পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ৮০ জন আততায়ীকে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করিয়েছে : জুলকারনাইন সায়ের

fec-image

পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা গত কয়েক মাসে অন্তত ৮০ জন সুব্রত বাইনের মতো আততায়ীকে দেশের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে অনুপ্রবেশ করিয়েছে বলে জানান আল-জাজিরার সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের।

বৃহস্পতিবার (১২ ডিসেম্বর) রাজধানীর বিজয়নগর এলাকায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে আহত হয়েছেন ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদি।

ওসমান হাদির গুলিবিদ্ধের ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক স্ট্যাটাসে এমন তথ্য দেন আল-জাজিরার সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের।

স্ট্যাটাসে তিনি বলেন, পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা গত কয়েক মাসে অন্তত ৮০ জন সুব্রত বাইনের মতো আততায়ীকে দেশের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে অনুপ্রবেশ করিয়েছে। আন্ডারওয়ার্ল্ড, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর অঞ্চলের চরমপন্থি গ্রুপ এক হয়ে নির্বাচনকে সামনে রেখে বিভিন্ন প্রার্থী ও কেন্দ্রীয় নেতা, এলাকার জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বদের টার্গেট করে হত্যা ও সহিংসতার ঘটনা ঘটানোর পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে।

সায়ের আরও জানান, পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, যিনি সুব্রত বাইন-এর হ্যান্ডলার ছিলেন, জামিনে থাকা পিচ্চি হেলাল ও চরমপন্থি গ্রুপ গণমুক্তি ফৌজের প্রধান মুকুল সম্প্রতি টেলিফোনে কনফারেন্সের মাধ্যমে এসব বিষয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেছেন।

সুব্রত বাইন কারাগার থেকে তার মেয়ে সিনথিয়ার মোবাইলে ফোন দিয়ে কনফারেন্স করে পিচ্চি হেলাল ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গে পলাতক মুকুলের সঙ্গে কথা বলেছেন। পরবর্তীতে সুব্রত বাইন-এর মেয়ে সিনথিয়া বিতু নেপালে পলাতক বিডিআর মামলার পলাতক আসামি লেদার লিটন, পিচ্চি হেলাল, মুকুল, বাড্ডার বড় সাঈদ ও দিপুর সঙ্গে কথা বলিয়ে দেয়।

তিনি বলেন, নির্বাচন বানচাল এবং দেশকে চরম অস্থিতিশীল করতে বিশেষ গোষ্ঠী সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাবে। একতাবদ্ধ হয়ে এদের মোকাবিলা করাই একমাত্র উপায়।

উল্লেখ্য, চলতি বছরে (৩০ মে) শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়ে প্রকাশ করা পোস্টটি আজকের স্ট্যাটাসের সঙ্গে শেয়ার করেছেন জুলকারনাইন সায়ের। যেখানে সুব্রত বাইনের ভারতে যাতায়াতের পাসপোর্ট সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরেন তিনি।

পাঠকদের জন্য পোস্টটি হুবহু তুলে ধরা হলো:

সংযুক্ত ছবিগুলো শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনের বিশেষ পাসপোর্টের, যা কেবল বাংলাদেশ ও ভারতে যাতায়াতের জন্যে ইস্যু করা হয় ২০০১ সালের ২ আগস্ট, যখন দেশে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করছিলো তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার।

বিশ্বস্ত সূত্রে পাওয়া এই সম্পূর্ণ পাসপোর্টটি যাচাই করে দেখা যায়, মোহাম্মদ আলী ছদ্মনামে নেয়া এই পাসপোর্ট ব্যবহার করে সুব্রত বাইন, অরফে মোহাম্মদ আলী ২০০১ সালের ৮ অক্টোবর সর্বপ্রথম বাংলা বান্ধা সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করে (ভিসা প্রদান করা হয় ৭ অক্টোবর ২০০১)। এর প্রায় তিন মাস পর (ভারতে অবস্থানের সময় বৃদ্ধি করে) ৭ জানুয়ারি ২০০২ আবার বাংলাদেশে ফেরত আসে।

এভাবে তার ভারত-বাংলাদেশ যাতায়াত চলতেই থাকে, পাসপোর্টের সকল ইমিগ্রেশন সিল ও ভিসা যাচাই করে পাওয়া গেছে ১৩ জুন ২০০৪ পর্যন্ত সর্বমোট ৯ বার মোহাম্মদ আলী নামের বিশেষ পাসপোর্টটি ব্যবহার করে ভারতীয় ভিসা গ্রহণ করে সুব্রত বাইন, এক্সিট-এন্ট্রি করেন ৩২ বার।
সূত্রটি জানিয়েছে, এ সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বেশ কয়েকটি টার্গেটেড কিলিং সংঘটিত করে সুব্রত। প্রতিবার একেকটি হত্যা করেই ভারতে পাড়ি জমাতো এই খুনি। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এবং দেশটির সেনা গোয়েন্দা এমআই (Military Intelligence) এর সাথে সম্পর্কিত সুব্রত বাইনকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অবস্থান করা ভারতের প্রতি হুমকি এমন সব ব্যক্তিদের হত্যার মিশন দেয়া হয়েছিলো। উলফা, ইউনাইটেড লিবারেশন অফ নাগাল্যান্ড, পাকিস্তান ভিত্তিক মুত্তাহিদা কওমি মুভমেন্ট (এমকিউএম) এর বাংলাদেশ শাখা সহ আরও কয়েকটি সংগঠনের (যা ভারতে নিষিদ্ধ) নেতাদের ছবি ও ঠিকানা দিয়ে; অস্ত্র-অর্থ সহ মিশন কার্যকরী করতে যা যা প্রয়োজন, সেসবের ব্যবস্থা করে বারবারই বাংলাদেশে প্রবেশ করতো সুব্রত বাইন ও তার সহযোগী মোল্লা মাসুদ।

২০০৩ সালে এভাবেই একবার প্রস্তুতি নিয়ে সুব্রত ঢাকায় আসে এবং মোহাম্মদপুর এলাকার একটি বাড়িতে হামলা করে নাগাল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব দাবী করা বম সম্প্রদায়ের এক নেতার স্ত্রী ও তার ৭ বছরের সন্তানকে হত্যা করে। এই ঘটনার কিছুদিন পর, পাকিস্তানী বংশোদ্ভূত মোহাম্মদপুর বিহারী ক্যাম্পের মোস্তাকিম কাবাবের মালিক মোস্তাকিমকে গুলি করে হত্যা করে। মুত্তাহিদা কওমি মুভমেন্ট (এমকিউএম) নামের পাকিস্তান ভিত্তিক একটি সংগঠনের সাথে সংশ্লিষ্টতার কারণে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন মোস্তাকিম। এছাড়াও বহুবার উলফার নেতা পরেশ বড়ুয়াকে হত্যার চেষ্টা করে সুব্রত বাইন, কিন্তু ব্যর্থ হয় প্রতিবার।

এই পাসপোর্টে সর্বশেষ ১৩ জুন ২০০৪ একটি সিঙ্গেল এন্ট্রি ভারতীয় ভিসা ইস্যু করা হয়, যার মেয়াদ ১২ জুলাই ২০০৪ পর্যন্ত। কিন্তু ভিসার মেয়াদ পার হয়ে গেলেও ৬ সেপ্টেম্বর ২০০৪ পর্যন্ত ভারতে অবস্থান করতে তাকে সম্ভবত তেমন কোন সমস্যার মুখে পড়তে হয়নি। সর্বশেষ পাসপোর্টটি ব্যবহার করে সুব্রত বাইন বাংলাদেশে প্রবেশ করে ৬ সেপ্টেম্বর ২০০৪, পরবর্তীতে এই পাসপোর্টে আর কোন ভিসা কিংবা বহির্গমন সিল লক্ষ্য করা যায়নি।

ইন্টারেস্টিং হলো এর প্রায় তিন বছর পর, ১৪ মে, ২০০৭ মোহাম্মদ আলী নামে একটি ভারতীয় পাসপোর্ট প্রদান করা হয় সুব্রতকে।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন