চার সংগঠনের হাতে ৪ হাজার অস্ত্র

পার্বত্য শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নে প্রধান অন্তরায় অবৈধ অস্ত্র

fec-image

এসএমজি (সাব-মেশিন গান), একে-৪৭ কিংবা একে-২২ রাইফেল। এসব সাধারণত কোনো দেশের সামরিক বাহিনীরা ব্যবহার করে থাকে। অথচ দেশের পার্বত্য অঞ্চলে এমন ধরনের বিপুলসংখ্যক অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র ব্যবহার করছে উপজাতীয় সন্ত্রাসীরা। পাহাড়ের নিরীহ বাঙালি ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজি করতে এবং ভূমি দখলসহ পার্বত্য অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের রাখতে এসব অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার ও মজুদ করছে পার্বত্য অঞ্চলের চারটি আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠন।

সরেজমিনে গত রোববার থেকে বুধবার পর্যন্ত চার দিন পার্বত্য অঞ্চল ঘুরে বিভিন্ন পর্যায়ে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

পার্বত্য অঞ্চলে কাজ করা গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে বর্তমানে পার্বত্য অঞ্চলভিত্তিক চারটি উপজাতীয় সংগঠনের হাতে বর্তমানে প্রায় ৪ হাজারের মতো আগ্নেয়াস্ত্র মজুদ রয়েছে। সশস্ত্র ওই চার সংগঠন হচ্ছে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ), ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক), জনসংহতি সমিতি (জেএসএস-মূল/সন্তু লারমা) ও জেএসএস (সংস্কার)। গোয়েন্দারা বলছেন ধীরে ধীরে এসব সংগঠনে যুক্ত হয়েছে অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র। চাঁদাবাজি ও আধিপত্য নিয়ে কোন্দলে মাঝেমধ্যেই গর্জে উঠছে ভয়ঙ্কর ওইসব অস্ত্র। অস্ত্রের গর্জন ছড়িয়ে শান্তির পাহাড়কে করছে তারা অশান্ত। ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে পাহাড়ে বাঙালি হটানোর কৌশলও চালিয়ে যাচ্ছে তারা। রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে ব্যাপক হারে প্রাণ যাচ্ছে ওইসব সংগঠনের নেতাকর্মীসহ সাধারণ পাহাড়িদের। তাদের এসব অবৈধ অস্ত্রের জোগান দিতে সহায়তা করছে প্রতিবেশী দুটি দেশের প্রভাবশালী অসাধু চক্র।

বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ক্য শৈ হ্লা বলেন, অন্য পার্বত্য জেলার তুলনায় বান্দরবানে সৌহার্দপূর্ণভাবে ১১টি জাতি গোষ্ঠী বসবাস করছে। এখানে সবচেয়ে বড় সমস্যা অবৈধ অস্ত্র এবং ভূমি জটিলতা। এই অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার করছে কিছু সন্ত্রাসী সংগঠন। আমি তাদের সন্ত্রাসী বা অপরাধী হিসেবেই চিহ্নিত করি। শান্তি চুক্তি বাস্তবায়িত হলেও ওইসব সংগঠন কেন অস্ত্র জমা দেয়নি- এটা আমারও প্রশ্ন। বান্দরবান জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ক্য শৈ হ্লা আরও বলেন, পার্বত্য অঞ্চলের এসব অবৈধ অস্ত্রবাজদের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অভিযান পরিচালনা করা উচিত। কেননা এখানে অস্ত্রের রাজনীতি বা চাঁদাবাজি করলে শান্তিচুক্তি শতভাগ কোনোভাবেই বাস্তবায়িত হবে না।

