ঠিকাদারের কৌশল, মাদক কারবার নিরাপদ করতে এনজিওতে পরিবহন সরবরাহের অভিযোগ

fec-image

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকে পরিবহন সরবরাহের নামে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মাদক কারবারের অভিযোগ ওঠেছে। রয়েছে টেন্ডারে অনিয়মেরও বিস্তর অভিযোগ। এসব কাজে একটি চিহ্নিত মাদক কারবারি জড়িত। মাদক মামলার আসামিদের পাশাপাশি অনভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তিদের নির্বাচনের চেষ্টা চালাচ্ছে ব্রাকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। -এমন অভিযোগ করেছে বেশ কয়েকজন ব্যক্তি।

অভিযোগ উঠেছে, এনজিও সংস্থার গাড়ি ব্যবহার করে ইয়াবাপাচারের উদ্দেশ্যে চিহ্নিত কতিপয় ব্যক্তি কৌশলে ব্র্যাককে পরিবহন সরবরাহের চেষ্টা চালাচ্ছে। এতে পরিবহন সেক্টরের নির্ধারিত মূল্যের চাইতে কম দামে টেন্ডার প্রদানও করেছে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। ইতোমধ্যে ব্র্যাকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে মাসিক কমিশনের শর্তে পরিবহন সরবরাহকারি হিসাবে মাদকপাচারে অভিযুক্ত থাকা এসব প্রতিষ্ঠানকে চূড়ান্ত করা হয়েছে।

টেন্ডার প্রদানকারি কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান ও ব্র্যাকের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গত বছরের ১৩ নভেম্বর ব্র্যাকের একটি মাইক্রোবাস থেকে ইয়াবাসহ চালককে আটক করে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী। যে কারণে ১৫ নভেম্বর থেকে পরিবহন সরবরাহকারি ‘সাইরা রেন্ট এ কার’ নামের প্রতিষ্ঠানটি সাথে চুক্তি বাতিল করে। এর কিছুদিন পর ব্র্যাকের পক্ষে পরিবহন সরবরাহকারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে টেন্ডার দাখিল করতে বিজ্ঞপ্তি প্রচার করা হয়। বিজ্ঞপ্তিটি প্রচারের পর বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান টেন্ডার জমা দেয়। টেন্ডার জমা দানকারি এসব প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ৬টির সাথে চুক্তিবদ্ধ হতে চুড়ান্তভাবে নির্বাচিত করে ব্র্যাক।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ব্র্যাকের আরেক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, হিমেল মোটরস, পূণ্য পাওয়ার অটো সলিউশন, রাকিব এন্টারপ্রাইজ, মোহনা এন্টারপ্রাইজ, সাস কার ও নাইমা এন্টারপ্রাইজ নামের প্রতিষ্ঠানের সাথে পরিবহন সরবরাহকারি হিসেবে ব্র্যাকের চুক্তি করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। টেন্ডার জমা দানকারি এসব নির্বাচিত প্রতিষ্ঠান প্রধানকে ইতোমধ্যে মোবাইল ফোনে ক্ষুদ্রবার্তা (এসএমএস) পাঠিয়ে ইতিমধ্যে ব্র্যাকের পক্ষ থেকে চুক্তির বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে।

কিন্তু ব্র্যাকের কাছে পরিবহন সরবরাহের জন্য নির্বাচিত এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উঠেছে। টেন্ডার জমা দানকারি কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরা জানিয়েছেন, চুক্তিবদ্ধ হতে নির্বাচিত পূর্ণ পাওয়ার অটো সলিউশন অনভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠান হলেও শর্ত লংঘন করে নির্বাচিত করা হয়েছে।

তাদের দাবি, ব্র্যাকের প্রচারিত বিজ্ঞপ্তিতে টেন্ডার জমা দানের জন্য ২ লাখ টাকার জামানতের কথা উল্লেখ থাকলেও পূণ্য পাওয়ার অটো সলিউশন জমা দিয়েছে সাড়ে ৩ লাখ টাকা। অতিরিক্ত দেড় লাখ টাকা জামানত জমা দান নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে নানা রহস্যের। এছাড়া বিজ্ঞপ্তির শর্তে পরিবহন সরবরাহকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে ২ বছরের অভিজ্ঞতা, নিজস্ব পরিবহন ও পার্কিংয়ের ব্যবস্থার পাশাপাশি ইতোপূর্বে অন্তত ৫ টি প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তি সম্পাদনের অভিজ্ঞতার কথা বলা হলেও এই প্রতিষ্ঠানটির সেই সবের কিছুই নেই।

অন্যদিকে চুক্তির জন্য নির্বাচিত প্রতিষ্ঠান প্রধান কোন সরকারি চাকুরিজীবী হওয়া যাবে না বলে শর্ত রয়েছে। অথচ পূণ্য পাওয়ার অটো সলিউশনের প্রধান হাবিব উল্লাহ খান সরকারি চাকুরিজীবী। তিনি বাংলাদেশ বিমানের কর্মরত। প্রতিষ্ঠানটি টেন্ডার দাখিলের ক্ষেত্রে যে মূল্য উল্লেখ করেছে তা পরিবহন সেক্টরের বর্তমান বাজারদরের চাইতে কম। কম টাকায় পরিবহন সরবরাহ করার ক্ষেত্রে অন্য কোন অসৎ উদ্দেশ্য আছে কিনা তা যাচাই-বাছাই করার দাবি চুক্তি বঞ্চিত অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টদের।

গত বছরের ১৩ নভেম্বর একটি মাইক্রোবাসে ইয়াবাসহ চালক আটকের ঘটনায় পরিবহন সরবরাহকারি সাইরা রেন্ট এ কার নামের প্রতিষ্ঠানটির সাথে চুক্তি বাতিল করেছিল ব্র্যাক। অথচ একই চুক্তিটির জন্য নির্বাচন হয় রাকিব এন্টারপ্রাইজ, যে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান মোহাম্মদ ইউনুছ একজন চিহ্নিত মাদক কারবারি। যার বিরুদ্ধে মাদক আইনসহ নানা অপরাধে ৭টি মামলা রয়েছে বলে তথ্য দিয়েছে পুলিশ।

পুলিশের দেয়া তথ্য মতে, গত ২০১৫ সালে ২৯ মার্চ ডিবি পুলিশের অভিযানে মাদকদ্রব্যসহ আটক হয় মোহাম্মদ ইউনুছ। এ ব্যাপারে ডিবির এসআই আমিরুল ইসলাম বাদি হয়ে দায়ের করা মামলাটি এখনো বিচারাধীন। যার নম্বর এসটি-২২৩৭/১৫। এছাড়া ইউনুছের বিরুদ্ধে উখিয়া থানায় দুইটি মামলা রয়েছে। যার নম্বর-২০, তারিখ-২০/০৮/১২, ১১ ২৪/১/২০০৯। এর বাইরেও সাতক্ষীরা, নরসিংদীতে মাদক সহ আটক হওয়ার ঘটনায় ইউনুছের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে।

কিন্তু মোহাম্মদ ইউনুছ পরিবহন সরবরাহ করতে ব্র্যাকের কাছে কম অর্থ দাবি করেছে। মূলত: স্বাভাবিকের চাইতে কম দামে পরিবহন সরবরাহ করে মাদক ব্যবসা অব্যাহত রাখতে এমন কৌশল নিয়েছে বলে মনে করছেন অন্যান্য প্রতিষ্ঠান। সাইরা রেন্ট এ কার নামের প্রতিষ্ঠানটির সাথে যে চুক্তিটি মাদকপাচারের অভিযোগে বাতিল করা হয়েছিল সেটি আবারো মাদক কারবারির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হওয়ায় ব্র্যাকের কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতায় নানা প্রশ্নের পাশাপাশি রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে।

এছাড়া নতুন করে নির্বাচিত সাস কার নামের প্রতিষ্ঠানটি গত বছরের ১৩ নভেম্বর ইয়াবাসহ চালক আটকের গাড়ী সরবরাহকারি সাইরা রেন্ট এ কার এর মালিকের বলে তথ্য পাওয়া গেছে। মূলত: সাস কার নামটি ব্যবহার করে সাইরা রেন্ট এ কার প্রতিষ্ঠানটির মালিক এই টেন্ডার জমা দিয়ে নির্বাচিত হয়েছে।

এব্যাপারে ব্র্যাকের কক্সবাজার আঞ্চলিক কার্যালয়ের সিনিয়র ম্যানেজার মোহাম্মদ হানিফ এর ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে পার্বত্যনিউজের কাছে টেন্ডারে অনিয়ম হওয়ার কথা অস্বীকার করেন।

হানিফ বলেন, পরিবহন সরবরাহের জন্য আহ্বান করা টেন্ডারে কোন ধরনের অনিয়ম ঘটেনি। এ সংশ্লিষ্ট টেকনিক্যাল ও মনোনয়ন বোর্ড সবধরণের শর্তাবলী যাচাই-বাছাই করে উপযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো নির্বাচন করা হয়েছে।

যে বা যারা অভিযোগ করেছে তারা ব্র্যাকের সংশ্লিষ্টদের আভ্যন্তরীন বিষয়াদি না জেনেই অপপ্রচার করছে বলে দাবি করেন মোহাম্মদ হানিফ।

মাদকপাচারে অভিযুক্ত থাকা প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক ও জাতীয় সংশ্লিষ্ট সংস্থার তথ্যভান্ডার পর্যালোচনা করেই মাদকের সংশ্লিষ্টতা নেই, এমন প্রতিষ্ঠানগুলোকে বেছে নেয়া হয়েছে। তারপরও দেশের কোন থানা বা আদালতে আভ্যন্তরীনভাবে কারো বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্টতা বা অভিযোগ থাকলে তা তাদের পক্ষে জানা সম্ভব নয়। এতে কারো বিরুদ্ধে এ ধরণের অভিযোগের সত্যতা পেলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তি বাতিল করা হবে।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

1 × 2 =

আরও পড়ুন