পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক চুক্তির আদ্যোপান্ত

fec-image

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস) ও তার সশস্ত্র সংগঠন শান্তিবাহিনী আত্মপ্রকাশ করে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর। যদিও তার প্রস্তুতি চলছিল স্বাধীনতা যুদ্ধের পূর্ব থেকেই। একদিকে শান্তিবাহিনীর ধারাবাহিক সশস্ত্র তৎপরতা এবং অন্যদিকে তার প্রতিকারে রাষ্ট্রের পাল্টা পদক্ষেপের ফলে সামরিক-বেসামরিক হাজার হাজার মানুষের জীবন ক্ষয় হয়েছে এই পাহাড়ে। পিতা-মাতা হারিয়ে বহু সন্তান এতিম হয়েছেন, বহু নারী স্বামী হারিয়ে বিধবা হয়েছেন, সন্তান হারিয়েছেন অসংখ্য মা ও বাবা। হামলা-অগ্নিসংযোগে সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে অগণিত ব্যক্তি ও পরিবার। অবশেষে পিসিজেএসএস-এর সঙ্গে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক গঠিত পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটির একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। যে চুক্তিটি ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক চুক্তি’, ‘পার্বত্য চুক্তি’, ‘শান্তিচুক্তি’ ইত্যাদি নামে পরিচিত। চুক্তির উদ্দেশ্য ছিল পাহাড় থেকে সশস্ত্র তৎপরতার অবসান করে জনজীবনে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। পিছিয়ে পড়া পাহাড়ি অঞ্চলে ব্যাপক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম ও এর অধিবাসীদের ভাগ্যোন্নয়ন। চুক্তি স্বাক্ষরের ২৮ বছর অতিক্রান্ত হলো, কিন্তু এর সুফল কতটা বাস্তবে রূপ পেয়েছে সেটা নিয়ে প্রশ্নের শেষ হয়নি। চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী একটি পক্ষ পিসিজেএসএস বলছে, চুক্তির মৌলিক ধারাগুলোই বাস্তবায়ন হয়নি, অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, চুক্তির অধিকাংশ ধারাই বাস্তবায়িত হয়েছে।

পিসিজেএসএস এবং তার সশস্ত্র সংগঠন শান্তিবাহিনী প্রতিষ্ঠার প্রায় তিন দশক পর চুক্তি হয়েছে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে। তবে এটা ছিল আগের দুটি সরকারের সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনার ফসল। ১৯৮৫ সালের ২১ অক্টোবর এরশাদ সরকার শুরু করেছিল এই আলোচনা, পর পর ৬টি বৈঠক করেছিল সেই সরকার। পরবর্তী সময়ে বিএনপি সরকার এই আলোচনা এগিয়ে নিয়ে যায়, তারা তাদের ক্ষমতায় থাকা পাঁচ বছরে ১৩টি বৈঠক করে পিসিজেএসএস-এর সঙ্গে। ১৯৯৬ সালের ১২ জুন অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জয়লাভের পর তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ৭টি বৈঠক করে পিসিজেএসএস-এর সঙ্গে চুক্তিতে পৌঁছায়। তবে এরশাদ সরকারের আগের সরকারগুলোও এ ব্যাপারে তৎপর ছিল। বিশেষ করে, পিসিজেএসএস ও শান্তিবাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা এম এন লারমার ১৯৭৫ সালে বাকশালে যোগদান, পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আমলে ট্রাইবাল কনভেশন গঠন, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড প্রতিষ্ঠা, কালচারাল ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা, এম এন লারমার ছোট ভাই এবং বর্তমান আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমাকে (সন্তু লারমা) জেল থেকে মুক্তি প্রদান সেই সময়কার সরকারগুলোর তৎপরতার স্বাক্ষর বহন করে। এতে বোঝা যায়, সশস্ত্র তৎপরতা বন্ধ করে পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সব সরকারেরই কোনো না কোনো প্রচেষ্টা ছিল। শেষ পর্যন্ত চুক্তিও হলো, তারপর ২৮ বছর পেরিয়ে গেছে, কিন্তু শান্তির স্বপ্ন এখনো পরিপূর্ণ ডানা মেলেনি। এর কারণ কী? সেটাই এখন মূল প্রশ্ন।

রাজনৈতিক বাস্তবতা
স্বাক্ষরকালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার এবং তাদের মিত্র কয়েকটি রাজনৈতিক দল বাদে দেশের প্রায় সব রাজনৈতিক দল এটিকে একটি দেশবিরোধী ও অসাংবিধানিক চুক্তি বলে আখ্যায়িত করে। বিশেষ করে, বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট এই চুক্তিকে কালো চুক্তি আখ্যা দিয়ে এর বিরুদ্ধে লংমার্চ পর্যন্ত করেছে এবং ভবিষ্যতে ক্ষমতায় গেলে এই চুক্তি বাতিল করা হবে বলে তারা জানিয়েছিল। চুক্তির পর আওয়ামী লীগ ৩ বছরের বেশি সময় ক্ষমতায় ছিল। সেই সময় চুক্তির আলোকে তারা ৩ পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন (১৯৯৮) সংশোধন করেছে, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন-১৯৯৮ প্রণয়ন করেছে, পার্বত্য ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন-২০০১ প্রণয়ন করেছে। তবে সম্পূর্ণ চুক্তি তারা বাস্তবায়ন করেনি। অপরদিকে ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোট ক্ষমতায় আসার পর চুক্তি বাতিল না করে বরং সবকিছুই চলমান রাখে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ আবারো সরকার গঠনের পর টানা সাড়ে ১৫ বছর ক্ষমতায় ছিল। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়েও তারা তাদের নিজেদের করা চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করেনি। ২০২৪ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়’র এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, চুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ইতোমধ্যে ৬৫টি সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়িত হয়েছে। ৩টি ধারা আংশিকভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে। ৪টি ধারা বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। এত দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার পরও আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার কেনো এই চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করেনি তা নিয়ে নানাজনের নানা বক্তব্য আছে। তবে এর পেছনের অন্তর্নিহিত কারণ জানতে হলে এই চুক্তি সম্পর্কে হাইকোর্টের মূল্যায়ন সহায়তা করতে পারে।

উচ্চ আদালতের মূল্যায়ন
হাইকোর্টে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক চুক্তিকে চ্যালেঞ্জ করা রিট আবেদন নম্বর ২৬৬৯/২০০০ এবং ৬৪৫১/২০০৭-এর প্রেক্ষিতে ২০১০ সালের ১২ ও ১৩ এপ্রিল ২ দিনব্যাপী এক ঐতিহাসিক রায় দেন আদালত। দীর্ঘ শুনানি শেষে বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ (বর্তমানে প্রধান বিচারপতি) ও বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীকে নিয়ে গঠিত হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি সম্পর্কে বলেন, ‘বহু-বৈচিত্র্যময় শান্তিচুক্তিটি সংবিধানের অধীন বর্ণিত চুক্তির অন্তর্ভুক্ত নয়। দীর্ঘদিন ধরে চলমান শান্তি প্রক্রিয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট এই আন্তঃরাষ্ট্রীয় শান্তিচুক্তিটি মূলতঃ সংবিধান সংশ্লিষ্ট নয় এবং সাংবিধানিক বিবেচনার বাইরে থেকেই এর প্রকৃতি ও বৈধতা নির্ধারণ করতে হবে। তাছাড়া শান্তিচুক্তি স্বাভাবিক কার্যকারিতা হারিয়েছে। কারণ, এই চুক্তিটি পরবর্তীকালে ৪টি (তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদ) আইনে পরিবর্তিত হয়েছে। এ কারণে শান্তিচুক্তির বৈধতার প্রশ্নে আদালতের কিছু বিবেচনার প্রয়োজন নেই। কারণ শান্তিচুক্তির শর্তগুলো উক্ত ৪টি আইনের মাধ্যমে কার্যকর হয়েছে। ফলে আদালত শান্তিচুক্তির পরিবর্তে চুক্তির শর্ত মোতাবেক প্রণীত আইনগুলো সম্পর্কে মতামত ব্যক্ত করে রায় প্রদান করছে।’

পার্বত্য চুক্তির গ’ খণ্ডের আলোকে প্রণীত আঞ্চলিক পরিষদ আইন সম্পর্কে আদালতের বক্তব্য হচ্ছে, ‘আঞ্চলিক পরিষদ আইনের ধারা ৪১-এর মাধ্যমে আইন প্রণেতাদের ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দেয়ার উদ্দেশ্যকেই প্রকাশ করে। রাষ্ট্রের একক স্বত্বাকে খর্ব করার উদ্দেশ্যেই আঞ্চলিক পরিষদ আইনের ধারা ৪০ এবং ৪১ ইচ্ছাকৃতভাবেই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়াও আঞ্চলিক পরিষদ আইন সংবিধানের ১ নম্বর অনুচ্ছেদে রক্ষিত রাষ্ট্রের একক চরিত্র হিসেবে সংবিধানের মৌলিক কাঠামোকে বিনষ্ট ও ধ্বংস করেছে। বাদী এবং বিবাদী পক্ষের যুক্তিতর্ক ও সংবিধানের অষ্টম সংশোধনী মামলার মতামত ও পর্যবেক্ষণ থেকে আদালত সিদ্ধান্তে আসে যে, আঞ্চলিক পরিষদ আইনটি রাষ্ট্রের একক চরিত্র ধ্বংস করেছে বিধায় এটি অসাংবিধানিক। এ ছাড়াও সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদ মোতাবেক এই আঞ্চলিক পরিষদ কোনো স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা নয়। এর কারণ হচ্ছে যে, পরিষদ আইনে আঞ্চলিক পরিষদকে প্রশাসনিক কোনো ইউনিট হিসাবে আখ্যা দেয়া হয়নি।’

পার্বত্য চুক্তির খ-খণ্ডের বিভিন্ন ধারা ও উপধারার আলোকে ১৯৯৮ সালে সংশোধিত পার্বত্য ৩টি জেলা পরিষদ আইনের ৪(৬) নম্বর ধারা অনুযায়ী হেডম্যান ও সার্কেল চিফ কর্তৃক স্থায়ী বাসিন্দার সনদ প্রদানের বিধানের মানদণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তোলেন আদালত; ১৭(৪) ধারা অনুযায়ী স্থানীয় সরকার পরিষদে ভোটার হতে হলে পার্বত্যাঞ্চলে ভূমির মালিক হওয়ার বিধান নিয়ে আপত্তি জানান আদালত। আদালত মনে করেন যে, ওই ধারা বাস্তবিকভাবে একজন অ-উপজাতীয় ব্যক্তিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে যেকোন নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকে বঞ্চিত করছে, যদিও বাংলাদেশ সংবিধানে সেই অধিকারগুলো রক্ষিত আছে। আইনের ৩২(২) ধারা অনুযায়ী জেলা পরিষদের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে উপজাতীয়দের অগ্রাধিকার প্রদান এবং ৬২(১) ধারা অনুযায়ী পুলিশ বাহিনীতে নিয়োগের ক্ষেত্রে উপজাতীয়দের অগ্রাধিকার দেয়া প্রসঙ্গেও আপত্তি তোলেন আদালত। এ প্রসঙ্গে আদালতের বক্তব্য, কোনো ব্যক্তি কীভাবে এবং কিসের ওপর ভিত্তি করে অন্য ব্যক্তির অধিকারকে লঙ্ঘন করে এবং তাকে বাদ দিয়ে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে নিয়োগের সুবিধা পাবে, এই আইনে সে বিষয়ে কিছুই উল্লেখ নেই। তাই আদালত মনে করেন যে, এই বিধানগুলো সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৭, ২৮(১), ২৯(১) এবং (২) এর পরিপন্থী। এই পরিপ্রেক্ষিতে বস্তুনিষ্ঠ মানদণ্ডের অনুপস্থিতিতে এবং বর্ণ বৈষম্যের ওপর ভিত্তি করে অগ্রাধিকার নীতি প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় তা অসাংবিধানিক।

হাইকোর্টের রায় পেশ করার দিনই আদালত প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে তৎকালীন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট মুরাদ রেজা গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন যে, ‘রায় ঘোষণার পর এর বিরুদ্ধে আপিল না করা পর্যন্ত আঞ্চলিক পরিষদের কোনো অস্তিত্ব নেই।’ উল্লেখিত রিট দুটির রিভিউ শুনানি আপিল বিভাগের বিবেচনাধীন থাকায় উপরের রায়কেই চূড়ান্ত ধরে নেয়া ঠিক হবে না, তবে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক চুক্তি এবং চুক্তির অন্তর্নিহিত বিষয়বস্তু সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পেতে হাইকোর্টের এসব মন্তব্য ও মূল্যায়ন অবশ্যই সহায়ক। কেনো দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থেকেও চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী আওয়ামী লীগের পক্ষে তা পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি সেটারও ইঙ্গিত এর মধ্যেই রয়েছে। একইসঙ্গে এই চুক্তির অবাস্তবায়িত ধারাসমূহের ভবিষ্যৎও এখানে স্পষ্ট।

চুক্তির শর্ত অপর পক্ষ কতটা মানছেন?
দুটি পক্ষের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত্র তৎপরতা বন্ধ করে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য। সে কারণে চুক্তিতে সরকারের জন্য পালনীয় বিভিন্ন ধারা-উপধারা যেমন আছে, তেমনি অপর পক্ষ পিসিজেএসএস এর জন্যও পালনীয় কিছু শর্ত আছে। তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন সকল অস্ত্র ও গোলাবারুদ জমাদান। কিন্তু তারা কি গত ২৮ বছরে সেটা করতে পেরেছেন? পাহাড়ের বাস্তবতা এবং একটি বেসরকারি টেলিভিশনকে দেয়া পিসিজেএসএস প্রধানের স্বীকারোক্তি তো তার প্রমাণ বহন করে না। পার্বত্য চুক্তির ক-খণ্ডের ধারা ১ অনুযায়ী স্বাক্ষরকারী উভয় পক্ষ ‘পার্বত্য চট্টগ্রামকে উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চল’ হিসেবে বিবেচনা করেছে। কিন্তু চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী পিসিজেএসএস প্রধান বর্তমানে ‘বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সভাপতি!’ এটা কি চুক্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বিষয় নয়? চুক্তির গ-খণ্ডের ধারা ৬ এবং আঞ্চলিক পরিষদ আইনের ধারা ১২ অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক পরিষদের মেয়াদ ৫ বছর। কিন্তু বর্তমান পরিষদ ক্ষমতায় আছে ১৯৯৯ সাল থেকে!

পার্বত্যাঞ্চলে বসবাসকারী বাঙালিদের অস্তিত্বের বিলুপ্তি
পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ১৯৪৭ সালে এই ভূ-খণ্ডকে পূর্বপাকিস্তানের অন্তর্ভুক্তির পেছনে বাঙালিদের অগ্রণী ভূমিকা আছে। ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠাকালে পার্বত্য চট্টগ্রামে যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন, জীবন দিয়েছেন তাদের সিংহভাগই বাঙালি। এমনকি এই অঞ্চলের বৃহত্তর জনগোষ্ঠিও বাঙালি। অথচ, চুক্তির ক-খণ্ডের ধারা ১ অনুযায়ী এ অঞ্চলকে বিবেচনা করা হয়েছে ‘উপজাতি অধ্যুষিত’ অঞ্চল হিসেবে। এর মাধ্যমে বাঙালিদের অস্তিত্বকে প্রথমে অস্বীকার করা হয়েছে। পরে চুক্তির খ-খণ্ডের ধারা ৩-এ বাঙালিদের চিহ্নিত করা হয়েছে ‘অ-উপজাতি’ হিসেবে, যা তাদের এই অঞ্চলে অস্তিত্বের বিলুপ্তির দিকে ধাবিত করছে।

করণীয়
চুক্তির বিভিন্ন ধারা-উপধারা বিশ্লেষণ করলে এমন আরো বহু অসঙ্গতি নিয়ে আলোচনা করা সম্ভব। তবে সংক্ষেপে এটা বলতে দ্বিধা নেই যে, এই চুক্তি আসলে ভারসাম্যপূর্ণ কোনো চুক্তি নয়, এর মাধ্যমে কোনো জাতি গোষ্ঠিকে অপরিমেয় ক্ষমতায়ন করা হয়েছে, অন্যদিকে বৃহত্তর জনগোষ্ঠি বাঙালিদের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা হয়েছে। পাশাপাশি, রাষ্ট্রের সংবিধানের সঙ্গেও এর কোনো কোনো ধারা সাংঘর্ষিক। যার কারণে ২৮ বছরেও যেমন চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি, তেমনি এর মাধ্যমে কাঙ্খিত শান্তিও আসেনি। বরং চুক্তিপূর্ব সময়ে যেখানে ১টি সশস্ত্র সংগঠন এই অঞ্চলে তৎপর ছিল, সেখানে এখন অন্তত ৬টি সংগঠন সক্রিয় আছে। পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রামের পূর্বদিক থেকে ‘গ্রেটার কুকি ল্যান্ড’ এবং অতিসম্প্রতি উত্তর দিক ‘গ্রেটার ত্রিপুরা ল্যান্ড’ নামে নতুন নতুন সংকটের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। সেই সঙ্গে সন্নিহিত আরাকানের অস্থিরতাও ভাবনার বিষয়। এই অঞ্চল নিয়ে ভূ-রাজনৈতিক পরাশক্তিগুলোরও আছে ভিন্ন ভিন্ন প্ল্যান। ভেতরে এবং বাইরের সকল অশুভ পরিকল্পনা ও অপতৎরতাকে প্রতিহত করতে প্রয়োজন এই অঞ্চলে বসবাসকারী সকল জনগোষ্ঠির মধ্যে ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ থাকা। কিন্তু পার্বত্য চুক্তির মতো ভারসাম্যহীন একটি চুক্তির মাধ্যমে সেটা কোনো দিনই সম্ভব নয়। বিষয়টি সকলকে উপলব্ধি করে, এখানে কেউ রাজা, কেউ প্রজা নয়, বরং সকলেই যেন বাংলাদেশের সম্মানিত ও সমমর্যাদার নাগরিক হিসেবে এক কাতারে থাকতে পারে, সেইসব বিষয় নিয়েই আমাদের আলাপ-আলোচনা করা প্রয়োজন।

(২২ নভেম্বর ২০২৫ শনিবার রাঙামাটি প্রেসক্লাব মিলনায়তনে ‘ডায়ালগ ফর পিস অব চিটাগং হিল ট্রাক্টস’ আয়োজিত ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি-৯৭ এর আদ্যোপান্ত’ শীর্ষক গোল টেবিল বৈঠকে পঠিত মূল প্রবন্ধ।)

লেখক : সাংবাদিক ও পার্বত্য গবেষক।

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: আলোচনা, পার্বত্য চট্টগ্রাম, প্রবন্ধ
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন