পার্বত্য চট্টগ্রাম রেগুলেশন ১৯০০ আসলে কার স্বার্থে প্রণীত?

fec-image

১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের পর বৃটিশরা দারুন এক শিক্ষা গ্রহণ করে। তা হলো ভারতীয়দের কার্যকর ভাবে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ডিভাইড এন্ড রুল পলিসি গ্রহণ করা। ভারতের উপনিবেশকে তারা দুটো বড় বর্গে বিভক্ত করে- ‘অগ্রসর’ ও ‘অনগ্রসর’ বা ‘সভ্য ও অসভ্য’।  তারা জাতিগত ও ধর্মীয় বিভেদকে উস্কে দেয়। হিন্দু ও মুসলিম পরিচয়কে সামনে আনে। আবার পার্বত্য এলাকার অধিবাসীদের মধ্যকার আন্তঃগোষ্ঠী ও আন্তঃজাতিগত কলহ কাজে লাগিয়ে নিজেদের শাসন পোক্ত করার জন্য।

১৮৬০-১৮৬৭ সাল পর্যন্ত  পার্বত্য চট্টগ্রামে বৃটিশরা ৩ জন সামরিক কর্মকর্তাকে সুপারিন্টেন্ডেন্ট করে পাঠায়। তারা হলেন ক্যাপ্টেন এস আর ম্যাগরাথ, ক্যাপ্টন জে এম গ্রাহাম ও ক্যাপ্টেন জি ম্যাকগিল। শেষোক্তজন পার্বত্য চট্টগ্রামের শাসন বিষয়ে বেশ গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করেন।

ভারতে ৩ ধরনের শাসনবিধি ছিল সমতলের প্রদেশ (রেগুলেশন) ও পাহাড়িদের জন্য নন রেগুলেশন জেলা ও দেশীয় রাজাদের দ্বারা পরিচালিত রাজ্যসমূহ। পার্বত্য চট্টগ্রাম কখনোই দেশীয় রাজ্য হিসেবে স্বীকৃত হয়নি। চট্টগ্রাম এলাকা ছিল একটা রাজনৈতিক সীমান্ত, যেটাকে ঘিরে অতীতে ত্রিপুরা, আরাকান, চাকমা, মুঘল শক্তিসমূহের চতুর্মুখী লড়াই ছিল।

ক্যাপ্টেন জি ম্যাকগিল (১৮৬৩-৬৪)  সুপারিশ করেন- রেগুলেশন জেলার শাসন ব্যবস্থার সঙ্গে পার্বত্য অঞ্চলের শাসন ব্যবস্থা একীকরণ মোটেই উচিত হবে না। পাহাড়ি লোকেদের স্বভাব চরিত্র হলো সহজ সরল তারা যত বেশি সমতলের লোকদের সাথে মিশবে তত দ্রুত তারা মানবীয় গুণাবলী হারিয়ে ফেলবে। অন্য বহিরাগতদের বিশেষ করে এ জেলায় প্রবেশের উপর কঠোর নজরদারি আরোপ করতে হবে।
এসব সুপারিশ নেহায়েত কোনো সুপারিশ নয় বরং ঔপনিবেশিক স্বার্থ সুরক্ষার সুস্পষ্ট প্রেসক্রিপন মাত্র এবং যা পাহাড়িদের রাজনৈতিক স্বার্থেরও পরিপন্থী ছিল। যা দেশভাগের সময় চাকমা নেতারা মর্মে মর্মে টের পান। পাহাড়িদের জীবন ও সমাজকে ‘সহজ’, ‘ সরল’ স্পষ্টবাদী আখ্যা দিয়ে আদর্শায়িত করে বৃটিশ শাসকগোষ্ঠী এই সমাজের রক্ষাকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হন।

তারা ১৮৭৪ সালে চালু করেন ‘তফসিলি  শাসন পদ্ধতির। যার মর্মার্থ হলো ‘বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখো ও শাসন করো’। তফসিলি জেলা ও ইনার রেগুলেশন (১৮৭৩) দিয়ে পাহাড়িদের কারাগারের মত এক অঞ্চলে গণ্ডিবদ্ধ করে জেলা শাসক দিয়ে সকল পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে শাসন করা হয়।

রেগুলেশন বহির্ভূত সব প্রদেশ, অঞ্চল বা জেলাতে আবার তাৎপর্যের উপর ভিত্তি করে ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলের বিশেষ প্রয়োজনের দিকে লক্ষ্য রেখে পরস্পর থেকে কিছুটা ভিন্নতরভাবে বিধি প্রণয়ন করা হয়। তার প্রকৃষ্ঠ উদাহরণ পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য জারি করা ‘হিল ট্র্যাক্টস রেগুলেশন ১৯০০’। এই রেগুলেশনের অধীনে ৫৪টি বিধি জারি করা হয়। যা এখনো ‘হিল ট্র্যাক্টস ম্যানুয়েল’ নামে ব্যাপক আলোচিত।

১৮৭৪ তফসিলি জেলা আইনের ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের লোকজন প্রথমবারের মত ‘তফসিলি ঘেরা বেড়ার মধ্যে পড়ে যায়। অন্য অর্থে উপনিবেশবাদ সৃষ্ট ‘নিষিদ্ধ কুয়োর’ গর্তে নিক্ষিপ্ত হলো সেখান থেকে উঠে দাঁড়ানো এবং দৌড়ানো দুটোই কঠিন হয়ে পড়ে। এই আইন বলে পার্বত্য চট্টগ্রামকে যে কোনো মূল্যে ‘বিশেষভাবে শাসনের ‘দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার বুনিয়াদ রচিত হয়।

বাংলার লে. গভর্নর নিজে ১৮৭৫ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম সফর করেন এবং তিনি দীর্ঘদিন বাঙালি মন্ত্রী উপদেষ্টা পরিবেষ্টিত হয়ে থাকা স্হানীয় চীফদেরকে ‘রায় বাহাদূর’ বা রাজা উপাধি দিয়ে তাদের আনুগত্য নিশ্চিত করেন। যেমন  রায় বাহাদূর রাজা হরিশ চন্দ্র।  এসব রাজা আসলে কানার নাম পদ্মলোচনের মতো।

বাংলা ছিলো উপনিবেশবাদ বিরোধী ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সূতিকাগার। বাঙালিদের জাতীয়তাবাদী চেতনা পাহাড়িদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা ছিল। তাই ভবিষ্যতে ভারতীয়দের মধ্যে যাতে কোনরূপ রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে উঠতে না পারে সেজন্য তারা নানা কৌশলে ভারতীয়দের মধ্যে বিভেদের প্রাচীর তৈরি করে। এজন্য ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম ম্যানুয়েল ছিল তাদের আইনাস্ত্র।

এভাবে ক্রমশ বিশেষ শাসনের চেতনা পার্বত্যবাসীদর মগজে  ঢুকিয়ে দেওয়া হয়, যা পরবর্তীকালে প্রজন্মান্তরে সঞ্চারিত হয়। অনেকটা রক্ত প্রবাহের মত। তথাপি ১৯০০ সালের মে মাসে জারি করা রেগুলেশনকে স্হানীয় পাহাড়িরা পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক ইতিহাসে বড় মাইলফলক হিসেবে দেখে।।

চাকমা রাজা ব্যারিষ্টার দেবাশীষ রায় এ রেগুলেশনকে নিঃসন্দেহে পার্বত্য চট্টগ্রামের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ আইনসমূহের অন্যতম একটি আইন গন্য করেন। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের  পিএইচডি স্কলার টিটন চাকমা তাঁর গবেষণায় পার্বত্য চট্টগ্রাম রেগুলেশনকে পাহাড়িদের জন্যই ‘ম্যাগনা কাটা’ হিসেবে তুলনা করেন।

তার বর্ননা এরকম যে, নতুন রেগুলেশন যাকে ‘আদিবাসী’ বলে আখ্যায়িত করা যায় সেটা পাহাড়িদের জন্য স্বায়ত্তশাসনের স্বীকৃতি দিয়েছে এবং বহিরাগত ও পাহাড়ি ‘আদিবাসী’ নয় এমন লোকদেরকে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রবেশ ও স্হায়ী বসতি স্হাপনে  নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। ওই ম্যানুয়েলের ৫১ বিধিতে অবাঞ্চিত অস্হানীয় অ-আদিবাসী (যিনি উপজাতি নন) ব্যক্তিকে জেলা থেকে বহিস্কার করার বিধান রয়েছে।

৫২(এ) বিধিতে বলা হয়েছে, “এখানে যাহাই কিছুই উল্লেখ থাকুক না কেনো, চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা,ম্রো,পাংখু বম, তঞ্চঙ্গাঁ অথবা পার্বত্য চট্টগ্রাম, লুসাই পাহাড়, পার্বত্য আরাকান, বা ত্রিপুরা রাজ্যের যে কোনো পাহাড়ি ট্রাইব আদিবাসী (হিল ট্রাইব ইন্ডিজেনাস) ব্যতীত কোনো ব্যক্তি পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসের জন্য প্রবেশ করিতে পারিবেন না, যতক্ষণ না তিনি ডেপুটি কমিশনার কর্তৃক তার সৎ চরিত্রের প্রমাণ স্বরূপ সনদ প্রাপ্ত না হন।”

বস্তুত, ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম রেগুলেশনে জেলা প্রশাসককে জেলার ক্ষুদ্র স্বৈরশাসকে পরিণত করে। কারণ তার ক্ষমতা রেগুলেশন জেলার জেলা প্রশাসকদের চেয়ে অনেক বেশি ছিল। এই রেগুলেশনের বিশেষত্ব হলো এটি কার্যকর হওয়ার পর পূর্বে  পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন বিষয়ে প্রণীত সকল আইন (১৮৬০ সালের ২২ নং আইন, ১৮৭৪ সালের তফসিলি আইন, ১৮৯২ এর পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন বিধি)  বাতিল ঘোষিত হয়। ১৯০০ সালের পর ‘হিল ট্র্যাক্টস ম্যানুয়েল’  সাংবিধানিক আইনের আঙ্গিকে কাজ করে, যা এই অঞ্চলের অন্যান্য আইনের  প্রয়োগের অধিক্ষেএ ও ব্যাপ্তি নির্ধারণ করে।

১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম রেগুলেশনের পর পরবর্তী ৪৭ বছর ব্রিটিশ সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে কোনো রেগুলেশন প্রণয়ন করেনি এবং আজ অব্দি বহাল আছে। ১২৫ বছরের আইনটি অনেক চ্যালেন্জের মুখোমুখি হয়েছে।

২০০৫ সালে বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ এটিকে ‘মৃত আইন’ বলে ঘোষণা করে। পরবর্তীতে ২০১৪ সালে বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের আপিল বিভাগ এর ব্যাপারে ইতিবাচক রায় দেয়।

আদালতের রায় পর্যালোচনা করে দেখা যায়, আদালতের এমন সিদ্ধান্তের মূলে কাজ করেছে রেগুলেশনের মধ্যে বিদ্যমান কাস্টমারি বা প্রথাগত আইনের স্বীকৃতি। এ রেগুলেশন পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন প্রথাগত সার্কেল চীফ বা রাজা ( চাকমা রাজা, মং রাজা, বোমাং রাজা) এবং ৩৮টি মৌজার হেডম্যানের কর্তৃত্ব স্বীকার করেছে, যাঁরা ভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্হাপনা এবং ভূমি রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব ছাড়াও  বিচার নিষ্পন্ন করার জন্য লিখিত আইন/সংবিধি ও প্রথাগত আইন প্রয়োগ করে। বস্তুত ভূমি ব্যবস্হাপনা ও সামাজিক/দেওয়ানী আদালত পরিচালনার ব্যাপারে প্রথাগত নেতৃত্বের ঐতিহাসিক ভূমিকার মধ্যেই রেগুলেশনটির বিশেষত্ব নিহিত।

অর্থাৎ পাহাড়িদের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষার্থে, তাদের আচার-প্রথা, রীতি-নীতি এবং তাদের জাতিগত বৈচিত্র্য ও সংস্কৃতি সুরক্ষার উদ্দেশ্যে ব্রিটিশ সরকার এ বিধি প্রনয়ন করেছে। কিন্তু এ বিধি যে আগাগোড়া সাম্রাজ্যের স্বার্থে প্রণীত সে প্রসঙ্গটি অনালোচিত। উপনিবেশবাদ বিরোধী অর্থাৎ স্বরাজ, স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতাকামী  রাজনীতি সচেতন জাতীয়তাবাদী বাঙালিদের পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রবেশকে চিরতরে নিষিদ্ধ করতেই সরকার সুচিন্তিতভাবে এ বিধি প্রণয়ন করেন।

পার্বত্য চট্টগ্রামের বিপুল বনজ সম্পদের উপর যেন বহিরাগত বাঙালিরা নজর না দেয় তার জন্যও বৃটিশরা সচেতন ছিলেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের বনভূমি থেকে আহরিত কাঠ আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে লাইনের জন্য অপরিহার্য ছিল।  ৫২নং বিধি বলে চাকমা-মারমা-এিপুরা- লুসাই প্রভৃতি জাতিসওার বংশোদ্ভূত লোক ছাড়া অন্য জেলার লোকদের পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রবেশ বা বসতি স্হাপনে বাধা দেয়।

আবার ৩৪ বিধি বলে বহিরাগতদের এ জেলায় জমিজমা ক্রয়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলেও সরকার কখনো জমিতে পাহাড়িদের স্বত্ব বা মালিকানা স্বীকার করেনি। রাজকুমারী চন্দ্রা কালিন্দি রায় (একজন গবেষক) ব্রিটিশদের এই অস্বীকৃতির নীতিকে ঊনিশ শতকে ইউরোপীয়দের ‘আদিবাসী’ জমি দখলের ক্ষেত্রে প্রয়োগকৃত ‘ডক্ট্রিন অব টেরা নুলিয়াস’  (Terra Nullius) এর প্রতিফলন হিসেবে বর্ণনা করেছেনে। এ মতবাদের মর্মার্থ হলো উপনিবেশবাদীরা আসার আগে ওই জমির কারো স্বত্ব ছিল না।

১৯০০ সালের রেগুলেশন দিয়ে বাঙালীদেরকে জমি কেনায় নিষেধাজ্ঞা জারি করলে পাহাড়িদের জমির মালিকানা প্রাপ্তি নিশ্চিত হয় না এ চরম সত্য বরাবর উপেক্ষিত থেকে গেছে। রানী কালিন্দী থেকে প্রত্যেক রাজা জমির ওপর স্হায়ী স্বত্বের দাবি করলে সরকার পৌনঃপুনিক
ভাবে সেই দাবি অস্বীকার করেছে এবং ঘোষণা করেছে জমির মালিক ব্রিটিশরাজ; রাজারা খাজনা সংগ্রাহক মাত্র।

ব্রিটিশ অধিকর্তারা বারংবার ঘোষণা করেছে, “এই পর্বতে বসবাসরত অর্ধ-সভ্য উপজাতিদের বোঝানো হয়েছে যে জমিতে বাস করছে তা হল রানীর অধীন, অর্থাৎ ভারতবর্ষের একটি অংশ। পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের সমস্ত জমিই সম্রাটের মালিকানাধীন, উপজাতীয় রাজাদের কোনো মালিকানা স্বত্ব নেই। সরকারের তরফ থেকে কর আদায়ের ও খাজনা আদায়ের যে অধিকার তাদের দেওয়া হয়েছে, সেটুকুই কেবলমাত্র তাদের ক্ষমতা।”( গভর্নমেন্ট অব বেঙ্গল,পলিটিকাল ডিপার্টমেন্ট, প্রসিডিং ১-২, জুন ১৯১৮)

পাহাড়িরা মনে করে পার্বত্য বিধি তাদের স্বায়ত্তশাসন দিয়েছে।  স্বায়ত্তশাসনের অন্যতম দুটি গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত যথা- রাজনৈতিক মত প্রকাশের অধিকার ও ভূমি অধিকার যেখানে স্বীকৃত নয় সেখানে সাংস্কৃতিক বিকাশের সুরক্ষাকবচ বিষয়টি অন্তঃসার শূন্য শ্লোগানে পরিণত হয়।

সুতরাং ১৯০০ সালের শাসন বিধি গভীর ভাবে তলিয়ে দেখলে বুঝা যায় পার্বত্য চট্টগ্রামে বহিরাগতদের চলাচল বসতি স্হাপন ও জমি ক্রয়ে কিছু নিষেধাজ্ঞা ছাড়া এতে রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক বিকাশের কোনো পথ ছিল না। পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনে জনগণের প্রতিনিধিত্বের কোনো ব্যবস্হাই এতে ছিল না। বরং এ বিধি বলে ব্রিটিশের ছত্রছায়ায় একটি রাজনীতি বিমূখ সুবিধাবাদী সামন্ত শ্রেণি গড়ে ওঠার রাষ্ট্রীয় আয়োজন সুসম্পন্ন হয়।

চন্দ্রিকাবসু মজুমদারের মূল্যায়ন এক্ষেত্রে স্মরণ করা যেতে পারে- “শান্তি সুরক্ষার নামে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের লোকদের রাজনৈতিক চৈতন্যদয়কে পদদলিত করার অভিপ্রায়ে ব্রিটিশ সরকার এখানকার সমাজের সুবিধাভোগীদের নিয়ে একটি গতানুগতিক পরম্পরাগত অভিজাত গোষ্ঠী তৈরি করেছিল। ফলে এখানে জন অংশগ্রহণ নিশ্চিতকারক গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহের উদ্ভব ও বিকাশের কোনো পরিসর বা সুযোগ ছিল না।” (Genesis of Chakma Movement In CHT,Kolkata : Progressive Publishers, 2003,p.5)

তিন চীফ (স্হানীয় ভাবে দক্ষিণ এশীয় প্রতিক ‘রাজা’ পরিচয়দানকারী) চাকমা চীফ, বোমাং চীফ, মং চীফের রাজকীয় আবরন, অভিষেক ও পূন্যাহপোলক্ষপ আয়োজিত আড়ম্বরপূর্ণ দরবার অনুষ্ঠান, সামাজিক বিচারিক ক্ষমতা, সুরম্য রাজপ্রাসাদ ও রাজপরিবারবর্গের শিক্ষা ও সংস্কৃতিচর্চা দেখে মনে হবে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রবল প্রতাপশালী রাজতন্ত্র বিরাজমান। আসলে তা ‘ঠুটোঁ জগন্নাথ’। ব্রিটিশ আইনের চোখে তাঁরা ছিলেন শুধুই খাজনা সংগ্রাহক।

১৯৩৫ সালে ভারতে প্রাদেশিক আইন পাশের সময় তিন চিফ সম্মিলিতভাবে সেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্হার বাইরে থাকার জন্য জোরালো আবেদন করে। ফলে বঙ্গীয় আইন সভায় হিন্দু মুসলমানদের প্রতিনিধিত্ব থাকলেও পাহাড়িরা এর বাইরে থেকে যায়। তাদের কোনো প্রতিনিধি না থাকায় তারা উভয় সম্প্রদায়ের কাছে মূল্যহীন হয়ে পড়ে।

দেশভাগের ঢংকা বেজে উঠলে তিন চীফসহ পাহাড়ি গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্হায় যেতে ইচ্ছুক প্রগতিশীল অংশ নিজেদের আশু ভবিষ্যতের কথা ভেবে বিচলিত হয়ে পড়েন। তিন চীফ ও কামিনী মোহন দেওয়ান, স্নেহ কুমার চাকমার তিন রকম ভিন্ন প্রস্তাবে বাউন্ডারি কমিশন রাঙামাটি সফরে এসে কোনো সিদ্ধান্ত না দিয়ে চলে যান। ১৪-১৫ তারিখে পাকিস্তান ও ভারত স্ব স্ব স্বাধীনতার সনদ পেলেও পাহাড়িরা অনিশ্চয়তার দোলায় দুলতে থাকে। ১৭ আগস্ট পার্বত্য চট্টগ্রামের ভাগ্য পাকিস্তানের সাথে নিবন্ধিত হওয়ায় তারা হতাশায় নিমজ্জিত হন।

১৯০০ সালের বিধি বলে ডেপুটি কমিশনারের প্রশাসনে পাহাড়িদের কোনো বক্তব্য প্রদানের জায়গা ছিল না। সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো তাদের জন্য, তবে তাদের সঙ্গে আলোচনা না করেই তা নেয়া হতো। যেমন ১৯১৫ সালে ডেপুটি কমিশনার সিজি স্টিবেনের সুপারিশ অনুসারে সার্কেল চীফদের ভূমি রাজস্ব আদায়ের কমিশন প্রাপ্তির সুবিধা বাতিল করা হয়। এছাড়া ১৯৩৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন বিধি সংশোধন করে ইতিপূর্বে প্রদও সকল দায়িত্ব থেকে চীফদের অব্যাহতি দিয়ে কার্যত ঠুটোঁ জগন্নাথে পরিণত করা হয়।

এছাড়া পাকিস্তান আমলে যখন চাকমা রাজাদের গৌরবের প্রতীক রাজপ্রাসাদ কাপ্তাই বাঁধের অথৈ জলে নিমজ্জিত হয় তাতে ভেসে উঠে চীফদের অসহায়ত্বের নির্মম বাস্তব ও মর্মস্পর্শী চিত্র। বাংলাদেশ বিষয়ক প্রখ্যাত গবেষক ভেলাম ভ্যান সেন্দেল তাই আক্ষেপের সুরে লিখেন, “দুঃখের বিষয় এই যে ১৯০০ সালের বিধি বলে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনও প্রতিষ্ঠিত হয় না পাহাড়ি কৌম সমাজের অধিকারও অস্বীকৃত হয়েই থাকে। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ পার্বত্য চট্টগ্রামবাসীদের ভূমি সংক্রান্ত অধিকার রক্ষায় যত না উৎসাহী ছিল তার চেয়ে বেশি আগ্রহী ছিল ঔপনিবেশিক অর্থ ভাণ্ডারে ভালো অংকের রাজস্ব লাভ করতে। তাদের উৎসাহ ছিল আঞ্চলিক গোষ্ঠীপতিদের মাধ্যমে চাষীদের কাছ থেকে কর সংগ্রহ করা”।

তারপরও কেনো পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন বিধি ১৯০০ নিয়ে পাহাড়িদের এই মাতম? যাকে মৃত আইন বলে ঘোষণা করে হাইকোর্ট! পাহাড়িদের মাথায় একবার যা ঢুকে তা তাদের ডিএনএ-তে প্রবেশ করে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম পর্যন্ত বয়ে চলে, লেখক তা আগেই উল্লেখ করেন।

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বরের চুক্তির অন্যতম শর্ত ছিল এই “ম্যাগনা কাটা”কে সংরক্ষণ করা। বর্তমানে চাকমা রানী  ইয়ান ইয়ান সেই সামন্তবাদী স্বপ্নের ভেলায় চড়ে  ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতি চান। কারণ ‘আদিবাসী’ তকমা পাওয়া গেলে পুরো পার্বত্য চট্টগ্রামের জলস্হল আকাশ সীমার মধ্যে বিদ্যমান যাবতীয় সম্পদের একচ্ছত্র অধিপতি হবেন চাকমাসহ ‘রাজারা’। তারা সমগ্র ভূসম্পত্তির উপর উপজাতিদের সামষ্টিক বা প্রথাগত অধিকার ফিরে পেতে চান। এখানে রাষ্ট্রের কোনো এখতিয়ার থাকবে না। থাকবে একটি নৃগোষ্ঠীর অধিকার। অথচ আজ থেকে দেড়শ’ বছর আগেই ক্যাপ্টেন টমাস লুয়েন রানী কালিন্দীকে চিঠির মাধ্যমে বৃটিশ সরকারের অভিপ্রায় জানিয়ে দেন, রানী শুধু খাজনা সংগ্রাহক।

আর পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল ভূমি কোনো কালেই চীফদের অধিকারে ছিল না। পার্বত্য চট্টগ্রামের ২৯ লাখ ২০ হাজার ৮৯০ একর বনভূমিতে সরকারের অধিকার। তারপরও আছে আবাদি, খাস ও পতিত জমি। পাহাড়ি নেতারা সব জমিই তাদের গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত মনে করেন। তাই পার্বত্য চট্টগ্রাম বিধি ১৯০০ অনুসারে সকল ‘বহিরাগত বাঙালি’দের বহিস্কার চান। এই বিধিটিকে ‘আদিবাসী’ তকমা অর্জনে ব্যবহার করতে চান।

মজার বিষয় হলো- ১৯৭১ সালে যখন ৮ম ইস্ট বেঙ্গলের সৈনিকরা মহালছড়িতে অবস্থান নেন তখনই তারা পদদলিত করেন বৃটিশ প্রবর্তিত এই চরম বিতর্কিত আইন। বুড়িঘাটে শায়িত বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ বুকের রক্তে বাঙালিদের এই সনদ দিয়ে যান তারা কোনো চোর-বদমাশ ডাকাত নয়, যে তাদেরকে ডেপুটি কমিশনারের কাছ থেকে ‘সচ্চরিত্রের’ সনদ নিতে হবে।

স্বাধীন বাংলাদেশে বৈষম্যের কোনো স্হান নেই। বৃটিশরা নানাবিধ বৈষম্যমূলক আইন করেছে হিন্দু মুসলমান পাহাড়ি, হিলম্যান, উপজাতি, আদিবাসী নামে পরিচিত সকল ভারতীয়কে শাসন ও শোষণ করার জন্য। বৃটিশরা তাদের দীর্ঘ শাসনামলে পাহাড়িদের কোনো রাজনৈতিক গণতান্ত্রিক শাসন দেয়নি। আর পাহাড়ি নৃপতিরাও চাননি তাদের অধঃস্হনরা রাজনৈতিক অধিকার সম্বৃদ্ধ সচেতন নাগরিক হয়ে উঠুক।

পাকিস্তান আমলেই ১৯৫৪ সালে পাহাড়িরা প্রথম ভোটাধিকার পায়। বাংলাদেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসে পাহাড়িরা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নীতিমহল থেকে সর্বনিম্ন ইউনিয়ন পরিষদ ও আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের ক্ষমতা ভোগ করছে। যার এক শতাংশ পরিমাণ সুযোগ ১৯০০ বিধিতে নেই। যেই বিধি পাহাড়িদের নূন্যতম সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ বা অসমর্থ তাকে চাকমা রাজপ্রাসাদের মতো কাপ্তাইয়ের জলে নিমজ্জিত করা উচিত।

লেখক : পার্বত্য গবেষক ও সামরিক বিশ্লেষক, ১৫ নভেম্বর ২০২৫।

বি. দ্র. লেখক এই লেখায় উল্লেখিত তথ্য-উপাত্তের ক্ষেত্রে ড. আনন্দ বিকাশ চাকমা’র ‘কার্পাস মহল থেকে শান্তি চুক্তি- পার্বত্য চট্টগ্রামে রাষ্ট্রীয় নীতির ইতিহাস’ গ্রন্থের প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেছেন।

 

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: পার্বত্য, প্রবন্ধ, মেজর নাসিম হোসেন (অব.)
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন