ত্রিপুরায় শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ইমদাদুল হক বীর উত্তমসহ ৫ শহীদের সমাধির সন্ধান

fec-image

ভারতের উত্তর ত্রিপুরার ধর্মনগর মহকুমার কদমতলা ব্লকের চল্লিশ দ্রোন নামক প্রত্যন্ত গ্রামের একটি কবরস্থানে সন্ধান মেলেছে শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা লেফটেন্যান্ট এসএম ইমদাদুল হক বীর উত্তমসহ পাঁচজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সমাধির। অযত্নে অবহেলা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে বাংলাদেশের শহীদ সূর্য সন্তানদের এ সমাধিগুলো। এদিকে, শহীদ ইমদাদুলের বয়োবৃদ্ধ ভাই মুক্তিযোদ্ধা এসএম তাবিবুর রহমন(৭০) মৃত্যুর আগে শহীদ ভাইয়ের কবর জন্মভূমি গোপালগঞ্জের মাটিতে দেখে যাওয়ার আকাঙ্খার কথা জানিয়ে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর কাছে এটা তাঁর প্রাণের দাবি।

উত্তর ত্রিপুরার ধর্মনগর মহকুমার কদমতলা ব্লক সদর হতে প্রায় দেড় কিলোমিটার উত্তরে চল্লিশ দ্রোন গ্রামের বড় কবরস্থানে শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা লেফট্যানেন্ট এসএম ইমদাদুল হক বীর উত্তমসহ পাঁচজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সমাধির সন্ধান পান এ গ্রামের বাসিন্দা স্কুল শিক্ষক আব্দুল ছবুর(৬০)। তাঁর সাথে মুঠোফোনে কথা হয় পার্বত্যনিউজের। ১৯৭১ সালে ৫ম শ্রেণীর ছাত্র ছিলেন তিনি। বয়স ছিল ১১ বছর।

তিনি বলেন, চল্লিশ দ্রোন গ্রামে মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্প ছিল। স্কুলে আসা যাওয়ার পথে ঐ ক্যাম্পে যেতেন তিনি। ক্যাম্পেই পরিচয় হয় ইমাদুল স্যারের সাথে। কখনও কখনও অংক কষাতেন, বইয়ের পড়াও দেখাতেন। শেষ দেখারদিন তিনি বলেছিলেন, ‘অপারেশনে যাব, কয়েকদিন ক্যাম্পে এসো না।’ ৪-৫দিন পর ক্যাম্পে গিয়ে জানতে পারি ইমাদুল স্যার যুদ্ধে মারা গেছেন।

তিনি জানান, চল্লিশ দ্রোন গ্রামের বড় কবরস্থানের পাশে লম্বাটিলা নামক স্থানে শহীদ ইমাদুলসহ আরও চারজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার নামাজে জানাজা হয়। মাওলানা আব্দুল সালাম নামে একজন ইমাম এ জানাজা নামাজ পড়ান। পরে বড় কবরস্থানে তাদের দাফন করা হয়। বাংলাদেশ স্বাধীনের পর স্থানীয় এক জনপ্রতিনিধির উদ্যোগে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের কবর পাকা করা হয়।

তিনি জানান, কেউ রক্ষণাবেক্ষণ না করায় কবরের প্রাচীর ভেঙ্গে গেছে। ৫টি কবরের মধ্যে দুটি সম্পুর্ণ ভেঙ্গে যাওয়ায় তাদের নাম পরিচয় হারিয়ে গেছে। এখন ধ্বংসের শেষপ্রান্তের তিনটি কবরের মধ্যে শহীদ ইমাদুল হক ছাড়াও সমাধির ফলকে লেখা অপর দুই শহীদ মুক্তিযোদ্ধার নাম ঠিকানা হচ্ছে, সিপাই মোকমেদ আলী, রেজি: নম্বর ৩৯৪০০৮৮, বাড়ি কুমিল্লা জেলার গোয়াল পাড়ার কিসমত নোয়াপাড়া গ্রাম। তিনি শহীদ হন ১৯৭১ সালের ১২ অক্টোবর এবং মো. জামাল উদ্দিন, রেজি: নম্বর ৩৯৫০০১৭, বাড়ি কুমিল্লা জেলার হোমনা থানার বিজয়নগরের পারাবন গ্রামে। তিনি শহীদ হন ১৭ অক্টোবর ১৯৭১। লেফটেন্যান্ট ইমদাাদুল হকসহ এ দুজনও ৮নম্বর বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্য।

শিক্ষক আব্দুল ছবুর বলেন, এক্ষুনি সমাধিগুলো সংরক্ষণের পদক্ষেপ নেয়া না হলে অচিরেই এগুলো সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যাবে। তিনি দেশের জন্য আত্মবলিদানকারি এসব শহীদের যথাযথ সন্মান ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকারকে দ্রুত উদ্যোগ নিতে হবে।

এদিকে, গোপালগঞ্জ সদরের মধুমতি নদীর তীরবর্তী মাটলা গ্রামের বাসিন্দা শহীদ লেফটেন্যান্ট এসএম ইমদাদুল হকের সহোদর মুক্তিযোদ্ধা এসএম তাবিবুর রহমান বলেন, ইমদাদুল পশ্চিম পাকিস্তানে কর্মরত ছিলেন। তিনি সেখান থেকে পালিয়ে এসে পরিবারের সাথে দেখা না করেই ৮ম বেঙ্গল রেজিমেন্টে অন্তর্ভুক্ত হয়ে প্রথমে যুদ্ধ করেন ১১ নম্বর সেক্টর এলাকায়। পরে জেড ফোর্সের অধীনে সিলেট অঞ্চলে যোগ দেন। ১৯৭১ সালের ৭ নভেম্বর ভারতের ক্যাম্প থেকে ১০০ জনের মুক্তিযোদ্ধার একটি গ্রুপ নিয়ে মৌলভীবাজারের ধামাই চা বাগানে পাকবাহিনীর ঘাঁটিতে আক্রমণ করতে গেলে দুপক্ষের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ বাঁধে। প্রচণ্ড এ যুদ্ধে শহীদ হন অসীম সাহসি ইমদাদুলসহ তার অপর দুই সহযোদ্ধা। পরে সহযোদ্ধারা তাদের মরদেহ উদ্ধার করে ভারতের ত্রিপুরায় সমাহিত করেন।

তাবিবুর রহমান আরও বলেন, দেশ স্বাধীনের পর যুদ্ধে ইমদাদুল শহীদ হওয়ার কথা জানতে পারেন তারা। শহীদ ইমদাদুল ছাড়াও পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে তিনি ও তাঁর আরেক ভাই ইনামুল কবির মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। বর্তমানে তিনি ছাড়া বাবা-মা ভাই বোন কেউ বেঁচে নেই। শহীদ ইমদাদুলের কবর ভারতের ত্রিপুরা থেকে দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়ে বয়োবৃদ্ধ মুক্তিযোদ্ধা তাবিবুর বলেন,‘আমার মৃত্যুর আগে গোপালগঞ্জের মাটিতে আমার ভাই শহীদ ইমদাদুলের কবর ফিরিয়ে আনতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিকট আমার প্রাণের দাবি।’

এদিকে, দিল্লীতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাই কমিশনার মোহাম্মদ ইমরান সম্প্রতি ত্রিপুরা সফরে এসে রামগড়-সাব্রুম সীমান্তে নির্মাণাধীন বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী সেতু পরিদর্শনকালে ত্রিপুরায় শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ইমদাদুল হক বীর উত্তমসহ অন্যান্য শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের সমাধি সংরক্ষণের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ত্রিপুরার সহকারী হাই কমিশনারকে এ ব্যাপারে বিস্তারিত খোঁজ খবর নিতে বলবেন।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eleven + eight =

আরও পড়ুন