তাক্বওয়া অর্জনের মাস রমজান

fec-image

আল্লাহর ভয় তথা তাক্বওয়া অর্জনের অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে পবিত্র রমজান মাস। এই মাসে ঈমানদারের তাক্বওয়া তথা আল্লাহ ভীতি বৃদ্ধি পেতে থাকে। রমজান মাসের রোজা বান্দাকে শিক্ষা দেয় তাক্বওয়া। কারণ রমজান মাসের রোজা অল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে দেয়া অন্যান্য ইবাদাত থেকে ভিন্ন। এই মাস সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেই দিয়েছেন এটা তাক্বওয়া অর্জনের মাস।

আল্লাহ তা‘আলা রমজান মাস সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে বলেন, হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরয করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা পরহেযগারী অর্জন করতে পার–সুরা বাকারা -১৮৩

সুরা বাকারার ১৮৩ নাম্বার আয়াত অনুসারে বুঝা যায় এই রমজান মাসের রোজা ফরজ করার মূল কারণই হল বান্দাকে আল্লাহ পরিশুদ্ধ করা।

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসির গ্রন্থ ‘রুহুল মাআনি’তে আল্লামা আলুসি (র.) উল্লেখ করেছেন যে, উপরোক্ত আয়াতে ‘মিনকাবলিকুম’ তথা পূর্ববর্তী দ্বারা হজরত আদম (আ.) থেকে শুরু করে হজরত ঈসা (আ.) পর্যন্ত সব নবী-রসুলের জামানা বুঝানো হয়েছে।

রোজার ইতিহাস সম্পর্কে যতদূর জানা যায়, মহান আল্লাহতায়ালা হজরত আদম (আ.)-কে জান্নাতে প্রেরণ করে একটি গাছের ফল খেতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এক ধরনের রোজা রাখার নির্দেশ প্রদান করেছেন। যেহেতু রোজার আরবি শব্দ সওম, আর সওম অর্থ  বিরত থাকা। এ ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা বলেন, হে আদম! তুমি এবং তোমার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস করতে থাক এবং সেখানে যা চাও, যেখান থেকে চাও, পরিতৃপ্তসহ খেতে থাক, কিন্তু তোমরা এ গাছের কাছে যেও না। (যদি যাও বা তার ফল ভক্ষণ কর) তাহলে জালিমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। (সূরা বাকারা, আয়াত-৩৫)। মুফাসসিরে কেরাম বলেন, এটাই ছিল মানব ইতিহাসের প্রথম রোজা।

হজরত আদম (আ.) ও হজরত হাওয়া (আ.) শয়তানের প্ররোচনার শিকার হয়ে ওই গাছের ফল ভক্ষণ করেছিলেন এবং এর পরিণামে মহান আল্লাহতায়ালা তাদের ভূ-পৃষ্ঠে পাঠিয়ে দিলেন। অতঃপর তারা উক্ত ভুলের জন্য অনুতপ্ত হন, তওবা ইস্তিগফার করেন এবং এর কাফ্ফারাস্বরূপ ধারাবাহিক ৪০ বছর রোজা রেখেছিলেন।

হজরত আদম (আ.)-এর পর অন্য সব নবী-রসুলের জামানায়ও রোজার বিধান ছিল। তবে তাদের রোজা পালনের পদ্ধতি ভিন্নতর ছিল।

হজরত নুহ (আ.) এর উপরও রোজা ফরজ ছিল; রসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, হজরত নুহ (আ.) ১ শাওয়াল ও ১০ জিলহজ ব্যতীত সারা বছর রোজা রাখতেন। (ইবনে মাজাহ)।

তাওরাত কিতাব নাজিল হওয়ার আগে হজরত মুসা (আ.) ৩০ দিন রোজা রেখেছিলেন। অতঃপর মহান আল্লাহতায়ালা তাঁর উপর ওহি নাজিল করলেন এবং আরও দশ ১০ দিন রোজা রাখার নির্দেশ প্রদান করে মোট ৪০ দিন রোজা ফরজ করে দিয়েছেন। হজরত ইদ্রিস (আ.) বছরজুড়ে প্রতিদিন রোজা রাখতেন। হজরত দাউদ (আ.) একদিন পর পর রোজা রাখতেন।

রোজা বান্দাকে তাক্বওয়ার উচ্চস্থানে নিয়ে পৌঁছে দেয়। আল্লাহ তা‘য়ালা ইসলামের যে পাঁচটি স্তম্ভ দিয়েছেন তার মধ্যে রোজা হলে তৃতীয় স্তম্ভ। বাকী ইবাদাতগুলো বান্দার সাথে আর্থিক এবং আত্মিক দু‘টোর সমন্বয়ে গঠিত। কেবল রোজা একমাত্র ইবাদাত যা কেবল বান্দার সাথে আত্মার সম্পর্ক। বান্দা রোজা কেবল আল্লাহর জন্যই রাখে।

মসজিদে গেলে বান্দার মনে আকস্মিক এই ধারণা আসা অস্বাভাবিক নই যে, আমি নামাজি, লোকে আমাকে দেখে নামাজি বলবে। হজ্ব করতে গেলে সওয়াব অর্জনের সাথে এই ধারণা বান্দার মনে আসা অস্বাভাবিক নই যে, লোকে আমাকে হাজি সাহেব বলবে। যাকাত দাতার এই ধারণা আসা অস্বাভাবিক নই যে, লোকে আমাকে দানবীর বলবে। এছাড়াও জিহাদেও এমন ধারণা আসতে পারে লোকে আমাকে গাজী বা শহিদ কিংবা বীর বলবে। এই ইবাদাতগুলোর সাথে লোক দেখানোর একটা সুযোগ চলে আসে। কিন্তু- একমাত্র রমজান মাসের রোজা তার বিপরীত।

রমজান মাসে বান্দা কেবল আল্লাহর জন্যই রোজা রাখে। কারণ বান্দা চাইলে লুকিয়ে পানি পান করতে পারে, যা কেউ দেখতে পারবে না। পুকুরে কিংবা ওয়াশরুমে গিয়ে ইচ্ছা মত পানি পান করতে পারে, যেখানে কেউ দেখার নাই। অথচ বান্দা কেবল আল্লাহর জন্যই দিনের বেলায় এসব পানাহার থেকে বিরত থেকে কেবল আল্লাহকে ভয় করে। তাই তো হাদিসে কুদসীতে আল্লাহ বলেছেন- রোজা একমাত্র আমার জন্য আর এর প্রতিদান আমি আল্লাহ নিজেই দান করবো, কিংবা আমি আল্লাহ নিজেই এর প্রতিদান (সুবহানাল্লাহ)।

যেহেতু এই মাসের ইবাদাত কেবল বান্দা আল্লাহর জন্যই করে, তাই এই মাসের রোজার প্রতিদান হাশরের মাঠে আল্লাহ নিজ হাতে বান্দাকে দিবেন।

তিরমিজির একটি হাদিসে এসেছে “তোমরা আল্লাহর গুণে গুণান্বিত হও“। এই রমজান মাসে আল্লাহর এই গুণটি বান্দার জন্য অর্জন করা সম্ভব। আল্লাহ কোন কিছু আহার করেন না, বান্দাও এই মাসের দিনের বেলায় কোন কিছু আহার করেন না।

এই মাসই একমাত্র সময় আল্লাহর গুণে গুণান্বিত হওয়ার। এই মাসই একমাত্র পাথেয় তাক্বওয়া অর্জন করার। আল্লাহ ভয় মনে বৃদ্ধমুল করার এটাই সময়। আসুন আমরা সবাই ফিরে আসি সেই মহান রবের দিকে। যিনি আমাদেরকে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন আবার সেই জান্নাতে নেয়ার জন্য। যে জান্নাতে থেকে আমরা বেরিয়ে এসেছিলাম অবাধ্যতার জন্য। আবার এই রমজান মাসে তাক্বওয়া অর্জন করে আল্লাহর সন্তুষ্টির মাধ্যমে সেই জান্নাতে যাওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করি।

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: তাক্বওয়া, নামাজ, রমজান মাস
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

9 − six =

আরও পড়ুন