নানিয়ারচর গণহত্যার ২৮ বছর : কেমন ছিল সেই দিন

fec-image

আজ (বুধবার) ১৭-ই নভেম্বর, পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসের একটি কালো দিন। ১৯৯৩ সালের এই কালো দিনে রাঙ্গামাটি জেলার নানিয়ারচর উপজেলার বাঙ্গালীদের উপর জেএসএস সন্তুর সন্ত্রাসীরা পরিকল্পিতভাবে গণহত্যা পরিচালনা করে। এই গণহত্যার ২৮ বছর আজ। পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে নানিয়ারচর গণহত্যাটি ১৯তম কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে পরিচিত।

স্বজন হারা পরিবারগুলোর সদস্যরা আজও নানিয়ারচর গণহত্যার সাথে জড়িত প্রকৃত অপরাধীদের বিচার দাবি তুলে আর্তনাদ করে। কিন্তু কেউ তাদের পাশে দাঁড়ায় নি। এইভাবেই ২৮টি বছর কেটে গেছে। এই গণহত্যায় ৪৯ জনের অধিক নিরস্ত্র বাঙ্গালীকে হত্যা করা হয়। বাঙ্গালী মা-বোনদের জেএসএস সন্ত্রাসীরা গণধর্ষণ করে হত্যা করে। আহত হয় প্রায় ১৫০/২০০ জন।

কী ঘটেছিলো সেই দিন?

পার্বত্য চট্টগ্রামে চরমভাবে অবহেলিত, সরকারি সুযোগ- সুবিধা বঞ্চিত, নিপিড়িত, নির্যাতিত, অধিকার বঞ্চিত, বর্বরতম সন্ত্রাসের নির্মম ও অসহায়ের শিকার, নিরীহ ও নিরস্ত্র বাঙালীদের খুন করা, তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া, তাদের সম্পত্তি লুটপাট করার জন্য উপজাতি জঙ্গিরা, যারা মিয়ানমার ও ভারতের রিফিউজি বা অনুপ্রবেশকারী বা বসতিস্থাপনকারী বা সেটেলার উগ্রবাদি উপজাতি জঙ্গি সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) এর সংগঠক ৩৮ হাজার বাঙ্গালীর হত্যাকারী খুনি সন্তু লারমার উগ্রবাদি জঙ্গি বাহিনী বা শান্তি বাহিনী বা গেরিলা বাহিনী, উগ্রবাদি উপজাতি জঙ্গি বা সন্ত্রাসীরা নিরীহ পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বাঙালীদের আক্রমণ করা, তাদের হত্যা করা, অপহরণ ও গুম করা, তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া, তাদের সম্পত্তি লুটপাট বা ঘর-বাড়ি লুটতরাজ করে সম্পূর্ন ভাবে পুড়িয়ে দেওয়া, তাদের গৃহহীন করার অসংখ্য নজির বাংলাদেশ আমলের বিভিন্ন সময় আমরা দেখেছি। এসবই এখানকার নিয়মিত ঘটনা। আবার কোনো কোনো সময় উগ্র উপজাতিরাই বিভিন্ন অজুহাত তৈরি করে। তারপর শুরু হয় এসব তাণ্ডবলীলা।

রাঙ্গামাটি জেলার নানিয়ারচর উপজেলার নানিয়ারচর বাজারে ১৭ নভেম্বর ১৯৯৩ সালে সংঘটিত এই বর্বর গণহত্যায় ৪৯ জন বাঙ্গালীকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়, ছাত্র জনতা, নারী, শিশু, বৃদ্ধ আহত হয় শতাধিক, গুম করে শত শত বাঙালী ছাত্র-জনতা-নারী-শিশু-বৃদ্ধ, আহত হয় শতাধিক। এই জঘন্য বর্বর গণহত্যায় উগ্রবাদি জঙ্গি বাহিনী বা শান্তি বাহিনী বা গেরিলা বাহিনীর বন্দুক গর্জে উঠেছিল নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার মিছিলে, উগ্রবাদী জঙ্গি বাহিনী বা শান্তি বাহিনী বা গেরিলা বাহিনী পরিকল্পিত ইশারায় সেদিন ধারালো দা, বর্শা, বল্লম নিয়ে নানিয়াচর বাজারে আগত নিরিহ বাঙালীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল বেতছড়ি, ছয়কুড়িবিল, মাইচ্ছড়ি, গবছড়ি, তৈচাকমা, যাদুকাছড়া, বগাছড়ি, বড়াদম, বুড়িঘাট, কাঁঠালতলী, শৈলেশ্বরী, নানাক্রুম, সাবেক্ষ্যং, এগারাল্যাছড়া, বাকছড়ি, কেঙ্গালছড়ি থেকে আগত সশস্ত্র উপজাতি অনুপ্রবেশকারীরা। জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছিল বাঙালীদের ১শ ৩২টি ঘর বাড়ি।

১৭ নভেম্বর দিনটি ছিল বুধবার, নানিয়ারচর বাজারের সাপ্তাহিক বাজার দিন। তাই স্বভাবিকভাবে দুর-দূরান্ত থেকে বাজারে এসেছিল শত শত বাঙালী, শিশু-বৃদ্ধ, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে। ১৭ নভেম্বর সকালের দিকে তৎকালীন ইউনিয়ন পরিষদ মেম্বার আহমেদ মিয়া ও বুড়িঘাট ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবদুল লতিফসহ পার্বত্য গণপরিষদের মিছিলটি স্থানীয় লাইবেরী প্রাঙ্গণ থেকে শুরু হয় যাদের প্রধান দাবীগুলো ছিল: শান্তিবাহিনীর হাত থেকে নানিয়ারচরের নিরীহ বাঙালীদের বাঁচাও, লঞ্চঘাটের যাত্রী ছাউনি দিতে হবে ও সেনাবাহিনীর ৪০ ইবি রেজিমেন্টের সেনাছাউনি স্থাপন করতে হবে।

কয়েক হাজার বাঙালী ছাত্র-জনতার মিচ্ছিলে তখন সারা নানিয়ারচর উজ্জীবিত। মিচ্ছিল থেকে গনতন্ত্র ও সাংবিধানিক অধিকারের দাবী উচ্চকন্ঠে জানানো হচ্ছিল। মিচ্ছিলটি শান্তিপুর্ণভাবে শহরের রাস্তা প্রদক্ষিন শেষে কৃষি ব্যাংক এর সামনে সমাবেশ করে।

অন্যদিকে, উগ্র উপজাতি পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ ও খুনি সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) এর সশস্ত্র সংগঠন শান্তি বাহিনীর গেরিলা যোদ্ধারা ও উগ্রবাদী উপজাতি জঙ্গি সন্ত্রাসী হায়নারা সমাবেশকে প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়ে রাস্তায় নেমে পড়ে জঙ্গী মিচ্ছিল বের করে। তারা মিছিল থেকে সাম্প্রদায়িক শ্লোগান তুলতে থাকে। এক পর্যায়ে উপজাতি জঙ্গি মিছিল থেকে হামলা করে এক বৃদ্ধ বাঙালীকে আহত করা হয়। এতে করে বাঙালীদের মাঝে ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পরে। এ পর্যায়ে অনুপ্রবেশকারী জঙ্গি উপজাতিদের মিছিল থেকে দা, বল্লম ইত্যাদি দিয়ে হামলা হলে পার্বত্য গণপরিষদের ছাত্র সমাজ জনতাকে নিয়ে প্রবল প্রতিরোধ করে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) এর সশস্ত্র সংগঠন শান্তি বাহিনী ফনি ভূষণ চাকমা, শোভাপূর্ণ চাকমা, বীরেন্দ্র চাকমা নেতৃত্বে আরো ৩০/৩৫ জন জঙ্গি শান্তিবাহিনী সন্ত্রাসীরা নিরীহ বাঙালীদের উপর গুলি চালায়, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের সদস্যরা বেয়নেট দিয়ে কোপায়, আর দাঙ্গায় মারা গেছে দেখানোর জন্য লেলিয়ে দেয়া উগ্রবাদী উপজাতিরা জ়েট বোট ও নৌকার উপর থেকে দা, বর্শা, বল্লম দিয়ে নৃশংসভাবে মেরে, কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে অনেক বাঙালীদেরকে।

আহত বাঙালীদেরকে আহত অবস্থায়ই কাপুরুষেরা অনেক পশুর মত জবাই করে হত্যা করেছে। জীবন বাঁচানোর তাগিদে সেদিন বাঙালীরা কাপ্তাই লেকের পানিতে ঝাঁপ দিলেও জনসংহতি সমিতির শান্তিবাহিনী ও উগ্র পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ নামক হায়নার নির্মমতার হাত থেকে রক্ষা পায়নি। যারা দোকানে, বাড়িতে লুকিয়ে ছিল তাদেরকে টেনে হিঁচড়ে বের করে হত্যা করা হয়েছে অথবা পুড়িয়ে মারা হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের পাশের বাঙালীদের গ্রামগুলি লুটপাট করে জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। সেই সময় রাঙ্গামাটি থেকে আসা লঞ্চ পৌঁছালে সেখানেও হামলা করে অনেক নিরীহ নিরস্ত্র বাঙ্গালীকে হতাহত করা হয়। আনিসুজ্জামান নামক এক মৌলভীকে হত্যার পর লাশ গুম করা হয়। এভাবে প্রায় দু’ ঘন্টা ধরে হত্যাযজ্ঞ চালানো হয় বাঙালীদের উপর।

১৯৯৩ সালের ১৭ নভেম্বর রাঙ্গামাটি জেলার নানিয়ারচর গণহত্যাটি ঘটনার মাধ্যমে কয়েক ঘন্টা সময়ের ব্যবধানে ৪৯ জনের অধিক নারী, শিশু, আবাল বৃদ্ধ বনিতা নিরস্ত্র নিরীহ বাঙ্গালীকে হত্যা করে, অধিকাংশ লাশগুলোকে গুম করা হয়েছে এবং আহত করা হয়েছে আরও শতাধিকের অধিক, অপহরণ করা হয়েছে আরো শত শত বাঙ্গালীকে। ২০৪টি বাড়ি লুটতরাজ করে সম্পূর্ণ ভাবে পুড়িয়ে দেয়া হয়। জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছিল বাঙালীদের ১শ ৩২টি ঘর বাড়ি। গৃহহীন হয়েছেন প্রায় শহস্রাধীক পরিবার। এরা লাশগুলোকে গুম করে আত্মীয়-স্বজনকে ফেরত না দিয়ে বা কবর দেয়ার সুযোগ না দিয়ে একত্রে পুড়িয়ে ফেলে মুসলিম ধর্মীয় রীতিকে অবমাননা করে।

এ খবর দৈনিক ইত্তেফাক ও দৈনিক ইনকিলাব পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছিল। ইতিপূর্বে ও সর্বদাই এরা এভাবে বাঙালীদের গণহত্যাকে ধামাচাপা দিতে চেয়েছে। ১৭ই নভেম্বর তারিখে শান্তি বাহিনী ও উগ্র পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ নামক হায়নার কর্তৃক রচিত হয়েছিলো এক কালো গণহত্যার ইতিহাস যা বাঙ্গালী জনগন কখনোই ভুলতে পারবে না।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

18 − eight =

আরও পড়ুন