বান্দরবান জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ জাকির হোসেন মজুমদার বলেন, তিন পার্বত্য জেলার তুলনায় বান্দরবান তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ। তবে ইদানীং পাহাড়ি আঞ্চলিক কিছু সংগঠন বান্দরবানকে উত্তপ্ত করার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে এখানে জাতীয় রাজনীতি ঠেকাতে এবং চাঁদাবাজি ও আধিপত্যের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে খুনোখুনি হচ্ছে। মাঝেমধ্যেই অস্ত্রের গর্জন বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। এ বছর বান্দরবানে ওইসব সংগঠনের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে চলতি বছরের দুই-তিন মাসে অন্তত ৮টি হত্যাকাণ্ড ও একাধিক সশস্ত্র হামলা হয়েছে। তবে পুলিশসহ নিরাপত্তা বাহিনী এ ব্যাপারে সজাগ রয়েছে। এসব ঘটনায় অন্তত ১৫ জন গ্রেফতার ও বেশকিছু অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে রাঙ্গামাটি জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) আলমগীর কবির বলেন, অবৈধ অস্ত্রের বিরুদ্ধে পুলিশের নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। পুলিশের পাশাপাশি বিভিন্ন সংস্থা অবৈধ অস্ত্রের বিরুদ্ধে কাজ করছে। এ ব্যাপারে প্রয়োজনে আরও কঠোর অভিযান চালানো হবে।

পার্বত্য অঞ্চলে কর্মরত মাঠ পর্যায়ের একাধিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, পাহাড়ে অবস্থানরত সশস্ত্র সংগঠনগুলোর কাছে বর্তমানে এসএমজি, এলএমজি, এম-১ কারবাইন, গ্রেনেড, এম-১৬ রাইফেল, এম-৪, একে-৪৭ ও একে-২২ রাইফেলের মতো অস্ত্রসহ অন্তত ৪ হাজারের মতো অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে অস্ত্রসহ আটক ইউপিডিএফ বা জেএসএস’র সন্ত্রাসীদের মাধ্যমে গোয়েন্দারা আরও জানতে পেরেছেন, পার্বত্য অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ওই চারটি সশস্ত্র আঞ্চলিক সংগঠনের চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার, শান্তিচুক্তি নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান জেলায় অশান্তি-অস্থিরতা কাজ করছে। এ চারটি সংগঠনের হাতে অস্ত্র তুলে দিচ্ছে প্রতিবেশী দুটি দেশের প্রভাবশালী চক্র।

স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, শান্তিপ্রিয় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী কিংবা পাহাড়ি বাঙালি তারা চাঁদা দিয়েও এখন আর কেউই শান্তিতে বসবাস করতে পারছেন না। প্রতিটি মুহূর্ত কাটছে নিরাপত্তাহীনতায়। চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল বান্দরবানের রাজস্থলী এলাকায় পাহাড়ি দুটি সংগঠনের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে গোলাগুলি হয়। এতে ৬ থেকে ৭ জন নিহত হয় বলে গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে। এরপর ৫ মে রাজবিলা ইউনিয়নের তাইংখালী এলাকায় বিনয় তঞ্চঙ্গ্যা নামে একজনকে পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা গুলি করে হত্যা করে। একই দিনে রাজবিলা ইউনিয়নের তাইংখালী এলাকায় ৯ নম্বর রাবার বাগান এলাকায় ফোলা ডং তঞ্চঙ্গ্যাকে হত্যা করা হয়। এরপর ৩০ মে রাজবিলার ৩ নম্বর রাবার বাগান এলাকায় রাজমনি তঞ্চঙ্গ্যাকে নিজ বাড়িতে এলোপাতাড়ি গুলি করে হত্যা করা হয়। একই দিনে ওই এলাকার ৮ নম্বর রাবার বাগান এলাকা থেকে ক্য চিং মারমাকে তুলে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হয়। একই দিন হেডম্যানপাড়ার খামারবাড়ী থেকে চ থোয়াই মং মারমাকে হত্যা করা হয়। এরপর ৫ জুন থানচি সদরের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের চমিপাড়ায় বাঙালি হকার ব্যবসায়ী মো. আইয়ুবকে হত্যা করা হয়। ৩০ জুন থোয়াইংগ্যাপাড়া এলাকায় অংথুই চিং মারমাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

এর আগে গত বছরের ৩ মে আধিপত্যের কোন্দলে ‘ব্রাশফায়ার’ করে জেএসএস (সংস্কার) সমর্থিত নানিয়ারচর উপজেলা চেয়ারম্যান শক্তিমান চাকমাকে হত্যা করে ইউপিডিফের (মূল) সন্ত্রাসীরা। পরের দিন ৪ মে শক্তিমানের শেষকৃত্যে যোগ দিতে যাওয়ার সময় ইউপিডিএফের (গণতান্ত্রিক) সভাপতি তপন জ্যোতি চাকমা বর্মাসহ পাঁচজনকে ‘ব্রাশফায়ার’ করে হত্যা করে ইউপিডিএফের (মূল) সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা। একই বছরে ২ মে ইউপিডিএফের সাবেক সদস্য উজ্জল কান্তি চাকমাকে জেএসএসের (সংস্কার) সশস্ত্র ক্যাডাররা গুলি করে হত্যা করে। কয়েকদিন পর ২৮ মে সাজেক থানাধীন করল্ল্যাছড়ি এলাকায় ইউপিডিএফের (গণতান্ত্রিক) ক্যাডারদের গুলিতে ইউপিডিএফের (মূল) সদস্য সৃতী চাকমা, সুশীল চাকমা এবং অটল চাকমা নিহত হন। গত বছরের ৭ জুন নানিয়ারচরের সিলুন্যা নামক এলাকায় ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) ও জেএসএস (সংস্কার) একত্র হয়ে ইউপিডিএফের (মূল) সঙ্গে ভয়াবহ গুলাগুলি করে। এ সময় দুপক্ষের মধ্যে অন্তত ৩০০ রাউন্ড গুলি চালানো হয় বলে স্থানীয়রা জানায়। এরপর ১১ জুন বালুখালির বনবিহার নামক স্থানে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ইউপিডিএফের (মূল) সঙ্গে ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) ও জেএসএসের (সংস্কার) ব্যাপক গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এ সময়েও অন্তত সাড়ে ৩০০ রাউন্ড গুলি ছোড়া হয়। পাহাড়ে এমন গোলাগুলি, সংঘর্ষ, হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণের ঘটনা অহরহ। এই অস্ত্র গোলাবারুদে হুংকার এখন যেন নিত্যদিনের ঘটনা।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে বিপুল পরিমাণ চাঁদা আদায় এবং এলাকার নিয়ন্ত্রণ রাখতেই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে পাহাড়ে। ১৯৯৭ সালে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতির সঙ্গে (জেএসএস) শান্তিচুক্তির পর তখনই এর বিরোধিতা করে ইউপিডিএফ। শান্তি চুক্তির বিরোধিতা করে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে সক্রিয় হয়ে উঠে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। মূলত তার পরেই পাহাড়ে আবারও ভ্রাতৃঘাতী রক্তের খেলা শুরু হয়। এরপর ২০০৭ সালে জেএসএস থেকে বেরিয়ে রূপায়ণ দেওয়ান-সুধাসিন্ধু খীসাদের নেতৃত্বে আত্মপ্রকাশ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (এম এন লারমা) যা সংস্কার নামেও পরিচিত। এত দিন ইউপিডিএফজেএসএস (সংস্কার) দুই সংগঠন অনেকটা এক হয়ে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জেএসএসের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছিল। কিন্তু গত বছরে ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) নামে মূল ইউপিডিএফ ভেঙে পাহাড়ের চতুর্থ আঞ্চলিক দল বা সংগঠন গঠিত হলে এই চার সংগঠনের ক্ষমতার বিস্তার, চাঁদাবাজি ও আধিপত্যের দ্বন্দ্বে আবারও অশান্ত হয়ে উঠেছে পাহাড়। এর বাইরেও উপজাতিদের মধ্যে থেকে আরও দুয়েকটি সংগঠন মাথা চাড়া দেওয়ার চেষ্টা করছে বলেও জানা গেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, মূল ধারার রাজনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নই পারে পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি ফিরিয়ে আনতে। বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়িদের আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠন রয়েছে। কিন্তু তারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও ভূখণ্ডের বিরুদ্ধেই বৃদ্ধাঙুলি দেখাচ্ছে। এমনকি শান্তিচুক্তিরও বেশিরভাগ শর্ত তারা মানছে না। পার্বত্য শান্তিচুক্তির পর আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনের কাছে থাকা অস্ত্রের ৩ ভাগের এক ভাগেরও কম জমা দেয়। তাও আবার জরাজীর্ণ, নষ্ট বা পরিত্যক্ত অস্ত্রগুলো। পক্ষান্তরে অত্যাধুনিক অস্ত্রগুলো তারা তাদের কাছে রেখে দেয়। পাশাপাশি দিনে দিনে নতুন নতুন অত্যাধুনিক অস্ত্রে তারা আরও সমৃদ্ধ হয়েছে।

সূত্র: সময়ের আলো

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nineteen − 5 =

আরও পড়ুন