পার্বত্য শান্তিচুক্তি : বিভাজন ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার সংকট


১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বিতর্কিত অধ্যায়ের সূচনা হয়, যখন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জনসংহতি সমিতির (পিসিজেএসএস) সঙ্গে একটি শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করেন। বাংলাদেশের সংবিধান, সার্বভৌমত্ব, অখ-তা এবং রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলা এই চুক্তিটি সেসময় রাজনৈতিকভাবে ‘শান্তি প্রতিষ্ঠার সাফল্য’ হিসেবে প্রচার পেলেও বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। চুক্তিটি শুরু থেকেই অসম, বৈষম্যমূলক এবং রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থী বলে বহু বিশেষজ্ঞ, সামরিক কর্মকর্তা এবং নীতিনির্ধারকের বিশ্লেষণে উঠে আসে। চুক্তির মোট ৭২টি ধারার অনেকগুলো সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক, বিশেষ করে ভূমি ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক কর্তৃত্ব, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে গুরুতর অসঙ্গতি রয়েছে। চুক্তির সবচেয়ে বড় ত্রুটিগুলোর একটিই হলো, এটি প্রস্তুত ও স্বাক্ষরের সময়ে রাষ্ট্রের নিরাপত্তার কেন্দ্রবিন্দু সেনাবাহিনীর মতামত বা অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। ১৯৭৩ সাল থেকে পার্বত্য অঞ্চলকে সশস্ত্র বিদ্রোহ, হত্যা, অপহরণ ও বিচ্ছিন্নতাবাদের হাত থেকে রক্ষা করার প্রধান প্রতিষ্ঠান ছিল সেনাবাহিনী। তার অভিজ্ঞতা, মাঠের বাস্তবতা, গোয়েন্দা মূল্যায়নকে উপেক্ষা করে একটি রাজনৈতিক সংকল্পে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হওয়ায় পরবর্তী সময়ে এতে অসংখ্য ত্রুটি ও বিচ্যুতির জন্ম হয়। এর ফলে পার্বত্য অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামো ভঙ্গুর হয়ে পড়ে, যা পরে সশস্ত্র গোষ্ঠীর পুনরুত্থানকে আরও সহজ করে দেয়।
শান্তিচুক্তির আগে এবং পরে পার্বত্য সংকট সমাধানের প্রচেষ্টা তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে চলে। জিয়াউর রহমান প্রথম আলোচনার সূচনা করেন, পরে এরশাদ ছয়বার এবং খালেদা জিয়া তেরবার আনুষ্ঠানিক বৈঠক করেন। হাসিনার সময় আরও সাত দফা আলোচনা শেষে চুক্তি স্বাক্ষর হয়। মোট ২৬টি আলোচনার পরও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি। কারণ, আলোচনার প্রতিটি ধাপে ভারতের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ চাপ ছিল স্পষ্ট। ভারত বহুদিন ধরেই পার্বত্য চট্টগ্রামকে তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর মতো একটি প্রভাববলয়ের অংশ হিসেবে দেখতে চাইত। সেই কারণেই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়কে কেন্দ্র করে দীর্ঘমেয়াদি একটি ভূরাজনৈতিক হিসাব ভারতের কূটনীতিতে লক্ষ করা যায়। চুক্তির পর সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো, অস্ত্রসমর্পণের বিষয়টি বাস্তবায়িত হয়নি। পিসিজেএসএস প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, সে শান্তিবাহিনীর সব সদস্যকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনবে এবং অস্ত্র জমা দেবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। পাহাড়ে অস্ত্রবহনকারীরা আরো শক্তিশালী হয়ে ওঠে, বিভক্ত হয়ে একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠী জন্ম নেয়: যেমন পিসিজেএসএস-এর ভেতর বিভক্তি, ইউপিডিএফ ও বিভিন্ন উপজাতীয় সশস্ত্র গ্রুপ। তারা নিজেদের মধ্যে হত্যা, সংঘর্ষ, চাঁদাবাজি, দখলদারি, অপহরণ ও অস্ত্রবাণিজ্যে লিপ্ত হয়। চুক্তির পর যে শান্তি ও স্থিতিশীলতার প্রত্যাশা ছিল, তা হয়নি বরং পাহাড়ে পরিস্থিতি অনেক ক্ষেত্রে আরও জটিল হয়েছে।
১৯৭৩ সাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত প্রায় ৪০০-এর অধিক সেনা, বিজিবি ও পুলিশ সদস্য শহীদ হয়েছেন এবং ৫৫০-এর বেশি আহত হয়েছেন। সংখ্যাটা নিজেই বলে দেয় পাহাড়ে প্রকৃত শান্তি কখনোই প্রতিষ্ঠা পায়নি। এই বছরগুলোতে সাধারণ বাঙালি জনগোষ্ঠীও বারবার সন্ত্রাসী হামলা, হত্যা, নির্যাতন ও ভূমি দখলের শিকার হয়েছে। চুক্তির মাধ্যমে উপজাতি নেতৃত্বকে ব্যাপক রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও আর্থিক সুবিধা দেওয়া হলেও বাঙালি স্থায়ী বাসিন্দাদের নিরাপত্তা এবং মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা হয়নি। চুক্তির একটি বড় বিতর্ক হলো, এর মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামকে উপজাতি অধ্যুষিত এলাকা ঘোষণা করা, যা সংবিধানে প্রতিষ্ঠিত বাঙালি জাতীয়তাবাদের ধারণার বিপরীত। এর ফলে বাঙালিদের ভূমি দাবি, সরকারি চাকরি, প্রশাসনিক সুযোগ: সব ক্ষেত্রে বৈষম্যের জন্ম হয়। উপজাতিদের জন্য বিশেষাধিকার প্রতিষ্ঠিত হলেও বাঙালি জনগোষ্ঠী পিছিয়ে পড়ে, যা বর্তমানে পাহাড়ে দুই সম্প্রদায়ের সামাজিক-অর্থনৈতিক ভারসাম্য ভেঙে দিয়েছে।
চুক্তির পর আরেকটি মারাত্মক সিদ্ধান্ত ছিল সেনাবাহিনীর ২৩৮টি ক্যাম্প ও একটি ব্রিগেড সদরদপ্তর অপসারণ। এ পদক্ষেপে পুরো পাহাড়ে একটি নিরাপত্তাহীনতার শূন্যতা সৃষ্টি হয়, যা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো দ্রুত কাজে লাগায়। অল্প সময়ের মধ্যে তারা আবার সংগঠিত হয়ে চাঁদাবাজি, হত্যা, দখলদারি ও বিদেশি যোগাযোগ আরও বাড়িয়ে তোলে। ভারত ও মিয়ানমারের ভেতরে তাদের বিভিন্ন গোপন মিটিং, প্রশিক্ষণ ও অস্ত্রক্রয় কার্যক্রমও এই সময় তীব্র হয়। সন্তু লারমা এই চুক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগীদের একজন। তিনি আজও প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা, সরকারি ভাতা, অফিস, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক ক্ষমতা ভোগ করেন, অথচ বাংলাদেশের জাতীয় দিবসগুলো পালন করেন না এবং তার অনুসারীরাও নয়। বাংলাদেশে থেকে সুবিধা ভোগ করেও তিনি দেশ-বিদেশে রাষ্ট্রবিরোধী প্রচারণা চালান, বিশেষত সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য দেন। চাকমা রাজা দেবাশিষ রায় ও তাঁর স্ত্রীর বিদেশে লবিং—ঈঐঞ-কে রহফরমবহড়ঁং ধহপবংঃৎধষ ঃবৎৎরঃড়ৎু হিসেবে প্রচার করে, যা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের জন্য দীর্ঘমেয়াদে বিপজ্জনক।
চুক্তির পর উপজাতিদের উন্নয়ন ও বিদেশি সহায়তা ব্যাপক বৃদ্ধি পেলেও বাঙালি জনগণ প্রশাসনিকভাবে উপেক্ষিত ও বৈষম্যের শিকার হয়েছে। ভূমি কমিশন এখনো কার্যকর হয়নি, বরং ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধ ও দখলদারি আরও বেড়েছে। বাঙালিদের সুরক্ষার বিষয়টি সম্পূর্ণ উপেক্ষিত থেকে গেছে। এদিকে পাহাড়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বার্ষিক চাঁদাবাজির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে বছরে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা, যা দিয়ে সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক, অস্ত্র ক্রয়, ভারত-মিয়ানমার সংযোগ এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ আর্থিক সাম্রাজ্য ধ্বংস করা না গেলে পাহাড়ে কখনোই শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। চুক্তির সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বিপর্যয় হলো, এটি বিভাজনমূলক। শেখ মুজিব যে নীতি: উপজাতিরা বাঙালির অংশ, এ ধারণা দিয়ে দেশের জাতিগত ঐক্য চেয়েছিলেন, তাঁর কন্যা সেই নীতিকে উল্টে দিয়ে একটি পৃথক জাতিগত পরিচয়কে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন। এর ফলে পাহাড়ে বিচ্ছিন্নতাবাদের সাংবিধানিক ভিত্তি তৈরির সুযোগ জন্মেছে, যা রাষ্ট্রের অখ-তার জন্য সুস্পষ্ট হুমকি।
বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, সংবিধান এবং জাতীয় নিরাপত্তা আজ যে জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি: তা স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, পার্বত্য চুক্তির পুনর্মূল্যায়ন ছাড়া স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার আর কোনো পথ নেই। পাহাড়ে দীর্ঘদিন ধরে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর আধিপত্য, চাঁদাবাজি, হত্যা, অপহরণ, দখলদারি এবং ভারত-মিয়ানমারের অভ্যন্তরে তাদের গোপন যোগাযোগ দেশের নিরাপত্তা কাঠামোকে দুর্বল করে দিয়েছে। তাই এই মুহূর্তে রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব হলো, পাহাড়ে বিদ্যমান সব সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা প্রয়োগ করা: আইন, অভিযান, গোয়েন্দা কার্যক্রম, অর্থনৈতিক অবরোধ এবং আন্তর্জাতিক চাপ: সব মাধ্যম ব্যবহার করে সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া। গোয়েন্দা নজরদারিকে আরও বহুমাত্রিক করতে হবে। শুধু সামরিক গোয়েন্দা নয়, বেসামরিক গোয়েন্দা, বিশেষ গোয়েন্দা শাখা, সাইবার পর্যবেক্ষণ, সীমান্ত গোয়েন্দা ও আর্থিক গোয়েন্দাসহ সব ইউনিটকে সমন্বিত করতে হবে। পাহাড়ে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর অস্ত্রের উৎস, বিদেশি যোগাযোগ, অর্থনৈতিক লেনদেন, চাঁদাবাজির নেটওয়ার্ক এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার সব উৎস চিহ্নিত করে প্রতিটি ধাপ বিচ্ছিন্ন করার জন্য একটি কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা কোষ গঠন অপরিহার্য। গোয়েন্দা তথ্যভিত্তিক অভিযানের মাধ্যমে পাহাড়কে আবার নিরাপদ এলাকায় পরিণত করতে হবে।
ভূমি সংকট পাহাড়ের সবচেয়ে জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের উৎস। চুক্তির নামে ভূমি কমিশন তৈরি হলেও তা কার্যত অকার্যকর। বাঙালি স্থায়ী বাসিন্দারা দশকের পর দশক ধরে জমির মালিকানা হারিয়েছেন, আর উপজাতি গোষ্ঠীগুলো ভূমি-দখল ও দখলদারি শক্তিশালী করেছে। তাই একটি পূর্ণাঙ্গ, বৈজ্ঞানিক ভূমি জরিপ এবং তার ভিত্তিতে নিরপেক্ষ পুনর্বিন্যাস এখন এক জরুরি রাষ্ট্রীয় কাজ। জমি কার, কীভাবে ব্যবহৃত হবে, কার মালিকানায় ছিল: এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট মানদ- ঠিক করতে না পারলে পাহাড়ে সংঘাত কখনোই শেষ হবে না। বাঙালি এবং উপজাতি উভয় সম্প্রদায়ের সমঅধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ছাড়া বাস্তব শান্তি প্রতিষ্ঠা অসম্ভব। ভারতের প্রভাব দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ের রাজনীতিকে প্রভাবিত করেছে। পাহাড়ের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের যোগাযোগ নতুন নয়। চুক্তির পরে এই যোগাযোগ আরও গভীর হয়েছে। ভারতের বিভিন্ন শহরে গোপন বৈঠক, রাজনৈতিক লবিং এবং সন্ত্রাসী প্রশিক্ষণের অভিযোগ বহুবার প্রমাণসহ প্রকাশ্যে এসেছে। এই অনুপ্রবেশ এবং প্রভাব প্রতিরোধ করা রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য। সীমান্ত পর্যবেক্ষণ, আন্তর্জাতিক কূটনীতি, গোয়েন্দা সহযোগিতা এবং কঠোর সীমান্ত সুরক্ষার মাধ্যমে ভারতীয় প্রভাবের পথ বন্ধ করতে হবে।
দীর্ঘমেয়াদী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন সশস্ত্র দমন নয়, ন্যায়বিচার ও সমঅধিকারভিত্তিক একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতি। পাহাড়ের উন্নয়ন যেন কেবল উপজাতিদের সুবিধায় সীমাবদ্ধ না থাকে, বাঙালি জনগোষ্ঠী যেন বৈষম্যের শিকার না হয়, প্রশাসন যেন একতরফাভাবে কোনো গোষ্ঠীর হাতে চলে না যায়: এগুলো নিশ্চিতে রাষ্ট্রকে সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। চুক্তিটি পর্যালোচনা করে সংবিধানসম্মত, নিরাপত্তা-বান্ধব এবং সমঅধিকারমূলক কাঠামো তৈরি করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পাহাড়ে স্থায়ী শান্তির পথ তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়ায়: নিরাপত্তা, সংবিধান ও সমঅধিকার। এই তিনটি স্তম্ভ শক্তিশালী করার মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামকে আবার একটি শান্ত, নিরাপদ ও সমৃদ্ধ অঞ্চলে রূপান্তর করা সম্ভব। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব ও সামগ্রিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে এখনই সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে।
লেখক: নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও গবেষক।
[email protected]

















