টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের নতুন চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়া

fec-image

ওয়ানডে বিশ্বকাপে রেকর্ড পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়ার টি২০’র ট্রফিটা ছিল অধরা। অবশেষে প্রায় দেড় দশকের অপেক্ষার অবসান হলো। এ্যারন ফিঞ্চের হাত ধরে ছোট্ট ফরমেটের ধুন্ধুমার ক্রিকেটের সপ্তম আসরে এসে প্রথম শিরোপার স্বাদ পেল অসিরা। দুবাই ইন্টারন্যাশনাল স্টেডিয়ামে রোববার ৮ উইকেটে জিতেছে অস্ট্রেলিয়া। নিউ জিল্যান্ডের ১৭২ রান ছাড়িয়ে গেছে ৭ বল বাকি থাকতে। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালে এটাই সর্বোচ্চ রান তাড়া করে জয়।

শুরু থেকেই উইকেটে ছিল ব্যাটসম্যানদের জন্য সহায়তা। সময় গড়ানোর সঙ্গে ব্যাটিং হয়ে যায় আরও সহজ। কন্ডিশন কাজে লাগিয়ে দলকে জয়ের বন্দরে নিয়ে যান মার্শ। ৫০ বলে ৪টি ছক্কা ও ৬টি চারে ৭৭ রানে অপরাজিত এই টপ অর্ডার ব্যাটসম্যানকে দারুণ সঙ্গ দেন ডেডিড ওয়ার্নার ও ম্যাক্সওয়েল।

বিশ্বকাপ ফাইনালে সর্বোচ্চ রান করেও খুব একটা লড়াই করতে পারেনি নিউ জিল্যান্ড। তাদের সাদামাটা বোলিংয়ের বিপরীতে মার্শ, ওয়ার্নার, ম্যাক্সওয়েলদের দারুণ ব্যাটিংয়ে পার্থক্য গড়ে যায় অনায়াসে। পুরোটা সময়ই কিউই বোলারদের ওপর ছড়ি ঘুরিয়ে গেছেন তারা।

দুবাইয়ে টস হারা মানেই যেন ম্যাচ হেরে যাওয়া। এই আসরেই যেমন ফাইনালের আগে এখানে প্রথমে ব্যাট করা দল জিততে পারে কেবল একটি ম্যাচ; স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে জিতেছিল নিউ জিল্যান্ডই। এর পুনরাবৃত্তি করা কতটা কঠিন জেনেই টস হেরে ব্যাটিং পাওয়ার পর শুরু থেকে দ্রুত রান তোলার চেষ্টা করে দলটি।

প্রথম দুই ওভারে বাউন্ডারি মারেন মার্টিন গাপটিল। তৃতীয় ওভারে ম্যাক্সওয়েলকে ছক্কায় স্বাগত জানান ড্যারিল মিচেল। তবে ডানা মেলার মুহূর্তে তাদের জুটি ভেঙে দেন জশ হেইজেলউড। তার স্লোয়ারে কট বিহাইন্ড হন মিচেল।

শুরুতে দুটি বাউন্ডারি মারা গাপটিল ভুগছিলেন টাইমিং পেতে। সময় লাগছিল উইলিয়ামসনেরও। পাওয়ার প্লেতে স্রেফ ৩২ রান তোলা নিউ জিল্যান্ড প্রথম ১০ ওভারে করে কেবল ৫৭।

রানের জন্য হাঁসফাঁস করা গাপটিলের বিদায়ে ভাঙে ৪৫ বল স্থায়ী ৪৮ রানের জুটি। লেগ স্পিনার অ্যাডাম জ্যাম্পাকে স্লগ করে ছক্কায় ওড়ানোর চেষ্টায় ডিপ মিডউইকেটে ধরা পড়েন এই ওপেনার। স্বভাববিরুদ্ধ ব্যাটিংয়ে ৩৫ বলে তিন চারে করেন কেবল ২৮ রান।

গাপটিলের আগেই ফিরতে পারতেন উইলিয়ামসন। মিচেল স্টার্কের বাজে এক ডেলিভারিতে ঠিক মতো টাইমিং করতে না পেরে সীমানায় ক্যাচ দেন নিউ জিল্যান্ড অধিনায়ক। কিন্তু সহজ ক্যাচ মুঠোয় জমাতে পারেননি হেইজেলউড। তার হাত ফস্কে বাউন্ডারি পেয়ে যান উইলিয়ামসন।

২১ বলে ২১ রানে জীবন পাওয়ার পর ডানা মেলেন ডানহাতি এই ব্যাটসম্যান। স্টার্ককে পরের দুই বলে মারেন দুটি চার। এর শেষটি ছিল আবার ‘নো’ বল। ওভার থেকে আসে ১৯ রান।

এক ওভার পর ম্যাক্সওয়েলকে দুই ছক্কা মারেন উইলিয়ামসন। দ্বিতীয় ছক্কায় ৩২ বলে ফিফটিতে পৌঁছান তিনি। সঙ্গে গড়েন বিশ্বকাপের ফাইনালে দ্রুততম ফিফটির রেকর্ড।
গ্লেন ফিলিপসের সঙ্গে উইলিয়ামসের জুটিতে রান আসতে থাকে দ্রুত। ২৬ বলে তাদের জুটির রান স্পর্শ করে পঞ্চাশ। ষোড়শ ওভারে স্টার্ককে চারটি চারের সঙ্গে একটি ছক্কায় ২২ রান নেন নিউ জিল্যান্ড অধিনায়ক।

অষ্টাদশ ওভারে চার বলের মধ্যে থিতু দুই ব্যাটসম্যানকে ফিরিয়ে দেন হেইজেলউড। ডিপ মিডউইকেটে ফিলিপস ক্যাচ দিলে ভাঙে ৩৭ বল স্থায়ী ৬৮ রানের জুটি।

গত আসরের শিরোপা লড়াইয়ে ৮৫ রান করেছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের মারলন স্যামুয়েলস। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালে ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ রানের ওই রেকর্ড ছুঁয়েই ফেরেন উইলিয়ামসন। তার ৪৮ বলের ইনিংসটি গড়া ১০ চার ও তিন ছক্কায়। জীবন পাওয়ার পর ২৭ বলে করেন ৬৪ রান। তার ঝড়ো ব্যাটিংয়ে শেষ ১০ ওভারে নিউ জিল্যান্ড তোলে ১১৫ রান।

শেষ দিকে জিমি নিশাম ও টিম সাইফার্টের ব্যাটে ১৭২ পর্যন্ত যায় নিউ জিল্যান্ডের সংগ্রহ। বিশ্বকাপের ফাইনালে এটাই সর্বোচ্চ রান। রান তাড়ায় যা ভেঙে দেয় অস্ট্রেলিয়া।

ফাইনালে আগের সর্বোচ্চ ছিল প্রথম আসরে পাকিস্তানের বিপক্ষে ভারতের ১৫৭।

খরুচে বোলিংয়ে ৪ ওভারে ৬০ রান দিয়ে উইকেটশূন্য বাঁহাতি পেসার স্টার্ক। ফাইনালে এটাই সবচেয়ে খরুচে বোলিং। বিশ্বকাপে তার চেয়ে খরুচে বোলিং আছেই কেবল তিনটি। আগের ম্যাচের খরুচে বোলিং ভুলে হেইজেলউড ৩ উইকেট নেন কেবল ১৬ রানে।

রান তাড়ায় শুরুটা ভালো হয়নি অস্ট্রেলিয়ার। তৃতীয় ওভারে ট্রেন্ট বোল্টের বলে মিচেলের চমৎকার ক্যাচে ফিরে যান অধিনায়ক অ্যারন ফিঞ্চ।

শুরুতে উইকেট হারানোর কোনো প্রভাব অবশ্য পড়তে দেননি ওয়ার্নার ও মার্শ। অ্যাডাম মিল্নকে ছক্কায় ওড়ানোর পর টানা দুই চার মারেন মার্শ। প্রথম তিন বলে ১৪ রান করা ডানহাতি এই ব্যাটসম্যান এগোতে থাকেন দারুণ গতিতে। যোগ্য সঙ্গ দেন ওয়ার্নার। দ্রুত জমে যায় জুটি।

অনুমিতভাবে সময় গড়ানোর সঙ্গে সহজ হয়ে যায় ব্যাটিং। স্কিড করে দ্রুত ব্যাটে আসতে থাকে বল। সুবিধা কাজে লাগান দুই ব্যাটসম্যান।

নবম ওভারে ইশ সোধিকে দুই চারের সঙ্গে ওয়ার্নার মারেন ছক্কা। একাদশ ওভারে জিমি নিশামকে দুই ব্যাটসম্যানই ওড়ান ছক্কায়। ৩৪ বলে ওয়ার্নার স্পর্শ করেন ফিফটি। এরপর বেশি দূর যেতে পারেননি তিনি। বোল্টের দারুণ এক ডেলিভারিতে হয়ে যান বোল্ড। ভাঙে ৫৯ বলে গড়া ৯২ রানের জুটি।
৩৮ বলে খেলা বাঁহাতি ওপেনারের ৫৩ রানের ইনিংস গড়া তিন ছক্কা ও চারটি চারে।

বড় জুটির সঙ্গী ফিরে গেলেও থামেননি মার্শ। সোধিকে ছক্কা মেরে ৩১ বলে স্পর্শ করেন ফিফটি। ভেঙে দেন প্রথম ইনিংসে উইলিয়ামসনের গড়া ফাইনালে দ্রুততম ফিফটির রেকর্ড।ম্যাক্সওয়েলের সঙ্গে মার্শের জুটি

পঞ্চাশ স্পর্শ করে কেবল ২৬ বলেই। এরপরও একই গতিতে এগিয়ে গিয়ে ১৯তম ওভারেই দলকে জয়ের বন্দরে নিয়ে যান দুই ব্যাটসম্যান। ৭৭ রান করে ম্যাচ সেরা মার্শ। তার সঙ্গে ৬৬ রানের জুটিতে ম্যাক্সওয়েলের অবদান ১৮ বলে ২৮।

সংক্ষিপ্ত স্কোর:

নিউ জিল্যান্ড: ২০ ওভারে ১৭২/৪ (গাপটিল ২৮, মিচেল ১১, উইলিয়ামসন ৮৫, ফিলিপস ১৮, নিশাম ১৩*, সাইফার্ট ৮*; স্টার্ক ৪-০-৬০-০, হেইজেলউড ৪-০-১৬-৩, ম্যাক্সওয়েল ৩-০-২৮-০, কামিন্স ৪-০-২৭-০, জ্যাম্পা ৪-০-২৬-১, মার্শ ১-০-১১-০)।

অস্ট্রেলিয়া: ১৮.৫ ওভারে ১৭৩/২ (ওয়ার্নার ৫৩, ফিঞ্চ ৫, মার্শ ৭৭*, ম্যাক্সওয়েল ২৮*; বোল্ট ৪-০-১৮-২, সাউদি ৩.৫-০-৪৩-০, মিল্ন ৪-০-৩০-০, সোধি ৩-০-৪০-০, স্যান্টনার ৩-০-২৩-০, নিশাম ১-০-১৫-০)।

ফল: অস্ট্রেলিয়া ৮ উইকেটে জয়ী

ম্যান অব দা ম্যাচ: মিচেল মার্শ

ম্যান অব দা টুর্নামেন্ট: ডেডিড ওয়ার্নার

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

6 − 4 =

আরও পড়ুন