জেএসএস এর প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষ্যে বিশেষ লেখা

যে কারণে জেএসএস পাহাড়ে সেনা উপস্থিতির বিরোধিতা করছে

fec-image

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জে.এস.এস) হলো বাংলাদেশের একটি রাজনৈতিক দল যা চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চলের উপজাতিদের অধিকার আদায়ের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ সৃষ্টির পর পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা রাজনীতিবিদরা বাংলাদেশের সংবিধানের খসড়ার প্রতিবাদ করে। যদিও সংবিধানে জাতিগত পরিচয় স্বীকৃত ছিল কিন্তু তারা বাংলাদেশ থেকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন চেয়েছিলেন। পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন বাস্তবায়নের লক্ষে চাকমা প্রতিনিধি ও কর্মীরা সহ মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার নেতৃত্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) প্রতিষ্ঠা করে।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ২৪ এপ্রিল ১৯৭২ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় নেতারা সরকারের কাছে অসঙ্গতিপূর্ণ বিভিন্ন দাবি পেশ করলে সরকার তা প্রত্যাখ্যান করে। সরকার তাদের দাবি প্রত্যাখ্যান করার কারণে ১৯৭৩ সালের ৭ জানুয়ারি মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার নেতৃত্বে জেএসএস এর একটি  সামরিক শাখা শান্তিবাহিনী প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়া হয়। জনসংহতি সমিতি ও শান্তিবাহিনীর সদর দপ্তর ছিল বর্তমান খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালা উপজেলার দুর্গম অরণ্যে। ১৯৭৪ সালে বিপুল সংখ্যক পাহাড়িদেরকে সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে শান্তিবাহিনীর অন্তর্ভূক্ত করা হয়। নিয়মিত বাহিনী ছাড়াও সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ প্রাপ্তদের নিয়ে মিলিশিয়া বাহিনী গঠিত হয়। সামগ্রিক প্রস্তুতি গ্রহণ শেষে শান্তিবাহিনী ১৯৭৬ সালের প্রথমদিকে  সশস্ত্র তৎপরতা শুরু করে।

শান্তিবাহিনী পার্বত্য এলাকায় বসবাসকারী বাঙালিদের আক্রমণ ও হত্যা, নিরাপত্তা বাহিনীকে আক্রমণ, তাদের মতাদর্শ বিরোধী উপজাতীয়দের হত্যা, সরকারি সম্পদের ক্ষতিসাধন, অপহরণ ও বলপূর্বক চাঁদা আদায়সহ বিভিন্ন ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ শুরু করে। ১৯৮৩ সালের ১০ নভেম্বর অন্তর্দলীয় কোন্দলে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা নিহত হবার পূর্ব পর্যন্ত জনসংহতি সমিতি বা শান্তিবাহিনীর নেতৃত্ব দেন। মানবেন্দ্র লারমার হত্যাকান্ডের পর শান্তিবাহিনী দ্বিধাবিভক্ত হয়ে (লারমা ও প্রীতি গ্রুপ) আত্মঘাতি সংঘর্ষে লিপ্ত হয়।

বাংলাদেশ সরকার সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা দিয়ে এবং স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য শান্তিবাহিনীর সদস্যদের পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে শান্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয় এবং তাদের প্রতি অস্ত্র সমর্পণ ও বিদ্রোহ সংঘাত বন্ধ করার আহবান জানায়। প্রীতি গ্রুপের অধিকাংশ নেতা-কর্মী ১৯৮৫ সালের ২৯ এপ্রিল আত্মসমর্পণ করে। কিন্তু লারমা গ্রুপ নাশকতামূলক কর্মকান্ড অব্যাহত রাখে। ইতোমধ্যে শান্তিবাহিনীর ফিল্ড কমান্ডার জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা জনসংহতি সমিতির সভাপতি নিযুক্ত হন (১৯৮৫)। এরপর বিভিন্ন সময়ে সরকার ও শান্তিবাহিনীর মধ্যে সমঝোতার উদ্যোগ গৃহীত হয়। ১৯৯১-৯৬ মেয়াদের জন্য নির্বাচিত সরকার পূর্ববর্তী সকল সরকারের নেয়া শান্তি প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখেন। অবশেষে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করে।

১৯৯৯ সালে জনসংহতি সমিতির ষষ্ঠ মহাসম্মেলনে শান্তিবাহিনীর আনুষ্ঠানিক বিলুপ্তি ঘোষণা করা হয়। কিন্তু আজ পর্যন্ত ও শান্তিবাহিনীর নাশকতামূলক কর্মকান্ড অব্যাহত রয়েছে।

পার্বত্য চট্রগ্রামে শান্তুবাহিনী কর্তৃক সংগঘটিত উল্লেখযোগ্য গণহত্যা সমূহ-যা প্রত্যক্ষভাবে সন্তু লারমার নেতৃত্বে হয়, যেমনঃ
১। ১৯ ডিসেম্বর ১৯৭৯ সালে, লংগদু গণহত্যায় ৩২০ জনের অধিক বাঙ্গালীকে হত্যা করে।
২। ২৬ জুন ১৯৮১ সালে, বেলছড়ি গণহত্যায় ৫০০ জনের অধিক বাঙ্গালীকে হত্যা করে।
৩। ২৬ জুন ১৯৮৩ সালে, তারাবনছড়ি গণহত্যায় ১০০০ জনের অধিক বাঙ্গালীকে হত্যা করে।
৪। ৩১ মে ১৯৮৪ সালে, ভূষণছড়া গণহত্যায় ৪০০ জনের অধিক বাঙ্গালীকে হত্যা করে।
৫। ২৯ এপ্রিল ১৯৮৬ সালে, পানছড়ি, দিঘীনালা, তাইন্দ্ , মাটিরাঙা সহ চারটি স্থানে গণহত্যা চালিয়ে ৮৫৩ জন বাঙ্গালীকে হত্যা করে।
৬।  ৮,৯,১০ই আগস্ট ১৯৮৮ সালে, পাবলাখালী গণহত্যায় ৫০০ জনের অধিক বাঙ্গালীকে হত্যা করে।
৭। ৯ ই সেপ্টেম্বর ১৯৯৬ সালে, পাকুয়াখালী গণহত্যায় ৩৫ জন বাঙ্গালীকে হত্যা করে।

১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে সংগঠনটি স্বায়ত্তশাসন ও জাতিগত পরিচয়ের স্বীকৃতি এবং পার্বত্য অঞ্চলের উপজাতির অধিকারের জন্য লড়াই করে আসছে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে এক নরকীয় তান্ডব চালিয়ে যাচ্ছে জেএসএস সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠনটি। এ সংগঠনগুলোর সাম্প্রতিক বেশ কিছু আলোচিত সহিংস ঘটনা সরকারকে নতুন করে ভাবাচ্ছে। অভ্যন্তরীণ সংঘাত বৃত্ত ভেঙে এখন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত গিয়ে ঠেকছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নিরীহ জনগোষ্ঠী।

আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর আধিপত্যের লড়াই, চাঁদাবাজি, খুনোখুনিতে ভয়-আতঙ্কে দিন কাটাতে হচ্ছে সাধারণ লোকজনকে।জেএসএস সন্ত্রাসীরা বৃহত্তর স্বার্থে পাহাড়ে বাঙালীদের এবং নিরাপত্তাবাহিনীর অবস্থান সমর্থন করে না। যার ফলশ্রুতিতে অএ অঞ্চল সমূহের পাহাড়ী-বাঙালীর সম্প্রীতি ও সম্ভাবমূলক সহাবস্থান অনেক সময়ই হয়ে পড়েছে হুমকির সম্মুখীন। গত ২৬ আগষ্ট ২০০৩ সালে খাগড়াছড়ির মহালছড়িতে পাহাড়ী বাঙালীদের মধ্যে ঘটে যাওয়া রক্তক্ষয়ী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। পার্বত্য চট্টগ্রামে নিরাপত্তা বাহিনীর অবস্থান অতীব গুরুত্বপূর্ণ। দেশের স্বাধীনতা স্বার্বভৌমত্ব তথা ভৌগলিক অখন্ডতার স্বার্থে অত্র অঞ্চলে সেনাবাহিনী তথা অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের কথা নিঃসন্দেহে অনস্বীকার্য। কিন্তু জেএসএস ও তাদের সমর্থন প্রাপ্ত বিভিন্ন অংগ সংগঠন সমূহ পার্বত্য চট্টগ্রামে নিরাপত্তাবাহিনীর উপস্থিতির ব্যাপারে প্রতিনিয়তই বিরোধিতা করে আসছে।

কারন, এক হাতে তো তালি বাজে না। দীর্ঘ পরম্পরায় বিগত পঞ্চাশ বছর ধরে বিভিন্ন সময়ে সেনাবাহিনী তথা নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে শান্তিবাহিনীর বন্দুকযুদ্ধে উভয়পক্ষের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কর্মী নিহত হয়। পাহাড়ে অবস্থানকালীন শান্তিবাহিনী যদি কাউকে ভয় পেয়ে থাকে তাহলে একমাত্র সেনাবাহিনীকেই। দেশের সার্বভৌমত্ব তথা পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তারই ধারাবাহিকতায় সেনাবাহিনীর অবস্থান উক্ত অঞ্চলের সাধারণ পাহাড়ি-বাঙালিদের অধিকার ও অবাধ ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনার নিমিত্তেই। যা উক্ত সন্ত্রাসী কর্তৃক কখনোই গ্রহণযোগ্যতা পাবে না। সেনাবাহিনীর আধিপত্যের কারনে আজ তারা  এতটা ভিত সন্ত্রস্ত।

সেনাবাহিনী চাইলেই তাদের এক ঘণ্টার মধ্যে বিতাড়িত করে পুরো পার্বত্য অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে। কিন্তু বিতাড়িত এইসব শরণার্থী উপজাতি যারা (মিয়ানমার, ত্রিপুরা, মিজোরাম) বাংলাদেশের স্বাধীনতা উত্তর থেকে স্বায়ত্তশাসন ও জাতিগত পরিচয়ের স্বীকৃতি গ্রহণ করার পায়তারা করছে। উত্তরন্ত তারা এটাকে অধিকার দাবী করে আলাদা “জুম্মল্যান্ড” প্রতিষ্ঠা করতে উদ্ধত রয়েছে। বাঙালিরা- থানচি, নীলগিরী, সাজেক, মেরুন, হরিনা, বরকল, রুমা, বগালেক, আলুটিলা, রাইনখ্যাং পুকুরসহ বিভিন্ন পর্যটন স্থান সমূহের মধ্যে বেড়াতে যেতে পারত না, যদি না সেনাবাহিনী এই জায়গাগুলোকে জয় করত। সন্ত্রাসী সংগঠন জেএসএস এর প্রধান চাঁদাবাজির উৎসসমূহ উল্লেখ করা হলোঃ-
১। কাঠ ও বাঁশ বেত (সেগুন কাঠ ও বন উজার)।
২। বিভিন্ন টেন্ডার কৃত প্রতিষ্ঠান।
৩। মৎস্য আরোহণ কৃত জেলেদের কাছ থেকে।
৪। উৎপাদিত কৃষি পণ্যের উপর গরিব চাষিদের কাছ থেকে (আদা-হলুদ চাষি)।
৫। বিভিন্ন পরিবহন ও জলযান সমূহ থেকে।
৬। বিভিন্ন  ফলচাষীদের কাছ থেকে (আনারস/কলা ইত্যাদি)।
৭। পশুপাখি (গুরু-ছাগল) ও হাট-বাজারের ইজারাদারের কাছ থেকে।
৮। বিভিন্ন ভোগ্য পণ্য সরবরাহকারী সংস্থার/কোম্পানীর কাছ থেকে।

এছাড়াও অসহায় মানুষকে বন্দুকের নলা দেখিয়ে সন্তু লারমার সন্ত্রাসী বাহিনী বছরে প্রায় ৭০০ কোটি টাকার মত চাঁদা আদায় করে থাকে। নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতির কারণে তাদের সন্ত্রাসী কর্মকান্ড ও প্রধান আয়ের উৎসসমূহ অনেকাংশেই ব্যাহত হয়। তাছাড়া তাদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মকান্ড এবং অস্ত্রসহ স্বাভাবিক চলাচল বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। এ সমস্ত কারণে তারা পার্বত্য চট্টগ্রাম হতে সেনাবাহিনী তথা নিরাপত্তা বাহিনী অপসারণের জন্য প্রতিনিয়তই সরকারের নিকট দাবি জানিয়ে আসছে। কিন্তু এতদ-অঞ্চলের বসবাসকারী পাহাড়ী বাঙালিদের মধ্যে সুসম্পর্ক ও সম্প্রীতি বজায় রেখে সাম্প্রদায়িক কলহ রোধকল্পে এবং সরকার বিরোধী সশস্ত্র গ্রুপগুলোর চক্রান্ত ও কার্যকলাপ প্রতিহত করে সর্বোপরি দেশের স্বাধীনতা ও ভৌগলিক অখন্ডতা রক্ষার জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামে নিরাপত্তা বাহিনীর অবস্থান ও গৌরবময় কর্মকান্ড নিঃসন্দেহে প্রসংশার দাবিদার।

ধিক্কার জানাই এই সমস্ত নোংরা, রক্তচোষা, অমানুষ ও ছোট ছোট নৃ-গোষ্ঠীর সমন্বয়ে গঠিত সন্ত্রাসী গোষ্ঠী জেএসএসকে।

গতকাল ছিল এই তথাকথিত জেএসএস বা শান্তিবাহিনীর প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী। তাই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই মহেন্দ্র মুহূর্তে এই নরপিশাচ, অত্যাচারী, স্বার্থপর এবং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব বিরোধী দুষ্ট এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর চিরতরে বিলুপ্তি ঘোষণা করা হোক।

লেখক: পরিচালক, জাতিতাত্ত্বিক জাদুঘর
আগ্রাবাদ, চট্টগ্রাম।

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: জনসংহতি সমিতি, জেএসএস
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

6 + 4 =

আরও পড়ুন