নববর্ষ ও বাঙালি সংস্কৃতি ও আমাদের সংস্কৃতি

fec-image

প্রতিবছর বৈশাখ এলেই বাঙালি হওয়ার, বাঙালি সাজার, বাঙালি চেতনার ধুম পড়ে। অধুনা কর্পোরেটোক্রাসি তার স্বার্থ উদ্ধারে এই ধুমকে আরো উষ্কে দিয়েছে। ফলে সেখানে যুক্ত হয়েছে বৈশাখি ফ্যাশন, বৈশাখি উপহার, বৈশাখি ছাড় ও বৈশাখি উৎসবের শহুরে কেতা। এরসাথে গ্রাম বাঙলার আবহমান সংস্কৃতির মিল সামান্যই। এর সাথে মিশে গেছে স্যাটেলাইট সংস্কৃতি- যা মূলত হিন্দি প্রভাবান্বিত। পহেলা বৈশাখের বাঙালি সংস্কৃতি বিতর্কের মূলে রয়েছে বাঙালি ও সংস্কৃতি স্বরূপ নির্ধারণ।

প্রথমেই বাঙালি। বাঙালি শব্দের একটি ভাষাতাত্ত্বিক, একটি নৃতাত্ত্বিক ও সর্বশেষ জাতীয়তাবাদী ব্যাখা রয়েছে। এরপর আসে সংস্কৃতি। সংস্কৃতি শব্দের ইংরেজি প্রতিশব্দ Culture যা ল্যাটিন শব্দ Colere থেকে উৎপত্তি হয়েছে। এর অর্থ কর্ষণ করা। ষোল শতকের শেষের দিকে ইংরেজ দার্শনিক ফ্রান্সিস বেকন সর্বপ্রথম ইংরেজি ভাষায় Culture শব্দটি ব্যবহার করেন। সমাজবিজ্ঞানী কার্লাইল সংস্কৃতির সংজ্ঞা দিতে দিয়ে বলেছেন, মানবিক সত্ত্বার পূর্ণাঙ্গ বিকাশের জন্য সাধনার নামই সংস্কৃতি। অন্যদিকে কার্ল মার্কস সংস্কৃতির সংজ্ঞা দিয়ে বলেছেন, অর্থনৈতিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত উপরি কাঠামোই হচ্ছে সংস্কৃতি। কার্ল মার্কস যাকে super structure বলেছেন। তবে সংস্কৃতির সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য সংজ্ঞা দিয়েছেন ই বি টাইলর। এই ব্রিটিশ নৃবিজ্ঞানী তার primitive culture বইতে লিখেছেন, সমাজের সদস্য হিসেবে অর্জিত আচার-আচরণ, দক্ষতা, জ্ঞান, বিশ্বাস,  শিল্পকলা রীতি-নীতি, প্রথা, প্রদ্ধতি ও আইন কানুন ইত্যাদির জটিল রূপকেই বলা হয় সংস্কৃতি। এক কথায় সংস্কৃতি হচ্ছে A way of life. ইংরেজিতে Culture বলতে যা আমরা যা বুঝি, বাংলায় এই সঠিক শব্দ- কৃষ্টি।

বাংলাদেশী বাঙালিদের সংস্কৃতি বলতে আমরা বুঝি বাংলাদেশ নামক ভূ-খণ্ডের মধ্যে নৃতাত্ত্বিক ও ভাষাতাত্ত্বিকভাবে যে বাঙালি জনগোষ্ঠী রয়েছে তাদের সংস্কৃতি সম্মিলিতভাবে বাঙালি সংস্কৃতি। অর্থাৎ বাঙালি মুসলিম, বাঙালি হিন্দু, বাঙালি বৌদ্ধ, বাঙালি খ্রিস্টান, এমনকি বাঙালি নাস্তিক তথা এই ভূ-খণ্ডের মধ্যে বসবাসকারী সকল বাঙালির সংস্কৃতিই সম্মিলিতভাবে বাঙালি সংস্কৃতি। সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে উৎসব। বাঙালি সংস্কৃতির প্রধান উৎসব হচ্ছে পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ। ধর্ম, বর্ণ, নির্বিশেষে বাংলাদেশের সকল বাঙালির প্রাণের উৎসব বাংলা নববর্ষ। কিন্তু এই নববর্ষ উদযাপনে পদ্ধতি ও কৌশল নিয়ে কিছু বিতর্ক উঠেছে বিগত বেশ কয়েকবছর ধরে।


এ বিষয়ে লেখকের আরো লেখা:


বাংলাদেশের শতকরা নব্বইভাগ জনগোষ্ঠী মুসলিম। কাজেই এদেশের জাতীয় উৎসব উৎযাপনের রীতি ও পদ্ধতিতে সেই জনগোষ্ঠীর বিশ্বাস ও আচারে প্রতিফলন থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু বাংলা নববর্ষকে ঘিরে সার্বজনীন বাঙালী সংস্কৃতির বরণ ডালায় যেভাবে পৌরাণিকতা ও পৌত্তলিকতাকে মুসলিম সমাজে, পরিবারে ও ব্যাক্তি জীবনে যেভাবে অনুপ্রবেশ করানো হচ্ছে তাতেই তারা আপত্তি তুলেছেন। বিশেষ করে এর সাথে বাংলা নববর্ষ উৎযাপনের হাজার বছরের ঐতিহ্যের কোনো সাদৃশ্য না থাকার পরও তা মুসলিম সমাজে অনুপ্রবেশ করানো জোর চেষ্টাই তাদের আপত্তির মূল কারণ।

রাজধানীতে রমনাপার্কে অশ্বত্থবৃক্ষের বেদীমূলে মাঙ্গলিক গান গেয়ে নববর্ষ বরণের যে কালচার অথবা রেওয়াজ চলছে তার ইতিহাস খুব বেশী দিন নয়। ১৯৬৭(মতান্তরে ১৯৬৫) সালে ছায়ানট শিল্পীগোষ্ঠী এর প্রবর্তন করে। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় তথ্য ও বেতারমন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দিন রেডিওতে রবীন্দ্র সঙ্গীত বাজানো নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। খাজা শাহাবুদ্দিনের এই ঘোষণায় পূর্ব পাকিস্তানে রবীন্দ্র চর্চা নিয়ে চলমান বিভেদ নতুন করে চাঙ্গা হয়ে ওঠে। মূলতঃ তৎকালীন সরকারের রবীন্দ্র চর্চা নিষিদ্ধ নীতির বিরোধিতা করেই ছায়ানট রমনার অশ্বত্থমূলে বাংলা নববর্ষ উদযাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করে ১৯৬৭ সালে। সুতরাং এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, রমনার অশত্থমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ উৎসবের একটি রাজনৈতিক দিকও রয়েছে।

তবে রমনা পার্কে ছায়ানট এই বাংলা নববর্ষ বরণে যে বিশেষত্ব নিয়ে আসে তার সাথে কয়েক শত বছর ধরে এ অঞ্চলের মানুষ যেভাবে বাংলা নববর্ষ পালন করে আসছে তার খুব বেশী মিল নেই। পূর্ব বাংলায় বাংলা নববর্ষ উৎযাপনের শত বছরের যে ঐতিহ্য ধারা ছায়ানটের বর্ষবরণ উৎসবে তার কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। তারা প্রতি বছর পহেলা বৈশাখে সূর্যোদয়ের পূর্বে তাদের নিজস্ব শিল্পী গোষ্ঠি নিয়ে রমনা পার্কে লেকের পাড়ে অবস্থিত অশ্বত্থবৃক্ষের বেদীমুলে সূর্যদেবের উদয়ের অপেক্ষায় থাকে। যখন পূর্ব আকাশে সূর্য উদিত হয় তখনই ছায়ানটের শিল্পীরা তার কাছে নিখিল ও অখিলের কল্যাণ কামনায় গেয়ে ওঠে নানা মাঙ্গলিক এবং প্রার্থনামূলক সঙ্গীত:

‘অন্তর মম বিকশিত করো অন্তরতর হে, নির্মল কর, উজ্জল কর, সুন্দর করো হে…..’।

ছায়ানটের এই গান নির্বাচনেও একটি বিশেষত্ব লক্ষ্যণীয়। অনুষ্ঠানে যেসব গান গাওয়া হয় এবং কবিতা আবৃত্তি করা হয় তার শতকরা ৯০ভাগ কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এবং বাকী ১০ ভাগ অন্যান্য কবি বা গীতিকারের। সন্দেহ নেই রবীন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্যের প্রধানতম কবি। সুতরাং তার কবিতা বা গান গাওয়া নিয়ে কোনো প্রশ্ন উঠতে পারে না। প্রশ্ন উঠছে এই কারণে যে, ছায়ানটের এই অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথের সেই গানগুলোই বেছে নেয়া হয় যে গানগুলো মূলতঃ হিন্দু দেবদেবীর কাছে মঙ্গল কামনা করে বা ঐসব দেবদেবীর স্তুতি কামনা করে লেখা রবীন্দ্রনাথের পূজা পর্বের গান। ছায়ানটের অনুষ্ঠানে কাজী নজরুল ইসলামের যে দু’একটি গান গাওয়া হয় তাও ঐ শ্যামা সঙ্গীত। এমনকি অন্যান্য কবিদের যেসব গান নির্বাচন করা হয় সেগুলোরও প্রধান উপজীব্য  উপনিষদ ও হিন্দু পুরাণ।

এদিকে রমনা অশ্বত্থমূলের বাইরেও কর্তৃপক্ষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের সামনে থেকে একটি মঙ্গল শোভা যাত্রা বের করে। এর সাথেও আমাদের হাজার বছরের নববর্ষ উৎযাপনের ঐতিহ্যের কোনো মিল নেই। মূলতঃ ১৯৮৫ সালে চারুপীঠ নামের একটি সংগঠন সর্বপ্রথম যশোরে বাংলা নববর্ষে এই মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রচলন করে। তারই অনুকরণে ১৯৮৯ সালে চারুশিল্পী সংসদ ঢাকায় নববর্ষে মঙ্গল শোভা যাত্রার প্রচলন করে।

এ শোভা যাত্রাকেও ব্রাহ্মণ্যবাদী সংস্কৃতির নগ্ন প্রদর্শনী চলে। মনসাপট, লক্ষীর সরা, বেদ-এ বর্ণিত নানা দেবদেবীর বাহন বিভিন্ন পশুপাখির ডামি, পূরাণের নানা অসূর, রাক্ষস, ভূত-প্রেত, প্যাঁচার মুখোশ সহকারে এই শোভাযাত্রা বের হয়। আগামী বছরের সুফলা কামনা করে ধনের দেবী লক্ষ্ণীর সরা রাখা হয়, বিদ্যার উন্নতি কামনা করে বিদ্যার দেবী সরস্বতীর বাহন হংস ও বীণা রাখা হয়, অমঙ্গল থেকে দুরে থাকতে অমঙ্গলের দেবী মনসার পট রাখা হয় এই মঙ্গল শোভাযাত্রায়। আর মুসলিম তরুণ তরুণীরা সংস্কৃতির নামে তা গলাধঃকরণ করে নিজের অজান্তেই শিরক-এর সাথে জড়িয়ে পড়ছে। ছায়ানটিদের আয়োজনে বাংলা নববর্ষ উদযাপন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যা দেখে পশ্চিমবঙ্গের আনন্দবাজার পত্রিকার মনে হয়েছে, ‘অষ্টমীর এক ডালা’। অর্থাৎ সারদীয় দূর্গাপূজার অষ্টম তিথিতে দেবী দূর্গা বরণে সজ্জিত অষ্টমীর বরণডালা। এই অষ্টমীর বরণডালা ৮৫% মুসলিম অধ্যুষিত বাঙালি মুসলিমদের জাতীয় উৎসবের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না।

যেহেতু বাঙালি জাতিসত্ত্বা গড়ে উঠেছে নানা ধর্মের লোকদের সমন্বয়ে তাই বাঙালির উৎসব বাংলা নববর্ষ পালনেও তাতে ভিন্নতা থাকবে এটাই স্বাভাবিক। ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের বাঙালি তাদের নিজস্ব বিশ্বাস ও মূল্যবোধের সাথে সঙ্গতি রেখে বাংলা নববর্ষ পালন করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এসব কিছুর সমন্বয়েই গড়ে উঠেছে বাঙালি সংস্কৃতি। সে কারণে যদি কোনো বাঙালি হিন্দু সূর্যদেবের পূজা করে, অগ্নিস্নানে সুচী হয়ে, শাঁখ বাজিয়ে, সিঁদুর পরে বাংলা নববর্ষ পালন করে, কিম্বা বাঙালি বৌদ্ধ তাদের মৃত স্বজনদের মঙ্গল কামনায় ফানুস উড়িয়ে বৈশাখ উদযাপন করে, বাঙালি খ্রিস্টান গির্জায় প্রার্থনার মাধ্যমে পহেলা বৈশাখের দিনটি শুরু করে তাতে সমস্যা দেখি না।

বাঙালি হিন্দু যদি পহেলা বৈশাখে মঙ্গল শোভা যাত্রা করে তাতে সমস্যা কোথায়? তবে কোনো বাঙালি মুসলিম সেই মঙ্গল শোভা যাত্রায় শামিল হতে পারবে না। কেননা, আকীদাগতভাবে মুসলিম সম্প্রদায়ের এই মঙ্গল- অমঙ্গলের ধারণার সাথে বিরোধ রয়েছে। তাছাড়া এই মঙ্গল শোভা যাত্রায় পৌরাণিক বিভিন্ন দেবদেবী চরিত্র, পৌত্তলিকতার উপাচার যুক্ত করা হয় তাতে মুসলমানদের সামিল হওয়া সম্ভব নয়।  কিন্তু বাঙালি মুসলিম নববর্ষকে বরণ করে নিতে যদি তাদের ধর্মীয় বিধি নিষেধের সাথে সাংঘর্ষিক নয় এমন উপায়ে স্বাগত মিছিল করে তাতে তো কোথাও বাধার কিছু দেখি না। হেফাজতে ইসলাম ঢালাওভাবে মঙ্গল শোভাযাত্রাকে হারাম ঘোষণা করেছে। তাদের জবাবে বলতে চাই, এটা এবাদত নয়। সংস্কৃতি। ইসলাম নির্দোষ স্থানীয় সংস্কৃতিতে নিষিদ্ধ করেনি। যেমন রসুল সা. যখন মদীনায় হিজরত করেন তখন মদীনার আনসারগণ তাকে খেজুরের ডাল উঁচিয়ে, দফ বাজিয়ে বরণ করেছিলেন। এটা ছিলো মদীনার তৎকালীন সংস্কৃতি।  ইসলামের নামে কঠোরতা, রুঢ়তা দেখানো যাবে আর খুশী হওয়া যাবে না- এটা ইসলাম নয়। মুসলমানদের জীবনে আনন্দ থাকবে না, তারা খুশী হতে পারবে না- তা ইসলাম নয়। সবচেয়ে বড় কথা হিজরী সনকে স্বাগত জানিয়ে যদি মিছিল করা যায়, তবে বাংলা সনকে কেন স্বাগত জানানো যাবে না?

ইসলাম নির্দোষ সংস্কৃতির বিরোধিতা করে না।  কিন্তু তাই বলে সংস্কৃতির নামে অন্যের ধর্মীয় মূলবোধ, আচার, আচরণকে যখন মুসলমানদের উপর চাপিয়ে দেয়া হয়, প্রশ্ন ওঠে তখনেই। বৈশাখ উদযাপনে কোনো হিন্দু যদি কপালে সিঁদুর পড়ে, শঙ্খ বাজায় তাতে সমস্যার কিছু নেই। কিন্তু এই কাজটি যখন বাঙালি সংস্কৃতির ডালায় সাজিঁয়ে মুসলিম যুবকের হাতে তুলে দেয়া হয়- আপত্তিটা ওঠে সেখানেই।

প্রাচীন শাস্ত্র অনুযায়ী সিঁদুর শক্তির প্রতীক। শাস্ত্র মতে, মানব শরীরে নানা দেবতা অবস্থান করেন নানা স্থানে । কপালে থাকেন স্বয়ং ব্রহ্মা। লাল সিঁদুর ব্রহ্মাকে তুষ্ট করার জন্যই কপালে দেওয়া হয়। শক্তি সাধক পুরুষেরাও কপালে সিঁদুর ব্যবহার করেন ব্রহ্মাকে তুষ্ট রাখার জন্য। হিন্দু শাস্ত্রে অনুযায়ী নারী হোলো শক্তি সেই শক্তিকে সম্মান প্রদর্শনের জন্য সিঁদুরের ব্যবহার করা হত। প্রাচীন রামায়ণে মাতা সীতা এবং মহাভারতে দ্রৌপদী সিঁথিতে সিঁদুর ব্যাবহারের স্পস্ট প্রমাণ আছে। রামায়ণে শ্রীরাম যখন মাতা সীতাকে বিবাহ করেন তখন তিনি মাতা সীতার সিঁথিতে সিঁদুর দান করেছিলেন। একই প্রমাণ আছে হরিবংশ পুরাণে যখন শ্রীকৃষ্ণ রুক্মিনীদেবীকে বিবাহ করেন, তখন তিনিও রুক্কিনীদেবী সিঁথিতে সিঁদুর দান করেছিলেন। এই পরম্পরাই এখনও অবধি হিন্দু বিবাহতে চলে আসছে। যেখানে স্বামী তার স্ত্রীকে সিঁথিতে সিঁদুর দান করে, স্ত্রী হিসাবে তাকে গ্রহণ করে। হিন্দু ধর্মে বিশ্বাস করা হয়, স্ত্রী তার সিঁদুরের শক্তি দিয়ে স্বামীকে যে- কোনও বিপদের হাত থেকে বাঁচাতে পারেন। তাই হিন্দু ধর্মে বিবাহিত মহিলাদের সিঁদুর পরার রীতি। সেই প্রাচীনকাল থেকেই হিন্দু মহিলারা স্বামীর মঙ্গলকামনায় সিঁথিতে সিঁদুর পরে আসছেন।

অন্যদিকে সনাতন ধর্মে শঙ্খ ভগবান বিষ্ণুর প্রতীক। একে বিষ্ণুর অর্ধাঙ্গী হিসেবেও পূজো করা হয়। সৃষ্টির শুরুতে সমুদ্রগর্ভ হতে, পালনকর্তা ভগবান বিষ্ণু ও স্বর্গীয় দেবতাদের তৈরী ঘূর্ণাবর্তের মধ্য থেকে অস্ত্ররূপে শঙ্খকে হাতে ধরে আবির্ভাব হয় ভগবান বিষ্ণুর।  পুরাণে উল্লেখ পাওয়া যায় যে সমুদ্রমন্থনের সময় মহাসমুদ্রের গর্ভ থেকে উঠে এসেছিল শঙ্খ, যা পরে জায়গা পায় ভগবান বিষ্ণুর হাতে। বিশ্বাস করা হয় যে চন্দ্র, সূর্য এবং বরুণ দেব শঙ্খের একেবারে নিচে অবস্থান করেন। মধ্যভাগে থাকেন প্রজাপতি এবং বাকি অংশে অবস্থান করেন মা গঙ্গা এবং সরস্বতী। শাস্ত্রে বলা হয় বাড়িতে শঙ্খ তিনবার বাজানো উচিত। তিনবারের বেশি শঙ্খ বাজানো উচিত নয়। এর কারণ হিসেবে শাস্ত্রে বলা হয় যে, ৩ বার শঙ্খ বাজালে ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ এই তিন দেবতার সাথে সমস্ত দেবদেবীরা আমন্ত্রিত হন। কিন্তু তিনবারের বেশি শঙ্খ বাজালে দেবের সাথে দানব বা অসুরকে নিমন্ত্রণ পাঠানো হয়। হিন্দু সংস্কৃতির সুপ্রাচীন রীতি শ্বেত শঙ্খের ব্যবহার। শুদ্ধতার প্রতীক এই শঙ্খ যে কোনও শুভ কাজে তো বটেই, সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় পুজো-পাঠে। শাস্ত্র মতে কোনও শুভ কাজ করার আগে শঙ্খধ্বনি করলে গৃহস্থের মঙ্গল হয়। এই ধ্বনিই পরিবারকে সমস্তরকম অশুভ শক্তি, ভাবনা ও কাজ থেকে বিরত রাখে। শুধু তাই নয়, কালা জাদুর প্রভাব থেকেও শঙ্খ দূরে রাখে। এই বিশ্বাসেই বাড়ির মহিলা ও পুরুষরা প্রতিদিন সন্ধ্যারতির সময় শঙ্খধ্বনি করে থাকেন।

একইভাবে অগ্নি বা আগুনকে বলা হয় যজ্ঞ সারথী। অগ্নি তার নিজের রথে করে দেবতাদের যজ্ঞস্থলে নিয়ে আসে। সে কারণে হিন্দুদের পূজা, যাজ্ঞযজ্ঞসহ সকল শুভ কাজে আগুন রাখা হয়। আগুন দিয়ে পবিত্রতা পরীক্ষা করা হয়। মহাভারতে ভগবান শ্রীরামের স্ত্রী সীতাকে অগ্নিপরীক্ষার মাধ্যমে সুচিতা পরীক্ষা করা হয়। কাজেই হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা বাংলা নববর্ষে বা বছরের প্রথম দিনটা যদি অগ্নিস্নানে সুচী হয়ে, শঙ্খ ধনী দিয়ে উদযাপন করে তাতে কোনো সমস্যা হওয়ার কারণ নেই। কিন্তু বাঙালি সংস্কৃতি আখ্যা দিয়ে সেই শঙ্খ, সিঁদুর যখন মুসলিম পুরুষের হাতে ও মহিলার সিঁথিতে তুলে দেয়া হয় এবং কিছু না বুঝেই মুসলিম যুবক, যুবতীরা তা গ্রহণ করে আপত্তিটা সেখানেই উঠবেই।

সহজভাবে উদাহরণ দিই। আরবে পশু কুরবানীতে উঠ, দুম্বা, মেষ ব্যবহার করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশ তথা ভারতবর্ষে গরু, ছাগল কুরবানী করা হয়। কেননা, গরু ছাগল আমাদের স্থানীয় সংস্কৃতির সাথে জড়িত। কিন্তু বাঙালি সংস্কৃতি বলে কোনো হিন্দু প্রতিবেশীকে কুরবানীর ঈদে বাড়িতে নিমন্ত্রণ করে গরুর গোস্ত দিয়ে আপ্যায়ন করাতে পারি না এবং তিনিও এটা ভালোভাবে গ্রহণ করবেন না। কারণ এটি তার ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে সাংঘর্ষিক। ঠিক যেভাবে কোনো মুসলিম তরুণ তরুণী মুখে হোলির রঙ মাখাতে পারি না। মাহরাম পুরুষ সামাজিক উৎসবে নারীকে রঙ মাখাতে কোনো দোষ নেই যদি সেখানে ইসলাম বহির্ভূত কিছু না থাকে। কিন্তু সেটা হোলির রঙ নয়, কারণ এর উৎসব বৃন্দাবনে শ্রীরাধা-কৃষ্ণের লীলার সাথে সম্পর্কিত।

গত কয়েক বছর ধরে পহেলা বৈশাখের সাথে চৈত্র সংক্রান্তি উৎসব পালনেরও ধুম পড়েছে। সার্বজনীন বাঙালী সংস্কৃতি বলে এই অনুষ্ঠানও পালিত হচ্ছে পহেলা বৈশাখের আগের দিন থেকে। ছায়ানটী সাংস্কৃতিক বলয়ের লোকেরা বিগত দেড় দশক ধরে ঘরোয়াভাবে চৈত্র সংক্রান্তি উৎসব পালন করে আসছিল এবং তা জাতীয়ভাবে পালনের জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছে এবং কিছুটা সফলতাও পেয়েছে। চৈত্র সংক্রান্তির মূল উৎসব হচ্ছে চড়ক পূজা। বাংলাপিডিয়া মতে, এটি হিন্দুদের একটি ধর্মানুষ্ঠান। চৈত্র মাসের সংক্রান্তিতে এটি পালিত হয়। এর অপর নাম নীলপূজা। পশ্চিম বঙ্গের গম্ভীরাপূজা বা শিবের গাজন এই চড়ক পূজারই রকমফের। এ পূজা খুবই আড়ম্বরপূর্ণ। এতে জলভরা একটি পাত্রে শিবের প্রতীক শিব লিঙ্গ রাখা হয়, যা পূজারীদের কাছে ‘বুড়োশিব’ নামে পরিচিত। এ পূজার পুরোহিত হলেন আচার্য ব্রা‏হ্মণ বা গ্রহবিপ্র, অর্থাৎ পতিত ব্রা‏হ্মণ। চড়ক পূজার বিশেষ বিশেষ অঙ্গ হলো কুমিরের পূজা, জ্বলন্ত অঙ্গারের উপর হাঁটা, কাঁটা আর ছুরির উপর লাফানো, বাণফোঁড়া, শিবের বিয়ে, অগ্নিনৃত্য, চড়ক গাছে দোলা এবং দানো-বারানো বা হাজারা পূজা। ১৮৬৫ সালে ইংরেজ সরকার আইন করে এ নিয়ম বন্ধ করলেও গ্রামের সাধারণ লোকের মধ্যে কোথায়ও কোথাও এ অনুষ্ঠান এখনো প্রচলিত আছে।

একটি বিশেষ ধর্মীয় উৎসব। উৎস, ইতিহাস ও পালন পদ্ধতি সবকিছু প্রমাণ করে এটি হিন্দুদের ধর্মীয় উৎসব। এ বছর সংক্রান্তি এলায়েন্স চৈত্র সংক্রান্তি উৎযাপন উপলক্ষ্যে ঢাকায় অগ্নি নৃত্যের আয়োজন করে। এটিও এক বিশেষ ধরণের পূজা আচার। তবু হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের তা পালনে মুসলমানদের মনে কোনো দ্বিধা থাকতে পারে না। কিন্তু চৈত্র সংক্রান্তি বা চড়কপূজাকে ‘বাঙালী সংস্কৃতি’বলে বাংলাদেশী মুসলমানদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

বাংলা নববর্ষে অনুষ্ঠানে শরীরে তিলক, স্বস্তিকা, টীকা, উল্কি আঁকা নামক আরেকটি উপাচার যোগ হয়েছে ইদানিং। প্রথমদিকে এটি চালু করেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের ছাত্ররা। এখন এর সাথে নানা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সৌখিন চিত্রকরেরাও যোগ দিয়েছে। এমনিতেই শরীরে উল্কি আঁকা ইসলামে বা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। কিন্তু পহেলা বৈশাখে যেভাবে রমনা পার্ক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ছেলেরা মেয়েদের এবং মেয়েরা ছেলেদের শরীর ছুঁয়ে উল্কি আঁকে তা অপসংস্কৃতি ছাড়িয়ে বেহায়াপনার পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত চিত্রে দেখা যায়, প্রথম প্রথম ছেলেরা মেয়েদের কপালে, কপোলে, চিবুকে উল্কি এঁকে দিত। এখন সেটা নীচে নেমে বুক ও পিঠের অনাবৃত অংশে পৌঁছেছে।

তিলক বিভিন্ন হিন্দু সম্প্রদায়ের ভক্তগণ কর্তৃক ললাটাদি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে অঙ্কিত চিহ্নবিশেষ। সম্প্রদায়ভেদে চন্দন, খড়িমাটি জাতীয় গুঁড়া, ভস্ম প্রভৃতি দিয়ে তিলক অঙ্কিত হয়। বাংলাপিডিয়া মোতাবেক, শৈবাদি বিভিন্ন সম্প্রদায় যেসব ভঙ্গিতে তিলক ধারণ করে তার অনুপ্রেরণা এসেছে স্ব স্ব ইষ্ট দেবদেবীর মূর্তিতে অঙ্কিত বিভিন্ন চিহ্ন থেকে। সাধারণত নিষ্ঠাবান হিন্দুরা নিত্য, নৈমিত্তিক ও কাম্য এবং পৈত্র্যাদি কর্ম অনুষ্ঠানের পূর্বে তিলকচর্চা করে থাকেন। তবে শৈব, শাক্ত, বৈষ্ণব, সৌর এবং গাণপত্য সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে এটি একটি নিয়মিত আচার। এদের মধ্যে আবার বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব অধিক। স্নানের পর বৈষ্ণবরা বিষ্ণুর দ্বাদশ নাম স্মরণ করে দেহের দ্বাদশ অঙ্গে তিলক ধারণ করেন।

স্বস্তিকা একটি সংস্কৃত শব্দ, যার অর্থ কল্যাণ বা মঙ্গল বা ‘সৌভাগ্য, ‘ভালো থাকা’। স্বস্তিকা উল্লেখযোগ্য ব্যবহার ভারতে দেখা যায়, যেখানে স্বস্তিকা হিন্দু, বৌদ্ধ ও জৈনবাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। স্বস্তিকাকে ব্রহ্মা ও সূর্যের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়। চতুর্মস্তকধারী ব্রহ্মা ও সূর্য যেহেতু জীবন, সৃষ্টি এবং সৌভাগ্যের প্রতীক এছাড়া  স্বস্তিকা চারটি বাহু সাধারণত চতুর্মস্তকধারী ব্রহ্মাকে চিহ্নিত করে। মাঝখানের  যোগ চিহ্ন থেকে বোঝায় যে এভাবেই পরমাত্মার সঙ্গে জীবাত্মার মিলন হয়ে থাকে। ডানহাতি স্বস্তিকা হল ভগবান বিষ্ণু ও সূর্যের প্রতীক। বামহাতি স্বস্তিকা চিহ্ন মা কালী ও জাদুর প্রতীক। যেহেতু সূর্য নিজেই সৌভাগ্য, সৃষ্টি এবং জীবনের প্রতীক, তাই সূর্যদেবতার সাথে স্বস্তিকার একধরনের সম্পর্ক টানতে চেয়েছেন অনেকেই।

জৈনধর্মে স্বস্তিকা তীর্থঙ্কর পার্শ্বনাথকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। বৌদ্ধ ধর্মেও স্বস্তিকা অর্থ সৌভাগ্য বা নিরর্বান। বুদ্ধের বুকে, হাতে পায়ে স্বস্তিকার দেখা মেলে। এই চিহ্নের নাম চিনে ‘ওয়ান’, জাপানে ‘মানজি’, ইংল্যান্ডে ‘ফাইলফট’। হিটলার তার জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রতীক হিসেবে স্বস্তিকাকে বেছে নিয়েছিলেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রচীন মিথলজিতে স্বস্তিকার ব্যবহার দেখা যায়। এর ইতিহাস মতান্তরে ১৫ হাজার বছরের পুরাতন। তবে সর্বত্রই এটি মঙ্গলের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।কিন্তু এর কোনো পর্যায়ে ইসলাম বা মুসলমানেদের সম্পর্ক নেই।ইসলাম কল্যাণ ধারণার সাথে কোনো প্রতীক বা চিহ্নের যোগসূত্র নেই। ইসলামী বিশ্বাসে সকল কল্যাণের মালিক একমাত্র আল্লাহ যিনি নির্দিষ্ট কোনো আকার ধারণ করেন না।

হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা বাংলাদেশের দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়। পরধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা ও সহিষ্ণুতা প্রদর্শন ইসলামের নির্দেশ। হাজার বছর ধরে এ দেশের হিন্দু মুসলমান পাশাপাশি বসবাস করে এই সহিষ্ণুতার বিরল নজির স্থাপন করেছে। চৈত্র সংক্রান্তি কিম্বা দূর্গাপূজার মেলায় অনেক বাঙালী মুসলিম তরুণরা অংশ নিয়ে থাকে। কিন্তু চৈত্র সংক্রান্তি বা দূর্গাপূজাকে কোনো দিন তাদের সংস্কৃতি বলে মনে করেনি। একই ভাবে মুসলমানদের ঈদের মাঠের রাস্তায় হিন্দুরা মিষ্টির দোকান দিয়েছে, চকবাজার থেকে ইফতারীর স্বাদ তারাও গ্রহণ করে থাকে। কিন্তু ঈদ বা রমজানকে কেউ তাদের সংস্কৃতি বলে গ্রহণ করেনি। ইসলাম ধর্মে শিরক ও পৌত্তলিকতা হারাম। কিন্তু নববর্ষ উৎযাপনের নামে বাঙালী সংস্কৃতির বরণ ডালায় শিরক, পৌত্তলিতা সাজিয়ে, অপসংস্কৃতির নানা পসরা যেভাবে মুসলিম সমাজে অনুপ্রবেশের চেষ্টা চলছে, এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের বিরোধিতা শুধু সেখানেই। মুসলিম ছেলেরা ধুতি পরে, ললাটে তিলক এঁকে বাঙালী সেজে উৎসবে যোগ দিলে তার ছবি দেখে বিশ্ববাসী কোলকাতা বলে ভুল করুক তার বিরোধিতা করছে শুধু। তারা চায়, সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশের জাতীয় অনুষ্ঠানে তাদের বিশ্বাস, মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির প্রতিফলন ঘটুক।

১৯৪৬ সালে যেমন আমরা পশ্চিমবঙ্গের বাঙালীদের সাথে থাকতে চাইনি কিম্বা পশ্চিমবঙ্গের বাঙালীরা আমাদের সাথে থাকতে চায়নি; বরং ভোট দিয়ে আমরা বেছে নিয়েছি শত শত মাইল দুরের পিণ্ডি ও দিল্লীকে। আজও তেমনি শাখারী বাজার ইসলামপুরের সাথে পহেলা বৈশাখ বা হালখাতা পালন না করে একদিন পর শত শত মাইল দুরের বাগবাজারের সাথে উৎযাপন করে। এর মূল কারণ দুইটি পঞ্জিকা। মোহাম্মাদী পঞ্জিকা ও লোকনাথ পঞ্জিকা। আক্ষরিক অর্থে এ শুধু দুই পঞ্জিকার দ্বন্দ্ব নয়। এর পেছনে রয়েছে হাজার বছরের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ধর্ম বিশ্বাসের দ্বন্দ্ব। তসবিহ আর জপমালার মতোই তা আলাদা রয়ে গেছে হাজার বছর ধরে। বাঙালীত্বের রাখী বেঁধে তাকে এক করার চেষ্টা আজকের মতোই চলছে বহুকাল ধরে। কিন্তু তসবিহ কখনো জপমালা হয়নি, জপমালাও তসবিহ নয়। মোহাম্মদ ও লোকনাথের এই সাতন্ত্র সহস্ত্র বছর ধরেই একই নদীর দুই স্রোতধারার মতো বয়ে চলেছে বাঙালী শোনিতে। নদী বিধৌত এই দেশে কোনো দিন কোনো মুসলিম মাঝি মাল্লা ‘ এবার তোর মরা গাঙে বান এসেছে জয় মা’ বলে নদীর বুকে তরী ভাসায়নি। কিম্বা ‘মা ভৈ, মা ভৈ’ অর্থাৎ মা ভৈরবীর( মা কালী) নামে জয়ধ্বনি দিয়ে যাত্রা শুরু করেনি। এখানকার মুসলিম মাঝি মাল্লার ‘বদর বদর’ কণ্ঠে নাও ভাসানোর গান ছিল ‘দাড়ি মুখে সারী গান লা শারীক আল্লা’।

হেফাজতে ইসলাম বলেছেন, মঙ্গল শোভা যাত্রা হারাম। ঢালাওভাবে এই ফতোয়া সঠিক নয়। এদেশের ইসলামী সংগঠনগুলো হিজরী নববর্ষকে স্বাগত জানিয়ে র‌্যালি করে থাকে সেটা যদি জায়েজ হয়, বাংলা নববর্ষকে স্বাগত জানিয়ে র‌্যালি করা হারাম হবে কেন? প্রশ্ন, থাকতে পারে মঙ্গল শোভা যাত্রাকে যেভাবে পৌত্তলিকতার উপাদানে ও মোড়কে আবৃত করা হয়েছে, মুসলমানদের জন্য সেটা জায়েজ কিনা? উত্তর- পৌত্তলিকতা সম্পৃক্ত কোন কিছুই মুসলমানের জন্য জায়েজ নয়, আলাদা করে মঙ্গল শোভা যাত্রা নয়। কিন্তু ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক নয় এমন উপায়ে এদেশের কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য তুলে ধরে যদি নববর্ষকে স্বাগত জানিয়ে র‌্যালি করা হয় তাহলে ইসলামে বাধা কোথায়? এই ঢালাও ফতোয়াগুলো মুসলমানদের ক্ষতি করছে।

বেশ কয়েক বছর ধরেই বিভিন্ন জনে বিজাতীয় ও হিন্দুয়ানী সংস্কৃতি বলে বাংলা নববর্ষকে বয়কট করার জন্য মুসলিমদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছেন। এর প্রভাবে এ বছরও সামাজিক গণমাধ্যমে বিজাতীয় সংস্কৃতি, বিদায়াতি সংস্কৃতি, হিন্দুয়ানী সংস্কৃতি আখ্যা দিয়ে বাংলা নববর্ষকে বয়কট করার আহ্বানও জানিয়েছেন কেউ কেউ। প্রশ্ন হচ্ছে আসলেই কি নববর্ষ  হারাম? বিদায়াত? বিজাতীয়, হিন্দুয়ানী  সংস্কৃতি? সবার আগে এ প্রসঙ্গটি পরিস্কার হওয়া প্রয়োজন।

১. বাংলা নববর্ষ চালু হয়েছে মোঘল সম্রাট আকবরের সময়। সম্রাট আকবর কতোটুকু মুসলিম ছিলেন সে বিতর্কে না গিয়ে মোঘল শাসনামল যেহেতু মুসলিম মুসলিম শাসনামল হিসাবে ইতিহাসে প্রতিষ্ঠিত তাই এ কথা বলা যায় যে, বাংলা নববর্ষের প্রচলন করেছে মুসলমান শাসকগণ।

২. বিদায়াতের দুই প্রকার সংজ্ঞা রয়েছে। কারো মতে, কুরআন ও হাদীসে যা হালাল বলা হয়েছে এর বাইরে যা কিছু আছে সব বিদায়াত। এই মত যারা প্রচার করেন তারা নিজেরাও এ মত বেশিরভাগ সময় পালন করতে পারেন না। অন্যপক্ষের মতে, কুরআন ও হাদীসে যা কিছু হারাম বলা হয়েছে তার বাইরে যা আছে সব বৈধ, ইসলামি পরিভাষায় ‘মোবাহ’।  দ্বিতীয় পক্ষে পৃথিবীর অধিকাংশ মত।

৩. আমরা জানি মদ খাওয়া, মৃত প্রাণীর গোস্ত খাওয়া হারাম। কিন্তু কেউ যদি জীবন রক্ষার্থে বাধ্য হয়ে খায়, সেটা জায়েজ। একইভাবে মুরগী, গরু, ছাগলের গোস্ত হালাল। কিন্তু আল্লাহর নামে জবাই না করা হলে তা হারাম। অর্থাৎ হারাম ও হালাল বিচারের ক্ষেত্রে কারণ ও পন্থা বা পদ্ধতিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

৪. নববর্ষ হারাম না হালাল তা নির্ধারিত হবে নববর্ষ কীভাবে উদযাপন করা হচ্ছে তার বিচারের উপর। যেমন, যে কাজ ৩৬৪ দিন হারাম, তা নববর্ষে করাও হারাম। যে কাজ অন্য যেকোনো সময় করা হালাল, তা নববর্ষে করাও হালাল। প্রত্যেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান নিজ নিজ আঙ্গিকে নববর্ষ উৎযাপন করে। নববর্ষ উদযাপনে পত্রিকাগুলো বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করে- এটা কি হারাম?(অবশ্য ক্রোড়পত্রে হারাম কোনো অনুষঙ্গ থাকলে তা এমনিতেই হারাম)। বিভিন্ন কোম্পানী  নববর্ষ উপলক্ষে বিশেষ মূল্য ছাড় দেয়- এটা কি হারাম? আবার কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নববর্ষ উপলক্ষে যদি ককটেল বা ডিজে পার্টি দেয় তা কি তা কি বছরের বাকি দিনগুলোতে হালাল? নববর্ষ উপলক্ষে রমনার বটমূলে দেবদেবীর প্রশস্তিমূলক মাঙ্গলিক গান, বেদ-পুরাণের চরিত্রের অনুকরণে মুখোশ ও সাজসজ্জা পরিধান, উল্কি আঁকা, রমনা এলাকায় নারী-পুরুষের প্রচণ্ড ভিড়ে অবাধ মেলামেশা কি মুসলমানদের জন্য বছরের বাকি ৩৬৪ দিন জায়েজ? একাজগুলো অন্যান্য জাতীয় দিবসে হালাল?

৫. বিজাতীয় সংস্কৃতির সংজ্ঞা নির্ধারণের আগে বাংলাদেশের জাতীয়তার সংজ্ঞা স্মরণ করা জরুরী। বাংলাদেশে প্রায় ১০ ভাগ অমুসলিম বাস করেন যাদের অধিকাংশ হিন্দু। তারাও আমাদের জাতির অভিন্ন অংশ। বাংলাদেশে বসবাসকারী জাতি, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা নির্বিশেষে সকল মানুষের সংস্কৃতিই বাংলাদেশের জাতীয় সংস্কৃতি। কোনো হিন্দু যদি নববর্ষে দেবদেবীর প্রশস্তিমূলক মাঙ্গলিক গান বা শ্যামা সঙ্গীত গায়, বেদ পুরাণের চরিত্রের অনুকরণে মুখোশ ও সাজসজ্জা পরিধান করে এটাকে কি বিজাতীয় সংস্কৃতি বলা যাবে? পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় বাসিন্দারা নববর্ষ উদযাপনে স্থানীয়ভাবে তৈরী মদ(বাংলা মদ) পান করে থাকে। নদীতে ফুল ভাসিয়ে প্রার্থনা করে যা তাদের সংস্কৃতির অংশ- এটাকে কি বিজাতীয় বলা যায়? হোলি খেলা, চৈত্র সংক্রান্তি হিন্দুদের ধর্মীয় উৎসব। এটাও বাংলাদেশের জাতীয় সংস্কৃতি। কিন্তু বাংলাদেশী মুসলমানদের সংস্কৃতি নয়। কুরবানী যেমন হিন্দুদের সংস্কৃতি নয়, তেমনি বলি মুসলিমদের সংস্কৃতি নয়। কিন্তু দুটোই আবার একসাথে বাংলাদেশী জাতীয় সংস্কৃতি।

৬. প্রশ্ন হচ্ছে মুসলিমরা কেন এটা করবে? এসব তো তাদের জন্য অন্য যেকোনো সময়ই হারাম। তাহলে নববর্ষকে কেন দোষ দেয়া হবে? হিন্দুরা যদি নববর্ষে মাঙ্গলিক বা শ্যামা সঙ্গীত গায়, মুসলিমরা যদি নববর্ষে ইসলাম সম্মত পন্থায় ইসলামী সঙ্গীত পরিবেশন করে তা অবৈধ হবে কেন? কিম্বা এমন কোনো সঙ্গীত পরিবেশন করে অথবা এমন কোনো পন্থায় নববর্ষ উদযাপন করে যা ইসলাম সিদ্ধ, তাহলে- নববর্ষ উদযাপন হারাম কেন হবে?

৭. যারা বাংলা নববর্ষ পালনকে না জাযেজ মনে করেন তাদের অনেকে আবার হালাল মনে করে ১ মহররমকে হিজরী নববর্ষ হিসাবে পালন করে থাকেন। প্রশ্ন হচ্ছে, হিজরী নববর্ষের সাথে ইসলামের সম্পর্ক কী? কুরআন হাদীসে কি হিজরী নববর্ষের কথা বলা হয়েছে? হিজরী সন তো শুরু হয়েছে রসুলের(সা.) ওফাতের অনেক বছর পর হযরত ওমর(রা.) শাসনামলে, ইরাক ও কুফার প্রশাসক আবু মুসা আশআরী (রা.) প্রস্তাবে শাসনকার্য পরিচালনার সুবিধার্থে। হযরত ওমর রা. এটা উদযাপন করেননি। কিন্তু এখন আরবরা সাড়ম্বরে হিজরী নববর্ষ সাড়ম্বরে পালন করে থাকে।

৮. আসলে বাঙালী মুসলমানের সংস্কৃতি কি হবে হাজার বছর ধরে এদেশের আলেম সমাজ ও সাংস্কৃতিক কর্মী ও মুসলিম বৃদ্ধিজীবীরা নির্ধারণ করেননি। শুধু না জায়েজ, হারাম বলে প্রচার করেছেন, ফতোয়া দিয়েছেন। আর এই সুযোগে একটি গ্রুপ আরব সংস্কৃতিকে ইসলামী সংস্কৃতি বলে বাঙালী মুসলমানদের উপর চাপিয়ে দিয়েছে। কিন্তু আরব সংস্কৃতি ও ইসলামি সংস্কৃতি এক নয়। আরবরা আবহাওয়া ও ভূ-প্রাকৃতিক কারণে উটে চড়ে, রুমাল ও জোব্বা পরিধান করে, মশকে(চামড়ার পাত্রে) পানি খায়। তাই বলে এগুলো ইসলামিক সংস্কৃতি নয়।

৯. অপসংস্কৃতি, বিজাতীয় সংস্কৃতি বলে আমরা শুধু চিৎকার করেছি, কিন্তু সংস্কৃতি কি তা নির্ধারণ করিনি। ফলে আমাদের তরুণরা না বুঝে, না জেনে, অসতর্ক ও অসচেতনভাবে অপসংস্কৃতির খপ্পরে পড়েছে। এ কথা ভুললে চলবে না যে, চিৎকার করে, ফতোয়া দিয়ে অপসাংস্কৃতিক আগ্রাসন বন্ধ করা সম্ভব নয়। সুষ্ঠু সংস্কৃতির জোরালো চর্চাই কেবল পারে অপসংস্কৃতির কবল থেকে তরুণ সমাজকে দুরে রাখতে। যেমন, রমনার অশত্থমূলে ছায়ানট অনুষ্ঠান করে। কোনো সংগঠন যদি উল্টোদিকে শতায়ু অঙ্গনে লাঠি খেলা, শাপ খেলার মতো অনুষ্ঠান পরিচালনা করে, ছায়ানটের গান শোনার জন্য কতোজন থাকবে তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।

১০. রমনার অশত্থমূল কেন্দ্রীক বাংলা নববর্ষ উদযাপনের শুরু বিগত শতাব্দির ষাটের দশকে। একটি রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ছায়ানট এই উৎসবের প্রচলন করে। নববর্ষে মঙ্গল শোভাযাত্রা আশির দশকে এবং পান্তা-ইলিশ আরো পরের সংযুক্তি। দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ ফুটবলের পর যুক্ত হয়েছে ভুভুজেলা, মিডিয়ার কল্যাণে রিও ডি জেনিরোর সাম্বা উৎসব থেকে গত কয়েক বছরে এতে যুক্ত হয়েছে মেয়েদের মাথায় ফুলের রিং। চারুকলার ছাত্ররা এক দশকের মতো হবে নববর্ষে মুখে-বুকে উল্কি আঁকা প্রচলন করেছে। এ বছর পুলিশ ভুভুজেলা নিষিদ্ধ করেছে। পান্তা-ইলিশ বিরোধী যে মনোভাব এ বছর তৈরী হয়েছে তাতে হয়তো অচিরেই এ প্রচলনটিও টিকবে না বলে বিশ্বাস। গ্রহণ ও বর্জনের মধ্য দিয়েই বহতা নদীর মতো সংস্কৃতি এগিয়ে যায়। মুসলমানদের জন্য উল্কি আঁকা, চন্দন তিলক, সিদুর পরা নিষিদ্ধ বলে অমুসলিমদের জন্যও তা নিষিদ্ধ নয়। বহু জাতির দেশ মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে যত্রতত্র মদের দোকান থাকলেও মুসলমানদের সেখানে গমন বৈধ নয়। মুসলিমদের সেখানে দেখলে পুলিশ আটক করে।

১১. জর্জ বার্নাড শ বলেছেন, ই্য়ুথ ইজ ফুল অভ জয়, ফুল অভ প্লেজার। তারুণ্য মানেই উৎসব। ইসলাম ধর্ম উৎসব মুখর ধর্ম। হিন্দুদের বারো মাসে তের পার্বন বা উৎসব। কিন্তু মুসলমানদের প্রতি সপ্তাহেই ঈদ বা উৎসব। অর্থাৎ বছরে ৫২টি ঈদ (বড় ঈদ বা উৎসবের কথা বাদই দিলাম)। কিন্তু আমাদের সমাজ ব্যবস্থা এই সাপ্তাহিক ঈদ উদযাপনের কোনো পন্থা ও সংস্কৃতি চালু করতে ব্যর্থ হয়েছে। ইরানে শুক্রবারগুলো  অত্যন্ত উৎসবমুখর পরিবেশে পালিত হয়। নওরোজ বা ফার্সি নববর্ষ তাদের ১০ হাজার বছরের প্রাচীন উৎসব। ইরানের ঐতিহ্যবাহী নববর্ষ উৎসব নওরোজ উৎসব এসেছে অগ্নিউপাসকদের কাছ থেকে। কিন্তু ইসলামী বিপ্লবের পরে এই নওরোজ উৎসব নিষিদ্ধ হয়ে যায়নি, বরং আরো জাকজমকপূর্ণভাবে পালিত হচ্ছে। শুধু উদযাপনের পদ্ধতি ও কৌশলে পরিবর্তন এসেছে।  মানুষ বিনোদন চায়, তারুণ্য উৎসব চায়, আনন্দ চায়। উৎসব ও বিনোদনের ইসলাম সম্মত পন্থা তাদের সামনে না থাকলে দূর্বল যৌক্তিক ফতোয়া দিয়ে তারুণ্যকে ঠেকিয়ে রাখা যাবে না। আদতে হচ্ছেও সেটাই।

বৈশাখের অনুষ্ঠানে রমনা এলাকায় আমি অনেক বোরখাপরা নারীকে দেখেছি, অনেক দাঁড়ি, টুপিওয়ালা তরুণকে দেখেছি। নববর্ষ পালনের ইসলাম সম্মত উপায় তাদের সামনে থাকলে হয়তো এদের অনেকেই এ অনুষ্ঠানে শরীক হতো না। ইসলামপন্থীদের প্রতি অনুরোধ বাংলা নববর্ষকে স্বাগত জানানো ইসলাম সম্মত র‌্যালি, উৎসবের আয়োজন করুন যাতে বাঙালি মুসলমানের কৃষ্টি ও ঐতিহ্য প্রতিফলিত হয়। যা ইসলামী বিধি নিষেধে আটকায় না আবার মুসলিম সম্প্রদায় আনন্দ ও উৎসবে ঘাটতি না থাকে। তাহলেই কেবল শিরক থেকে বাঙালি মুসলিম তারুণ্যকে ফেরানো সম্ভব।

কাজেই আমাদের তরুণ সমাজকে অপসাংস্কৃতিক আগ্রাসনের হাত থেকে রক্ষা করতে হলে সুষ্ঠু সংস্কৃতি ও নির্মল বিনোদনের রূপরেখা তৈরী করে তার জোরালো চর্চা করতে হবে। মুসলিম সম্প্রদায় কিভাবে ইসলাম সম্মতভাবে নর্ববর্ষ উদযাপন করবে তার রূপরেখা মুসলিম ধর্মীয় স্কলার ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের বের করতে হবে। যুগোপযোগী চাহিদা পুরণের উপযোগী নববর্ষের আনন্দ, বিনোদন ও উৎসব উপভোগের ইসলাম সিদ্ধ পন্থা বের করা গেলে মুসলিম তরুণ-তরুণীদের সহজেই অপসংস্কৃতি থেকে দুরে রাখা সম্ভব।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

one + 8 =

আরও পড়ুন