পার্বত্য চুক্তির ২১ বছর: হত্যা, সংঘাত, চাঁদাবাজি চলছেই

নিজস্ব প্রতিনিধি, রাঙামাটি:

পার্বত্যচুক্তি বলি আর শান্তি চুক্তি বলি; তৎকালীন  তথা বর্তমান আ’লীগ সরকারের সাথে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (পিসিজেএসএস) এ চুক্তির ২১ বছর পার হলো। কিন্তু যে কারণে বা যে শর্তের ভিত্তিতে  সরকারের সাথে এ চুক্তি করা হয়েছে তার সুফল এখনো পাহাড়ের বাসিন্দারা পাইনি।

একটা সময় পাহাড়ে পিসিজেএসএস’র তাণ্ডব চললেও যুগের পরিপ্রেক্ষিতে এখন পাহাড়ে চারটি সশস্ত্র গ্রুপ তৈরি হয়েছে। এসব আঞ্চলিক সশস্ত্র গ্রুপগুলোর মূললক্ষ্য উদ্দেশ্য হলো- চাঁদাবাজি, হত্যা ঘুম চালিয়ে পাহাড়ে অরাজকতা সৃষ্টি করা। প্রশাসন যেমন একদিকে অসহায় তেমনি এ অঞ্চলের মানুষ তাদের ভয়ে তটস্থ থাকে। কখন মৃত্যুর আলিঙ্গন করতে হয়। তাই তাদের ভয়ে জীবন বাঁচাতে প্রতিনিয়ত নিয়ম মাফিক বাৎসরিক চাঁদা দিতে হয়। প্রশাসনও নিশ্চুপ। তাহলে কে পাহাড়ের অসহায় মানুষকে এসব সশস্ত্র বাহিনীর করাল গ্রাস থেকে মুক্তি দিবে।

এমন কোন নেতার আবির্ভাব ঘটবে না পাহাড়ে সন্ত্রাসীদের হাত থেকে মুক্তি দিবে! স্বাধীনতার পর থেকে অশান্ত পাহাড়ে যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ শুরু হয়েছে তা কোন সরকার প্রধান বন্ধ করতে পারনি। যদিও আ’লীগ সরকার একটি চুক্তির মাধ্যমে এসব সংঘর্ষ বন্ধ করার চেষ্টা করলেও চুক্তির সুফলতা কতটুকু পাহাড়ের মানুষ ভোগ করছে তা সময় বিচার করবে।

এদিকে স্বাধীন বাংলাদেশের ভূখন্ড হলো-পার্বত্য চট্টগ্রাম। তাই সারা দেশের স্বার্বভৌমত্ব রক্ষার দায়িত্ব সেনাবাহিনীর। এরই ধারাবাহিকতায় পাহাড়ে সেনাবাহিনী একদিকে যেমন দেশের স্বার্বভৈৗমত্ব রক্ষা করছে ঠিক অন্যদিকে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর  শিক্ষা, স্বাস্থ্যের উন্নয়নে প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছে।

কিন্তু রাষ্ট্রের এমন বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রকাশ্য পাহাড়ের বিশেষ মহল প্রতিনিয়ত অপবাদ, ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে এ অঞ্চল থেকে সেনাবাহিনীকে উৎখাত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। সেনাবাহিনীকে পাহাড় থেকে উৎখাত করতে কখনো দুর্বল নারীদের উপর এ মহলটির সন্ত্রাসীরা ধর্ষণ করে সেনাবাহিনীর উপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কখনো আবার ঘর-বাড়িতে অগ্নিসংযোগ চালিয়ে সেনাবাহিনীর উপর কলঙ্ক দেওয়া হচ্ছে।

এ মহলটি শুধু এসব অপকর্ম করে ক্ষান্ত হয়নি। বর্তমানে ধর্মীয় উপসনালয় ভাংচুর করে দেশের গর্বিত সেনাবাহিনীর উপর দোষ চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। অথচ ইতিহাস বলে ভিন্ন কথা- ১৯৭৪ সাল থেকে সেনাবাহিনী পাহাড়ে অবস্থান করে অন্ধকার পাহাড়ে আলো জ্বালিয়ে যাচ্ছে।

এবার ব্যবসা-বাণিজ্যের দিকে দেখা যায়- এক সময় এ এলাকায় ব্যবসা করার জন্য তৎকালীন একটি গ্রুপকে চাঁদা দেওয়া হলেও বর্তমানে চারটি গ্রুপকে চাঁদা দিতে হচ্ছে।  ঠিকাদার, ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান, মাছ, গাছ ব্যবসা সকল স্থলে চাঁদা আর চাঁদা। না হলে বন্দুকের বুলেটে মৃত্যু অনিবার্য। যে কারণে ব্যবসার স্বর্গরাজ্য পাহাড় হওয়ার সত্ত্বেও ব্যবসা আর জমছে না। হতাশ ব্যবসায়ীরা। তাদের অভিমত- সরকারকে কর দিয়ে স্বাধীন দেশে ব্যবসা করছি। এখন সরকারের পাশাপশি চারটি গ্রুপকে চাঁদা দিয়ে ব্যবসা করতে হয় তাহলে আমাদের লাভ হলো কি?  চোখে-মুখে তাদের চরম ক্ষোভ।

