পার্বত্যনিউজ বিশেষ সাক্ষাৎকার

পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা সংকট মূলত ভারতের সৃষ্ট : ব্রি. জে. (অব.) আযমী

fec-image

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহিল আমান আযমী বলেছেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা সংকট মূলত ভারতের সৃষ্ট’। খ্যাতিমান এই নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ কর্মজীবনের একটি দীর্ঘ সময় পার্বত্য চট্টগ্রামে পেশাগত দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে দেশের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা রক্ষায় উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন। তিনি জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির প্রয়াত অধ্যাপক গোলাম আজমের মেঝো ছেলে। তিনি ২০১৬ সালে গুমের স্বীকার হন এবং তাকে আয়নাঘরে রাখা হয়। চব্বিশের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ৬ আগস্ট তিনি মুক্ত হন। সম্প্রতি তিনি পার্বত্যনিউজ ডিজিটালকে একটি বিশেষ সাক্ষাৎকার দেন। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন পার্বত্যনিউজ’র সম্পাদক মেহেদী হাসান পলাশ। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহিল আমান আযমীর এই বিশেষ সাক্ষাৎকারের অনূলিখিতরূপ হুবহু তুলে ধরা হলো :

মেহেদী হাসান পলাশ : পার্বত্য চট্টগ্রামে বর্তমানে যে নিরাপত্তা সংকট চলছে, আপনার সামরিক অভিজ্ঞতা থেকে এটিকে কীভাবে দেখেন?

ব্রি. জে. (অব.) আবদুল্লাহিল আমান আযমী : ধন্যবাদ আপনাকে। পার্বত্য চট্টগ্রামে যে ধরনের সমস্যা রয়েছে তা শুধু আমাদের দেশেই নয়, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে, বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন আঙ্গিকে এ ধরনের সমস্যা হয়েছে। সামরিক ও বেসামরিক সমন্বিত প্রচেষ্টা ছাড়া এ সমস্যার কখনোই সমাধান সম্ভব নয়। আমি যেটা উপলব্ধি করি, ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর যে শান্তি চুক্তি হয়েছিল- যেখানে সন্তু লারমা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কাছে আত্মসমর্পণ করেন—তার আগ পর্যন্ত বিষয়টি একমাত্রিক ছিল। এরপর গত ২৭ থেকে ২৮ বছরে এর মাত্রা ভিন্ন হয়ে গেছে। এটি মূলত ভারতের সৃষ্ট একটি সমস্যা এবং ভারত চেষ্টা করবে এটি জিইয়ে রাখতে। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকলে এই সংকট লো-স্কেলে, খুব সীমিত আকারে থাকে। কিন্তু আওয়ামী লীগ যখনই ক্ষমতায় থাকে না, তখনই এটি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। গত ৭ থেকে ৮ বছরে যে সমস্যা হয়েছে, গত ১ থেকে দেড় বছরে তা আরও বেড়েছে। এর বিভিন্ন কারণ রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি বিশাল অঞ্চল। বাংলাদেশের প্রায় এক-দশমাংশ। এই এলাকায় বিদ্রোহ দমন অভিযানের জন্য যেই সংখ্যক জনবল দরকার, সেই জনবল মোতায়েন থাকলে আমাদের প্রাধান্য বজায় থাকে এবং ষড়যন্ত্রকারীদের আগ্রাসী ভূমিকা নিম্নমানের থাকে। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার দুঃসময়ে ক্যাম্প প্রত্যাহার করেছিল। যার ফলে সশস্ত্র বাহিনীর প্রাধান্য কমে যাওয়ায় বেসামরিক প্রশাসনও যতটা কার্যকরভাবে কাজ করতে পারার কথা, ততটা পারছে না। কারণ তারা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত। এ সমস্যা সমাধানের জন্য আমি মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা ও নিরাপত্তা উপদেষ্টার সঙ্গে আলোচনা করেছি। ইমিডিয়েট সমস্যা সমাধানের জন্য আমার মতে সেখানে ক্যাম্পের সংখ্যা বাড়াতে হবে। আমরা যদি ২০০টি ক্যাম্প পুনঃস্থাপন করতে পারি, আগের লোকেশনে না হলেও বর্তমানে যেসব এলাকা বেশি খারাপ, সেখানে বেশি করে ক্যাম্প স্থাপন করতে হবে। আমি বলেছি, ৪টি ব্রিগেড যদি সেখানে মোতায়েন করা যায়, তাহলে প্রতিটি ব্রিগেড প্রায় ৫০টি ক্যাম্প সুন্দরভাবে ম্যানেজ করতে পারবে। কোন কোন ডিভিশন থেকে এই ব্রিগেড নেওয়া যেতে পারে, সেটাও আমি প্রধান উপদেষ্টা ও নিরাপত্তা উপদেষ্টাকে জানিয়েছি। বর্তমান পরিস্থিতিতে যদি এই মুহূর্তে ক্যাম্প মোতায়েন করা না যায়, তাহলে অবস্থা আরও খারাপ হবে বলে আমি আশঙ্কা করছি। ভিডিও ক্লিপে দেখলাম, ফুরোমন পাহাড়ে পর্যটকদের যেভাবে হেনস্তা করা হয়েছে, তা চিন্তাও করা যায় না। আমাদের উপস্থিতি যদি সেখানে বেশি থাকত, যেটাকে আমরা ডমিনেশন প্যাট্রোল বলি, অথবা স্বরাষ্ট্র বাহিনী যদি পর্যাপ্ত সেখানে থাকত এবং টহল কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে পারত, তাহলে তারা এতটা দুঃসাহস দেখাতে পারত না। আজ তারা খাগড়াছড়ি শহরে আমাদের সৈনিকদের ওপর হাত তুলছে। আশির দশক ও নব্বই দশকে আমরা যখন কোনো এলাকায় যেতাম, তখন সেই এলাকা প্রায় পুরুষশূন্য হয়ে যেত। আর এখন তারা পাল্টা আক্রমণ করছে।

পার্বত্যনিউজ : এটা কি ভালো যে আপনারা কোনো এলাকায় গেলেন সেখানে পুরুষশূন্য হয়ে গেলো?

ব্রি. জে. (অব.) আবদুল্লাহিল আমান আযমী : আমি এটাকে ভালো বলছি না। কিন্তু তখন তাদের মধ্যে একটি ভয় কাজ করত। ক্যাম্প কমানোর ফলে তারা ধীরে ধীরে মানসিকভাবে শক্তি পেয়েছে। সেই শক্তি থেকেই তারা আগ্রাসী হচ্ছে। পর্যটকদের হেনস্তা করছে। আক্রমণ ও বিরোধিতা করছে। ওদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখতে হবে। ভালো সম্পর্কের জন্য সেখানে উন্নয়নমূলক কাজ করতে হবে।

পার্বত্যনিউজ : আপনি কি মনে করেন পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনা ক্যাম্প বাড়ালেই সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে?

ব্রি. জে. (অব.) আবদুল্লাহিল আমান আযমী : বর্তমানে যে পরিস্থিতি আছে, সেই পরিস্থিতি থেকে যেন অবস্থা আরও খারাপ না হয়, অবনতি না ঘটে। সেজন্য এখানে যদি আমরা সেনা ক্যাম্প বৃদ্ধি করি এবং ডমিনেশন অব্যাহত রাখি, তাহলে তারা এমন আগ্রাসী হতে পারবে না। এই মুহূর্তে বুঝতে হবে জরুরি ভিত্তিতে কীভাবে অবস্থা সামাল দেওয়া যায় এবং সামরিক ও বেসামরিক সমন্বিত প্রচেষ্টা কীভাবে করা যায়। এগুলোর কিছু ক্লাসিক্যাল ফর্মুলা আছে, কিছু প্রেক্ষাপটগত বিষয় আছে। বর্তমান পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে হবে। তাদের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে এবং সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে একটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দিকে যেতে হবে। স্থায়ী সমাধানের জন্য ৩টি পরিকল্পনা করতে হবে—শর্ট টার্ম, মিড টার্ম ও লং টার্ম।

পার্বত্যনিউজ : সমাধানের জন্য কী ধরনের পরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন—আপনি কি একটু ধারণা দেবেন?

ব্রি. জে. (অব.) আবদুল্লাহিল আমান আযমী : একটি বিষয় হলো পার্বত্য অঞ্চলে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড। পার্বত্য এলাকায় আমি গিয়েছিলাম ১৯৮৪ সালের জানুয়ারিতে। তখন আমরা সাজেকে যেতে রাঙামাটি থেকে লঞ্চে করে পুরো একদিন সময় নিতাম। এরপর ২ দিন পায়ে হেঁটে সাজেকে যেতাম। এখন তো গাড়িতে করে খাগড়াছড়ি কয়েক ঘণ্টায় যাওয়া যায়। উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড অনেক হয়েছে। কর্মসংস্থান আরেকটি বিষয়। মানুষ যদি বেকার না থাকে, তাহলে তারা অপরাধের কথা চিন্তা করে না। সেখানে যে যুবকরা অস্ত্রধারী, যারা সশস্ত্র সংগ্রাম করছে বা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার জন্য কাজ করছে—তাদের যদি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। পার্বত্য চট্টগ্রামে কর্মসংস্থানের অনেক সুযোগ রয়েছে। তাদের সঙ্গে সরকারের একটি সুসম্পর্ক সৃষ্টি করতে হবে। তাদের জনপ্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের সমতলের মতো স্বাভাবিক প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে যদি তাদের যুক্ত ও সক্রিয় করা যায়, তাহলে সমাধান সম্ভব। এসবের জন্য সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।

পার্বত্যনিউজ : ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোকে শিক্ষিত করলেই কি সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে?

ব্রি. জে. (অব.) আবদুল্লাহিল আমান আযমী : তাদের যদি সঠিকভাবে শিক্ষিত করা যায়, তাদের মধ্যে দেশপ্রেম জাগানো যায় এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে চিন্তা করতে শেখানো যায়, তাহলে ধীরে ধীরে সমস্যা কমে যাবে বলে আমি মনে করি। তবে অনেক পাহাড়ি শিক্ষিত হয়েও তাদের অধিকার আদায়ে সক্রিয় থাকে। তাদের যে বঞ্চনাগুলো আছে, সেগুলো নিয়ে তারা কথা বলে—এটা ঠেকানো যাবে না। কিন্তু উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড, কর্মসংস্থান ও শিক্ষা—এই ৩টির সমন্বয়ে যদি সেখানে অগ্রগতি হয় এবং তারা যদি দেখতে পায় যে তাদের উন্নতি হচ্ছে, তাহলে অপরাধপ্রবণতা কমে আসবে।

পার্বত্যনিউজ : শুরুতে আপনি বলেছেন পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা ভারতের সৃষ্টি—এটা কেন বললেন?

ব্রি. জে. (অব.) আবদুল্লাহিল আমান আযমী : দেখুন, যদি আমরা পেছনে ফিরে যাই, ১৯৪৭ সালে দেশভাগ হলো, ভারত ভাগ হলো, পাকিস্তান সৃষ্টি হলো এবং পরে বাংলাদেশ। তখন পাকিস্তানের ভূখণ্ডের মধ্যে, বর্তমান পূর্ব পাকিস্তানের পাশে ভারতের যে ৫টি রাজ্য—মিজোরাম, আসাম, ত্রিপুরা, নাগাল্যান্ড ইত্যাদি—সেখানে ধীরে ধীরে বিদ্রোহ দানা বাঁধতে শুরু করে। তখন পঞ্চাশের দশকের শেষ দিকে আমাদের চিটাগাং হিল ট্র্যাক্টসে ৩টি ক্যাম্প স্থাপন করা হয়, যেগুলো এখন গ্যারিসন হিসেবে পরিচিত। পুরো পার্বত্য এলাকায় এই ৩টিই গ্যারিসন—দীঘিনালা, রুমা ও আলীকদম। উত্তরে ১টি, দক্ষিণে ২টি। পাকিস্তান আমলে এই ক্যাম্পগুলো ব্যবহার করে ভারতের বিদ্রোহীদের আশ্রয় দেওয়া হতো, প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো এবং অস্ত্র সরবরাহ করা হতো। তারা এখান থেকে গিয়ে ভারতে অপারেশন চালাত। এটি পাকিস্তান আমল থেকেই দুই দেশের মধ্যে শত্রুতার অংশ ছিল। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পার্বত্য অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় তারা ভারতের অংশ হতে চেয়েছিল, কিন্তু ভারত তা চায়নি। র‍্যাডক্লিফ কমিশনের মাধ্যমে বড় বড় পাহাড়গুলো ভারত নিজেদের রেখে দেয়, বাকিগুলো বাংলাদেশে দেয়। তৎকালীন ভারতীয় কংগ্রেস নেতারা তাদের যথাযথ গুরুত্ব দেয়নি। এর ফলে তাদের মধ্যে ভারতবিরোধী মনোভাব তৈরি হয়। আবার তারা পাকিস্তানের অংশ হতে না চাওয়ায় পাকিস্তান সরকারও তাদের ভালো চোখে দেখেনি। ফলে তারা পাকিস্তান আমলেও বঞ্চনার শিকার হয়। ১৯৬২ সালে কাপ্তাইয়ে কর্ণফুলী নদীর ওপর বাঁধ নির্মাণের ফলে বিশাল এলাকা পানির নিচে চলে যায়। এতে তাদের ক্ষোভ আরও বেড়ে যায়। ব্রিটিশ আমলেও তারা বিভিন্ন ধরনের শোষণের শিকার হয়েছিল। এসবের ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তারা যুদ্ধে যোগ দেয়নি, কারণ যুদ্ধে যোগ দিতে ভারতের সহায়তা নিতে হতো এবং ভারতের প্রতি তাদের ক্ষোভ ছিল। কেউ কেউ রাজাকারও হয়েছিল। ফলে স্বাধীনতার পর সরকারও তাদের ভালো চোখে দেখেনি। তারা অধিকার আদায়ের দাবিতে আন্দোলন করে। উপেন্দ্র নারায়ণ লারমা শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। কিন্তু সে সময় সরকার তাদের দাবিকে গুরুত্ব দেয়নি। এতে তাদের মধ্যে ক্ষোভ আরও বেড়ে যায়। মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা ও তার ভাই জ্যোতিরিন্দ্র লারমা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন এবং বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৬৯ সালে তারা রাঙামাটি কমিউনিস্ট পার্টি গঠন করেন। ১৯৭৩ সালে তারা দেখলেন সরকার তাদের দাবি আমলে নিচ্ছে না। তখন তারা পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি গঠন করেন এবং এর সশস্ত্র শাখা হিসেবে শান্তিবাহিনী তৈরি হয়। স্বাধীনতার পরপরই ভারতীয় সেনাবাহিনী ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী যৌথভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামে অবস্থানরত ভারতীয় বিদ্রোহীদের বিতাড়নে কাজ করে। কয়েক মাস পর ভারতীয় সেনাবাহিনী চলে যায়, কিন্তু বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে যায়। ১৯৭৩–৭৪ সালে শান্তিবাহিনীর কিছু বড় নেতা গ্রেপ্তার হন। তারা শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে ক্ষমা চাইলে তিনি ক্ষমা করে দেন। এরপর তারা আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যান এবং ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে ভারত তাদের সহায়তা দেয়নি। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার পর ভারত তাদের আশ্রয় দেয়। ১৯৭৫ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ভারতের ভেতরে তাদের ক্যাম্প রয়েছে, যেখানে অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ, রেশন, লজিস্টিক সাপোর্ট, অস্ত্র সরবরাহ এবং বেতন-ভাতা দেওয়া হচ্ছে। সেখান থেকে তারা এসে আমাদের দেশে অপারেশন চালাত। এই ধারা এখনো চলছে। যেমন পাকিস্তান পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে ভারতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদের প্রশ্রয় দিয়েছিল, তেমনি ভারত আমাদের বিরুদ্ধে শান্তিবাহিনীকে সহায়তা করছে।

পার্বত্যনিউজ : আওয়ামী লীগের সঙ্গে ভারতের সুসম্পর্ক থাকার শর্তেও শেখ হাসিনা কেন এই সমস্যা ভারত থেকে উদ্ধার করতে পারলেন না?

ব্রি. জে. (অব.) আবদুল্লাহিল আমান আযমী : ভারত কোনদিন এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান চাইবে না। কারণ এই সমস্যা যদি স্থায়ীভাবে সমাধান হয়ে যায়, তাহলে তাদের যেসব রাজ্য নিয়ে সমস্যা আছে যেমন- সেভেন সিস্টার্স—সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করাও তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশকে যতদিন পর্যন্ত তাবেদারি রাষ্ট্র, অর্থাৎ কার্যত একটি রাজ্যে পরিণত করতে না পারবে, ততদিন পর্যন্ত তারা এক চোখে বিশ্বাস করবে আরেক চোখে অবিশ্বাস করবে। তারা জানে কোনো সরকারই চিরস্থায়ী নয়। যদি কখনো শেখ হাসিনা ক্ষমতা থেকে চলে যান, তাহলে যেন তারা এখানে পা ফেলতে পারে—সেজন্যই তারা এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হতে দেয়নি। ভারত এটা চায়নি, কারণ পার্বত্য চট্টগ্রামে আমাদের বিশাল সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন রয়েছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সঙ্গে অন্যান্য বাহিনী মিলিয়ে সেখানে সরকারের বছরে বিপুল খরচ হচ্ছে। যদি পার্বত্য এলাকার স্থায়ী সমাধান হয়ে যায়, তাহলে এই অর্থ দেশের উন্নয়ন খাতে ব্যবহার করা যেত। ভারত এটা চাইবে না। ভারত চাইবে আমাদের বাজেট কম হোক এবং আমরা সমস্যার মধ্যে থাকি। আর এই বিশাল সংখ্যক বাহিনী তখন কোথায় মোতায়েন করা হবে? স্বাভাবিকভাবেই সেগুলো ভারতের বিরুদ্ধেই মোতায়েন করা হবে।

পার্বত্যনিউজ : চিটাগাং হিল ট্র্যাক্টস সমস্যা সমাধানে আমরা ভারতকে কীভাবে অ্যাড্রেস করতে পারি?

