশপ্রেমিক ও নিঃস্বার্থ জিয়াউর রহমান আওয়ামী লীগের এই অনুরোধ গ্রহণ করে ২৮শে মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানের নামে আরেকটি স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। এই ঘোষণাতেও তিনি নিজেকে মুক্তি বাহিনীর অস্থায়ী প্রধান হিসেবে ঘোষণা করেন। তবে ৩০ শে মার্চ জিয়াউর রহমান একই কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে আরও একটি স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচার করেন। এই ঘোষণায় তিনি আর ‘অন বিভাভ শেখ মুজিবুর রহমান’ উল্লেখ করেননি। পরবর্তীকালে প্রবাসী সরকার গঠিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে এই ঘোষণা বারবার পাঠ করা হয়।
প্রশ্ন উঠতে পারে, বাংলাদেশ যদি ২৬ শে মার্চ স্বাধীন হয় তাহলে ১৭ ই এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠনের পূর্ব পর্যন্ত কে ছিল বাংলাদেশ সরকার প্রধান এই প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা কোন সরকার প্রধান ছাড়া একটি রাষ্ট্র গঠিত হতে পারে না। উত্তর একটাই- শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধান। এরপর তিনি যুদ্ধ করতে করতে রামগড় হয়ে ভারতে গমন করেন। এবং সেখান থেকে পুনরায় সংঘটিত হয়ে বাংলাদেশের ফিরে যুদ্ধ শুরু করেন। প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তাজউদ্দিন আহমদ তার প্রথম ভাষণে বলেছিলেন, ‘এই প্রাথমিক বিজয়ের সাথে সাথে মেজর জিয়াউর রহমান একটি পরিচালনা কেন্দ্র গড়ে তোলেন এবং সেখান থেকেই আপনারা শুনতে পান স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম কণ্ঠস্বর। এখানেই প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠনের কথা ঘোষণা করা হয়।’ অর্থাৎ মুজিবনগর সরকার জিয়াউর রহমানের নিজেকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ঘোষণার দাবি স্বীকৃতি দিয়েছে। অর্থাৎ তাজউদ্দিন আহমেদের এই ভাষণে জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণাকে ‘স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম কণ্ঠস্বর’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। এর পূর্বে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বেতার কর্মীরা স্থানীয়ভাবে শেখ মুজিবুর রহমানের নামে তৈরি করা একটি বক্তব্য স্বাধীনতার ঘোষণা হিসেবে পাঠ করলেও সেটিকে মুজিবনগর সরকার স্বীকৃতি দেয়নি। দিয়েছে জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণাকে যেটিকে তার ভাষায় ‘স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম কণ্ঠস্বর’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছিল।
যদি মুক্তিবাহিনী ব্যর্থ হত, বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করতো না, পাকিস্তানি বাহিনী জয়লাভ করতো তাহলে পরবর্তীকালে যাদেরকে স্বাধীনতার ঘোষক বলে দাবি করা হয়েছে তারা বলতেন, আমরা কোথাও স্বাধীনতার ঘোষণা দিই নি। এমন কোন প্রমাণ নেই। চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রের কিছু কর্মী আমাদের নামে একটি মিথ্যা বয়ান বানিয়ে প্রচার করেছেন। এর কোন দায় আমাদের নেই। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী কর্মকর্তা নিজ দায়িত্বে বিদ্রোহ করেছেন। তাদের প্রতি এধরনের কোন নির্দেশনা আমরা কখনো দিইনি। এর কোন প্রমাণ নেই। এ ধরনের বক্তব্য দিয়ে হয়তো তারা দিব্যি পার পেয়ে যেতেন। কিন্তু মেজর জিয়া এবং তার নেতৃত্বে অষ্টম বেঙ্গল রেজিমেন্টের যে সমস্ত সেনা কর্মকর্তা ও সাধারণ সৈনিকেরা বিদ্রোহে শামিল হয়েছিল, পরবর্তীকালে বিভিন্ন ব্যাটেলিয়ানের যে সমস্ত সেরা কর্মকর্তা ও সৈনিকেরা, ইপিআর, পুলিশ মুক্তিযুদ্ধে শামিল হয়েছিলেন সামরিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও রাষ্ট্রদ্রোহী তার অভিযোগে তাদের সবার নিঃসন্দেহে ফাঁসিতে ঝুলতে হতো। পার পেয়ে যেতেন স্বাধীনতার ঘোষণার কৃতীত্বের মিথ্যা দাবিকারি রাজনৈতিক নেতৃত্ব।
১৯৭১ সালের ১৭ই এপ্রিল প্রবাসী সরকার গঠিত হলে সমগ্র বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধকে ১১ টি সেক্টরে ভাগ করা হয় এবং জিয়াউর রহমান প্রথমে এক নম্বর সেক্টর ও পরে ১১ নম্বর সেক্টরে সেক্টর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১ সালের ৭ জুলাই জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধে প্রথম ব্রিগেড গঠিত হয়। তার নামের অদ্যাক্ষর অনুযায়ী এই ব্রিগেডের নাম দেয়া হয় জেড ফোর্স। এর প্রায় দুই মাস পরে অর্থাৎ সেপ্টেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে কে ফোর্স ও অক্টোবরের এক তারিখে এস ফোর্স নামে আরো দুইটি ব্রিগেড গঠিত হয়। মুক্তিযুদ্ধে সবচেয়ে বেশি বীরত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বাধীন জেড ফোর্স। স্বীকৃতি স্বরূপ স্বাধীনতার পর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বাধীন মুক্তিযোদ্ধারা এসব চেয়ে বেশি বীরত্বপূর্ণ খেতাব অর্জন করেছে। জেড ফোর্সের মোট খেতাবের সংখ্যা ৭৬ টি। এর মধ্যে একজন বীর উত্তম, বীর বিক্রম ১৮ জন এবং ৫৭ জন বীর প্রতীক। মুক্তিযুদ্ধে এত অর্জনের পরেও প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার পর একজন পেশাদার সৈনিক হিসেবে তিনি নিজ পেশায় ফিরে যান এবং দেশ গঠনের কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে সর্বসম্মতভাবে দাবি করা হয়ে থাকে এই সেনাবাহিনী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে গঠিত হয়েছে। প্রশ্ন উঠতে পারে, মুক্তিযুদ্ধের কোন পর্যায়ে, কখন ও কিভাবে এবং কার নেতৃত্বে এই সেনাবাহিনী গঠিত হয়েছে? যেহেতু ইতিহাসে স্বীকৃত যে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সে কারণে এটা স্পষ্ট যে, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে অর্থাৎ ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে চট্টগ্রামের অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে পাকিস্তান সেনাবাহিনী বিদ্রোহ ঘোষণা করে বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য পোষণ এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর জন্ম। আরো স্পষ্ট করে বললে বলা যায়, অষ্টম বেঙ্গল রেজিমেন্টে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যখন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কমান্ডের বিরুদ্ধে ‘উই রিভোল্ট’ বলে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন এবং তার নেতৃত্বে অষ্টম বেঙ্গল রেজিমেন্টের অফিসার ও সৈন্যরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন তখনই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জন্ম। এ কারণেই শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা— এ নিয়ে কোন বিতর্ক বা সন্দেহ থাকার কারণ নেই। তাই আজ সময় এসেছে, জিয়াউর রহমানকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে স্বীকৃতি দেয়ার।
১৯৭৫ সালে উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি সশস্ত্র বাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, পুনর্গঠন, আধুনিকীকরণ এবং বাহিনীর সদস্যদের মনোবল বাড়াতে যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। সে সময় পেশাদারিত্ব ও শৃঙ্খলা আনয়ন, মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে সশস্ত্র বাহিনীতে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। জিয়াউর রহমান বাহিনীর চেইন অব কমান্ড বা শৃঙ্খলার ধারা পুনরুদ্ধার করেন। তিনি সেনাবাহিনীকে রাজনীতি থেকে দূরে রেখে একটি সম্পূর্ণ পেশাদার বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলেন। আধুনিকীকরণ ও সম্প্রসারণ, একটি আধুনিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে তিনি প্রতিটি বাহিনীকে নতুন করে সাজান। নবগঠিত সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বাড়াতে তিনি ট্যাঙ্ক ব্যাটালিয়ন ও আর্টিলারি ইউনিট সম্প্রসারণ করেন। তাঁর রাষ্ট্রপতিত্বের মেয়াদে সেনাবাহিনীর সদস্য সংখ্যা প্রায় ৫০,০০০ থেকে বৃদ্ধি করে ৯০,০০০-এ উন্নীত করা হয়, যা দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। সেনাবাহিনীর সক্ষমতা ও জনবল বাড়াতে তিনি বেশ কয়েকটি নতুন পদাতিক ডিভিশন (যেমন: নবম পদাতিক ডিভিশন, চট্টগ্রামের ২৪ পদাতিক ডিভিশন, বগুড়ার ১১ পদাতিক ডিভিশন) এবং কয়েকটি নতুন ব্রিগেড গঠন করেন। উন্নত প্রশিক্ষণের জন্য তিনি ১৯৭৭ সালে ‘কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজ’ (Defense Services Command and Staff College – DSCSC) প্রতিষ্ঠা করেন। এর পাশাপাশি সৈনিক ও অফিসারদের জন্য সামরিক প্রশিক্ষণ অ্যাকাডেমি ও স্কুলগুলোর আধুনিকায়ন করেন। চট্টগ্রামের ভাটিয়ারীতে অবস্থিত বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি (বিএমএ)-কে পূর্ণাঙ্গ ও আধুনিক রূপ দেওয়া হয় তাঁর সময়েই। চীন এবং অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে সফল কূটনৈতিক সম্পর্কের মাধ্যমে সামরিক বাহিনীতে আধুনিক ট্যাংক, আর্টিলারি এবং উন্নত স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র যুক্ত করা হয়। সেনাবাহিনীর মনোবল চাঙ্গা রাখতে তিনি অফিসার ও সৈনিকদের জন্য রেশন ব্যবস্থা, উন্নত আবাসন, বেতন কাঠামো সংস্কার এবং কল্যাণমূলক ট্রাস্ট গঠন করেন।
নৌবাহিনীতে নতুন যুদ্ধজাহাজ যুক্ত করা হয় এবং বিমানবাহিনীর রাডার নেটওয়ার্ক আধুনিকীকরণ করা হয়।প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট: বাহিনীর সদস্যদের উন্নত ও আধুনিক প্রশিক্ষণের জন্য তিনি বিভিন্ন মিলিটারি একাডেমি ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।৩. “সশস্ত্র বাহিনী দিবস” প্রবর্তনসশস্ত্র বাহিনীর সকল শাখায় (সেনা, নৌ ও বিমান) পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সমন্বয় বৃদ্ধির জন্য তিনি ২১ নভেম্বরকে ‘সশস্ত্র বাহিনী দিবস’ হিসেবে প্রবর্তন করেন। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে পথচলা তাঁর শাসনামলেই বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সামরিক কূটনীতির বড় সাফল্য অর্জন করে এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে (UN Peacekeeping Missions) বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের অংশগ্রহণ শুরু হয়।৫. কল্যাণমূলক কার্যক্রমসেনা সদস্যদের জীবনমান উন্নয়ন এবং তাদের পরিবারের কল্যাণে তিনি ক্যাডেট কলেজ প্রতিষ্ঠা, সৈনিক স্কুল, মিলিটারি হাসপাতাল এবং কল্যাণ ট্রাস্ট গঠন করেন।
১৯৭৮ সালে তৎকালীন বাংলাদেশ রাইফেলস (BDR)-কে উইং পদ্ধতির পরিবর্তে ব্যাটালিয়ন কাঠামোতে রূপান্তর করে সামরিক কায়দায় পুনর্গঠন করা হয়। সীমান্ত রক্ষার সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে দক্ষ ও মেধাবী কর্মকর্তাদের প্রেষণে (Deputation) সীমান্তরক্ষী বাহিনীতে পাঠানোর হার বাড়িয়ে দেন। ১৯৭৬ সালে তাঁর সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনায় প্রান্তিক ও তৃণমূল পর্যায়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য স্বেচ্ছাসেবী ‘গ্রাম প্রতিরক্ষা দল (ভিডিপি)’ গঠন করা হয়। তাঁর আমলেই দেশের নিরাপত্তা ও পিপলস আর্মি তথা গণপ্রতিরক্ষার ধারণাকে ভিত্তি করে আনসার ও ভিডিপিকে একত্রিত করে এক শক্তিশালী ও সুসংগঠিত বাহিনীতে রূপ দেওয়া হয়। বর্তমানে প্রায় ৬১ লাখ সদস্যের এই বাহিনী দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, জাতীয় নির্বাচন, ভিভিআইপি প্রটোকল এবং দুর্যোগ মোকাবেলায় অন্যান্য বাহিনীকে সর্বাত্মক সহায়তা প্রদান করে আসছে। এটি বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ রিজার্ভ ফোর্স।
জিয়াউর রহমান যেন ছিলেন বাংলাদেশের এক চারণ কবি। ৫৬ হাজার বর্গমাইল জুড়ে উন্নয়নের গল্প ও কবিতা লেখার জন্য তিনি যখন চষে বেড়াচ্ছেন তখন যারা চায় না বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে স্বনির্ভর ও শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াক তারা নিশ্চুপ বসেছিল না। জিয়াউর রহমানকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে একের পর এক নানা ষড়যন্ত্রের জাল তারা বিছিয়ে গেছেন পুরো সময়টা ধরে। একের পর এক সেনা অভ্যুত্থানের চেষ্টা জিয়াউর রহমানকে মোকাবেলা করতে হয়েছে। সামান্য কয়েক বছরের মধ্যে জিয়াউর রহমানকে ক্ষমতা ও পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেয়ার জন্য ২১ টিরও অধিক সেনা অভ্যুত্থানের চেষ্টা হয়েছিল। জিয়াউর রহমান সেগুলো সফলভাবে ব্যর্থ করে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। সর্বশেষ ১৯ ৮১ সালের ৩০ মে যে চট্টগ্রামে নিজ ও পরিবারের জীবন বাজি রেখে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন সেই চট্টগ্রামেই ঘাতকের গুলি নিভিয়ে দেয় বাংলাদেশের ইতিহাসের সৎ, সফল ও দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়কের জীবনের আলো। জিয়াউর রহমান এমন একজন ক্ষণজন্মা পুরুষ এমন একজন রাষ্ট্রনায়ক যার সম্পর্কে কেমন জীবনানন্দ দাশের শঙ্খমালা কবিতার একটি লাইন উচ্চারণ করা যায়, এ পৃথিবী একবার পায় তারে, পায় না কো আর। আমাদের জাতীয় জীবনে আরেকজন জিয়াউর রহমানের আর জন্ম হবে না। আমরা আর কোন জিয়াউর রহমানকে পাব না। কিন্তু তার রেখে যাওয়া দর্শন, রাজনীতি, আদর্শ, নির্দেশনা, দেশপ্রেম, সততা, দৃষ্টান্ত ও কার্যক্রম বাংলাদেশের ১৮ কোটি দেশ প্রেমিক মানুষের চেতনার বাতিঘর হয়ে স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষার কবচ এবং উন্নত সুখী ও সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ গড়ার মূলমন্ত্র হিসেবে টিকে রয়েছে আমাদের মাঝে।
লেখকঃ সিনিয়র সংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, গবেষক,সম্পাদক, পার্বত্যনিউজ।
