parbattanews

দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ : মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী দ্বন্দ্ব, নাকি আঞ্চলিক চাপ?

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী জনাব দীপেন দেওয়ানের আকস্মিক পদত্যাগ পার্বত্য অঞ্চলের রাজনীতিতে এক বিশাল আলোড়ন ও ঝোড়ো হাওয়া তৈরি করেছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে রাঙামাটির ২৯৯ নম্বর আসন থেকে নির্বাচিত হয়ে সংসদ সদস্য এবং পরবর্তীতে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন তিনি। কিন্তু ক্ষমতার মাত্র কয়েক মাসের মাথায়, গত ১ জুন তিনি ‘স্বাস্থ্যগত কারণ’ দেখিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন এবং রাষ্ট্রপতি কর্তৃক তা গৃহীত হয়ে ইতিমধ্যে প্রজ্ঞাপনও জারি হয়েছে। একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারক এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রবীণ কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে তাঁর এই আকস্মিক বিদায়ের পর থেকে পাহাড়ের রাজনৈতিক অঙ্গন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানামুখী আলোচনা, প্রোপাগান্ডা ও জলঘোলা করার অপচেষ্টা চলছে।

মন্ত্রীপ্রতিমন্ত্রী দ্বন্দ্ব? নাকি অপপ্রচার?

মন্ত্রী সাহেবের পদত্যাগের পর পাহাড়ের কিছু আঞ্চলিক সংগঠন এবং স্বার্থান্বেষী মহল এই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনকে জড়িয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সমালোচনা করছে। তাদের দাবি, প্রতিমন্ত্রী নাকি মন্ত্রীকে ‘পুতুলের মতো’ রাখতে চেয়েছিলেন, সবকিছুতেই তাঁর আধিপত্য ছিল এবং রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ পুনর্গঠন নিয়ে তাঁদের মধ্যে তীব্র দ্বন্দ্ব ছিল। অথচ এই অবাস্তব ও কাল্পনিক দাবির সপক্ষে আজ পর্যন্ত কেউ কোনো দালিলিক প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি।

বাস্তবতা হলো, জনাব দীপেন দেওয়ান দীর্ঘদিন বিচারক হিসেবে অত্যন্ত সুনামের সাথে কাজ করেছেন এবং ২০০৫ সালে যুগ্ম জজের মর্যাদাপূর্ণ চাকরি ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দেন। দলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিজের যোগ্যতা ও বিশ্বস্ততা প্রমাণ করেই তিনি মন্ত্রী হয়েছেন। সুতরাং, তাঁর মতো একজন পরিপক্ব, জ্ঞানী ও আইনজ্ঞ ব্যক্তিত্বকে অন্য কেউ নিয়ন্ত্রণ বা ডমিনেট করতেন—এই দাবিটি একেবারেই অমূলক। তাছাড়া, একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারক এবং পূর্ণ মন্ত্রীকে যদি অন্য কেউ আসলেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তবে তো পূর্ণ মন্ত্রীর সেই পদে থাকার মানসিক দৃঢ়তা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে।

অন্যদিকে, ব্যারিস্টার মীর হেলাল উদ্দিন পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থানীয় রাজনীতিতে একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করতে চান বলে যে প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হচ্ছে, তাও সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। তিনি তাঁর নিজের হাটহাজারী নির্বাচনী আসন এবং চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে বিশাল দলীয় দায়িত্ব নিয়ে অত্যন্ত ব্যস্ত। একই সাথে তিনি দুটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। এরপাশাপাশি তিনি জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশন, বিএনপির মিডিয়া সেল ও “আমরা বিএনপি পরিবার”-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ সংগঠনের নেতৃত্বে আছেন। সুতরাং, রাঙামাটির স্থানীয় পদ-পদবি বা পদের তদবির নিয়ে তাঁর মন্ত্রীর সাথে মনোমালিন্যে জড়ানোর তথ্যগুলো সোশ্যাল মিডিয়ার অপপ্রচার ছাড়া আর কিছুই নয়।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজেই পার্বত্য চট্টগ্রামের জটিল ভূরাজনীতি, ভেতরের কোন্দল ঠেকানো এবং এই অঞ্চলের আইন ও অর্থনীতি সম্পর্কে প্র্যাক্টিক্যাল ধারণা রাখতেই একজন বিশ্বস্ত, অভিজ্ঞ ব্যক্তি হিসেবে দীপেন দেওয়ানকে মন্ত্রী ও ব্যারিস্টার মীর হেলালকে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিয়েছিলেন।

মীর হেলাল সমতলের মানুষ হিসেবে শুরুতেই আঞ্চলিক সংগঠন সমর্থিতদের সমালোচনারমুখে পড়েন। কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তিনি কোনো একপাক্ষিক বা বিতর্কিত মন্তব্য করেননি। কিন্তু যারা জনাব দীপেন দেওয়ানকে আঞ্চলিক সংগঠন ‘জেএসএস’-এর এজেন্ট বানানোর চেষ্টা করছেন, তাদের এই এভিডেন্সহীন অভিযোগ পাহাড়ের শান্তির জন্য সুখকর নয়। তাঁরা দুজনেই দলের পরীক্ষিত নেতা এবং কোনো নির্দিষ্ট উপজাতি বা বাঙালি সংগঠনের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য কাজ করেন না।

কৌশলগত ভুল কাঠামোগত সংকট

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে আমি মনে করি, জনাব দীপেন দেওয়ানের এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতির জন্য তিনি নিজেই কৌশলগতভাবে কিছুটা দায়ী। পার্বত্য মন্ত্রণালয় মূলত মাঠপর্যায়ে ফাংশন করে পার্বত্য ৩ জেলার ৩টি পার্বত্য জেলা পরিষদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড, শরণার্থী বিষয়ক টাস্কফোর্স এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের মাধ্যমে। তিনি মন্ত্রী হওয়ার সাথে সাথেই যদি এই জেলা পরিষদ, উন্নয়ন বোর্ড এবং টাস্কফোর্সগুলো দ্রুত পুনর্গঠন করতেন, তাহলে আজকে তাঁকে এই প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়তে হতো না। যা তার অসুস্থ শরীর ও মনের উপর ভীষণ চাপ তৈরি করেছে।

কিন্তু তিনি দীর্ঘ সময় পূর্বের আওয়ামী সরকারের নিয়োগকৃত ব্যক্তিদেরই দায়িত্বে রেখে দিয়েছিলেন, যা এক ধরনের প্রশাসনিক স্থবিরতা তৈরি করেছিল এবং তৃণমূলের মাঝে হতাশা জন্ম দিয়েছিল। এর সুযোগে ইতিবৎসরে স্থানীয় বিএনপির নেতৃবৃন্দ বিভিন্ন পদ-পদবি, পার্বত্য ৩ টি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্য পদের জন্য মন্ত্রীর ওপর প্রচণ্ড চাপ, তদবির ও লবিং শুরু করেন। দীর্ঘদিনের বঞ্চিত নেতা-কর্মীদের এই যৌক্তিক চাপ সামাল দেওয়া তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়েছিল।

জেএসএস ইউপিডিএফএর ত্রিমুখী চাপ:

বিভিন্ন আলোচনায় স্থান পেয়েছে সবচেয়ে বড় ও হিংস্র চাপটি এসেছে পাহাড়ের আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনগুলোর কাছ থেকে। গত নির্বাচনে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) সরাসরি প্রার্থী না দিয়ে পর্দার আড়াল থেকে দীপেন দেওয়ানকে সমর্থন দিয়েছিল। তবে এই সমর্থনের পেছনে ছিল সুদূরপ্রসারী ও বিতর্কিত রাজনৈতিক স্বার্থ। জেএসএস-এর মূল লক্ষ্য ছিল, তিনি মন্ত্রী হলে পার্বত্য চুক্তির এমন কিছু ধারা (যা আমাদের পবিত্র সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক এবং সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য বাস্তবায়নে চরম চ্যালেঞ্জিং) বাস্তবায়নে তাঁকে বাধ্য করা এবং উন্নয়নবোর্ড, শরনার্থী বিষয়কটাস্কফোর্স, পার্বত্য জেলা পরিষদগুলোতে জেএসএস-পন্থী বিতর্কিত ব্যক্তিদের বসানো। সম্প্রতি পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের (পিসিপি) ৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে রাঙামাটিতে জেএসএস সহ-সভাপতি ও সাবেক এমপি উষাতন তালুকদারের বক্তব্যেও এমন অনৈতিক দাবি ও হুমকির সুস্পষ্ট ইঙ্গিত মিলেছিল। জেএসএস নেতারা প্রকাশ্যে বলতে শুরু করেছিলেন, “আমরা ভোট দিয়ে জিতিয়েছি, সুতরাং আমাদের সব কথা শুনতে হবে।”

অন্যদিকে, জেএসএস-এর চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রসিত খীসার নেতৃত্বাধীন ইউপিডিএফ (চুক্তি বিরোধী অংশ) শুরু থেকেই দীপেন দেওয়ানকে ‘জেএসএস সমর্থক’ তকমা দিয়ে কোণঠাসা করার চেষ্টা চালিয়ে আসছিল। ইউপিডিএফ নেতারাও জেলা পরিষদ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিজেদের পছন্দের লোক নিয়োগ এবং অবৈধ প্রকল্প পাসের জন্য সমান্তরাল চাপ সৃষ্টি করে আসছিল। মূলত জেএসএস-কে রাজনৈতিকভাবে ঘায়েল করতে এবং মন্ত্রীকে বিতর্কিত করতেই তারা জলঘোলা করতে শুরু করে।

সজ্জন রাজনীতিকের অসহায়ত্ব:

আলোচনায় এটাও উঠে এসেছে- দীপেন দেওয়ান তার নির্বাচনী এলাকা রাঙ্গামাটিতে পাহাড়ি-বাঙালি সকল সম্প্রদায়ের বিএনপি নেতাকর্মীদের কাছে একজন শান্ত, ভদ্র ও উদারপন্থী মানুষ হিসেবে পরিচিত। জেএসএস ও ইউপিডিএফ-এর আকাশচুম্বী ও অসাংবিধানিক চাওয়া কোনোভাবেই একজন সাবেক বিচারকের পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না বলেও মনে করেন অনেকে। কারণ আঞ্চলিক দলগুলোর সংকীর্ণ স্বার্থে কাজ করলে তিনি জনগণের কাছে এবং রাষ্ট্রের আইনের কাছে বিতর্কিত হতেন।

বিভিন্ন সময় তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন শিল্পের বিকাশ এবং পিছিয়ে পড়া এই জনপদের সার্বিক উন্নয়নের স্বপ্নের কথা। কিন্তু পাহাড়ের সশস্ত্র সংগঠনগুলো কখনই চায় না পাহাড়ের মূল ধারার টেকসই উন্নয়ন হোক; কারণ পাহাড় অনগ্রসর ও অশান্ত থাকলেই তাদের চাঁদাবাজি ও আধিপত্যের রাজনীতি টিকে থাকে। ফলশ্রুতিতে, একদিকে স্থানীয় দলীয় নেতা-কর্মীদের পদের জন্য তীব্র চাপ, অন্যদিকে জেএসএস ও ইউপিডিএফ-এর অনৈতিক ও ত্রিমুখী লবিং—অসুস্থ শরীরে এই বিপুল মানসিক ও রাজনৈতিক চাপ সজ্জন রাজনীতিক দীপেন দেওয়ান আর নিতে পারেননি। ফলে নিজের পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ণ রাখতে এবং কোনো অসাংবিধানিক দাবির কাছে মাথা নত না করার নৈতিক দৃঢ়তা থেকেই তিনি পদত্যাগের পথ বেছে নিয়েছেন বলেও তার শুভকাঙ্খিরা মনে করছেন। যা ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে।

মূলত পার্বত্য রাজনীতিতে মেইনস্ট্রিম দলগুলোর পাশাপাশি আঞ্চলিক দল, বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী, কখনো পাহাড়ে বসবাস করেনি এমন কিছু সুশীল সমাজ, বামপন্থী সংগঠন, আন্তর্জাতিক এনজিও এবং বিশেষ মহলের নানামুখী প্রভাব রয়েছে। তবে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এই অঞ্চলের কোনো পক্ষই বৈষম্যের শিকার হয়নি। একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারক এবং একজন দক্ষ ব্যারিস্টারের এই সম্ভাবনাময় জুটি যখন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছিল, তখন আমরা আশা করেছিলাম যে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিতর্কিত ও বৈষম্যমূলক আইন ও পলিসিগুলো সংশোধন ও আধুনিকায়ন করা সম্ভব হবে। কিন্তু এই আকস্মিক বিদায় সত্যিই মর্মাহত করার মতো।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দলের ভেতরের ও বাইরের অতি-উৎসাহী মহল যারা জলঘোলা করার চেষ্টা করছে, তাদের থামাতে জনাব দীপেন দেওয়ানের উচিত দ্রুত একটি প্রেস কনফারেন্স করে পদত্যাগের প্রকৃত কারণ ও এসব অনৈতিক চাপের সত্যতা দেশবাসীর সামনে পরিষ্কার করা। পাহাড়ে শান্তি, সুশাসন ও টেকসই উন্নয়নের ধারা বজায় রাখতে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও সংবিধানের আলোকে একটি সুষম নীতিমালার কোনো বিকল্প নেই।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

(পার্বত্য চট্টগ্রাম, রোহিঙ্গা ও সীমান্ত নিরাপত্তা বিষয়ক গবেষক)

ইমেইল: ahmfarukcht@gmail.com

Exit mobile version