ব্রি. জে. (অব.) আবদুল্লাহিল আমান আযমী : একটি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে এটা ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে করতে হবে। আমাদের ফরেন পলিসি হলো—সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়। কিন্তু ভারতের সেই মনোভাব নেই। আমাদের কূটনীতিবিদরা রাজনৈতিক পর্যায়ে ভারতকে এনগেজড করতে পারেন। রাষ্ট্রীয় ও শীর্ষ পর্যায়ে আলোচনা করে একটি সমাধানে আসা যায় যে, আমরা তোমাদের বিদ্রোহীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেব না, তোমরাও আমাদের বিরুদ্ধে কাউকে আশ্রয় দেবে না। আমরা উইন-উইন সিচুয়েশনে থাকতে পারি, যা আলোচনার মাধ্যমেই সম্ভব। ভারত যদি সমর্থন না দেয়, তাহলে এই সমস্যা ধীরে ধীরে থেমে যাবে।

পার্বত্যনিউজ : আপনি সম্প্রতি এক সেমিনারে বলেছিলেন, ভারত দশ টুকরো না হওয়া পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার সমাধান হবে না। এ নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মিডিয়ায় অনেক আলোচনা-সমালোচনা হয়েছিল। আসলে বিষয়টা আপনি কীভাবে ভেবেছিলেন?

ব্রি. জে. (অব.) আবদুল্লাহিল আমান আযমী : আমি দশ টুকরোর কথা বলিনি। আমি বলেছিলাম, এখন যে ভারত আছে ভারত যদি অখণ্ডভাবে এভাবেই থেকে যায়, তাহলে তারা আমাদের এই সমস্যা সবসময় জিইয়ে রাখবে আমাদের বিপদে রাখার জন্য। আমাদের সবসময় একটা ব্যথা দিয়ে রাখবে, যেন আমরা উন্নয়ন করতে না পারি এবং সশস্ত্র বাহিনীকে চূড়ান্তভাবে উন্নত করতে না পারি। এই সমস্যার জন্য মূলত তারাই দায়ী। তারাই এই সমস্যা সৃষ্টি করেছে এবং তারাই এটাকে জিইয়ে রাখছে। আমি যা বলতে চেয়েছি তা হলো—ভারতের সেভেন সিস্টার্স অঞ্চল নিয়ে তাদের অনেক ধরনের ক্যালকুলেশন ও ডাইনামিক্স আছে। সেখানেও বিভিন্ন ধরনের সমস্যা রয়েছে। আমাদের স্কেল আর তাদের স্কেলে হয়তো পার্থক্য আছে। যদি কখনো সেগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তাহলে ভারত আমাদের ওপর এতটা সমস্যা সৃষ্টি করতে পারত না, কারণ তখন সেগুলো আলাদা রাষ্ট্রে পরিণত হবে। যতদিন পর্যন্ত ভারত অখণ্ডভাবে একসঙ্গে থাকবে, ততদিন পর্যন্ত আমাদের শান্তিতে থাকতে দেবে না। আমি কখনো বলিনি যে ভারত দশ টুকরো হয়ে যাবে বা ভারতকে দশ টুকরো করার ইচ্ছা আমার আছে। আমি শুধু একটি বাস্তবতা তুলে ধরেছি—ভারত যেভাবে এখন আছে এবং আমাদের সাড়ে তিন দিক ঘিরে রেখেছে, তারা যদি এইভাবে নিজেদের অস্তিত্ব ধরে রাখতে পারে, তাহলে আমাদের শান্তিতে থাকতে দেবে না।

পার্বত্যনিউজ : দি সেভেন সিস্টার্স আলাদা কোনো রাষ্ট্র হয়, তাহলে পার্বত্য চট্টগ্রামকেও কি তার সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি উঠতে পারে?

ব্রি. জে. (অব.) আবদুল্লাহিল আমান আযমী : আমি মনে করি, যদি ভারতের সেভেন সিস্টার্স কখনো বিচ্ছিন্নও হয়ে যায়, তারপরও তারা এক রাষ্ট্র হবে না। কারণ তাদের মধ্যে অনেক ভিন্নতা রয়েছে। নেতৃত্বের কোন্দল একটি বড় সমস্যা হবে। আর এই নেতৃত্বের কোন্দলের কারণেই তাদের একত্রে থাকা সম্ভব হবে না। আমি বিশ্বাস করি না যে অদূর ভবিষ্যতে তারা বিচ্ছিন্ন হবে। আমার মনে হয়, যেভাবেই হোক ভারত এটি ধরে রাখবে এবং বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে রাখবে। আমাদেরও এটা ভাবা উচিত নয় যে ভারতকে বিচ্ছিন্ন করা হবে। কেউ যদি এভাবে চিন্তাও করে, তেমন আগ্রাসী চিন্তা আমি করতে চাই না। তারা যেভাবে আছে, সেভাবেই থাকুক। আমরাও আমাদের মতো থাকি। সেভেন সিস্টার্স নিয়ে আমাদের অতটা দুশ্চিন্তার কিছু নেই। আমরা তাদের সঙ্গে সৎ প্রতিবেশী হিসেবে থাকতে চাই। তাদের সুবিধার জন্য যদি ট্রানজিট বা পোর্ট ব্যবহারের সুযোগ দিতে হয়, সেটাও সরকারের টেবিলে আলোচনা করে—যদি মনে করে এটা আমাদের জন্য কল্যাণকর—তাহলে দেওয়া যেতে পারে।

পার্বত্যনিউজ : জুলাই আন্দোলনের পরবর্তী সময়ে ভারতীয় মিডিয়ায় বাংলাদেশ ও আপনাকে নিয়ে নানা ধরনের মিথ্যাচার করা হয়েছে। আপনি সামগ্রিক বিষয়টি কীভাবে দেখেন?

ব্রি. জে. (অব.) আবদুল্লাহিল আমান আযমী : আপনি যদি আমাদের দেশের ইতিহাসের দিকে তাকান, তাহলে দেখবেন তারা (ভারত) সব সময় আমাদের একটি ফেইল্ড স্টেট কনসেপ্ট প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছে। তারা আমাদের অস্থিতিশীল করতে চেয়েছে। জুলাই বিপ্লবের পর শত শত উদাহরণ দেওয়া যাবে, যেখানে তাদের মিডিয়া ও থিঙ্ক ট্যাংকগুলো বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছে। ওখান থেকে বসে তারা সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে অপপ্রচার করছে। এগুলো হাস্যকর। আমাকে নিয়ে আনন্দবাজার পত্রিকা এবং সেখানে যারা বাংলাদেশে ভারতের এজেন্ট আছে এমন কিছু ইউটিউবার, এমনকি পাকিস্তানের কিছু কিছু মিডিয়া সবাই মিলে বলার চেষ্টা করছে যে আমার সঙ্গে আইএসআইয়ের যোগাযোগ আছে এবং ‘আনসারুল ইসলাম’ নামে কী জানি একটা সংগঠনের সঙ্গে আমি জড়িত। আমি তো এসব নাম আগে কখনো শুনিই নাই। আইএসআইয়ের নাম শুনেছি, কিন্তু তাদের কোনো ব্যক্তি বা সংস্থার সঙ্গে আমার ন্যূনতম সম্পর্ক আছে এমন কোনো প্রমাণ তারা (ভারতীয় মিডিয়া) দেখাতে পারেনি। তারা শুধু বলেই যাচ্ছে। গতকাল যেমন চন্দন নন্দীর একটি রিপোর্ট বেরিয়েছে, সেখানে বলা হয়েছে আমি বনানীতে বসে মিটিং করছি। এর আগেও একটি রিপোর্টে বলা হয়েছিল আমি নাকি ট্রেনিং দিচ্ছি। অথচ আমি বলতে গেলে বনানীতেই যাই না। বনানীর কোনো বাসায় আমি গিয়েছি এমন প্রমাণ কেউ দিতে পারবে না।
এসবের বিরুদ্ধে আমি একটি স্টেটমেন্ট দিয়েছি এবং কয়েক মাস আগে থানায় জিডিও করেছি। তারা এমন সব কল্পিত রিপোর্ট দিচ্ছে, যা আমাদের কল্পনারও বাইরে। আমি মনে করি, এগুলো সম্পূর্ণ হাস্যকর এবং এর কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা নেই। এগুলোর সামান্যতম প্রমাণও তারা দিতে পারবে না। ‘কথিত আছে’, ‘বলা হয়ে থাকে’, ‘শোনা যায়’ এসবের তো কোনো ভিত্তি নেই। তারা সুনির্দিষ্ট প্রমাণ দিক। এটা তারা পারবে না, কারণ আমি একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক। এই ধরনের কোনো বিদেশি সংস্থার সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। আমি দেশি-বিদেশি অনেক মিডিয়ায় সাক্ষাৎকার দিয়েছি- আমার আয়নাঘরের বন্দিজীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে।

পার্বত্যনিউজ : আপনি রাজনীতিতে নেই। কিন্তু রাজনীতিতে আপনাকে নিয়ে ব্যাপক আলোচনা আছে। আপনি এখন কী করছেন বা আপনাকে নিয়ে কেনো এত আলোচনা?

ব্রি. জে. (অব.) আবদুল্লাহিল আমান আযমী : যারা আমাকে নিয়ে এত আলোচনা যারা করছেন, প্রশ্নটা তাদের জিজ্ঞেস করলেই ভালো হতো। আলোচনার একটি কারণ হতে পারে আমার বাবার পরিচিতি। দ্বিতীয় কারণ যেটি হতে পারে তা হলো- সেনাবাহিনীতে অনেক অফিসার আমাকে ভালোবাসেন। কারণ আমি সেনাবাহিনীতে দীর্ঘদিন কাটিয়েছি। আলহামদুলিল্লাহ, আমার ফলাফল সব সময় ভালো ছিল, যার কারণে সবাই আমাকে অন্তর থেকে ভালোবাসেন ও শ্রদ্ধা করে। আপনারা জানেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে আমার প্রায় ৬০০ জন ছাত্র আছে। তাদের অনেকেই জেনারেল, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ওয়ান স্টার, টু স্টার, থ্রি স্টার জেনারেল, এমনকি বর্তমান সেনাপ্রধানও আমার ছাত্র। আর আমার আয়নাঘরের ৮ বছরের কঠিন জীবন এসব মিলিয়ে হয়তো তারা আমাকে নিয়ে আলোচনা করে। কেনো করে, সেটা আমি নিজেও জানি না। দেশের একজন রাজনীতিবিদ (গোলাম মাওলা রনি) বলেছেন, আমি নাকি এখন বাংলাদেশ চালাই, দেশের সমস্ত প্রশাসন আমার কথায় ওঠে-বসে, সমস্ত সিদ্ধান্ত আমি দিই। এর জবাবে আমি বলেছিলাম, কবে থেকে আমি এই দায়িত্ব পেলাম? আমি কীভাবে দেশ চালাই? আমার অফিস কোথায়? এগুলো যদি তিনি বলতেন, তাহলে আমি আমার আত্মজীবনীতে লিখতে পারতাম। আমি তো মাত্র ১৭ মাস হলো মুক্ত। এখনো আমি আমার পেনশনের টাকাও পাইনি।

পার্বত্যনিউজ : আপনি কি আত্মজীবনীতে আয়নাঘর বিষয়ে কিছু লিখছেন?

ব্রি. জে. (অব.) আবদুল্লাহিল আমান আযমী : আমার একটি বই গত আগস্টে প্রকাশিত হয়েছে। এখন আমি আমার আত্মজীবনী লিখছি, আব্বাকে নিয়ে লিখছি, দেশ ও রাজনীতিসহ বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে লিখছি।

পার্বত্যনিউজ : আপনার রাজনীতিতে আসার কোনো সম্ভাবনা আছে কী?

ব্রি. জে. (অব.) আবদুল্লাহিল আমান আযমী : আমি কখনো প্রতিজ্ঞা করিনি যে রাজনীতিতে আসব না। দেশের কল্যাণের জন্য যদি মনে করি রাজনীতি করা প্রয়োজন, তাহলে করব। আমি দেশের জন্য কাজ করছি। আমি অটিস্টিক ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যুক্ত আছি। একটি চ্যারিটেবল অর্গানাইজেশনের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষকদের মোটিভেশনাল লেকচার দিচ্ছি, অভিভাবকদের সঙ্গে প্যারেন্টিং প্রোগ্রাম করছি।

পার্বত্যনিউজ : আপনি আয়নাঘরের কথা বললেন। কিন্তু আয়নাঘরের জীবনের বাইরে একটি সময়ে আপনাকে নাকি এসি রুমে রাখা হয়েছিল, এমন আলোচনা ব্যাপকভাবে হয়েছে। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?

ব্রি. জে. (অব.) আবদুল্লাহিল আমান আযমী : যেহেতু বিষয়টি এখনো বিচারাধীন, তাই এ নিয়ে কথা না বলাই ভালো। তবে এটুকু বলতে পারি আমাকে কীভাবে রাখা হয়েছে বা হয়নি, সেটা মূল বিষয় নয়। বিচার হচ্ছে এই প্রশ্নে যে আমাকে অপহরণ করা হয়েছিল এবং বেআইনিভাবে আটক রাখা হয়েছিল। এখন তো জেনারেলদের বিচার হচ্ছে। তারা ভালো কন্ডিশনে আছেন, এসি গাড়িতে যাতায়াত করছেন, ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে সাব-জেলে ভালো পরিবেশে রাখা হয়েছে। এতে কি তাদের বিচার প্রক্রিয়ায় কোনো প্রভাব পড়ছে? পড়ছে না। আমাকে কীভাবে রাখা হয়েছিল এই আলোচনা আসলে বিষয়টাকে হালকা করার চেষ্টা। মনে করেন, আমাকে দুবাইয়ের সেভেন স্টার হোটেলে সব সুযোগ-সুবিধা দিয়ে রাখা হয়েছে। তাতে কি আমাকে অপহরণ করা হয়েছিল সেটা বাদ যাবে? আমাকে পুরো পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছিল। আমি জানতাম না আমার বাবা-মা, স্ত্রী, সন্তানরা বেঁচে আছেন কি না। তারাও জানতেন না আমি বেঁচে আছি কি না। এগুলোই মূল বিষয়। আমাকে কুঁড়েঘরে রাখুক, মাটিতে রাখুক, জঙ্গলে ফেলে রাখুক এরেস্ট তো এরেস্টই। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী বলেছেন, আমাকে এসি রুমে রাখা হয়েছিল এবং রুমের সাইজও উল্লেখ করেছেন ২১, ২২, ১৭। কিন্তু এর সঙ্গে আমার ক্লায়েন্টদের কোনো সম্পর্ক নেই বলে তারা দায় নিতে চায় না। অথচ তিনি যদি আমার রুমের সাইজ জানেন, তার মানে তিনি জানেন যে আমাকে অবৈধভাবে আটক ও অপহরণ করা হয়েছিল। রুমে এসি ছিল কি না এটার জবাব আমি আদালতে দেব। কিন্তু এই প্রশ্নটি অবান্তর। আমাকে ৮ বছর অপহরণ করে আটক রাখা হয়েছে এটাই ঘটনা। আমাকে পোলাও খাওয়ানো হয়নি নাকি পঁচা রুটি খাওয়ানো হয়েছে এগুলো আমার মামলার বিষয় নয়। তাই এসব অহেতুক কথাবার্তা।

পার্বত্যনিউজ : পার্বত্য চট্টগ্রামে এখন খ্রিস্টিয়ানাইজেশন করার ষড়যন্ত্র চলছে। এই বিষয়ে যদি কিছু বলতেন।

ব্রি. জে. (অব.) আবদুল্লাহিল আমান আযমী : উত্তর দিকে পাঙ্খুয়া এবং দক্ষিণ দিকে বম এই ২টি উপজাতি খ্রিস্টান, এবং তারা ব্রিটিশ আমল থেকেই সেখানে বসবাস করছে। তবে তাদের জনসংখ্যা খুব বেশি নয়। নতুন শতাব্দীতে এসে ধীরে ধীরে এনজিও কার্যক্রমের মাধ্যমে কিছু কিছু এলাকায় খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তর ঘটানো হচ্ছে। আমার একটি আশঙ্কা আছে ইস্ট তিমুরের মতো করে পশ্চিমা শক্তিগুলো এখানে দীর্ঘমেয়াদি, এমনকি অর্ধশতাব্দীব্যাপী একটি পরিকল্পনার মাধ্যমে খ্রিস্টান জনসংখ্যা বাড়িয়ে এটিকে বিচ্ছিন্নভাবে একটি রাষ্ট্রে রূপ দেওয়ার চিন্তা করছে কি না। যেহেতু গত ২০ বছরে আমার পার্বত্য এলাকায় যাওয়া হয়নি, তাই বর্তমানে খ্রিস্টান জনসংখ্যা ঠিক কতটা বেড়েছে, সে বিষয়ে আমার সুনির্দিষ্ট ধারণা নেই। তবে যখন থেকে জেনেছি যে ধীরে ধীরে কিছু মানুষ খ্রিস্টান হচ্ছে, তখন থেকেই আমার এই আশঙ্কা যে, তারা কি এটিকে ইস্ট তিমুরের মতো আলাদা রাষ্ট্র করার চিন্তা করছে কি না।

পার্বত্যনিউজ : ত্রিপুরার রাজা প্রদ্যুত কুমার দেববর্মা ভারতীয় প্রথম সারির গণমাধ্যমে নিয়মিত বলে যাচ্ছেন যে, ভারত সরকার দায়িত্ব দিলে তিনি ২ ঘণ্টার মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর পর্যন্ত দখল করে নেবেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক সভাতেও তিনি বলেছেন যে, চট্টগ্রাম বন্দর ছাড়া তারা বাঁচতে পারবে না, যে কোনো মূল্যেই হোক তাদের চট্টগ্রাম বন্দর লাগবে। এই বিষয়গুলো আপনি কীভাবে দেখেন?

ব্রি. জে. (অব.) আবদুল্লাহিল আমান আযমী : এ ধরনের কথা আমার কাছে হাস্যকর মনে হয়। তবে খেয়াল করুন ভূকৌশলগতভাবে আমরা ভারতের ওপর নির্ভরশীল নই, বরং ভারত সেভেন সিস্টার্সের জন্য আমাদের ওপর নির্ভরশীল। কারণ ওই রাজ্যগুলো ল্যান্ডলকড (স্থলবেষ্টিত)। ভারত ওই রাজ্যগুলোতে লজিস্টিক সাপ্লাই দেওয়ার জন্য পরোক্ষভাবে আমাদের ওপর নির্ভরশীল। কারণ শিলিগুড়ি করিডোর, যেটাকে ‘চিকেন নেক’ বলা হয়, সেটি পঞ্চগড়ের ওপর দিয়ে একটি অত্যন্ত সংকীর্ণ পথ। পুরো বাংলাদেশের ভূখণ্ড এড়িয়ে শুধু ওই সরু করিডোর দিয়ে লজিস্টিক সাপ্লাই দেওয়া ভারতের জন্য অত্যন্ত কঠিন। যদি তারা আমাদের কাছ থেকে সড়কপথে যোগাযোগের এক্সেস পায়, তাহলে তাদের জন্য লজিস্টিক সাপ্লাই অনেক সহজ হবে। সুতরাং তারা পরোক্ষভাবে আমাদের ওপর নির্ভরশীল। আমরা তাদের ওপর নির্ভরশীল নই। ত্রিপুরার রাজা কীভাবে ২ ঘণ্টার মধ্যে চট্টগ্রাম দখলের কথা বলেন, এটা শুনে আমি বিস্মিত। তাদের কী আছে যে তারা চট্টগ্রাম বন্দর দখল করতে পারবে? আমাদের একটি সশস্ত্র বাহিনী আছে, পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূপ্রকৃতি আছে, সব মিলিয়ে তারা তাদের সম্পূর্ণ সামরিক সক্ষমতা নিয়ে এলেও বন্দর দখল করা সম্ভব নয়। তারা দখল করতে এলে আমাদের সেনাবাহিনী কি বসে থাকবে? আমাদের বিজিবি, পুলিশ, সাধারণ জনগণ সবাই কি বসে থাকবে? এটা তাদের একটি অলীক কল্পনা ছাড়া কিছুই নয়।

পার্বত্যনিউজ : মিজোরামের মুখ্যমন্ত্রী লালদুহোমা বলেছেন যে ব্রিটিশরা অন্যায়ভাবে একটি জাতিগোষ্ঠীকে ৩টি রাষ্ট্রে ভাগ করে দিয়েছে। আমরা এটা মানি না এবং খ্রিস্টধর্মের ভিত্তিতে এটিকে এক করতে হবে। তিনি এ কথা আমেরিকায় গিয়ে বলেছেন। এই বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী?

ব্রি. জে. (অব.) আবদুল্লাহিল আমান আযমী : বান্দরবান জেলার সুংসুং পাড়ায় মিজোরামের মুখ্যমন্ত্রী লালদুহোমাদের একটি ক্যাম্প ছিল। বর্তমানে ক্যাম্প না থাকলেও সেখানে এখনো তাদের বিভিন্ন স্ট্রাকচার রয়েছে এবং যারা মারা গিয়েছিল তাদের কবরও রয়েছে। আমি নিজে সেখানে হেলিকপ্টারে গিয়েছিলাম। আমি ১৯৮৫/৮৬ সালের দিকে বান্দরবানে ছিলাম। টু-নেশন থিওরি, যেটি ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় পাকিস্তান ও ভারতকে ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ করেছিল একটি দেশের ২টি অংশ, ইস্ট পাকিস্তান ও ওয়েস্ট পাকিস্তান, দেড় হাজার কিলোমিটার দূরে থেকে বাস্তবভাবে একটি ভায়াবল নেশন স্টেট হতে পারেনি। শেরে-বাংলা এ কে ফজলুল হকের ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবে বলা হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ, পশ্চিম দিনাজপুর, নদীয়া, আসাম এই অঞ্চলগুলো আমাদের দিকে আসবে। আমার মনে হয়, ৩টি রাষ্ট্র হলে সেটাই বেশি ভায়াবল হতো।
লালদুহোমা যদি এ ধরনের কথা বলে থাকেন, তবে তা সম্পূর্ণ হাস্যকর, কারণ এর কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই।

পার্বত্যনিউজ : বর্তমানে যে রোহিঙ্গা সংকট চলছে, আপনি কি এর সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামের কোনো সংযোগ দেখেন?

ব্রি. জে. (অব.) আবদুল্লাহিল আমান আযমী : রোহিঙ্গা সংকটের সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যাকে লিঙ্ক করা যাবে না। এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি ইস্যু এবং আলাদা আলোচনার বিষয়। তবে আমি মনে করি, রোহিঙ্গা সংকটেরও একটি স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন।

পার্বত্যনিউজ : পার্বত্য চট্টগ্রামে যে ছয়টি সশস্ত্র গ্রুপ রয়েছে, শান্তি চুক্তির মাধ্যমে কি তাদের নিরস্ত্র করা বা সেখানে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব বলে আপনি মনে করেন?

ব্রি. জে. (অব.) আবদুল্লাহিল আমান আযমী : যদি একটু পেছনে ফিরে তাকাই, তাহলে দেখবেন ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত শুধু পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতিই (জেএসএস) ছিল, অন্য কোনো দল ছিল না। তাদের সশস্ত্র শাখা ছিল শান্তিবাহিনী, আর জনসংহতি সমিতি ছিল একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম। ভারত যেহেতু পুরো বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করত এবং এখনো কিছু উপজাতি নেতা সেখানে রয়েছেন, তারা যখন দেখলেন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায়, তখন তারা একটি আইওয়াশ শান্তি চুক্তি করার বিষয়ে ভাবলেন। যাতে তাদের পরিস্থিতি যেন তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে। সেই চিন্তা থেকেই আত্মসমর্পণের আগেই ইউপিডিএফ তৈরি করা হয়। সমস্ত সচল অস্ত্র ইউপিডিএফের কাছে দিয়ে দেওয়া হয়, আর সন্তু লারমা খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আত্মসমর্পণ করেন। এটি ছিল সম্পূর্ণ একটি আইওয়াশ। যে অস্ত্রগুলো জমা দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোর বেশিরভাগই ছিল অচল অস্ত্র। যে দিন আত্মসমর্পণ করা হলো, তার পরদিনই ইউপিডিএফ আত্মপ্রকাশ করল। আমি তখন পার্বত্য চট্টগ্রামে কর্মরত ছিলাম এবং তখন থেকেই আমাদের বড় সমস্যা শুরু হয়। এরপর ধীরে ধীরে অন্য সংগঠনগুলো গড়ে উঠতে থাকে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস এগুলো সবই ভারতের সৃষ্টি।

পার্বত্যনিউজ : পাহাড়িরা এখন বাংলাদেশে নিজেদের ‘আদিবাসী’ দাবি করছে। আপনি জানেন যে তারা মূলত মিয়ানমার ও ভারত থেকে আসা। এই বিষয়টা আপনি কীভাবে দেখছেন?

ব্রি. জে. (অব.) আবদুল্লাহিল আমান আযমী :আদিবাসী’ টার্মটা নিয়ে আমার কোনো এলার্জি নেই। আমার কথা হলো তারা এই ভূখণ্ডের মানুষ। এই ভূখণ্ডে স্বাভাবিকভাবেই থাকবে। কিন্তু তারা যদি ঢাকায় এসে জমি বা ফ্ল্যাট কিনতে পারে, তাহলে আমি কেনো খাগড়াছড়ি বা বান্দরবানে গিয়ে জমি কিনতে পারব না? তারা সেখানে গিয়ে বসবাসে বাধা দিচ্ছে এই ধরনের বৈষম্য আমার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। একটা ভূখণ্ডে যারা বসবাস করে, তাদের সবারই সমান অধিকার থাকা উচিত। তারা সমতলে এসে যদি সব সুবিধা ভোগ করতে পারে, তাহলে আমি কেনো সেখানে গিয়ে সেই একই সুবিধা ভোগ করতে পারব না? সুতরাং কে ‘আদিবাসী’ আর কে ‘আদিবাসী নয়’ এই প্রশ্নে না গিয়ে, এক ভূখণ্ডের সবাইকে সমান অধিকার দিতে হবে। তবে উপজাতি হিসেবে তারা কিছু বাড়তি সুযোগ-সুবিধা পেতে পারে।

পার্বত্যনিউজ : আজকের বিশ্ব রাজনীতির যে ফেনোমেনা অর্থাৎ এই অঞ্চলকে ঘিরে ইন্দো-প্যাসিফিক পলিসি, কনটেইন চায়না পলিসি এই প্রেক্ষাপটে আপনি চিটাগাং হিল ট্র্যাক্টসকে কীভাবে দেখেন? এবং বাংলাদেশ কিভাবে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারে?

ব্রি. জে. (অব.) আবদুল্লাহিল আমান আযমী : ইন্দো-প্যাসিফিক পলিসি বা কনটেইন চায়না পলিসিতে চিটাগাং হিল ট্র্যাক্টস খুব বেশি ভূমিকা রাখছে বলে আমি মনে করি না। এক সময় আমরা দেখেছি ভারত ও আমেরিকা ছিল শত্রু, কিন্তু এখন তাদের মধ্যে ভালো সম্পর্ক রয়েছে। আমি ২০০৭ সালে Indo-China Relations and Its Impact on Bangladesh বিষয়ে এমফিল রিসার্চ করেছিলাম। সেখানে আমি পড়েছি, আশির দশকের শেষের দিকে জর্জ এরকল নামে একজন বলেছিলেন এখন থেকে ২৫ বছর পরে ভারত, আমেরিকা ও ইসরায়েল পুরো বিশ্ব নিয়ন্ত্রণে নেবে। আপনি দেখবেন, গত ১০ থেকে ১৫ বছরে ঠিক সেটাই ঘটছে। ইউএসএ কেনো এই এলাকায় হঠাৎ চায়নার সঙ্গে বন্ধুত্ব করলো? কারণ রাশিয়ার অ্যালায়েন্স হিসেবে একসময় চায়না আমেরিকার শত্রু ছিল। কিন্তু চায়নার ডাবল ডিজিট অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সারা বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছে। চায়নার নতুন নতুন প্রযুক্তি আমেরিকাকে ভাবিয়ে তুলেছে। ভবিষ্যতের বিশ্ব হবে অর্থনৈতিক বিশ্ব এবং অর্থনীতিই সব কিছুর নিয়ন্ত্রক হবে। চায়না যেভাবে সারা দুনিয়ায় বিভিন্ন পণ্য এক্সপোর্ট করছে, এতে আমেরিকা আতঙ্কিত। চায়নাকে কনটেইন (সীমাবদ্ধ) করার জন্যই তারা ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। চায়না ও ভারতের বিপুল জনসংখ্যা রয়েছে এবং দুই দেশই এনার্জি-হাংরি রাষ্ট্র। তাদের উভয়ের সাপ্লাই রুট ভারত মহাসাগর। ভারত মহাসাগরকে কেন্দ্র করে আবার চায়না ও ভারতের মধ্যে প্রাধান্য বিস্তার নিয়ে এক ধরনের কোল্ডওয়্যার চলছে। আমেরিকা ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব করছে মূলত চায়নাকে কনটেইন করার উদ্দেশ্যে। কারণ এই অঞ্চলে চায়নাকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে ভারত একটি বড় শক্তি। তবে আমি এসব বিষয়কে চিটাগাং হিল ট্র্যাক্টসের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করে দেখতে চাই না। আমি মনে করি না যে এর সঙ্গে সরাসরি কোনো সম্পর্ক আছে। এটাকে আমি একটি বিচ্ছিন্ন পরিস্থিতি হিসেবে দেখি। এই অঞ্চলের জিওপলিটিক্সের সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক নেই। তবে পর্দার আড়ালে কিছু দেশের স্বার্থ থাকতে পারে এই অঞ্চলের একটি মুসলমান রাষ্ট্রকে হয়তো খ্রিস্টান রাষ্ট্রে রূপান্তরের সম্ভাবনা তারা লালন করতে পারে। পাশাপাশি বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল অবস্থায় রাখার জন্য এই পরিস্থিতিকে জিইয়ে রাখা হতে পারে। কিন্তু চায়না, ভারত ও আমেরিকার সম্পর্কের সঙ্গে এই অঞ্চলের ভূকৌশলগত কোনো প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা আছে এমনটা আমি এখনো পর্যন্ত মনে করি না।

মেহেদী হাসান পলাশ : সাক্ষাৎকার প্রদানের জন্য পার্বত্যনিউজের পক্ষ থেকে আপনাকে ধন্যবাদ।
ব্রি. জে. (অব.) আবদুল্লাহিল আমান আযমী : আপনাকেও ধন্যবাদ।

অনূলিখনে : মো. নিলয়, সহসম্পাদক, পার্বত্যনিউজ

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন