পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী বাসিন্দা সনদ বিতর্ক অবসানের উপায়

Sayed Ibn Rahmat

সৈয়দ ইবনে রহমত ::

পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী বাসিন্দা সনদপত্র প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ নিয়ে একটি বিতর্ক আছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম জন সংহতি সমিতির চেয়ারম্যান সন্তু লারমার দাবি হলো, পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী বাসিন্দা সনদপত্র প্রদানের কর্তৃত্ব জেলাপ্রশাসকদের কাছ থেকে নিয়ে সার্কেল চীফদের হাতে দেওয়া হোক। এর কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, জেলা প্রশাসকদের হাতে স্থায়ী বাসিন্দার সনদপত্র প্রদানের কর্তৃত্ব থাকায় সমতলের বাসিন্দারাও তা পেয়ে যাচ্ছে। আর সেটা বন্ধ করতেই স্থায়ী বাসিন্দার সনদপত্র প্রদানের কর্তৃত্ব সার্কেল চীফদের হাতে দিতে হবে (যদিও অন্তরে ভিন্ন পরিকল্পনা আছে বলে ধারণা করা যায়)। সন্তু লারমার এই দাবি পূরণে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তৎপরতাও চোখে পড়ার মতো। কিন্তু আইনি জটিলতার কারণে সরাসরি সেটি পূরণ করা যাচ্ছে না। তাই জেলাপ্রশাসকদের পাশাপাশি সার্কেল চীফগণও পার্বত্য জেলার অধিবাসীদের প্রয়োজনে স্থায়ী বাসিন্দার সনদপত্র দিতে পারবেন মর্মে একাধিকবার প্রজ্ঞাপন জারি করে মন্ত্রণালয়।

পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের দুটি প্রজ্ঞাপন : পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে গত ২০০১ সালের ১১ জুন জারি করা “চাকুরীক্ষেত্রসহ সকল প্রয়োজনে তিন পার্বত্য জেলার অধিবাসীদের স্থায়ী বাসিন্দার সনদপত্র প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ ঘোষণা প্রসংগে” শিরোনামের এক প্রজ্ঞাপনের দ্বিতীয় প্যারাগ্রাফে উল্লেখ করা হয়, ‘তিন পার্বত্য জেলার অধিবাসীদের স্থায়ী বাসিন্দার সনদ কোন্ কর্তৃপক্ষ প্রদান করবেন সে বিষয়ে পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন ১৯৮৯ ও উহার সংশোধনীতে (১৯৯৮ সালে জারীকৃত) কোন বিধান করা হয়নি। পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন ১৯৯৮ এর পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্য পদে নির্বাচনে প্রার্থীতার ক্ষেত্রে কোন প্রার্থী উপজাতি বা অ-উপজাতি কিনা সে বিষয়ে প্রত্যয়নের ক্ষমতা সার্কেল চীফগণকে প্রদান করা হয়েছে। এক্ষেত্রে বর্ণিত আইনে স্থায়ী বাসিন্দার সনদ প্রদানের ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসকের ক্ষমতা রদ করা হয়নি।’

একই প্রজ্ঞাপনের চতুর্থ প্যারাগ্রাফে বলা হয়, ‘যেহেতু পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন ১৯৮৯ ও উহার সংশোধনীতে পার্বত্য জেলার অধিাসীদের সনদ প্রদানের বিষয়ে জেলা প্রশাসকদের ক্ষমতা রহিত/রদ করে কোন বিধান করা হয়নি সেহেতু আইন মন্ত্রণালয়ের মতামতের অনুসরণে জেলা প্রশাসকের পাশাপাশি সার্কেল চীফগণও পার্বত্য জেলার অধিবাসীদের চাকুরীসহ সকল প্রয়োজনে স্থায়ী বাসিন্দার সনদপত্র প্রদান করতে পারবেন মর্মে পুনরায় নির্দেশনা দেয়া হলো। তবে পার্বত্য জেলার অধিবাসী হিসেবে স্থায়ী বাসিন্দার সনদপত্র প্রদানের ক্ষেত্রে যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। অর্থাৎ কোন ভাবেই পার্বত্য জেলার অধিবাসী নন এমন কাউকে স্থায়ী বাসিন্দার সনদ প্রদান করা যাবে না।’

একই প্রসংগে মন্ত্রণালয় থেকে ২০০২ সালের ২১ অক্টোবর জারি করা অপর এক প্রজ্ঞাপনের দ্বিতীয় প্যারাগ্রাফে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়, ‘তিন পার্বত্য জেলার অধিবাসীদের স্থায়ী বাসিন্দার সনদ কোন কর্তৃপক্ষ প্রদান করবেন সে বিষয়ে পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন ১৯৮৯ ও উহার সংশোধনীতে (১৯৯৮ সালে জারীকৃত) কোন বিধান করা হয়নি। পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন, ১৯৮৯ এর ধারা ৪ এর উপধারা (৫) ও (৬) এ পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্য পদে নির্বাচনে প্রার্থীতার ক্ষেত্রে কোন প্রার্থী উপজাতি বা অ-উপজাতি কিনা সে বিষয়ে প্রত্যয়নের ক্ষমতা সার্কেল চীফগণকে প্রদান করা হয়েছে। আলোচ্য আইনে বা আইনের ৪ ধারার (৫) ও (৬) উপধারায় চাকুরীক্ষেত্রসহ অন্যান্য প্রয়োজনে সার্কেল চীফগণ স্থায়ী বাসিন্দার সনদপত্র প্রদান করতে পারবেন মর্মে কোন বিধান দেয়া হয়নি। এ উপধারা দুটির বিধাান এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত স্পষ্ট। এছাড়াও বর্ণিত আইনে নির্বাচন ব্যতীত অন্যান্য প্রয়োজনে স্থায়ী বাসিন্দার সনদ প্রদানের ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসকের ক্ষমতা রদ করা হয়নি।’

আইন বহির্ভূত এখতিয়ার : প্রজ্ঞাপন দুটির উল্লেখিত অংশবিশেষ থেকে এটা সুস্পষ্ট যে, পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনে পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্য পদে নির্বাচনে প্রার্থিতার ক্ষেত্রে কোন প্রার্থী উপজাতি বা অ-উপজাতি কিনা সে বিষয়ে প্রত্যয়নের ক্ষমতা সার্কেল চীফগণকে প্রদান করা হলেও চাকুরীক্ষেত্রসহ অন্যান্য প্রয়োজনে তারা স্থায়ী বাসিন্দার সনদপত্র প্রদান করতে পারবেন মর্মে কোন বিধান দেয়া হয়নি। তার পরেও জেলা প্রশাসকের পাশাপাশি সার্কেল চীফগণ পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীদের চাকুরীসহ সকল প্রয়োজনে স্থায়ী বাসিন্দার সনদপত্র প্রদান করতে পারবেন মর্মে নির্দেশনা দেয়া হয়, যা কার্যত আইন বহির্ভূত এখতিয়ার। সার্কেল চীফগণকে স্থায়ী বাসিন্দার সনদ প্রদানে আইন বহির্ভূত এখতিয়ার দেয়ার পরও বিষয়টির সমাধান হয়নি। সন্তু লারমার পক্ষ থেকে পার্বত্য জেলার স্থায়ী বাসিন্দার সনদপত্র প্রদানের এখতিয়ার জেলাপ্রশাসকদের হাত থেকে নিয়ে পূর্ণাঙ্গভাবেই সার্কেল চীফগণকে দেয়ার দাবি জানানো হচ্ছে অব্যাহতভাবে।

নতুন তৎপরতা : সম্ভবত সন্তু লারমা দাবিকে সামনে রেখেই সম্প্রতি আইন মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ থেকে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে পার্বত্য জেলার স্থায়ী বাসিন্দা সনদপত্র প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ বিষয়ক মতবিনিময় সভা’ আয়োজনের নিমিত্তে চিঠি দেয়া হয়েছে। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘Chittagong Hill Tracts Regulations, 1900, রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন, ১৯৮৯, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন, ১৯৮৯ এবং বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন, ১৯৮৯-সহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আইনে বর্ণিত আইনগত অবস্থা পর্যালোচনাক্রমে পার্বত্য জেলার স্থায়ী বাসিন্দা সনদপত্র প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ নির্ধারণের নিমিত্ত একটি সভা অনুষ্ঠিত হবে।’ এই বিষয়টি নিয়ে তিন পার্বত্য জেলার বাঙালিদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে আতঙ্ক। স্থায়ী বাসিন্দা সনদ দেয়ার একমাত্র কর্তৃত্ব সার্কেল চীফদের হাতে দেয়ার জন্য এ তৎপরতা শুরু হয়েছে মনে করাই- এই আতঙ্কের কারণ।

প্রসংগক্রমে এখানে উল্লেখ করা যায় যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে গত ২০০১ সালের ১১ জুন এবং ২০০২ সালের ২১ অক্টোবর জারি করা প্রজ্ঞাপনের ভাষ্য মতে, পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন, ১৯৮৯ (রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন, ১৯৮৯, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন, ১৯৮৯ এবং বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন, ১৯৮৯) ও উহার সংশোধনীতে (১৯৯৮ সালে জারীকৃত) এটা সুস্পষ্ট যে, পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনে পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্য পদে নির্বাচনে প্রার্থিতার ক্ষেত্রে কোন প্রার্থী উপজাতি বা অ-উপজাতি কিনা সে বিষয়ে প্রত্যয়নের ক্ষমতা সার্কেল চীফগণকে প্রদান করা হলেও চাকুরীক্ষেত্রসহ অন্যান্য প্রয়োজনে তারা স্থায়ী বাসিন্দার সনদপত্র প্রদান করতে পারবেন মর্মে কোন বিধান দেয়া হয়নি।

আর সংশ্লিষ্ট অন্য কোন আইনে যদি তেমন কোন বিধান থাকতই তাহলে তা নিশ্চয়ই ওইসব প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হতো। তাছাড়া প্রত্যেকবারই আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত নেয়া হয়েছে, তাই বিষয়টি আইন মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টিগোচর হওয়াও স্বাভাবিক ছিল, কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। এর সহজ, সরল এবং সুস্পষ্ট অর্থ হচ্ছে, আসলে অন্য কোন আইনে তেমন কোন বিধান নেই।

সাম্প্রতিক চিঠিতে Chittagong Hill Tracts Regulations, 1900,-কে পর্যালোচনা করার কথাও বলা হয়েছে, কিন্তু বাস্তবতা হলো, Chittagong Hill Tracts Regulations, 1900,-কে বাংলাদেশের সংবিধানে আজ পর্যন্ত স্বীকার করা হয়নি। উপরন্তু ১৯৮৯ সালের ১৬ নং আইন তথা ‘পার্বত্য জেলাসমূহ (আইন রহিত ও প্রয়োগ এবং বিশেষ বিধান) আইন, ১৯৮৯’-এ Chittagong Hill Tracts Regulations, 1900,-কে রহিত করার কথা বলা হয়েছে। অতএব, অসংবিধানিক Chittagong Hill Tracts Regulations, 1900, কোনক্রমেই আলোচ্য অন্যান্য আইনের চেয়ে গুরুত্ব পাওয়ার প্রশ্নই উঠে না। তাছাড়া মৃত একটি আইনকে বিবেচনায় এনে জীবিত করলে পরবর্তীতে এই উপনিবেশিক আইনের আওতায় সংবিধান বহির্ভূত অন্যান্য সুবিধাবলী যখন পাহাড়ীরা দাবি করে বসবে তখন পার্বত্য চট্টগ্রামে একটি সাংবিধানিক ও শাসনতান্ত্রিক সঙ্কট দেখা দেবে।

দাবিটি শান্তিচুক্তি বহির্ভূত : সার্কেল চীফগণকে আইন বহির্ভূত এখতিয়ার দেয়ার পরও সন্তু লারমার পক্ষ থেকে পার্বত্য জেলার স্থায়ী বাসিন্দার সনদপত্র প্রদানের এখতিয়ার জেলাপ্রশাসকদের হাত থেকে নিয়ে পূর্ণাঙ্গভাবেই সার্কেল চীফগণকে দেয়ার অব্যাহত দাবির ভিত্তিটা আসলে কোথায়, সেটাও ভাববার বিষয়। কেননা পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক চুক্তি তথা শান্তিচুক্তির আলোকে প্রণীত কোন আইনে সন্তু লারমার আলোচ্য দাবির পক্ষে কোন বিধান নেই। এমনকি খোদ শান্তিচুক্তিতেও এর কোন ভিত্তি নেই, কেননা চুক্তির ‘খ’ খণ্ডের অনুচ্ছেদ ৪ এর উপ-অনুচ্ছেদ ‘ঘ’-এ বলা হয়েছে-

“(পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন, ১৯৮৯-এর) ৪ নম্বর ধারায় নিম্নোক্ত উপ-ধারা সংযোজন করা হইবে-‘কোন ব্যক্তি অ-উপজাতীয় কিনা এবং হইলে তিনি কোন সম্প্রদায়ের সদস্য তাহা সংশ্লিষ্ট মৌজার হেডম্যান/ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান/পৌরসভার চেয়ারম্যান কর্তৃক প্রদত্ত সার্টিফিকেট দাখিল সাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট সার্কেলের চীফ স্থির করিবেন এবং এতদ্সম্পর্কে সার্কেল চীফের নিকট হইতে প্রাপ্ত সার্টিফিকেট ব্যতীত কোন ব্যক্তি অ-উপজাতীয় হিসাবে কোন অ-উপজাতীয় সদস্য পদের জন্য প্রার্থী হইতে পারিবেন না’।”

এখানে জেলা পরিষদের নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া ছাড়া অন্য কোন ক্ষেত্রে সার্কেল চীফের সার্টিফিকেটের কথা বলা হয়নি। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠছে যে, আজ কেন সন্তু লারমা শান্তিচুক্তি বহির্ভূত এই দাবি করছেন যে, চাকুরীসহ সকল ক্ষেত্রে পার্বত্য জেলার স্থায়ী বাসিন্দার সনদপত্র প্রদানের এখতিয়ার জেলাপ্রশাসকদের হাত থেকে নিয়ে পূর্ণাঙ্গভাবেই সার্কেল চীফগণকে দিতে হবে?

দাবিটি সংবিধান স্বীকৃত নাগরিকের মৌলিক অধিকার পরিপন্থী : পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক অন্যান্য আইন সংক্রান্ত রিট আবেদন ২৬৬৯/২০০০ এবং ৬৪৫১/২০০৭-এর পরিপ্রেক্ষিতে দীর্ঘ শুনানি শেষে বিচারপতি সৈয়দ রিফাত আহমেদ ও মইনুল ইসলাম চৌধুরী সমন্বয়ে গঠিত হাই কোর্টের একটি বেঞ্চ এক ঐতিহাসিক রায় দেন। যদিও সে রায়ের কার্যকারিতার ওপর আপিল বিভাগের স্থগিতাদেশ রয়েছে, তার পরেও সেটি এখানে স্মরণযোগ্য; যেখানে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদকে বাতিল করার পাশাপাশি পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনের চারটি ধারাকে সংবিধানের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ার কারণে আদালত বাতিল ঘোষণা করেছেন।

২০১০ সালের ১৩ এপ্রিল দেয়া হাইকোর্টের রায়ের আলোকে পরের দিন অর্থাৎ ১৪ এপ্রিল দৈনিক প্রথমআলোতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে, জেলা পরিষদের বাতিলকৃত চারটি ধারার প্রথমটিই স্থায়ী বাসিন্দার সনদপত্র প্রদানের কর্তৃত্ব সংক্রান্ত। জেলা পরিষদ আইনের যে ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, ‘কোনো ব্যক্তি অ-উপজাতীয় কিনা তা নির্ধারণে, গ্রামের হেডম্যান কর্তৃক প্রদত্ত সনদের দ্বারা সার্কেল চীফকে ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছে। এই সনদ ছাড়া কেউ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না।’ পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনের উল্লেখিত ধারাটি সংবিধানের ২৭, ২৮(১), ২৯(১) ও ৩১ অনুচ্ছেদের পরিপন্থী হওয়ায় তা বলে বাতিল ঘোষণা করেছেন আদালত। এটাও জানা যে, সংবিধানের ২৭, ২৮(১), ২৯(১) ও ৩১ অনুচ্ছেদ হচ্ছে নাগরিকের মৌলিক অধিকারের রক্ষাকবচ এবং অলঙ্ঘনীয়।

বিতর্ক অবসানের উপায় : উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে এটা নিশ্চিত যে, সন্তু লারমা যতই দাবি করুন না কেন, কোন ক্রমেই ‘সার্কেল চীফগণের পার্বত্য জেলার স্থায়ী বাসিন্দার সনদপত্র প্রদানের কর্তৃত্ব’ আইনি বৈধতা পাবে না। এর পরও সেটা দেয়া হলে, সংবিধান সিদ্ধ নাগরিকের মৌলিক অধিকার পরিপন্থী হওয়ায় তা যে কোন সময় নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে বাধ্য। তাই এই বিতর্কের অবসানে আমাদের বিকল্প পথে হাঁটতে হবে। আর তেমনই একটি ভালো বিকল্প পন্থা হতে পারে ‘জাতীয় পরিচয়পত্র’। সন্তু লারমাসহ আমরা সবাই বাংলাদেশি। আর আমাদের (প্রাপ্ত বয়স্ক) প্রত্যেকেরই রয়েছে ‘জাতীয় পরিচয়পত্র’। যার মধ্যে একজন নাগরিকের স্থায়ী ঠিকানাসহ তাকে চিহ্নিত করার যাবতীয় তথ্যই সংরক্ষিত রয়েছে। আর সেটা সহজে পরিবর্তন করার সুযোগও নেই। তাই ‘জাতীয় পরিচপত্র’ তৈরি হওয়ার পর আলাদা করে স্থায়ী বাসিন্দার সনদপত্র নিষ্প্রয়োজন। আর যাদের ‘জাতীয় পরিচয়পত্র’ তৈরি হয়নি অর্থাৎ যারা ১৮ বছরের কম বয়সের, তাদের প্রয়োজনে জন্ম সনদই হতে পারে উপযুক্ত বিকল্প।

‘জাতীয় পরিচয়পত্র’ তৈরি হওয়ার পূর্বে একজন নাগরিকের পক্ষে যে কোন স্থানে গিয়ে নিজেকে সেখানকার স্থায়ী বাসিন্দা বলে দাবি করা অনেকটা সহজ ছিল, কিন্তু এখন তা অসম্ভব। সমতল থেকে কারো পক্ষে যখন তখন পার্বত্য চট্টগ্রামে গিয়ে নিজেকে সেখানকার স্থায়ী বাসিন্দা বলে দাবি করার সুযোগও আর অবারিত নেই। তাই এটা নিয়ে বিতর্ক করে অহেতুক সময় নষ্ট করারও কোন যুক্তি নেই। আশা করি, সন্তু লারমাসহ পার্বত্য চট্টগ্রাম জন সংহতি সমিতির নেতারাও বিষয়টি অনুধাবন করবেন। একই সাথে, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদেরকেও বিষয়টি নিয়ে বারবার প্রজ্ঞাপন জারি কিংবা সভা-সেমিনার করা নিয়ে আর ব্যতিব্যস্ত হতে হবে না বলেই প্রত্যাশা রাখি।

লেখক : সাংবাদিক ও গবেষক

[email protected]

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: পার্বত্য চট্টগ্রাম, পার্বত্য মন্ত্রণালয়, শান্তিুচুক্তি
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

2 × 5 =

আরও পড়ুন