তাই চুক্তির পূর্তি নিয়ে পাহাড়ের বাসিন্দারা আর ভাবে না। তাদের দাবি এসব অরাজকতা থেকে মুক্তি চাই।এদিকে ২ ডিসেম্বর ১৯৯৭ সালে বর্তমান আ’লীগ সরকার এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে এখানকার দীর্ঘদিনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের অবসান ঘটানো হয়। কিন্তু চুক্তির ২১ বছর পার হলেও এখনো পাহাড়ে রক্তপাত বন্ধ হয়নি। ভ্রাতৃত্বঘাতি সংঘাত, চুক্তির পক্ষ-বিপক্ষ বিভক্ত হয়ে পাহাড়ে  সন্ত্রাস চাঁদাবাজি জনজীবনকে বিপন্ন করে তুলেছে।

জনসংহতি সমিতি ভেঙ্গে জেএসএস সংস্কার, ইউপিডিএফ ভেঙ্গে ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) আঞ্চলিক সংগঠনের সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়াও পূর্বের পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতিইউপিডিএফ তো আছে। এসব সংগঠনের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে ঘিরে খুনাখুনি চলছে প্রতিনিয়ত। ফলে পার্বত্যবাসী নানা সংশয় ও সংকটে থাকে।

পার্বত্য শান্তি চুক্তির বাস্তবায়নের আলোকে বর্তমান  সরকার  পাহাড়ে ব্যাপক উন্নয়ন পরিবর্তন ঘটালেও তা পাহাড়ে যেন অম্লান রয়েছে ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত আর চলমান সহিংসতায়। পাহাড়ে স্বাস্থ্য, শিক্ষা চিকিৎসা, বিদ্যুৎ, কৃষি, যোগাযোগসহ  নানা  উন্নয়নে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। চুক্তির পর পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়  সৃষ্টির মধ্য  দিয়ে  পার্বত্য  চট্টগ্রাম  আঞ্চলিক  পরিষদ গঠন, খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি-বান্দরবান তিন পার্বত্য জেলায় জেলা পরিষদ প্রতিষ্ঠা করা হয়। পার্বত্য জেলা পরিষদগুলোকে শক্তিশালী করার জন্য খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদে ৩০টি বিভাগ, রাঙামাটি জেলা পরিষদে ৩০টি  বিভাগ, বান্দরবানে ২৮টি  বিভাগ হস্তান্তর করা হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের অধীন এখানে চার হাজার পাড়া কেন্দ্রের মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষা ও প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবার উন্নয়ন করা হচ্ছে।

রাঙামাটি সরকারি মেডিকেল কলেজ ও রাঙামাটি প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, বিদ্যুতের সঞ্চালণ লাইন সম্প্রসারণ ও সাব স্টেশন স্থাপন, রাজধানী ঢাকার বেইলী রোডে পার্বত্য চট্টগ্রাম কমপ্লেক্স নির্মাণ, ভারত প্রত্যাগত উপজাতি শরনার্থী প্রত্যাবাসন ও অভ্যন্ত্যরীণ উদ্বাস্ত নির্দিষ্টকরণ সংক্রান্ত টাস্কফোর্স গঠন, পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন গঠনসহ নানাবিধ উন্নয়ন ঘটানো হয়েছে।

সরকারের এমন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা সত্ত্বে চুক্তি স্বাক্ষরকারীরা বলে পূর্ণাঙ্গ চুক্তি বাস্তবায়ন হয়নি। আর চুক্তি বিরোধীরাতো চুক্তিই মানে না। চুক্তির ২১ বছর ধরে পাহাড়ে জনজীবন এভাবে চলছে। তবুও মানুষ আশা ছাড়ে না। একদিন পাহাড়ে শান্তি আসবে।

এদিকে সরকার দল আ’লীগ থেকে বারবার বলা হয় পাহাড়ের অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করতে হবে। তারাও অসহায় এসব অস্ত্রবাজদের হাতে। তাদের অনেক নেতা-কর্মী হতাহত এবং নির্যাতনের শিকার হয়েছে অস্ত্রবাজদের অত্যাচারে।

এদিকে মহিলা সংরক্ষিত আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য ফিরোজা বেগম চিনু বলেন- অস্ত্রবাজদের ভয়ে পাহাড়ের সাধারণ মানুষ অসহায়। মৃত্যুর ভয়ে কেউ মুখ খুলতে চাই না। তাদের প্রতিহত করতে না পারলে পাহাড়ে শান্তি আসবে না।

সাবেক পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদার বলেছেন- আমার একার দাবি না, আমার দলের দাবি না, পাহাড়ের বসবাসরত সকল বাসিন্দাদের দাবি- পাহাড় থেকে অবৈধ অস্ত্রবাজ সন্ত্রাসীদের উৎখাত করা হোক। এসব অস্ত্রবাজদের উৎখাত করতে না পারলে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ কখনো বন্ধ হবে না, চাঁদাবাজি বন্ধ হবে না।

তবে যাই হোক- পাহাড়ের বাসিনন্দারা আর রক্তের হলিখেলা দেখতে চাই না। আর কোন মায়ের বুক খালি দেখতে চাই না। স্ত্রী স্বামীকে মা তার সন্তানকে, ছেলে-মেয়েরা তার বাবাকে হারাতে চাই না। ব্যবসায়ীরা চাঁদামুক্ত হয়ে শান্তিতে ব্যবসা করতে চাই, রাজনীতিবিদরা জীবনের নিরাপত্তা চাই। দেশের স্বার্বভৌমত্ব রক্ষা হোক এটাই দাবি পাহাড়ের বাসিন্দাদের।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

three × 1 =

আরও পড়ুন