পাহাড়ে অগ্রাধিকার কোটা নিয়ে সৃষ্ট সংকটের জন্য দায়ী পার্বত্য মন্ত্রণালয়

fec-image

পার্বত্য (রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি) জেলা পরিষদ আইনের ৩২ ধারায় আছে:

“(১) পরিষদের কার্যাদি সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের নিমিত্ত পরিষদ, সরকারের [অনুমোদনক্রমে] বিভিন্ন শ্রেণির কর্মকর্তা ও কর্মচারী পদ সৃষ্টি করিতে পারিবে৷

(২) পরিষদ প্রবিধান অনুযায়ী তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর পদে কর্মচারী নিয়োগ করিতে পারিবে এবং তাঁহাদিগকে বদলী ও সাময়িক বরখাস্ত, বরখাস্ত, অপসারণ বা অন্য কোন প্রকার শাস্ত প্রদান করিতে পারিবে : [তবে শর্ত থাকে যে, উক্ত নিয়োগের ক্ষেত্রে জেলার উপজাতীয় বাসিন্দাদের অগ্রাধিকার বজায় থাকিবে৷]”

জেলা পরিষদ আইনের এই ধারায় পরিষদের কার্যাদি সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের প্রয়োজনে কর্মকর্তা ও কর্মচারীর পদ সৃষ্টি ও সেখানে নিয়োগের কথা বলা হয়েছে। এখানে জেলা পরিষদে হস্তান্তরিত অন্যান্য বিভাগ/দপ্তরের কথা বলা হয়নি। কারণ, জেলা পরিষদ আইনের ২ (ঙ) ধারায় ‘পরিষদ’ এর সংজ্ঞায় পরিষদ বলতে শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট পার্বত্য জেলা পরিষদকেই বোঝানো হয়েছে।

কোনোভাবেই জেলা পরিষদে হস্তান্তরিত বিভাগ/দপ্তরকে বোঝানো হয়নি। অথচ, এতদিন এই ধারাটিকে ব্যবহার করেই পার্বত্য তিন জেলা পরিষদ সকল নিয়োগের ক্ষেত্রেই উপজাতীয়দের অগ্রাধিকার দিয়ে নিয়োগ করে এসেছে। যা কোনোভাবেই আইনসম্মত ছিল না।

সে কারণেই যখন জেলা পরিষদের বিভিন্ন নিয়োগের ক্ষেত্রে উপজাতীয়দের অগ্রাধিকার কোটা বৈধ কিনা সেটা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, তখন গত ১৩ মে ২০২৫ তারিখ পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে কোটার বিষয়ে আগের মতো উপজাতীয়দের অগ্রাধিকার দিয়ে নিয়োগ করা হবে নাকি ২০২৪ সালের ২৩ জুলাই সরকারের সর্বশেষ প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ৯৩% মেধা এবং ৭% কোটার ভিত্তিতে নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে, সে বিষয়ে জানতে চেয়েছে খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদ।

খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদের চিঠিকে রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলা পরিষদের জন্য সমভাবে প্রযোজ্য উল্লেখ করে সাড়ে তিন মাস পর কোটার বিষয়ে আগের মতো সর্বক্ষেত্রে উপজাতীয়দের অগ্রাধিকার কোটা বহাল থাকবে নাকি ২০২৪ সালের প্রজ্ঞাপন মতে ৯৩% মেধা এবং ৭% কোটার ভিত্তিতে নিয়োগ দিতে হবে, সেই বিষয়ে ৩১ আগস্ট ২০২৫ একটি চিঠি পাঠিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মতামত জানতে চেয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের চিঠির জবাবে ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ এক চিঠি দিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তিন পার্বত্য জেলায় উপজাতীয়দের অগ্রাধিকার কোটা বলবৎ থাকবে কিনা সে ব্যাপারে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মতামত গ্রহণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা সমীচীন হবে।

কিন্তু এরপর পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মতামত জানতে চেয়েছে কিনা সে ব্যাপারে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। তবে বিশ্বস্থ একটি সূত্র জানিয়েছে, পার্বত্য মন্ত্রণালয় থেকে ১৮ নভেম্বর পর্যন্ত এমন চিঠি আইন মন্ত্রণালয়ে যায়নি! অর্থাৎ পার্বত্য মন্ত্রণালয় আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত নিয়ে দ্রুত সংকট নিরসনে কোনো উদ্যোগ না নিয়ে বিষয়টিকে বরং ঝুলিয়ে রেখেছে।

পার্বত্য মন্ত্রণালয় একদিকে বিষয়টি ঝুলিয়ে রেখেছে, অন্যদিকে পার্বত্য জেলা পরিষদগুলো একের পর এক নিয়োগের কার্যক্রম চালিয়েই যাচ্ছে। এর ফলে পাহাড়ের অগ্রাধিকার কোটা নিয়ে সংকট ঘনীভূত হয়েছে। আর এই সংকটের দায় পার্বত্য মন্ত্রণালয় কোনোভাবেই এড়াতে পারে না।

২০২৪ সালে কোটা বৈষম্য দূর করতেই গণঅভ্যুত্থান হয়েছে, বর্তমান তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ, পার্বত্য মন্ত্রণালয় এবং সরকারসহ গোটা দেশ সেই বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ফসল। আর বৈষম্যবিরোধী অভ্যুত্থানের সুফল ভোগকারী সরকার, পার্বত্য মন্ত্রণালয় এবং পার্বত্য জেলা পরিষদগুলো তাদের কাছে ন্যাস্ত হস্তান্তরিত বিভাগ/দপ্তরসমূহে পূর্ব থেকে চলমান বেআইনী অগ্রাধিকার কোটা বহাল রাখার কোনো অধিকার রাখে না।

তাই, রাঙ্গামাটিতে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ ঘিরে যে সংকটের সৃষ্টি হয়েছে তা তাদেরকেই দ্রুত সমাধান করতে হবে। সেই সঙ্গে সকল বৈষম্যের বিরুদ্ধে সকলকে অবস্থান নিতে হবে। কেননা সমাজের কোনো একটি অংশে বৈষম্য জিঁইয়ে রেখে সেখানে শান্তির প্রত্যাশা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

লেখক: পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন