parbattanews

তোফায়েল আহমেদ মহান নেতা নাকি বিতর্কিত রাজনীতিবিদ?

বাংলাদেশের ইতিহাসের নন্দিত ও নিন্দিত নেতা তোফায়েল আহমেদের জীবনাবসান ঘটেছে। তার জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানে ডাকসুর ভিপি ও ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক হিসেবে নেতৃত্ব দান করা। এই আন্দোলনে মুক্ত শেখ মুজিবুর রহমানকে তিনি বঙ্গবন্ধু উপাধির প্রস্তাব করেন। মুক্তিযুদ্ধে তোফায়েল আহমেদ মুজিব বাহিনীর চার শীর্ষ নেতার একজন ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে এই বাহিনী প্রবাসী সরকারের নিয়ন্ত্রণ বহির্ভূত একটি এক্সট্রা ফোর্স হিসাবে কাজ করে।

ঐতিহাসিকদের মতে, মুজিববাহিনী মূলত মুক্তিযুদ্ধ যেন কোনভাবে শেখ মুজিবের নেতৃত্বের বাইরে না যায় সেটা নিশ্চিত করাই এই বাহিনীর মূল লক্ষ্য ছিল। এ নিয়ে অনেক বিতর্কিত কথা ইতিহাসে রচিত হয়েছে। আজ সে আলোচনায় যাব না। স্বাধীনতার পর নতুন সরকারে তিনি বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সচিব হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পান। অভিযোগ রয়েছে এই পদে দায়িত্ব পালনের কারণে বিতর্কিত রক্ষী বাহিনীর সমন্বয়ের কাজটি তার দায়িত্বে ছিল।

১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের ঘটনা শুনে প্রতিরোধের নির্দেশ নেয়ার জন্য রক্ষী বাহিনী তোফায়েল আহমেদ এর বাড়িতে গিয়েছিলেন এবং তিনি তাদেরকে কোন নির্দেশ দেননি। ফলে শেখ মুজিবকে রক্ষায় রক্ষী বাহিনী এগিয়ে আসেনি। ইতিহাসে এ নিয়ে বিতর্ক থাকলেও তোফায়েল আহমেদকে সারা জীবনে বহুবার এ বিষয়ে দলের ভেতরে ও বাইরে থেকে কম খোঁচা সহ্য করতে হয়নি। এমনকি এ ঘটনায় তোফায়েল আহমেদের নীরবতা নিয়ে খোদ শেখ হাসিনা বিভিন্ন সময়ে ঠারে বেঠারে তাকে খোঁচা দিতে ছাড়েননি। সম্ভবত এ কারণেই ৬৯ গণ অভ্যুত্থানের অন্যতম শীর্ষ এই নেতা আওয়ামী লীগে কখনোই গুরুত্বপূর্ণ পদ, দায়িত্ব বা আওয়ামী লীগ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান নি।

অভিযোগ রয়েছে ওয়ান ইলেভেন সরকারের সময় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের ভিতরে RATS (রাজ্জাক, আমু, তোফায়েল, সুরঞ্জিত) কোয়াড চক্র গড়ে তোলেন। আওয়ামী লীগের সংস্কার প্রস্তাব এমনকি শেখ হাসিনাকে মাইনাস করার পরিকল্পনাতেও এই কোয়াড কাজ করেছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনা এই RATS এর কাউকে মন্ত্রীত্ব দেননি, দলে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসান নি। দলে অনেকটা গুরুত্বহীন হয়ে মেইন স্ট্রিমে ওঠার জন্য তোফায়েল আহমেদ অনেক বেসামাল কথাবার্তা বলে আলোচনায় আসা এবং শেখ হাসিনার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন। এসবের মধ্যে তিনি মুক্তিযুদ্ধের দুইটি সেক্টরের কমান্ডার ও প্রথম ব্রিগেড জেড ফোর্সের কমান্ডার, স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমানের মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ব্যাপক সমালোচিত হন। জিয়াউর রহমানকে মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য বীর উত্তম খেতাব দানকারী সরকার প্রধানের রাজনৈতিক সচিব ছিলেন তিনি।

তার এমন একটি বক্তব্য সম্প্রতি তার দল থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল করা হয়েছে। এতে তিনি বলেছেন, জিয়াউর রহমান তাকে স্যার বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলে ফেলতো। যেহেতু সে সময় তিনি এমপি ছিলেন, পদমর্যাদা অনুযায়ী জিয়াউর রহমান তাকে স্যার বলবেন এটা খুবই স্বাভাবিক। তিনি বলেছেন, ৬৯ এর বড় অভ্যুত্থানের সময় জিয়াউর রহমানের নাম তিনি শোনেননি। তোফায়েল আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছেন ১৯৬৪ সালে। ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান ভারত যুদ্ধে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বাধীন কোম্পানি খেমকারান সেক্টরে ভারতীয় বাহিনীর আক্রমণে পাকিস্তানি সৈন্যরা যখন পর্যন্ত তখন জিয়াউর রহমান তাদেরকে রুখে দিয়েছিলেন। সে কারণে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ খেতাব হিলাল ই জুররত অর্জন করেন। এই যুদ্ধে তার ব্যাটেলিয়ান সর্বোচ্চ খেতাব অর্জন করে। যেমন মুক্তিযুদ্ধে জেড ফোর্স সর্বোচ্চ খেতাব অর্জন করেছে। ৬৫ সালের ওই যুদ্ধে জিয়াউর রহমানের কোম্পানির বীরত্বের কথা অখণ্ড পাকিস্তানে ছড়িয়ে পড়ে। পাকিস্তানের গণমাধ্যমগুলোতে এ নিয়ে অনেক প্রতিবেদন ছাপা হয়। পাকিস্তানি কবিরা এই কোম্পানির বীরত্বের কথা নিয়ে কবিতা রচনা করেন। এরপরও যদি তোফায়েল আহমেদ জিয়াউর রহমানের নাম না শুনে থাকেন সেটা কেমন তার ব্যর্থতা ও মূর্খতা।

শুধু জিয়াউর রহমান নন, তার ছেলে তারেক রহমানকে নিয়েও বিভিন্ন সময়ে বেফাঁস মন্তব্য করেছেন তিনি। অথচ অভিযোগ রয়েছে, তোফায়েল আহমেদ তার বাড়ী ভোলা যেতে সব সময় কোকো লঞ্চ ব্যবহার করতেন এবং ফ্রি কেবিন টিকেট দেয়ার জন্য তারেক রহমানকে ফোন করে খুব অনুরোধ করতেন!

বর্ষিয়ান এই রাজনীতিবিদ এখন ইতিহাস। তার জীবন ও কর্মকাণ্ড ইতিহাসের চর্চার বিষয় হিসেবে আলোচনায় আসবে সব সময়। তখনই এ ধরনের বিতর্কিত বক্তব্যগুলো সামনে আসবে বারবার। এ থেকে বর্তমান রাজনীতিবিদদের কথা ও কাজে শিক্ষা নেয়ার রয়েছে।

লেখকঃ সিনিয়র সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, গবেষক, সম্পাদক পার্বত্যনিউজ। 

Exit mobile version