পঞ্চাশ বছরেও গৃহীত হয়নি দূরদর্শী পার্বত্যনীতি

fec-image

স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি তথা সুবর্ণজয়ন্তীতে বাংলাদেশের মানুষ নানা আঙ্গিকে নিজেদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির হিসাব মিলাতে ব্যস্ত। এর মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি বিশেষ দিক হিসেবে বিবেচিত হওয়ার দাবি রাখে। কেননা, ১৯৭১ সালের মার্চে শুরু হয়ে একই বছরের ১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধ শেষ হলেও পাহাড়ে বন্দুকের আওয়াজ থামেনি এই ২০২১ সালে এসেও। প্রথমে বলা হয়েছিল, মুক্তিযুদ্ধের শেষদিকে মুক্তিযোদ্ধারা পাহাড়ের বিভিন্ন গ্রামে হামলা করে স্থানীয় জনগোষ্ঠিগুলোকে নির্যাতন, হয়রানি, অপমান, অপদস্ত করার কারণে তারা প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করে। কিন্তু বাস্তবতা ছিল একেবারেই ভিন্ন। সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণাতেও সেটা প্রমাণিত যে, মুক্তিযুদ্ধপরবর্তী সময়ে পাহাড়ে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে যেসব অপপ্রচার করা হয়েছে তার অধিকাংশ ঘটনা ঘটেইনি। যেসব ঘটনা ঘটেছে সেগুলোকে অতিরঞ্জিত করে, ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়ে অপপ্রচার করা হয়েছে।

বাংলাদেশ আমলে পাহাড়ে সৃষ্ট অশান্তির পেছনে দ্বিতীয় যে কারণটিকে দায়ী করা হয়, সেটি হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’। বিশেষ করে ১৯৭৩ সালে রাঙামাটিতে বঙ্গবন্ধু এক বক্তৃতায় সকলকে বাঙালি হয়ে যেতে বলেছিলেন বলে একটি প্রচার আছে। আর সেকারণেই পাহাড়ের উপজাতীয় জনগোষ্ঠিগুলো বাঙালি জাতীয়তাবাদের মধ্যে নিজেদের অস্তিত্ববিলীন হওয়ার আশঙ্কায় ক্ষুব্ধ হয়েছিল, ফলে তারা অস্ত্র হাতে নিতে বাধ্য হয়েছিল নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায়। কিন্তু সেকথাও ধোপে টেকেনি, কারণ পাহাড়ি জনগোষ্ঠির অনেক বিজ্ঞ মানুষ যারা সেদিন উপস্থিত ছিলেন, এমনকি বিভিন্ন সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সান্নিধ্য পেয়েছেন, তারা গবেষণামূলক প্রবন্ধ, বই লিখে, বিভিন্ন সভা-সমাবেশে বক্তৃতায় এটাকে মিথ্যা অযুহাত বলে উল্লেখ করেছেন। বাস্তবতা হলো, ব্রিটিশ আমলে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগোষ্ঠিগুলোর মানুষদের নাগরিক অধিকার ছিল না, ভোটাধিকার ছিল না। পাকিস্তান আমলে তাদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করে উন্নয়নবঞ্চিত রাখা হয়েছিল। আর বঙ্গবন্ধু তাদের বাঙালি হওয়া বলতে, বাঙালির সমান অধিকার দিয়ে এদেশের প্রতিটি নাগরিকের মতো সমমর্যাদায় তাদের অধিষ্ঠিত করেছিলেন।


এ বিষয়ে আরো পড়ুন:


‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ যে সংকটের মূল কারণ নয় সেটার প্রমাণ পাওয়া যায় বঙ্গবন্ধুর শাসনকালের পর। পরবর্তী সরকার যখন ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদে’র পরিবর্তে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ গ্রহণ করে আক্ষরিক এবং বাস্তবিক অর্থেই এদেশের সকল নাগরিককে একই মর্যাদায় চিহ্নিত করল, তখন তো পাহাড়ে অশান্তি থাকার কথা ছিল না। কিন্তু আমরা কী দেখলাম? শান্তির পথে না এসে, বরং তারা নতুন উদ্যমে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করল।

বঙ্গবন্ধু পাহাড়ের উপজাতীয় জনগোষ্ঠিগুলোর জন্য উচ্চ শিক্ষায় কোটা, বিদেশে শিক্ষার সুযোগ, ছাত্রাবাস, শিক্ষাবৃত্তি, চাকরিতে অগ্রাধিকার, ব্যবসা-বাণিজ্যে অগ্রাধিকার, পাহাড়ের উন্নয়নে বিশেষ বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ, উন্নয়ন বোর্ডের পরিকল্পনা, রাজাকার হওয়া সত্তে¡ও চাকমা সার্কেল চিফ ত্রিদিব রায়কে দেশে ফিরিয়ে এনে রাজনীতিতে সম্মানজনকভাবে প্রতিষ্ঠার আশ^াস, তার মা বিনীতা রায়কে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিতকরণ, তার পরিবারকে আর্থিক অনটন থেকে মুক্ত করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ, অবশেষে রাজাকার পুত্রকেই পরবর্তী চাকমা সার্কেল চিল হিসেবে নিয়োগ, পাহাড়িদের কৃষ্টি-কালচার সংরক্ষণসহ নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করার পরও অশান্তি সৃষ্টিকারীদের শান্তির পতাকাতলে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।

উন্নয়ন এবং ক্ষমার মতো উদারতা নিয়ে বঙ্গবন্ধুপরবর্তী জিয়াউর রহমানের সরকারও তাদের শান্তির পথে ফিরিয়ে আনতে একই নীতিতে চলার চেষ্টা করে। কিন্তু তাতেও কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আসার পরিবর্তে বরং উল্টো ফল দেখা দেওয়ায় পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে গ্রহণ করা হয় বাঙালি পুনর্বাসনের মতো কিছু সুচিন্তিত ও সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপকে। সেসময় গৃহীত এসব পদক্ষেপ পার্বত্য পরিস্থিতিকে জটিল করেছে বলে কেউ কেউ মনে করলেও অভিজ্ঞ মহলের বিশ্লেষণ হলো, পার্বত্য চট্টগ্রামে এখনো বাংলাদেশের পতাকা উড্ডীন আছে মূলত সেসব পদক্ষেপের কারণেই। উপরন্তু পাহাড়ে দুষ্টের দমন এবং শিষ্টের লালনে একটা ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা হয়েছিল এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে।

পাহাড়ে অশান্তির বীজ বপনকারী পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি- জেএসএস’র প্রতিষ্ঠাতা এম এন লারমার বাকশালে যোগদানকে অনেকেই মনে করেন, তিনি হয়তো শান্তির পথে ফিরে আসার পথ খুঁজছিলেন। কিন্তু বিষয় যে সেটা ছিল না, তার প্রমাণ পাওয়া যায় জনসংহতি সমিতির তৎকালীন কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা দেখে। আসলে বাকশালে তিনি যোগ দিয়েছিলেন, একটি পোশাকি পরিচয় টিকিয়ে রেখে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করার জন্য। জিয়াউর রহমানের আমলে শান্তিবাহিনীর প্রধান সন্তু লারমা আটক হয়ে জেলে ছিলেন। শান্তির স্বার্থে প্রেসিডেন্ট জিয়া সে সময় সন্তু লারমার স্ত্রীকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে সরকারি চাকরি দিয়েছিলেন, পরবর্তীতে বিনা শর্তে সন্তু লারমাকে মুক্তি দিয়েছিলেন, উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে পাহাড়ের ব্যাপক উন্নয়ন কার্যক্রম গ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু তাতেও ইতিবাচক ফল আসেনি। ইতিবাচক ফল যা এসেছিল, তা ওই সুচিন্তিত ও দূরদর্শী পদক্ষেপসমূহের কারণেই এসেছিল।

দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, বঙ্গবন্ধু এবং প্রেসিডেন্ট জিয়ার পার্বত্যনীতি থেকে অভিজ্ঞতা নিয়ে আরো দূরদর্শী হওয়ার সুযোগ ছিল জেনারেল এরশাদ সরকারের। একপেশে নমনীয়তা, উদারতার ভাষা বুঝতে পারার মতো মানসিকতা যে অশান্তিকারীদের ছিল না সেটা স্বাধীনতার পরবর্তী দশ বছরের অভিজ্ঞাতা থেকেই অনুধাবন করার সুযোগ ছিল, কিন্তু সে সুযোগটি কাজে লাগাতে পারেনি তৎকালীন সরকার। সেকারণে, তারা উন্নয়ন, নমনীয়তা, উদারতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখলেও জিয়া সরকারের সুচিন্তিত ও দৃঢ় পদক্ষেপগুলো থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নেয়। এর তিক্ত ফল এরশাদ সরকারকে হাতে নাতেই পেতে হয়েছে। পাহাড়ে শান্তিবাহিনী বাঙালিদের বিরুদ্ধে ব্যাপক হত্যাকান্ডে মেতে উঠে সে সময়। রেহায় পায়নি প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী, এমনকি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরাও।

এরশাদ সরকারের একপেশে নমনীয় নীতি থেকে উদ্ভূত পন্থার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে ১৯৮৯ সালে প্রণীত হয় পার্বত্য তিন জেলার জন্য স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন, প্রতিষ্ঠিত হয় তিনটি স্থানীয় সরকার পরিষদ। এর ধারাবাহিকতা বজায় রাখে ১৯৯১ সালে নির্বাচিত বেগম জিয়ার সরকার। ১৯৯৬ সালে নির্বাচিত হয়ে শেখ হাসিনার সরকার একই ধারাবাহিকতায় সব চেয়ে বড় সাফল্য পায় ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর। এই দিন স্বাক্ষরিত হয় পার্বত্য শান্তিচুক্তি। ১৯৯৮ সালে চুক্তির আদলে সংশোধিত হয় স্থানীয় সরকার পরিষদ আইনসমূহ এবং গঠিত হয় পার্বত্য জেলা পরিষদ। পাশাপাশি আঞ্চলিক পরিষদ আইন প্রণীত হয় এবং শান্তিবাহিনীর প্রধান সন্তু লারমার নেতৃত্বে গঠিত হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ। পাঁচ বছর মেয়াদী হলেও ১৯৯৯ সালে গঠিত একই আঞ্চলিক পরিষদ বিদ্যমান আছে এখনো।

শান্তিচুক্তির দুই যুগ পার হয়ে গেলেও শান্তি আসেনি পাহাড়ে। এখনো রক্ত ঝড়ছে সেখানে। সাধারণ মানুষ, পর্যটক থেকে শুরু করে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, এমনকি নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যরাও হামলা-হত্যাকান্ডের শিকার হচ্ছে যখন-তখন। চুক্তিপূর্ববর্তী সময়ে পাহাড়ে একটি সশস্ত্র গোষ্ঠি থাকলেও এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে চারটিতে। কখনো কখনো আবার ছোট ছোট আরো কিছু সন্ত্রাসী গ্রুপও আলোচনায় আসে। পাহাড়ে উপজাতীয় জনগোষ্ঠিগুলোকে শিক্ষা, চাকরি, রাজনৈতিক, ভূমির অধিকার, নাগরিক অধিকার, আয়করমুক্ত ব্যবসা-বাণিজ্যের একচেটিয়া অধিকার দেওয়ার পরও পাহাড়ে কেন শান্তি প্রতিষ্ঠায় সফলতা আসছে না স্বাধীনতার ৫০ বছর তথা সুবর্ণজয়ন্তীতে তা নিয়ে ভাবার অবকাশ অবশ্যই আছে। তাছাড়া, ইতোমধ্যে গৃহীত পদক্ষেপের কারণে পাহাড়ে সরকারের সার্বভৌম ক্ষমতা সীমিত হয়ে আসছে কিনা সে প্রশ্নও দেখা দিচ্ছে বারবার। বিশেষ করে, সরকার যখন সেখানে কোনো উন্নয়ন কর্মকান্ড পরিচালনা করতে যায়, এমনকি পাহাড়িদের জন্য উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান করতে যায় তখনও বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। এটা কোনো স্বাধীন-সার্ভৌম রাষ্ট্রের জন্য সুখকর বিষয় হতে পারে না।

তাই আমাদের পার্বত্যনীতি নতুন করে পর্যালোচনার দাবি রাখে এই কারণে যে, শান্তিচুক্তি, জেলা পরিষদ আইন, আঞ্চলিক পরিষদ আইন, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন-২০০১ এবং একই আইনের ২০১৬ সালের সংশোধনী, দ্বৈতভোটার তালিকার বিষয়ে স্বীকারোক্তি- শান্তির স্বার্থে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে চূড়ান্ত উদারতা হলেও এসব পদক্ষেপ পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি আনতে পারেনি। বরং একদিকে এসব উদ্যোগ সেখানকার বাঙালিদের জন্য চরম বৈষম্যের হাতিয়ার করে তাদের মেরুদন্ডকে ভেঙ্গে দিচ্ছে, অন্যদিকে সন্ত্রাসীরা একপেশে সুযোগ নিয়ে ফুলে-ফেঁপে উঠছে। বাস্তবতা হলো, পাহাড়ে সশস্ত্র সন্ত্রাসীর সংখ্যা এখন অন্য যে কোনো সময়ের তুলনায় বেশি এবং ভারী ও উন্নত অস্ত্র-শস্ত্রে সজ্জিত। অন্যদিকে পলাশী পরবর্তী সময়ে উপমহাদেশে মুসলমানরা যেভাবে বৈষম্যের শিকার হয়েছে, পাকিস্তান আমলে পূর্ববঙ্গের বাঙালিরা যেভাবে বৈষম্যের শিকার হয়েছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে উপজাতীয়দের প্রতি সরকারের সীমাহীন উদার দৃষ্টিভঙ্গি ঠিক যেন একইভাবে সেখানে বসবাসরত বাঙালিদের প্রান্তিক পর্যায়ে ঠেলে দিচ্ছে। কিন্তু এসব বিষয় অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে বিবেচনায় নিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ এবং সুদূরপ্রসারী পার্বত্যনীতি গ্রহণ করাই হোক বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর অন্যতম অঙ্গীকার।

♦ লেখক: সাংবাদিক ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: স্থায়ী পার্বত্যনীতি, স্বাধীনতার ৫০ বছর
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

13 − 5 =

আরও পড়ুন