তারেক রহমানের বক্তব্যে প্রতিবন্ধী ইস্যু ও জাতিসংঘ কনভেনশন ২০০৬

fec-image

২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ তারেক রহমানের বক্তব্যে দেশের ৪০ লাখ প্রতিবন্ধী মানুষের প্রত্যাশা ও আকাঙ্খার বিষয়টিও প্রাধান্য পেয়েছে। রাষ্ট্রের অবহেলা আর সমাজে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের শিকার এদেশের প্রতিবন্ধী মানুষের কথা গুরুত্বের সাথে তুলে ধরে মানবিক সমাজ এবং বৈষম্যহীন দেশ গড়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিলেন তারেক রহমান। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার সংক্রান্ত কনভেনশন ২০০৬ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৬১তম অধিবেশনে গৃহীত হলেও বাংলাদেশ এতে স্বাক্ষর করেই দায় শেষ করেছে। অথচ এই কনভেনশনে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তার জন্য সব ধরনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য রাষ্ট্রপক্ষসমূহকে বাধ্যবাধকতা দিয়েছে।

প্রায় দেড় যুগ নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ লন্ডন থেকে স্বদেশের মাটিতে পা রেখে ঢাকার পূর্বাচলে গণসংবর্ধনার বিশাল জনসমূদ্রে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান যুক্তরাষ্ট্রের বর্ণবাদবিরোধী নেতা মার্টিন লুথার কিংয়ের ঐতিহাসিক ভাষণের সূত্র টেনে বললেন, আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান। অর্থাৎ আমার একটি পরিকল্পনা আছে।

দেশ এবং দেশের মানুষের স্বার্থে তাঁর প্ল্যানটি কী, ১৬ মিনিটের বক্তব্যে তা তিনি পুরোপুরি তুলে ধরেননি। তিনি তাঁর বক্তব্যের এক জায়গায় বলেছেন ‘এ দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী, ৪ কোটিরও বেশি তরুণ প্রজন্মের সদস্য, ৫ কোটিরও বেশি শিশু, ৪০ লাখ প্রতিবন্ধী, কয়েক কোটি কৃষক-শ্রমিক রয়েছেন। এই মানুষগুলোর একটি প্রত্যাশা আছে রাষ্ট্রের কাছে, একটি আকাঙ্খা আছে এই দেশের কাছে। আজ আমরা যদি সকলে ঐক্যবদ্ধ হই, যদি সকলে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই, তাহলে আমরা এই লক্ষ-কোটি মানুষের প্রত্যাশাগুলো পূরণ করতে পারি- ইনশাআল্লাহ।’

এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, তারেক রহমানের দেশ নির্মাণ প্ল্যান বা পরিকল্পনায় নারী-শিশু, তরুণ প্রজন্ম, কৃষক-শ্রমিক এবং প্রতিবন্ধীদের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বে রয়েছে। যে দেশে প্রতিবন্ধীদের প্রতি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অবহেলা, উপহাস, ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ এমনকি হাসি, তামাশা করা হয়, সে দেশের আগামীর প্রধানমন্ত্রী পদে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা ব্যক্তির মুখ থেকে ৪০ লাখ প্রতিবন্ধীর জন্য কিছু করার তাগিদ অনুভব করা রাষ্ট্র, সমাজ কিংবা ধর্মীয়- সকল দৃষ্টিকোণ থেকেই প্রশংসার দাবি রাখে।

প্রতিবন্ধীদের সঙ্গে সদাচরণ করা, সাহায্য-সহযোগিতা করা এবং তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি বিষয়। তাদের পাশে দাঁড়ানো মানবতার দাবি ও ইমানি দায়িত্ব। প্রতিবন্ধীদের সঙ্গে অসদাচরণ, তাদের উপহাস, ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ, ঠাট্টা-তামাশা করা প্রতিটি ধর্মেই নিষেধ করা হয়েছে। প্রতিবন্ধীদের সঙ্গে অবহেলা বা উপহাস স্বয়ং আল্লাহকে উপহাস করার শামিল।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৬১তম অধিবেশনে ২০০৬ সালের ১৩ ডিসেম্বর গৃহিত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার সংক্রান্ত কনভেনশনে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তার জন্য সবধরনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের কথা বলা আছে। তাছাড়া বাংলাদেশের সংবিধানে ও সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী বলে ঘোষণা করা হয়েছে।

জাতিসংঘে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার সংক্রান্ত কনভেনশন দলিল বাংলাদেশ ২০০৭ সালে স্বাক্ষর ও সমর্থন করেছে। তারপরেও এদেশে প্রতিবন্ধী মানুষেরা এখনো চরম অবহলোর শিকার। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার সংক্রান্ত কনভেনশনের ১১ নং ধারায় ঝুঁকি ও মানবিক জরুরি পরিস্থিতি শিরোনামে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকারসহ আন্তর্জাতিক আইনের সব বাধ্যবাধকতাগুলো মেনে রাষ্ট্রপক্ষগুলো সশস্ত্র সংঘাত, মানবিক জরুরি অবস্থা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ ঝুঁকির পরিস্থিতিতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তার জন্য সবধরনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।

কনভেনশনের ৭ নম্বর ধারায় প্রতিবন্ধী শিশু শিরোনামে ৩টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলো হলো- এক. অন্য শিশুদের মতো প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্যও সব ধরনের মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতা সমানভাবে নিশ্চিতে রাষ্ট্রপক্ষগুলো প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ নেবে। দুই. প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য গৃহীত সব ধরনের পদক্ষেপে ওই শিশুদের সর্বোচ্চ স্বার্থ হবে প্রধান বিবেচ্য বিষয়। তিন. প্রতিবন্ধী শিশুদের সম্পকির্ত যেকোনো বিষয়ে তাদের নিজস্ব দৃিষ্টভঙ্গির আলোকে মতপ্রকাশের অধিকার, বয়স ও পরিপক্কতার ভিত্তিতে অন্য শিশুদের মতো তাদেরও দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি সমান গুরুত্বারোপ এবং তাদের নিজেদের অধিকার অনুধাবনে প্রতিবন্ধীতা ও বয়স অনুপাতে যথাযথ সহায়তা নিশ্চিত করবে রাষ্ট্রপক্ষগুলো।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার বিষয়ক কনভেনশনটি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৬১তম অধিবেশনে ১০৬ নং সিদ্ধান্ত মোতাবেক ২০০৬ সালের ১৩ ডিসেম্বর গৃহিত হয় এবং ২০০৭ সালের ৩০ মার্চ এটি স্বাক্ষরের জন্য উন্মুক্ত হয়। ২০০৮ সালের ৩ মে থেকে এ কনভেনশনটি কার্যকর হয়।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার সম্পর্কিত কনভেনশন হলো একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি যা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকারের পাশাপাশি সেই অধিকারগুলোর প্রচার, সুরক্ষা এবং নিশ্চিতকরণের জন্য কনভেনশনে রাষ্ট্রপক্ষসমূহের বাধ্যবাধকতাগুলো চিহ্নিত করা। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সহজাত মর্যাদার প্রতি সম্মান সমুন্নত করা এবং সেই সাথে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা অন্যদের মত সমতার ভিত্তিতে সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, নাগরিক, রাজনৈতিক অথবা যেকোনো ক্ষেত্রে পূর্ণ ও কার্যকরভাবে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই হলো এই কনভেনশনের উদ্দেশ্য। এ কনভেনশনের মোট ধারা ৫০টি।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭নং অনুচ্ছেদে বলা আছে- ‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।’ সংবিধানের ২৮নং অনুচ্ছেদে বলা আছে- ‘কেবল ধর্ম, বর্ণ, গোষ্ঠী, নারী, পুরুষ ভেদে বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করবে না’। এ দুটি অনুচ্ছেদ ছাড়াও সংবিধানের মৌলিক অধিকার অনুচ্ছেদে আরো কিছু অধিকারের কথা বলা হয়েছে সেখানে রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিগণ অপ্রতিবন্ধী ব্যক্তির ন্যায় সমান অধিকার ভোগ করবে। এখানে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন দ্বারা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার স্বীকৃত রয়েছে।

তাছাড়া ১৯৯৫ সালের ডিসেম্বরে ঘোষিত ‘প্রতিবন্ধী বিষয়ক জাতীয় নীতিমালা’ বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার প্রতিষ্ঠা, শনাক্তকরণ, প্রতিরোধ, এবং পুনর্বাসনের লক্ষ্যে সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রণীত একটি যুগান্তকারী দলিল। এটি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা এবং বাধামুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করে মূলধারায় অন্তর্ভুক্তির দিকনির্দেশনা প্রদান করে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বর্তমানে প্রতিবন্ধিতা একটি জাতীয় সমস্যা। দেশের অধিকাংশ পরিবারেই এমন এক বা একাধিক সদস্য হয়তো পাওয়া যাবে, যার কোনো শারীরিক ও মানসিক বৈশিষ্ট্য প্রতিবন্ধিতার সঙ্গে মিলে যায়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন ‘স্যাম্পল ভাইটাল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম (এসভিআরএস) জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশে প্রতি হাজারের বিপরীতে প্রতিবন্ধী ২৮ দশমিক ২ জন। শতকরা হারে ২ দশমিক ৮ শতাংশ। সংখ্যার হিসাবে প্রায় ৪৮ লাখ। সরকারের হিসাবে জাতীয় পর্যায়ে প্রতিবন্ধীদের সঠিক সংখ্যা তুলে ধরে তাদের অধিকার কিংবা সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হচ্ছে না।

অবশ্য এজন্য বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতি অভিযোগ তুলেছেন। ১৪ ডিসেম্বর ২০২৪ শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে বিএনপি আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে তিনি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের নিয়ে আগামী দিনে বিএনপির পরিকল্পনার কথা জানান।

তারেক রহমানের দাবি, ২০০১ সালে তৎকালীন বিএনপি সরকার বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিবন্ধীদের ভাতা প্রদান শুরু করে। কিন্তু আওয়ামী লীগ সেই ভাতাকে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে সামঞ্জস্য না রেখে, নিজেদের নেতাকর্মীর মাঝে লুটে নিয়েছে। অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে, প্রতিবন্ধীদের জন্য ভাতার পরিমাণ বাড়িয়ে তা ন্যায্যভাবে পুনর্নির্ধারণ করতে চান তারেক রহমান।

নিবন্ধন প্রক্রিয়াকে সহজ ও স্বচ্ছ করারও প্রতিশ্রুতি রয়েছে তাঁর। এজন্য সমাজকল্যাণ, স্বাস্থ্য, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ নেয়ার কথা বলেছেন তারেক রহমান। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জীবনের মানোন্নয়নে দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে চান, যার ভিত্তি হবে অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা, সামাজিক ক্ষমতায়ন এবং মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করা।

তারেক রহমানের পরিকল্পনায় একটি স্বতন্ত্র অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ রয়েছে। যা প্রতিবন্ধীদের জন্য সুনির্দিষ্ট কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কার্যক্রম সমন্বয় করবে। প্রতিবন্ধীদের জন্য ‘সুবর্ণ নাগরিক কার্ড’ গতিশীল করে এর আওতায় স্বাস্থ্য বীমা, শিক্ষা বৃত্তি, পরিবহন ডিসকাউন্টসহ অন্যান্য সামাজিক সুবিধা প্রদানের প্রতিশ্রুতির কথাও ইতোমধ্যে জানান দিয়েছেন তিনি।

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে বাস্তবসম্মত ভোকেশনাল ও টেকনিক্যাল প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার মধ্য দিয়ে তারেক রহমান তাঁর প্রতিশ্রুতি পূরণে সক্ষম হলে বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জল হবে। একই সাথে একটি মানবিক সমাজ ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র বিনির্মাণের স্থপতি হয়ে উঠতে পারেন তারেক রহমান।

লেখক : সাংবাদিক ও গবেষক, ই-মেইল : [email protected]

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: তারেক রহমান, নজরুল ইসলাম বশির, প্রবন্ধ
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন