পার্বত্য চট্টগ্রামে কাসাভা চাষ বন্ধের দাবি, বন গিলে খাচ্ছে দুই শিল্পপ্রতিষ্ঠান

fec-image

বন ধ্বংসকারী কাসাভা চাষ বন্ধের দাবিতে অয়োজিত মানববন্ধন কর্মসূচিতে বক্তারা পার্বত্য চট্টগ্রামে কাসাভা চাষ বন্ধে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। তারা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংককে কাসাভা চাষে অর্থায়ন থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে, যা পার্বত্য অঞ্চলের বাস্তুতন্ত্র এবং জীববৈচিত্র্যকে হুমকির মুখে ফেলছে।

বক্তারা বলেন, এমনিতেই জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হুমকিতে আছে বাংলাদেশ। তার ওপর কাসাভা চাষ করতে বন উজাড় করার ফলে আরও হুমকিতে পড়ছে পরিবেশ।

মঙ্গলবার (১১ জুন) বিকেলে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক মানববন্ধনে এ আহ্বান জানানো হয়। পরিবেশবাদী সংগঠন পিঠাছড়া বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ উদ্যোগে অয়োজিত মানববন্ধন কর্মসূচি একাত্মতা প্রকাশ করে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতি (বেলা), গ্রিন ফিঙ্গার, ইয়ুথ নেট ফর ক্লাইমেট জাস্টিস এবং নদী রক্ষা আন্দোলন।

মানববন্ধনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে পিট্টাছড়া বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ উদ্যোগের প্রতিষ্ঠাতা মাহফুজ আহমেদ রাসেল বলেন, প্রাণ আরএফএল গ্রুপের প্রতিষ্ঠান প্রাণ এগ্রো এবং রহমান কেমিক্যালস পার্বত্য অঞ্চলে কাসাভা চাষের জন্য দায়ী। ‘স্থানীয় প্রভাবশালীদের সাথে যোগসাজশে কোম্পানি দু’টি গত দুই বছরে মাটিরাঙ্গা এলাকায় ১২০০ একরের বেশি বন ধ্বংস করেছে এবং জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করেছে,’ যোগ করেন তিনি।

রাসেল অভিযোগ করেন, ইউএসএআইডি নামের একটি দাতা সংস্থা সম্প্রতি প্রাণ এগ্রোর সঙ্গে যৌথভাবে পার্বত্য অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে, যারা কাসাভা চাষের মাধ্যমে বন ধ্বংসের জন্য দায়ী।

তিনি বলেন, “পরিবেশ বিধ্বংসী এই কাসাভা চাষ যদি বন্ধ করা না যায়, তবে মাটির ক্ষয় এই অঞ্চলের সমস্ত ঝিরি-ঝর্ণা, খাল এবং নদী ধ্বংস করে দেবে, যা পার্বত্য অঞ্চলকে আদিবাসীদের জন্য বসবাসের অযোগ্য করে তুলবে।” তিনি এ অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কাসাভা চাষ বন্ধে অবিলম্বে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

মাফুজ আহমেদ রাসেলের সভাপতিত্বে মানববন্ধনে আরও বক্তব্য রাখেন বেলার চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমন্বয়কারী মুনিরা পারভিন রুবা, গ্রিন ফিঙ্গারস-এর সমন্বয়ক আবু সুফিয়ান, নদী সংরক্ষণ আন্দোলনের সভাপতি মোহাম্মদ জাফর, পরিবেশকর্মী ড. মনজুরুল করিম বিপ্লব, এবং ইয়ুথনেট ফর ক্লাইমেট জাস্টিসের চট্টগ্রাম চ্যাপ্টারের সমন্বয়ক সিদরাতুল মুনতাহা।

এর আগে, গত ২০ এপ্রিল, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডে ‘কাসাভা চাষের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামের বন ধ্বংস হচ্ছে, জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হচ্ছে’ শিরোনামে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে পার্বত্য অঞ্চলে কাসাভা চাষের ফলে সৃষ্ট ধ্বংসযজ্ঞ প্রকাশ করা হয়েছে, যা ব্যাপক আন্দোলনের জন্ম দিয়েছে। পার্বত্য অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য ও বাস্তুতন্ত্রের উপর কাসাভা চাষের নেতিবাচক প্রভাব প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর প্রকাশ্যে আসে।

প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়, স্থানীয় প্রভাবশালী, জনপ্রতিনিধি এবং রাজনীতিবিদরা কাসাভা চাষের জন্য জায়গা তৈরি করতে সমস্ত গাছ এবং ঝোপঝাড় পরিষ্কার করছেন। স্থানীয়ভাবে শিমুল আলু নামে পরিচিত, দক্ষিণ আমেরিকার এই কন্দজাতীয় ফসলের চাষ সাম্প্রতিক বছরগুলিতে পার্বত্য চট্টগ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে।

খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা ও মানিকছড়ি উপজেলায় কাসাভা চাষের জন্য শত শত একর বন উজাড় করা হয়েছে, যা দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে এবং প্রতিবছর পরিধি প্রায় দ্বিগুণ হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন কাসাভা চাষের জন্য বন পরিষ্কার করা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়। এই ধরনের কৃষিতে পার্বত্য অঞ্চলে মাটির ক্ষয় হতে পারে এবং ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) থেকে ১২.৫ মিলিয়ন ডলার ঋণ নিয়ে প্রাণ এগ্রো কাসাভা চাষ প্রকল্পটি ২০১৪ সালে শুরু করে। প্রাণ ২০১৩ সালে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হবিগঞ্জে একটি স্টার্চ এবং তরল গ্লুকোজ প্ল্যান্ট তৈরি করে। রহমান কেমিক্যাল লিমিটেডের প্ল্যান্ট ঢাকায় রয়েছে।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন