পার্বত্য চট্টগ্রামে বৈষম্যের স্বরূপ ও উত্তোরণ


পার্বত্য চট্টগ্রামের আলোচনা এলেই প্রায় সকল ক্ষেত্রে অনগ্রসর, পশ্চাদপদ, বঞ্চনা ও বৈষম্যের আলাপ শোনা যায়। কিন্তু কতোটা অনগ্রসর ও পশ্চাদপদ সেটা পরিসংখ্যানগতভাবে খতিয়ে দেখে না অনেকেই। সর্বশেষ জনশুমারী অনুযায়ী আমাদের জাতীয় স্বাক্ষরতার হার ৭৪.৬৬%। তিন পার্বত্য জেলার মধ্যে খাগড়াছড়িতে ৭১.৭৩%, রাঙামাটিতে ৭১.৩৩% এবং বান্দরবানে ৬৩.৬৪%। এটা জাতীয় স্বাক্ষরতার হারের প্রায় সমকক্ষ। এ পরিসংখ্যান থেকে বলা যায়, শিক্ষার ক্ষেত্রে পাহাড় জাতীয় মান থেকে খুব একটা পিছিয়ে নেই। জীবনমানের অন্যান্য সূচক ও পরিসংখ্যাগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কোনো কোনোটাতে পাহাড় সমতলের অনেক জেলার থেকে বা জাতীয় মানের থেকে এগিয়ে। আবার যেগুলোতে পিছিয়ে সেগুলোতে জাতীয় মানের খুব কাছাকাছি।
সম্প্রতি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় খাগড়াছড়ি রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান জেলা পরিষদে এবং এর অধীনে হস্তান্তরিত বিভাগসমূহে বিভিন্ন পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে জেলা পরিষদ আইনে যে অগ্রাধিকার কোটা রয়েছে, সেটা উল্লেখ করে ২০২৪ সালে আদালতের দেয়া রায়ের প্রেক্ষিতে প্রদত্ত প্রজ্ঞাপনের মধ্যে কোনটি অনুসৃত হবে সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত চেয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে একটি পত্র প্রদান করে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে নিজেরা কোন সিদ্ধান্ত না দিয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত নেয়ার জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে ফিরতি জবাব দিয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে এ প্রেক্ষাপটে পার্বত্য চট্টগ্রামে ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা দৃশ্যমান হচ্ছে, কী হতে যাচ্ছে পাহাড়ে নিয়োগের ক্ষেত্রে? ১৯৮৯ সালে প্রদত্ত অগ্রাধিকার কোটা কি বহাল থাকবে, নাকি ২০২৪ সালের কোটাবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে আদালতের দেয়া রায়ের প্রেক্ষিতে প্রদত্ত রিভাইস কোটা সিস্টেম অনুসৃত হবে?
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেককে দেখেছি কোটার বিরোধিতা করতে। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, যেকোনো কল্যাণমূলক রাষ্ট্রে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ প্রণোদনা বা উদ্যোগ থাকা উচিত। হতে পারে সেটা কোটা আকারে বা ভিন্ন কোন পন্থায়। বিশ্বের সকল কল্যাণকামী রাষ্ট্র অবশ্যই তার পিছিয়ে পড়া ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীকে সমতা সৃষ্টির লক্ষ্যে বিশেষ প্রণোদনা ও কোটা সুবিধা দিয়ে থাকে। বাংলাদেশেরও উচিত এই এদেশের প্রকৃত অনগ্রসর ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ প্রণোদনা ও কোটা সিস্টেম বহাল রাখা। কিন্তু সেটি বর্তমান আকারে নয়। কেননা বর্তমান কোটা সিস্টেম নির্দিষ্ট এলাকা ও নির্দিষ্ট কিছু জাতিগোষ্ঠী ভিত্তিক। অনগ্রসর বা পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী ভিত্তিক নয়। এই রাষ্ট্রে এখনো নির্ধারিত হয়নি প্রকৃতপক্ষে কারা এদেশের অনগ্রসর বা পিছিয়ে পড়া নাগরিক। এছাড়াও পাহাড়ে বর্তমান সিস্টেম ৩৫ বছরে প্রকৃত পিছিয়ে পড়া নাগরিকদের সমতা বিধানে সম উন্নয়নে ব্যর্থ হয়েছে। এর সুষম বন্টন ঘটেনি। ফলে এই সিস্টেমের মাধ্যমে নতুন আরেকটি বৈষম্যের সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমান কোটা সিস্টেম প্রকৃত পিছিয়ে পড়া নাগরিকদের সুবিধা নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়নি। ফলে এটি একটি ব্যর্থ ও অকার্যকর সিস্টেম হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।
বাংলাদেশের উচিত অবশ্যই এই রাষ্ট্রের প্রকৃত অনগ্রসর ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সম উন্নয়নের স্বার্থে কোটা সিস্টেম ও অন্যান্য সুবিধা সৃষ্টি করা। প্রয়োজনে বিদ্যমান সিস্টেমের থেকে আরও বেশি এ ধরনের সুবিধা দেয়ার পক্ষে আমার অভিমত। সেক্ষেত্রে প্রধান কর্তব্য রাষ্ট্রের প্রকৃত পিছিয়ে পড়া ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠী চিহ্নিত করা। এ দেশের পিছিয়ে পড়া নাগরিক ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠী কেবল নির্দিষ্ট অঞ্চল বা নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠীর মধ্যেই রয়েছে, নাকি সমগ্র অঞ্চল ও সমগ্র জাতি গোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে সেটি নির্ণয় করা জরুরী। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, কোন রাষ্ট্র যদি দুর্ভিক্ষ পীড়িত এলাকায় খাদ্য সহায়তা পৌঁছাতে চায়, তাহলে প্রথমেই চিহ্নিত করতে হবে কোন এলাকা দুর্ভিক্ষ পীড়িত। এটা সঠিকভাবে চিহ্নিত না করা গেলে বণ্টিত খাদ্যের অপব্যবহার হতে পারে। বর্তমান কোটা সিস্টেম ও বিভিন্ন প্রণোদনা উদ্যোগগুলো দীর্ঘদিন চালু থাকার পরেও এ কারণে লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে।
এ ব্যাপারে আমার সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব হচ্ছে, উচ্চ আদালতের একজন বিচারকের নেতৃত্বাধীন একটি কমিশন গঠনের মাধ্যমে সমগ্র রাষ্ট্র এবং সমগ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা, সমীক্ষা ও জরিপ চালিয়ে রাষ্ট্রের কোন অঞ্চলের, কোন জাতি গোষ্ঠী কতটা পিছিয়ে রয়েছে এবং তাদের সমতা সৃষ্টির লক্ষ্যে কোথায় এবং কতদিন ও কী হারে সহায়তা করা প্রয়োজন সেটি শনাক্ত করতে হবে। এবং এই পরামর্শের ভিত্তিতে রাষ্ট্রকে অনগ্রসর ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য কোটা ও অন্যান্য সহায়তা দিতে হবে। একই সাথে এই সহায়তা যাতে প্রকৃত অনগ্রসর ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর মানুষের কাছে পৌঁছায় তাও নিশ্চিত করতে হবে।
পার্বত্য চট্টগ্রামে অর্ধেক জনগোষ্ঠী বাঙালি। এর বাইরে ১৭টি ট্রাইবাল জনগোষ্ঠী রয়েছে। অফিসিয়াল রেকর্ডে ১৩ টি জনগোষ্ঠীর কথা উল্লেখ থাকলেও এর বাইরে আরও ৪টি জনগোষ্ঠী রয়েছে যাদের কোন অফিসিয়াল স্বীকৃতি নেই। এরা হচ্ছে সাঁওতাল, রাখাইন, গুর্খা ও অসমীয়া। পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন এবং শান্তি চুক্তির মাধ্যমে যে সকল বিশেষ সুযোগ সুবিধা রাষ্ট্র প্রদান করেছে তা কেবলমাত্র সেখানকার উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর জন্য নির্ধারিত। অর্ধেক জনগোষ্ঠী বাঙ্গালীদেরকে বিবেচনায় রাখা হয়নি। ফলে বাঙ্গালীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, শান্তিচুক্তির ফলে তাদের নানাভাবে বঞ্চিত করা হয়েছে। এমনকি তাদের আত্মপরিচয় কেড়ে নিয়ে বাঙালির পরিবর্তে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে ‘অ-উপজাতীয়’ বলে। উল্লিখিত অস্বীকৃত চারটি ট্রাইবাল জনগোষ্ঠী ছাড়াও প্রান্তিক পর্যায়ের, দুর্গম এলাকায় বসবাসকারী এবং কম জনগোষ্ঠীর উপজাতীয় সম্প্রদায় যারা পূর্ব থেকেই শিক্ষা-দীক্ষা, ক্ষমতা ও আর্থিকভাবে অনগ্রসর তারাও দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছে, শান্তিচুক্তির ফলে এবং পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনে রাষ্ট্র প্রদত্ত সুযোগ সুবিধার তেমন কিছুই তাদের কাছে পৌঁছায়নি। ফলে তারা নিজেদেরকে বঞ্চিত বলে দাবি করে আসছে। এই বঞ্চনার জন্য তাদের অভিযোগ রাষ্ট্র, সরকার বা বাঙালি জনগোষ্ঠীর প্রতি নয়, বরং সুনির্দিষ্টভাবে বললে বলতে হয় সেখানকার প্রান্তিক মানুষের অভিযোগ চাকমা জনগোষ্ঠী ও জেএসএসের প্রতি। কেননা ট্রাইবাল কোটার সুবিধা বাঙ্গালীদের পাওয়ার কোন সুযোগ নেই।
পার্বত্য চট্টগ্রামে সরকার প্রদত্ত কোটা সিস্টেম ও বিশেষ সহায়তা বিতরণে যে বৈষম্যের সৃষ্টি হয়েছে তার জন্য বাঙালিরা কোনভাবে দায়ী নয়। বাঙালিরা এই সিস্টেমের বাইরে। এখানে তাদের মাথা ঢোকানোর কোন সুযোগ নেই। পাহাড় পরিচালিত হয় পাহাড়ি নেতৃত্বের দ্বারা। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়, আঞ্চলিক পরিষদ, উন্নয়ন বোর্ড, তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ, টাস্কফোর্স, তিন সার্কেল প্রধান পাহাড়ি। হেডম্যান, কারবারী ৯৮% পাহাড়ি, ভূমি কমিশন পার্বত্য বাঙালিবিহীন। প্রায় সকল নিয়োগে পাহাড়িদের অগ্রাধিকার বা সর্বোচ্চ কোটা রয়েছে। এসবের মধ্যে বাঙালিদের ঢোকার কোনো সুযোগ নেই। কাজেই পাহাড়ে যদি কোনো বৈষম্য থাকে তার জন্য পার্বত্য বাঙালিদের কোনো দায় নেই।
পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন এবং শান্তিচুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ রাষ্ট্র পাহাড়ের কেবলমাত্র উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর জন্য বিভিন্ন ধরনের কোটা সিস্টেম ও বিশেষ সহায়তা প্রকল্প পরিচালনা করে আসছে দীর্ঘদিন। প্রায় ৩৫ বছর পর মূল্যায়ন করে দেখা যাচ্ছে, এই সিস্টেমে পাহাড়ের কেবল দুয়েকটি জাতি ও সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত মানুষেরা প্রদত্ত সকল সুবিধা করায়ত্ব করেছে। বাকিরা যে বঞ্চিত সেই বঞ্চিতই থেকে গেছে। সরাসরি বললে বলতে হয়, পার্বত্য শান্তিচুক্তি যেহেতু জেএসএসের সাথে সম্পাদিত হয়েছে এবং জেএসএস যেহেতু চাকমা ডমিনেটেড সংগঠন, সে কারণে এই চুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্র প্রদত্ত সকল সুযোগ সুবিধা অধিকাংশক্ষেত্রে চাকমা সম্প্রদায়ের মানুষ হস্তগত করেছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। এর বাইরে অন্যান্য জনগোষ্ঠীর মানুষ যতোটুকু পেয়েছে তারা মূলত জেএসএসের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার কারণে।
অর্থাৎ এই চুক্তির ফলে কেবলমাত্র চাকমা ও জেএসএসের সাথে সম্পৃক্ত জনগোষ্ঠী লাভবান হয়েছে। এছাড়াও চাকমা জনগোষ্ঠী যেহেতু পূর্ব থেকেই শিক্ষা-দীক্ষা, ক্ষমতা ও জীবন মানে অগ্রসর ছিল, সে কারণে রাষ্ট্রের দেয়া সকল সুবিধা তাদের হাতে গিয়ে পৌঁছেছে। এবং তারা এই সকল সুযোগ সুবিধা কেবলমাত্র নিজেদের পরিবার-পরিজন স্বজন ও জনগোষ্ঠীর মধ্যে কুক্ষিগত করেছে। যেখানে তাদের উপস্থিতি নেই সেখানে জেএসএস ও এর অঙ্গ সংগঠনের সাথে জড়িত অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। এর বাইরে খাগড়াছড়িতে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী এবং বান্দরবানে মারমা জনগোষ্ঠী কিছুটা সুযোগ-সুবিধা পেয়েছে। সেটাও মূলত শহরকেন্দ্রিক। কিন্তু একই জেলার এবং দুর্গম এলাকায় বসবাসকারী ত্রিপুরা ও মারমা সম্প্রদায়ের কাছে এই সুবিধা পৌঁছেনি।
বিভিন্ন সময়ে আমি পাহাড়ের অনেক বঞ্চিত মানুষের কাছে অভিযোগ শুনতে পেয়েছি, পাহাড়ে যেকোনো নিয়োগের ভাইভা বোর্ডে ৫ সদস্য উপস্থিত থাকলে তাদের মধ্যে ৩-৪ জন চাকমা সম্প্রদায়ের বা পরোক্ষভাবে জেএসএসের সাথে সম্পৃক্ত কর্মকর্তাগণ উপস্থিত থাকেন। এবং তারা ভাইভাতে তাদের আত্মীয়-পরিজন, সম্প্রদায় এবং দলীয় সুপারিশকৃত লোকদের নিয়োগ দিয়ে থাকেন। ফলে এর বাইরে অন্য যে কোন মানুষের নিয়োগ পাওয়া খুবই কঠিন। এ কারণেই গত ৩৫ বছরে কেবলমাত্র নির্দিষ্ট গোষ্ঠী ও দলের জনগণ সকল সুবিধা করায়ত্ব করে ফুলে ফেঁপে উঠেছে। শিক্ষা-দীক্ষা, কর্মসংস্থান, অর্থনীতি ও জীবনমানে তারা বাংলাদেশের জাতীয় স্ট্যান্ডার্ড এর চেয়ে অনেক উপরে উঠে গেছে। তবুও তারা পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দকৃত এই সুবিধা ভোগ করছে। কিন্তু সেখানকার প্রকৃত পিছিয়ে পড়া ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর কাছে এই সুবিধা পৌঁছাতে পারছে না। ফলে পাহাড়ে এক বিশাল বৈষম্যের সৃষ্টি হয়েছে। এই বৈষম্য থেকেই এমএনপি ও কেএনএফ নামক সশস্ত্র গোষ্ঠীর জন্ম হয়েছে। যারা সব সময় চাকমা ও জেএসএস ডমিনেটের বিরোধিতা করে এসেছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নের জন্য সরকার একটি স্বতন্ত্র মন্ত্রণালয় গঠন করেছে ১৯৯৮ সালে। এই মন্ত্রণালয় শুরু থেকে খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান জেলার জন্য আলাদা করে উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করে থাকে। এ মন্ত্রণালয়ের তিন জেলার জন্য বছরে হাজার কোটি টাকার উপরে উন্নয়ন বরাদ্দ বিতরণ করা হয়। এছাড়াও প্রত্যেকটি মন্ত্রণালয় ৬৪ জেলার জন্য যেভাবে স্বতন্ত্র উন্নয়ন বরাদ্দ রাখে সেগুলো এই তিন জেলা পেয়ে থাকে। এর বাইরে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা, আন্তর্জাতিক এনজিও, আন্তর্জাতিক মিশনারি সংস্থা, স্থানীয় এনজিও এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সেখানে আলাদা আলাদা অবকাঠামো ও জীবনমানের উন্নয়ন প্রকল্প পরিচালনা করে থাকে। এই বিপুল পরিমাণ বরাদ্দ গত ২৮ বছর ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামে পরিচালিত হওয়ার পরেও সেখানকার সকল মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সমভাবে ঘটেনি। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে, সেখানে এখনো অনেক অনগ্রসর ও পিছিয়ে পড়া মানুষের বসবাস রয়েছে। অথচ গত ২৮ বছরের সকল বরাদ্দ মাথাপিছু ভাগ করলে পাহাড়ের সকল মানুষের জীবনমান সমতলের চেয়ে অনেক বেশি উন্নত হওয়ার কথা। কিন্তু সেটি ঘটেনি।
এছাড়াও পাহাড়ের অর্থনীতির একটা বিরাট অংশ আসে পর্যটন খাত থেকে। প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ দেশি-বিদেশি পর্যটকের মাধ্যমে পাহাড়ে হাজার কোটি টাকার উপরে লেনদেন হয়। এর সুবিধা সেখানকার জনগণই পেয়ে থাকে। পর্যটন নির্ভর রিসোর্ট মালিক, হোটেল, রেস্টুরেন্ট, দোকান, যানবাহন প্রভৃতির সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে লক্ষাধিক লোকের জীবন ও জীবিকা জড়িত। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রায় সারা বছরই পর্যটক ভ্রমণ করে থাকে। সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে সুষমভাবে বণ্টিত হলে কেবলমাত্র পর্যটন খাতে আয়ের মাধ্যমে পাহাড়ের মানুষের জীবনমান বদলে যাওয়ার কথা। কিন্তু তা ঘটেনি। সড়ক অবকাঠামোগত উন্নয়নের ফলে পাহাড়ে উৎপাদিত কৃষিপণ্য ও কুটির শিল্পজাত পণ্য এখন সারাদেশে বাজারজাত হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, উল্লিখিত সময়ে বাংলাদেশ সরকার, দাতা সংস্থা এনজিও ও অন্যান্যভাবে যে পরিমাণ বিশুদ্ধ পানির জন্য গভীর নলকূপ এবং সোলার প্যানেল বিতরণ করা হয়েছে তা সঠিকভাবে জনগণের হাতে পৌঁছালে প্রত্যেকের বাড়িতে নলকূপ ও কমপক্ষে একটি করে সোলার প্যানেল থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। সীমাহীন দুর্ণীতির মাধ্যমে কিছু পাহাড়ি নেতৃবৃন্দ শতশত কোটি টাকার মালিক হয়েছে এসব প্রকল্প ব্যবহার করে।
পাহাড়ে কারা বৈষম্য সৃষ্টি করছে তা বোঝার জন্য সাম্প্রতিক কয়েকটি নিয়োগ ও উন্নয়ন বরাদ্দের সংক্ষিপ্ত চিত্র বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। ২০২২ সালের জনশুমারির হিসেব অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালি জনগোষ্ঠীর শতকরা হার ৫০.০৬% এবং উপজাতি জনগোষ্ঠীর হার ৪৯.৯৪%। এদের মধ্যে চাকমা জনগোষ্ঠীর সংখ্যা মোট জনসংখ্যার মাত্র ২৭%। কিন্তু প্রায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিয়োগ, বৃত্তি ও উন্নয়ন বরাদ্দের দুই তৃতীয়াংশের বেশি তারাই ভোগ করে থাকে।
গত ২৩ নভেম্বর, ২০২৪ তারিখে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের অধীনে RHDC- ERRD-CHT, UNDP এর যৌথ প্রকল্পের জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে মাত্র ১০ শতাংশ বাঙালি প্রার্থী নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। অবাঙালি নিয়োগ দেয়া হয় ৯০ শতাংশ, অবাঙালিদের মধ্যে অধিকাংশই ছিল চাকমা জনগোষ্ঠির। এরপর ২০ ডিসেম্বর ২০২৪ রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদের অধীনে RHDC ও ILO এর যৌথ বাস্তবায়নাধীন Progress প্রকল্পের শতভাগ জনবল নিয়োগ দেয়া হয়েছে চাকমা জনগোষ্ঠী থেকে। (পার্বত্যনিউজ, ১২ ডিসেম্বর, ২০২৪)। গত ২৫ মার্চ-২০২৫ পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও আপৎকালীন পরিস্থিতি মোকাবিলায় ৩ কোটি ১২ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দের ঘোষণা দেয়। সম্প্রদায় ভিত্তিক বণ্টনে চাকমাদের অনুকূলে ২ কোটি ৩২ লাখ ৬০ হাজার টাকা (৯৬ জন), মারমা ২১ লাখ ৭০ হাজার (৪০ জন), মুসলিম বাঙালি ৪৭ লাখ ১০ হাজার (৩৬ জন), হিন্দু ১ লাখ ৩০ হাজার (৬ জন) এবং ত্রিপুরা ৯ লাখ ৮০ হাজার টাকা (৭ জন) বরাদ্দ দেওয়া হয়। ( ডেইলি সোনার বাংলা ডটকম, ১০ এপ্রিল, ২০২৫)।
গত ২৯ মার্চ, ২০২৫ দৈনিক ইনকিলাব অনলাইনে প্রকাশিত এক রিপোর্টে দেখা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র পরিষদ (পিসিসিপি) কেন্দ্রীয় কমিটি প্রদত্ত এক বিবৃতিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়ের একটি বরাদ্দ বণ্টনে বৈষম্যের কিছু চিত্র তুলে ধরেছে। সেখানে দাবী করা হয়েছে, রাঙামাটির বরাদ্দ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চাকমা সম্প্রদায় পেয়েছে ৮৬.৫০%, বাঙালিরা পেয়েছে মাত্র ৬.৯৫%, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের বরাদ্দ আরও নগণ্য। খাগড়াছড়ির বরাদ্দের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে, চাকমারা পেয়েছে ৭৩.০৯%, যেখানে বাঙালি, মারমা, ত্রিপুরা, সাঁওতালদের বরাদ্দ তুলনামূলকভাবে খুবই কম।
মন্ত্রণালয়ের এহেন বরাদ্দ নিয়ে ৭ জুলাই ২০২৫ খাগড়াছড়ি প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে ‘সচেতন মারমা ও ত্রিপুরা সমাজ’ নামের একটি সংগঠন। তাদের দাবী, “এতে শুধু মারমা ও ত্রিপুরা নয়, অন্যান্য পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীরাও মারাত্মকভাবে বঞ্চিত ও বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। পাঁচ দফায় মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ২ হাজার ২৭৩ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে চাকমা সম্প্রদায়কে ১৮’শ ৯২ মেট্রিক টন, মারমাদের ১০২ মেট্রিক টন, ত্রিপুরাদের ৬৬ মেট্রিক টন এবং বাঙালি ও অন্যান্য সম্প্রদায়কে ২১৩ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য দেওয়া হয়। যা চরম বৈষম্যমূলক।”
পাহাড়ের আলো ডটকম নামের একটি অনলাইন পত্রিকায় প্রকাশিত এক রিপোর্টে দেখা গেছে, চলতি বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালের ১৯ জানুয়ারি ১ম বরাদ্দ দেয়া হয় ৭শ ৫১ মে: টন চাল। এই বরাদ্দে চাকমা ৪৬০ মে: টন, মারমা ৯২ মে: টন, ত্রিপুরা ৬৬ মে: টন এবং বাঙ্গালি ১৩৩ মে: টন। ২৫ মার্চ ২য় বরাদ্দে ৩ কোটি ১২লাখ ৫০ হাজার টাকার মধ্যে চাকমা ২ কোটি ৩২লাখ ৬০ হাজার টাকা, মারমা ২১লাখ ৭০ হাজার, ত্রিপুরা ৯লাখ ৮০ হাজার এবং বাঙ্গালি ৪৭লাখ ১০হাজার এর মধ্যে হিন্দুদের জন্য দেয়া হয় ১লাখ ৩০হাজার টাকা। ২৭ মার্চ ৩য় সবশেষ বরাদ্দে ১হাজার ৮১৩ মে: টন চাল এর মধ্যে ১হাজার ৮১৩ মে: টন পেয়েছেন চাকমারা, মারমা ২০ মে. টন, মুসলিম বাঙ্গালি ৮০ মে. টন বরাদ্দ দিলেও ত্রিপুরা, হিন্দু, সাঁওতাল ও বড়ুয়াদের কোনো বরাদ্দ না দিয়ে বঞ্চিত করা হয়েছে। রিপোর্টে আরো বলা হয়েছে, কিছুদিন আগে পার্বত্য মন্ত্রণালয় থেকে ৭৫১ মে: টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে খাগড়াছড়িতে যা বাজার মুল্য ৩কোটি টাকার বেশি সকল প্রকল্প তালিকাতে চাকমাদের নাম। গত কয়েকদিন আগে আপতকালিন অনুদান পাঠানো হয়েছে ৩ কোটি ১২ লক্ষ টাকা সেখানেও মাত্র ১২ লাখ টাকা মারমাদের, বাকী ৩ কোটি চাকমাদের। এরপর ১ হাজার ৯১৩ মে: টন চাল বরাদ্দ পাঠানো হয়- যা বাজার মুল্য ৮ কোটি টাকা বেশি। সেখানেও একজন মারমা পেয়েছে মাত্র ১০ টন। (পাহাড়ের আলো ডটকম, ২ এপ্রিল ২০২৫)।
এতে প্রমাণিত হয়, পাহাড়ে সুবিধা ও উন্নয়নের সুষম বন্টনের অভাব রয়েছে। এভাবেই পাহাড়ের সকল সুবিধা ও উন্নয়নের সুযোগ একটি চিহ্নিত গোষ্ঠীর হাতে গিয়ে পড়ছে যুগ যুগ ধরে। তাদের বেশিরভাগই পাহাড়ে থাকে না। তারা উন্নত দেশগুলোতে এবং ঢাকা ও চট্টগ্রামের মত উন্নত শহরে বসবাস করে। পাহাড়ে তাদের নিযুক্ত লোকজনের মাধ্যমে ব্যবসা করে তারা দেশে ও বিদেশে বিলাসবহুল জীবন যাপন করে। এদের বেশিরভাগই শতশত থেকে হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছে। এরাই দেশে ও বিদেশে পাহাড়ে বঞ্চনা ও পিছিয়ে পড়ার কথা জোরেশোরে প্রচার করে থাকে। সেখানকার পিছিয়ে পড়া মানুষদের নিয়ে নানা ধরনের প্রিন্ট ও ডিজিটাল ডকুমেন্টারি, রিপোর্ট তৈরি করে দেশে বিদেশে প্রচার করে সরকারি ও বেসরকারি বরাদ্দ সংগ্রহ করে থাকে।
এ সকল বরাদ্দের বেশিরভাগই তারা নিজেরা ভোগ করে থাকে। এবং এর খুব সামান্য অংশ প্রকৃত টার্গেটেড লোকদের কাছে পৌঁছে দিয়ে থাকে। ফলে পাহাড়ে যারা প্রকৃত বৈষম্যের শিকার যুগ যুগ ধরে তারা বৈষম্যের ভেতরেই বসবাস করে। এটা অনেকটা ক্ষত দেখিয়ে ভিক্ষা চাওয়া ভিখারির মত। ক্ষত শুকিয়ে গেলে ভিক্ষা পাওয়া যাবে না বলে ভিখারি কখনোই ক্ষতের চিকিৎসা করে না। ঠিক তেমনি পাহাড়ের সুবিধাপ্রাপ্ত শিক্ষিত ও প্রভাবশালী জনগোষ্ঠীরা সেখানকার নানা বৈষম্যের বয়ান জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে তুলে ধরে তাদের জন্য সহায়তা এনে নিজেরা ভোগ করে এবং হিসেব মেলানোর জন্য খুব সামান্যই প্রকৃত বৈষম্যের শিকার মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়। এই সকল বরাদ্দের একটা বড় অংশ আবার আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনগুলো চাঁদাবাজি ও ভয়ভীতির মাধ্যমে হাতিয়ে নেয়। প্রতিবছর পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রায় ৭০০ কোটি টাকা চাঁদাবাজির মাধ্যমে আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনগুলো সাধারণ মানুষের কাছ থেকে আদায় করে থাকে। এই বিপুল পরিমাণ অর্জিত অর্থের খুব সামান্য পরিমাণ স্থানীয় দল পরিচালনার জন্য ব্যয় করে বাকি অর্থ সংগঠনের সিনিয়র নেতারা শহরে বসবাসকারী তাদের পরিবার পরিজন ও বিলাসবহুল জীবনযাপনের জন্য ব্যয় করে থাকে।
প্রকৃতপক্ষে দুর্গম এলাকায় বসবাসকারী পাহাড়িদের সমস্যা, অভাব ও অভিযোগ সম্পর্কে পাহাড়ি এলিটরা খুব কমই ধারণা রাখে। কেননা তারা পাহাড় ছেড়ে এসেছে বহু পূর্বে বা পাহাড়ে থাকলেও শহরকেন্দ্রিকতায় আবদ্ধ জীবন। বিভিন্ন উৎসব ও অনুষ্ঠান ছাড়া পাহাড়ে তেমন একটা যায়ও না। কদাচিৎ গেলেও শহরকেন্দ্রিক তাদের ওঠা-চলা সীমাবদ্ধ থাকে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে তাদের পদধূলি পড়ে না। এছাড়াও পাহাড়ের ১৭টি ভিন্ন ভিন্ন জাতি গোষ্ঠী ভিন্ন ভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি ও ধর্মের কারণে একটি জাতিগোষ্ঠীর পক্ষে অন্য জাতি গোষ্ঠীর সমস্যা চাহিদা ও চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া কঠিন। একজন চাকমার পক্ষে একজন মুরং, চাক, খিয়াং সমস্যা বোঝা মুশকিল। একজন মুরং, বম, খিয়াং বা চাকের কাছে বাঙালি ও চাকমা, ত্রিপুরার পার্থক্য খুব বেশি নয়। কারণ এদের প্রত্যেকের ভাষা, সংস্কৃতি, জীবনযাপন পদ্ধতি সম্পূর্ণ আলাদা। সে কারণে শহুরে উচ্চ শিক্ষিত পাহাড়ের ‘বৈষম্য ব্যবসায়ীরা’ জানেই না প্রত্যন্ত ও দুর্গম অঞ্চলে বসবাসকারী পাহাড়িদের ক্রাই এন্ড ক্রাইসিস গুলো কী, চ্যালেঞ্জগুলো কী।
অথচ সরকার ও আন্তর্জাতিক মহল যখন পাহাড়ের সমস্যা, চ্যালেঞ্জ এবং বৈষম্যের কথা জানতে চায়, তখন তারা ডেকে নেয় শহরে বসবাসকারী সবচেয়ে সুবিধাভোগী ব্যক্তিগুলোকে। এদের কাছ থেকে বৈষম্যের গল্প শুনে বৈষম্য নিরসনে বরাদ্দটাও এদের হাতেই তুলে দেয়া হয়। প্রত্যন্ত ও দুর্গম অঞ্চলে বসবাসকারীদের ডেকে কখনো জিজ্ঞাসা করা হয় না তাদের সমস্যা কী, তাদের বৈষম্যের প্রকৃত কারণ কী এবং কীভাবে এর সমাধান সম্ভব? সরকার ও দেশি-বিদেশি এনজিও, দাতা সংস্থার কর্মকর্তাগণ যখন পাহাড়ে যান তাদের বরাদ্দের সদ্ব্যবহার দেখতে, তখন সিলেক্টেড লোকদের তাদের সামনে সাজিয়ে নিয়ে আসা হয় অথবা সিলেক্টেড এলাকায় তাদের নিয়ে যাওয়া হয়- যেটা দেখিয়ে, শুনিয়ে তাদের পরবর্তী বরাদ্দ নিশ্চিত করা যাবে।
এভাবেই চলছে বছরের পর বছর। কিন্তু পাহাড়ের বৈষম্য নিরসন করা যাচ্ছে না। যখন পাহাড়ের ভূমি সমস্যা নিরসনের কথা বলা হয়, তখন ডাকা হয় পাহাড়ের প্রথাগত নেতাদের- সার্কেল প্রধান, হেডম্যান, কারবারি, জনপ্রতিনিধি ও ধনিক সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণিকে। এরা একেক জন শত শত বা হাজার একর জমির মালিক। এরা প্রথাগত ভূমি ব্যবস্থার কথা বলে। কারণ তারা জানে, বাংলাদেশের সরকারি নিয়মে একজন মানুষ সর্বোচ্চ ৬০ বিঘা জমির মালিক হতে পারে। অর্থাৎ সর্বোচ্চ বিশ একর। কাজেই প্রথাগত ভূমি ব্যবস্থা উঠে গেলে এই সকল ভূ-স্বামীগণ তাদের বিপুল পরিমাণ জমি হারাবেন। ১৯৫০ সালে পূর্ব বঙ্গীয় রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের মাধ্যমে যখন শেরেবাংলা একে ফজলুল হক জমিদারি প্রথা বিলোপ করেছিল তখনো পূর্ব পাকিস্তানের জমিদারগণ একই ধরনের বিরোধিতা করেছিলেন। তারা এর বিরুদ্ধে মামলা পর্যন্ত রুজু করেছিলেন।
বাংলাদেশ সরকার বারবার পার্বত্য চট্টগ্রামের জমি সার্ভে করে জনগণের মালিকানায় দেয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু সেখানকার ভূ-স্বামীগণ এটার বিরোধিতা করেছে সব সময়। আমাদের সরকার, বুদ্ধিজীবী ও মিডিয়া ভূমি সমস্যার সমাধান উপরোক্ত ভূ-স্বামীগনের চোখ দিয়ে দেখেছে। কখনোই দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন সাধারণ প্রজা, জুম চাষীকে ডেকে শোনেনি, তুমি জমির মালিকানা কীভাবে চাও? তুমি নিজে মালিক হতে চাও, নাকি সার্কেল চিফ মালিকানায় থাকুক, সেটা চাও? তুমি নিজের প্রয়োজনে জমি বিক্রির অধিকার চাও কিনা? কেউ তাদের জিজ্ঞাসা করেনি এ প্রশ্ন।
এভাবেই পাহাড়ে যুগের পর যুগ চলে এসেছে বৈষম্য। এই বৈষম্য দূরীকরণে এখন সময় এসেছে কাজ করার। পাহাড়ে এবং সমতলে যারা বৈষম্যের শিকার, রাষ্ট্রের বিশেষ সুবিধা, প্রণোদনা, উদ্যোগ এবং কোটা ব্যবস্থা তাদের জন্য নিশ্চিত করতে হবে। এবং এই সুবিধা যেন অন্য কেউ ব্যবহার করতে না পারে সেটাও নিশ্চিত করতে হবে। যারা ইতিমধ্যেই এই সুবিধা ব্যবহার করে শিক্ষা-দীক্ষা কর্মসংস্থান অর্থনীতি ও জীবনযাপনের মানদণ্ডে উন্নত বা ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ডে উপনীত হয়েছে, তাদেরকে এই সুবিধার বাইরে রাখতে হবে। তারা যেন কোনভাবেই এই সুবিধার ভেতরে ঢুকে প্রকৃত অনগ্রসর জনগোষ্ঠীকে বঞ্চিত করতে না পারে সেটি বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে। যারা প্রকৃত বঞ্চিত, অনগ্রসর, পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় বিশেষ সুবিধাগুলো তাদের কাছে পৌঁছাতে হবে সরাসরি। এক্ষেত্রে কোন মধ্যসত্ত্ব ভোগীকে সুযোগ দেয়া যাবে না। কেননা বিগত ৩৫ বছর ধরে এই মধ্যসত্ত্বভোগীরাই রাষ্ট্রীয় বিশেষ সুবিধা ও প্রণোদনাগুলোকে কুক্ষিগত করে নিজেরা ধনী থেকে অতি ধনীতে পরিণত হয়েছে। এদেরকে মাঝখান থেকে সরিয়ে দিয়ে সরাসরি বঞ্চিত ও অনগ্রসর মানুষকে রাষ্ট্র প্রদত্ত সুবিধা পৌঁছে দেয়ার ম্যাকানিজম রাষ্ট্রকেই বের করতে হবে। তাহলে একদিন এই বাংলাদেশের পাহাড়-সমতল তথা ৫৬ হাজার বর্গমাইলের কোথাও বৈষম্যের আওয়াজ থাকবে না।
লেখক: সম্পাদক, পার্বত্যনিউজ, চেয়ারম্যান, সিএইচটি রিসার্চ ফাউন্ডেশন।

















