দুই যুগ ধরে একই কর্মস্থলে মানিকছড়ি’র ৭৬ জন প্রাথমিক শিক্ষক!

fec-image

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষণায় ১ জানুয়ারি-২০১৩ সালে সারাদেশে ২৬ হাজারের অধিক বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ হয়। ওই ঘোষণায় খাগড়াছড়ির মানিকছড়িতে উনিশটি প্রতিষ্ঠান ও ৭৬ জন শিক্ষক সরকারীকরণের আওতায় আসে। কিন্তু বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে দু’যুগের অধিক সময় একই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রয়েছে শিক্ষকরা! বছর দেড়েক আগে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকা শিক্ষকদের তথ্য সংগ্রহ করলেও মাঝপথে থমকে যায় কার্যক্রম! ফলে এ নিয়ে জনমনে ক্ষোভ দানা বাধঁছে।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষণার আওতায় খাগড়াছড়ির মানিকছড়িতে প্রথমধাপে ১৮টি প্রতিষ্ঠান ও ৭২ জন শিক্ষক এবং দ্বিতীয় ধাপে একটি প্রতিষ্ঠান ও ৪ জন শিক্ষকসহ মোট ১৯টি প্রতিষ্ঠানে ৭৬ জন শিক্ষক একযোগে সরকারীকরণ হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান ১৯৯০ সালের অল্প আগে বা পরে প্রতিষ্ঠিত। দু’চারটি প্রতিষ্ঠান ২০০০সালের পর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ওইসব প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা শিক্ষকরা যুগের পর যুগ (দুই থেকে আড়াই যুগ)একই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। ১৯টি বিদ্যালয়ের ৭/৮টি প্রতিষ্ঠানে ২/৩ করে শিক্ষক বদলী হলেও অন্যগুলোতে এখনো সেই প্রতিষ্ঠাতা শিক্ষকরাই শিক্ষকতা করছেন! যদিও ইতোমধ্যে অনেক শিক্ষক সিএনএড কোর্স সম্পন্ন করেছেন। তারপরও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় নিয়োগ পাওয়া উচ্চতর ডিগ্রীধারী শিক্ষকদের এসব প্রতিষ্ঠানে পদায়ণ জরুরী ছিল বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন অভিজ্ঞ শিক্ষাবিদরা।

এ প্রসঙ্গে অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও উপজেলা শিক্ষক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. নূরুজ্জামান মাস্টার বলেন, সরকারি নিয়মানুযায়ী একজন শিক্ষক একই কর্মস্থলে ৩-৫ বছরের অধিক থাকার সুযোগ নেই! কিন্তু এখানকার প্রশাসন চাকরীবিধির তোয়াক্কা করে না। ফলে শিক্ষকরা রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় নিয়ে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করে শিক্ষকতা করছেন। যা মোটেও উচিৎ না।

তিনি আরো বলেন, একজন শিক্ষক এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে বদলীর ফলে প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষক উভয়েই লাভবান হয়। যদিও পার্বত্য এলাকায় শিক্ষক বদলীর বিষয়টি জেলা পরিষদ নিয়ন্ত্রণ করেন, তারপরও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ইচ্ছা করলে আভ্যন্তরীণ বদলী কার্যক্রম করতে পারেন। তাঁরা তা না করে শিক্ষকদের নিকট থেকে উৎকোচ নিয়ে দায় এড়িয়ে যান! কথায় জেলা পরিষদের দোহাই দেন।

একসত্যাপাড়া,মহামুনি, চিলছড়ি,সাপমারা বনানী, পাঞ্জারামপাড়া, বাঞ্চারামপাড়া, পাক্কাটিলা, গভামারা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ অন্তত ১২/১৩টি প্রতিষ্ঠানে প্রতিষ্ঠালগ্ন সকল শিক্ষক এখনো শিক্ষকতা করছেন!

সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও লেমুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দু’দশক সভাপতিত্ব করা বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ মো. আবদুর রাজ্জাক আজকের পত্রিকাকে এ প্রসঙ্গে বলেন,একজন শিক্ষক যুগের পর একই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকায় তাঁর শিখন কলা-কৌশল, পদ্ধতি বা শিক্ষার মানোন্নয়ন সর্ম্পকে বিচার-বিশ্লেষণ করতে পারছেনা শিক্ষার্থী অভিভাবক ও সচেতন ব্যক্তিরা! জাতীয়করণকৃত এসব প্রতিষ্ঠানে গড়ে অন্তত ২জন শিক্ষকও যদি রদবদল হতো,তাহলে শিক্ষার মান নিঃসন্দেহে আরও বৃদ্ধি পেত। প্রত্যন্ত জনপদের এসব প্রতিষ্ঠানে নতুন প্রজন্মের গ্র্যাজুয়েট শিক্ষক পদায়ণ করে অনগ্রসর এলাকায় শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়া এখন সময়ের দাবি।

এই প্রসঙ্গে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলাম আজকের পত্রিকাকে বলেন, বছর দেড়েক আগে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস থেকে একই কর্মস্থলে দীর্ঘদিন থাকা শিক্ষকদের তথ্য চাওয়ার পরে আমরা যথা সময়ে তা দিয়েছিলাম। কিন্তু পরে সে সবের কার্যকরিতা মাঝ পথে থমকে যায়! তিনি আরো বলেন, যুগের পর যুগ একজন শিক্ষক একই কর্মস্থলে থাকলে নিজে যেমন অলস হয়ে যায়! শিক্ষার্থীরাও প্রকৃত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস ও জেলা পরিষদ এই বিষয়ে গঠনমূলক চিন্তা করলে তা সম্ভব।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে খাগড়াছড়ি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ডিপিইও) ফাতেমা মেহের ইয়াসমিন বলেন, একই প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন থাকা শিক্ষকদের উপজেলা পর্যায়ে বদলীর বিষয়টি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তারা করতে পারেন এবং এটি অবশ্যই করা উচিত। বিষয়টি নিয়ে আমি অচিরেই জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এর সাথে আলোচনা করবো।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

14 − 3 =

আরও পড়ুন