পাহাড়ে অসহায়দের পাশে প্রফেসর ফেরদৌসী পারভিন

fec-image

পাহাড়ের প্রান্তিক নারীদের চোখে স্বপ্নের আলো জ্বালাতে, অসহায় মানুষের জীবনে স্বস্তির ছোঁয়া পৌঁছে দিতে “মাত্রা,নারীর স্বস্তির যাত্রা” এই মানবিক মূলমন্ত্রকে সামনে রেখে সামাজিক সংগঠন ‘মাত্রা’ খাগড়াছড়িতে গড়ে তুলেছে এক অনন্য মানবিক দৃষ্টান্ত।

সোমবার (১২ জানুয়ারি) সকালে খাগড়াছড়ি জেলা সদরের খাগড়াপুর এলাকায় আয়োজিত এক মানবিক কর্মসূচিতে অস্বচ্ছল নারী, শারীরিক প্রতিবন্ধী, এতিমখানা ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের মাঝে সেলাই মেশিন, হুইলচেয়ার, কোরআন শরীফ, চাল ও শিক্ষা সামগ্রী বিতরণ করা হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে এসব সহায়তা সামগ্রী বিতরণ করেন ‘মাত্রা’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও গাজীপুর সরকারি মহিলা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর ফেরদৌসী পারভিন। এ সময় নারী উদ্যোক্তা বীণা রাণী ত্রিপুরা, চামেলী ত্রিপুরাসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

বহুমুখী সহায়তায় স্বাবলম্বিতার পথচলা:
এদিন অস্বচ্ছল নারীদের স্বাবলম্বী করতে ৭টি সেলাই মেশিন, শারীরিক প্রতিবন্ধীদের জন্য হুইলচেয়ার, মহিলা এতিম মাদ্রাসা ও নূরানী হাফিজী মাদ্রাসায় কোরআন শরীফ, হামাচাং বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও চম্পাঘাট শিশু সদনের শিক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষা সামগ্রী, ইসলামপুর এতিমখানায় ১০০ কেজি চাল, সবুজ নূরানী মাদ্রাসায় সেলাই মেশিন, রসুলপুর এতিমখানা মহিলা মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের মাঝে স্কুল ড্রেস ও শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করা হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন অস্বচ্ছল পরিবার ও নারীদের প্রয়োজনীয় সামগ্রীও প্রদান করা হয়।

“সহানুভূতি নয়, সুযোগই নারীর শক্তি”:
অনুষ্ঠানে প্রফেসর ফেরদৌসী পারভিন বলেন, “পাহাড়ের নারীরা কখনোই পিছিয়ে নয়,তারা পিছিয়ে থাকে কেবল সুযোগের অভাবে। সহানুভূতি নয়; দক্ষতা ও উপকরণ দিলে একজন নারী নিজেই নিজের ভাগ্য গড়ে নিতে পারে।”

তিনি আরও বলেন,“২০২১ সাল থেকে এই বিশ্বাস থেকেই খাগড়াছড়িতে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সেলাই মেশিন, কোমর তাঁতের সুতা ও প্রয়োজনীয় উপকরণ দিয়ে আসছি। অনেক নারী আছেন, যাদের হাতে কাজ আছে-কিন্তু পুঁজির অভাবে তারা উদ্যোক্তা হতে পারছেন না।”

পাহাড়ের নারীদের ঐতিহ্যের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “থামি, রিনাই-রিসা, কারুকাজের সুতা কিংবা সেলাই,এই পাহাড়ের নারীদের ঐতিহ্যই তাদের শক্তি। আমরা শুধু সেই শক্তিকে কাজে লাগানোর সুযোগ করে দিচ্ছি।”

অবসর ভাতায় মানবতার বিনিয়োগ
অবসর জীবন প্রসঙ্গে আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন, “চাকরি থেকে অবসরে যাওয়ার পর আমার অবসর ভাতার প্রতিটি টাকা আমি পাহাড়ের অসহায় ও অস্বচ্ছল নারীদের জন্য ব্যয় করছি। এটি কোনো দান নয়—এটি আমার সামাজিক দায়িত্ব। যতদিন বেঁচে থাকব, এই মানবিক কাজ অব্যাহত থাকবে।”
তিনি জানান,“২০২১ সাল থেকে এ পর্যন্ত খাগড়াছড়িতে প্রায় ১ হাজার ৭০০ জন অস্বচ্ছল নারী ও পরিবারের মাঝে বিভিন্ন সহায়তা সামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। আজ এতিমখানা, মাদ্রাসা, অনাথ আশ্রম ও প্রতিবন্ধীদের পাশে দাঁড়াতে পেরে আমি গর্বিত।”

উপকারভোগীদের কণ্ঠে নতুন জীবনের গল্প:
সেলাই মেশিন পাওয়া এক নারী বলেন,“সেলাইয়ের কাজ জানতাম, কিন্তু মেশিন কেনার সামর্থ্য ছিল না। আজ এই মেশিন পেয়ে মনে হচ্ছে নতুন করে জীবন শুরু করতে পারব।”

আরেক উপকারভোগী হাসিনা বেগম বলেন,“এই সেলাই মেশিন শুধু কাজের উপকরণ নয়,এটা আমাদের আত্মবিশ্বাস। এখন আর অন্যের ওপর নির্ভর করতে হবে না।”তবলছড়ি থেকে আসা উপকারভোগী নিপু আক্তার বলেন,“আমাদের মতো পাহাড়ের নারীদের কেউ সাধারণত খোঁজ নেয় না। আজ মনে হচ্ছে আমরা একা নই। এই সহায়তা আমাদের জীবনে বড় পরিবর্তন আনবে।”

রসুলপুর এতিমখানা মহিলা মাদ্রাসার প্রতিনিধি শাহ নেওয়াজ বলেন,“শিক্ষা সামগ্রী পেয়ে শিক্ষার্থীরা ভীষণ আনন্দিত। এতে তাদের পড়াশোনার আগ্রহ আরও বাড়বে।” নূরানী হাফিজী মহিলা মাদ্রাসার প্রতিনিধি ফাতেমা আক্তার বলেন,“এই সহায়তা আমাদের শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”

সমাজের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত:
অনুষ্ঠানে উপস্থিত স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা বলেন, পাহাড়ি অঞ্চলের নারীদের স্বাবলম্বী করতে ‘মাত্রা’-র এই উদ্যোগ কেবল সহানুভূতির প্রকাশ নয়, বরং টেকসই উন্নয়নের একটি কার্যকর মানবিক মডেল।

মানবিকতা, স্বাবলম্বিতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে ‘মাত্রা’ আজ খাগড়াছড়ির অসহায় মানুষের জীবনে নতুন আশার আলো জ্বালিয়েছে,যা নিঃসন্দেহে সমাজের জন্য অনুকরণীয়।

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: খাগড়াছড়ি
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন