parbattanews

‘পার্বত্য শান্তিচুক্তির দীর্ঘ সময় পরও পাহাড়ে স্থিতিশীলতা পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি’

পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান পরিস্থিতি, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতি উদ্ভূত নানাবিধ হুমকি এবং চলমান ভূ-রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে “চিটাগং হিল ট্র্যাক্টস স্টুডেন্ট পলিসি ফোরাম”-এর উদ্যোগে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

সোমবার (১১ মে) জতীয় প্রেসক্লাবে চিটাগং হিল ট্র্যাক্টস স্টুডেন্ট পলিসি ফোরামের মুখপাত্র রিয়াজুল হাসানের সঞ্চালনায় এবং সমন্বয়ক রাসেল মাহমুদের সভাপতিত্বে এই আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, পার্বত্য শান্তিচুক্তির দীর্ঘ সময় পরও পাহাড়ে স্থিতিশীলতা পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনগুলোর রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড জাতীয় ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশকে নিয়ে অপপ্রচার এবং বিদেশি শক্তির মদদপুষ্ট বিভিন্ন ষড়যন্ত্র দেশবাসীর সামনে তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

এসময় প্রধান অতিথি বিচারপতি মো. ফারুক বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে ১৯০০ সালের হিল ট্র্যাক্টস রেগুলেশন এবং বিদ্যমান কিছু বিতর্কিত আইনি কাঠামোর কারণে সেখানে বসবাসরত প্রায় ৫৮ শতাংশ বাঙালি জনগোষ্ঠী তাদের মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, শান্তিচুক্তির পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সময়ে হাজার হাজার নিরীহ বাঙালি ও সেনাবাহিনীর সদস্য আত্মত্যাগ করেছেন। অন্যদিকে সশস্ত্র সংগঠনগুলোর বার্ষিক প্রায় ৭০০ কোটি টাকার চাঁদাবাজির সংস্কৃতি উন্নয়ন কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করছে। সম্প্রতি জাতিসংঘের স্থায়ী ফোরামে পিসিজেএসএস প্রতিনিধির মাধ্যমে পরিচালিত দেশবিরোধী অপপ্রচার পাহাড়ের শান্তিপ্রিয় জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি বিগ্রেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. আব্দুল্লাহ আল ইউসুফ বলেন, বাংলাদেশ সরকার পার্বত্য অঞ্চলে ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন করেছে। সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে সীমান্ত সড়ক নির্মাণ, বিশেষায়িত হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন, শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান এবং পর্যটন শিল্পের বিকাশের মাধ্যমে পাহাড়ের মানুষের জীবনমানের উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন ঘটেছে।

এছাড়া প্রান্তিক ও নিম্নবিত্ত জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকারের ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি সাধারণ মানুষের আস্থার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এত উন্নয়নের পরও একটি গোষ্ঠী কেন দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে, তা গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

আলোচনা সভায় বক্তারা পার্বত্য চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, বর্তমান বাস্তবতা, বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ এবং একটি স্থিতিশীল ও শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে করণীয় বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য ও উপাত্ত উপস্থাপন করেন।

বক্তারা বলেন, বর্তমান বিশ্বে তথ্যের পাশাপাশি “ন্যারেটিভ যুদ্ধ” অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম ইস্যুতেও বিভিন্ন পক্ষ নিজেদের অবস্থান আন্তর্জাতিক পরিসরে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করছে। মানবাধিকার, নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি, আদিবাসী পরিচয় ও আঞ্চলিক সংঘাতকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের তথ্য ও প্রচারণা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, যা আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে প্রভাবিত করছে।

বক্তারা আরও বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তবতা অত্যন্ত জটিল ও বহুস্তরীয়। এখানে ভূমি বিরোধ, প্রশাসনিক জটিলতা, আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং উন্নয়ন কার্যক্রম—সবকিছু মিলিয়ে একটি বহুমাত্রিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। কিন্তু অনেক সময় এসব বিষয় একপাক্ষিকভাবে উপস্থাপন করা হয়, যা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। তারা দায়িত্বশীল গণমাধ্যম, তথ্যনির্ভর গবেষণা এবং ভারসাম্যপূর্ণ উপস্থাপনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

বক্তারা আরও বলেন, এ ধরনের আলোচনা দেশি-বিদেশি অপতৎপরতা ও ষড়যন্ত্রের প্রকৃত চিত্র জনগণের সামনে তুলে ধরতে সহায়ক হবে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত সকল নাগরিকের সমঅধিকার নিশ্চিত করার দাবিতে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতীয় অবস্থান গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখবে।

চিটাগং হিল ট্র্যাক্টস স্টুডেন্ট পলিসি ফোরাম এর আয়োজ‌নে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমসাময়িক বাস্তবতা, চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ- শীর্ষক আলোচনায় দাবীসমূহঃ

১) পার্বত্য শান্তিচুক্তির পুনর্মূল্যায়ন করা।

২) পার্বত্য চট্টগ্রামের ১৯০০ সালের শাসনবিধি আইনকে “মৃত আইন” হিসেবে বলবৎ রাখার বিষয়ে পুনর্বিবেচনা করা।

৩) তথাকথিত আদিবাসী আন্দোলনের নামে পার্বত্য চট্টগ্রামে স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা এবং পাহাড়কে অস্থিতিশীল করে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অপচেষ্টা প্রতিহত করা।

৪) জেএসএস (সন্তু), কেএনএফ ও ইউপিডিএফের চাঁদাবাজি, হত্যা ও অপহরণের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

৫) একচেটিয়া পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি আইন বাতিল করা।

৬) এনজিও ও বিদেশি দাতা সংস্থার সকল ষড়যন্ত্র বন্ধে সরকারের তৎপরতা ও নজরদারি বৃদ্ধি করা।

৭) জেএসএস, ইউপিডিএফ ও কেএনএফের মতো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর বিদেশে গিয়ে বাংলাদেশ সরকার ও দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য উপস্থাপনের মাধ্যমে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অপচেষ্টা রোধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

৮) আঞ্চলিক পরিষদের ২৮ বছর ধরে নির্বাচন না দিয়ে সন্ত্রাসীদের গডফাদার হিসেবে স্বৈরাচারী চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকা সন্তু লারমাকে অপসারণ করে নির্বাচন আয়োজন করা এবং পার্বত্য জেলা পরিষদগুলোর নির্বাচন নিশ্চিত করা।

৯) বর্তমান সরকারের পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড—যেমন সীমান্ত সড়ক নির্মাণ, ফ্যামিলি কার্ড প্রদান, দুর্গম এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা, নলকূপ স্থাপন, সেনাবাহিনীর সহায়তায় দুর্গম পাহাড় থেকে হেলিকপ্টারে রোগী পরিবহন, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সহায়তা ও শিক্ষা সহায়তা—প্রশংসনীয়। কিন্তু পার্বত্য সন্ত্রাসীরা এসব উন্নয়ন কর্মকাণ্ড উপেক্ষা করে বিদেশে অপপ্রচার চালায়; এ ধরনের অপপ্রচার প্রতিরোধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

১০) পার্বত্য চট্টগ্রামের ১৩টি জাতিগোষ্ঠীর সকল মানুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করে সম্প্রীতির পার্বত্য চট্টগ্রাম গড়ে তোলা।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক আব্দুল লতিফ মাছুম, সাবেক রাষ্ট্রদূত সাকিব আলী, কর্নেল (অব.) হাসিনুর রহমান, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি আবু সালেহ আকন, পার্বত্য নিউজ-এর সম্পাদক মেহেদী হাসান পলাশ, মেজর (অব.) জাকির হোসাইন, সাংবাদিক ও গবেষক এইচ এম ফারুক, সিএইচটি সার্বভৌমত্ব সুরক্ষা পরিষদের প্রধান সমন্বয়ক মো. মোস্তফা আল ইহযায, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক শেখ আদনান ফাহাদ, কর্নেল মো. আইয়ুব, এস এম জহিরুল ইসলাম, শাহ সুফি ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল হান্নান আল হাদী, শেখ আহম্মদ রাজু, ইঞ্জিনিয়ার শাহাদাৎ ফরাজী সাকিব, জিয়াউল হক, সাংবাদিক নেতা তাইজুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন রেদওয়ান সিকদার, মিলন মল্লিক ও সেলিম রেজা বাচ্চুসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিবৃন্দ।

Exit mobile version