পার্বত্য চুক্তির ২৪ বছর এবং আমাদের প্রত্যাশা

fec-image

২ ডিসেম্বর ২০২১ পার্বত্য চুক্তি অর্থাৎ শান্তি চুক্তির ২৪ বছর পূর্তি। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে এক চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে সশস্ত্র সংগ্রামের অবসান ঘটে। কিন্তু চুক্তির পর দীর্ঘ ২৪ বছরের সশস্ত্র সংগ্রামের সত্যিকারের অবসান ঘটেছে কিনা? সত্যিকার শান্তি ফিরে এসেছে কিনা এটাই এখন জিজ্ঞাসা?

কিছু অস্ত্র নিয়ে কিছু সংখ্যক নেতাকর্মী সরকারের নিকট আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছে। সরকার তাদের পুনর্বাসনও করেছে। যদিও বা অনেকের মতে সত্যিকারের পুনর্বাসন হয়নি। আবার অনেকেরই হয়েছে।

সরকার এবং জনসংহতি সমিতিরি মধ্যে ঠান্ডা লড়াই চলছে। সরকার বলছে, চুক্তির অধিকাংশ শর্তই পূরণ করেছে। জনসংহতি সমিতি বলছে, অনেক শর্তই পূরণ করেনি। পার্বত্য শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে বিভিন্ন সময় সরকার অসত্য বক্তব্যও প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করা হচ্ছে সংগঠনির পক্ষ থেকে। এখন কার কথা সত্যি। সরকারের না জনসংহতি সমিতির, সেটাও চিন্তা করার বিষয়।

সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী অস্ত্র সমর্পণের জন্য নির্দিষ্ট অংকের টাকা, চাকরি ফেরত এবং চাকরির মাধ্যমে পুনর্বাসন করেছে। দীর্ঘদিন যাবত বিনামূল্যে রেশন সরবরাহ করেছে।

ভারতে আশ্রয় গ্রহণকারী শরণার্থীদের ফেরত এনে তাদের ফেলে যাওয়া এমনকি বিক্রি করা জমিও ফেরত দেয়া হয়েছে। তাদের চাকরিতে পুনর্বহাল করেছে। খাগড়াছড়িতে শরণার্থী বিষয়ক টস্কফোর্সের অফিস স্থাপন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

চুক্তি অনুযায়ী সরকার অনেক সেনা ও এপিবিএন ক্যাম্প প্রত্যাহার করেছে, এর ফলে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটেছে। গ্রামের জনগণ নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারে না। মুখ ফুটে কিছুই বলতেও পারে না। অসহায়ের মতো রয়েছে তারা। সরকারের সাথে চুক্তি করেছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি শ্রী জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা। দীর্ঘদিন ধরে আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান হলেও তিনি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি নন। সরকার স্থানীয় সরকার পরিষদের পরিবর্তে পার্বত্য জেলা পরিষদ স্থাপন করে বার বার পরিচালনা পরিষদ পরিবর্তন করে আসছে। নির্বাচনের কথা থাকলেও নির্বাচন দেয়া হচ্ছে না। পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ প্রথম যেভাবে গঠন করেছে সেভাবেই রেখে দেওয়া হয়েছে। ২৩ বছরেও কোনো পরিবর্তন হয়নি।

চুক্তির ফলে আশা করা হয়েছিল, সশস্ত্র সংগ্রামের অবসান ঘটবে। তা ঘটেনি, বরং চুক্তির পর চারটি সশস্ত্র সংগঠনের জন্ম হয়েছে। এসব দলের মধ্যে আন্তঃদলীয় সংঘাতে অনেক প্রাণহাণি ঘটেছে। খুন, অপহরণ, চাঁদাবাজি, নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বে আইনী অস্ত্রের ব্যবহারে জনগণ অতিষ্ঠ। জনগণ আশা করেছিল, শান্তি চুক্তির ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তির সুবাতাস বইবে। জনগণ নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারবে। স্বাভাবিক জীবন যাপন করবে, কিন্তু তাদের সে আশা হতাশায় পরিণত হয়েছে।

চুক্তির কিছু কিছু ধারায় সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক এবং বাঙালি অধিবাসীদের অধিকারকে ক্ষুণ্ণ করা হয়েছে বলে বাঙালিদের দাবি। উক্ত ধারাগুলি সংশোধনের দাবি জানিয়ে আসছে বাঙালিদের অধিকার আদায়ে আন্দোলরত সংগঠনগুলো এবং এটা ছাড়া তারা চুক্তি বাস্তবায়ন প্রতিহতের ঘোষণা দিয়েছে। এ নিয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশংকা করছে অনেকেই।

যেভাবে বিভিন্ন সরকার আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সশস্ত্র সংগ্রাম থেকে ফিরিয়ে এনেছে তদ্রুপ আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা দরকার। শিক্ষাদীক্ষা, চাকরি-বাকরির ক্ষেত্রে যে বৈষম্যের সৃষ্টি হয়েছে তার সমাধান জরুরি। মাদক চোরাচালানি, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের জন্য জরুরি ব্যবস্থা না নিলে এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে কঠোরভাবে পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে চরম মাশুল দিতে হবে সরকার এবং জনগণকে। কাজেই সময় থাকতে পদক্ষেপ নিতে হবে।

সরকার হাজার হাজার কোটি টাকার উন্নয়নের নামে কর্ণফুলীর পানিতে ফেলে দিচ্ছে বললে ভুল হবে না। চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ এ দুরাবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে পার্বত্যাঞ্চলে সত্যিকারের শান্তি ফিরিয়ে আনতে সরকার জনসংহতি সমিতি ও জনগণকে এ নিয়ে সম্মিলিত ব্যবস্থা নিতে হবে। হিলট্রাক্টস ম্যানুয়েল ১৯০০ পুনবাস্তবায়নের দাবি অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে। তাই এসব উস্কানি থেকে দূরে থাকতে হবে। সাংবিধানিক আইনকে নিজস্ব গতিতে চলতে দিতে হবে।

লেখক: ভাসাসৈনিক এবং সম্পাদক, দৈনিক গিরিদর্পণ ও সাপ্তাহিক বনভূমি।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

six − three =

আরও পড়ুন