পাহাড় নিয়ে গভীর ষড়যন্ত্রের নীলনকশা : কথিত সুশীলরা লিখছেন দেশ ভাগের চিত্রনাট্য


বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের মানচিত্রে পার্বত্য চট্টগ্রাম কেবল একটি ভৌগোলিক অঞ্চল নয়; এটি আমাদের জাতীয় অস্তিত্ব, সার্বভৌমত্ব এবং ভূ-রাজনৈতিক নিরাপত্তার এক অবিচ্ছেদ্য প্রাণকেন্দ্র। একাত্তরের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের বিনিময়ে আমরা যে অখণ্ড মানচিত্র লাভ করেছি, আজ পাঁচ দশক পরবর্তী সময়ে এসে সেই মানচিত্রের এক-দশমাংশকে কেন্দ্র করে এক ভয়ংকর আন্তর্জাতিক ও দেশীয় ষড়যন্ত্রের বিষবাষ্প দানা বেঁধেছে। সাধারণ মানুষ যখন দৈনন্দিন জীবিকা ও রাষ্ট্রের উন্নয়ন নিয়ে ব্যস্ত, তখন পর্দার অন্তরালে অত্যন্ত সুক্ষ্মভাবে এবং সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনায় আঁকা হচ্ছে ‘দেশ ভাগের চিত্রনাট্য’। এই নীল নকশার একটি দিক যদি হয় সীমান্তে অস্ত্র ও মাদকের ঝনঝনানি, তবে অন্য দিকটি অত্যন্ত ভয়াবহ—যা ঢাকা ও বিদেশের এসি রুমে বসে লিখছেন একদল উচ্চশিক্ষিত ‘মীরজাফর’ সুশীল। আজ সময় এসেছে এই ষড়যন্ত্রের মুখোশ উন্মোচন করার।
পাহাড়ের এই সংকট আজ আর কেবল আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর চাঁদাবাজি বা নাশকতায় সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন একটি পূর্ণাঙ্গ ‘হাইব্রিড ওয়ারফেয়ার’ বা ছদ্মযুদ্ধে পরিণত হয়েছে। আমি আমার দীর্ঘদিনের গবেষণা এবং বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রবন্ধগুলোতে বারবার সতর্ক করেছি যে, পাহাড়কে নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক স্বার্থান্বেষী মহল বাংলাদেশকে ‘ফেইলড স্টেট’ বা ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’ হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করছে। তারা পাহাড়ের সহজ-সরল মানুষকে দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করছে, যেখানে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ থাকবে নড়বড়ে এবং বিচ্ছিন্নতাবাদীরা পাবে একচ্ছত্র রাজত্ব।
এই গভীর ষড়যন্ত্রের প্রথম ধাপটি হলো—মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। ঢাকার বুদ্ধিজীবী সমাজের একটি অংশ, যাদের আমরা ‘সুশীল সমাজ’ হিসেবে চিনি, সেই কথিত সুশীলরা আন্তর্জাতিক এনজিও-র কয়েকশ কোটি টাকার তহবিলের লোভে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে নিলামে তুলেছেন। তারা পাহাড়ে শান্তি রক্ষার দোহাই দিয়ে ‘জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ’ চাইছেন। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে বিজাতীয় শক্তির পদচারণা চাওয়া মানেই হলো নিজের সার্বভৌমত্ব বিসর্জন দেওয়া। প্রশ্ন হলো—কেন আজ একাত্তরের বিজয়ী জাতি নিজের ভূমিতে বিজাতীয় রক্ষক খুঁজবে? এর উত্তর লুকিয়ে আছে তাদের ‘ইস্ট তিমুর’ বা ‘দক্ষিণ সুদান’ মডেলে। তারা পাহাড়কে এমনভাবে অস্থিতিশীল করতে চায় যেন আন্তর্জাতিক বিশ্ব মনে করে এখানে ‘গণহত্যা’ চলছে, আর সেই অজুহাতে এখানে জাতিসংঘের ‘ব্লু হেলমেট’ বা শান্তিরক্ষী বাহিনী নামিয়ে দেওয়া যায়। একবার বিজাতীয় বাহিনী এখানে আসন গেড়ে বসলে, এদেশের মানচিত্র থেকে সম্পদশালী ওই এক-দশমাংশ এলাকা বিচ্ছিন্ন হওয়া কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র। এই অন্ধকার সময়ে সুশীলদের কলম আজ দেশভাগের চিত্রনাট্য লিখছে। তারা পাহাড়ের ইস্যুকে আন্তর্জাতিকীকরণ করে বাংলাদেশকে খণ্ডিত করতে চায়।
মানচিত্রের ওপর শকুনের ছায়া দীর্ঘতর হচ্ছে। পাহাড় বাংলাদেশের ভূখণ্ডের এক-দশমাংশ এবং আমাদের জাতীয় সার্বভৌমত্বের এক সুকৌশলী ঢাল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে পাহাড়ের আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। এই নীল নকশার স্বরূপ বুঝতে আমাদের নিচের সাতটি পয়েন্টের গভীরতা অনুধাবন করতে হবে:
ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট: সীমান্তে মেঘের ঘনঘটা
আমি আমার ‘সীমান্তে সেনা বাড়াচ্ছে ভারত-মিয়ানমার’ প্রবন্ধে বিস্তারিতভাবে দেখিয়েছি যে, আমাদের ভৌগোলিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সামরিক কৌশল কীভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে। বান্দরবান ও রাঙামাটির দুর্গম সীমান্তে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের অজুহাতে আরাকান আর্মির মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর আনাগোনা বেড়েছে। গত ১৬ ও ১৭ এপ্রিল থানচিতে ‘আরাকা ওয়াটার ফেস্টিভ্যাল’-এর আড়ালে আরাকান আর্মি যে সশস্ত্র মহড়া দিয়েছে, তা আমাদের সার্বভৌমত্বের গালে চড় মারার সমান। সীমান্তের ওপারে যখন ভিনদেশি সামরিক শক্তি ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ওত পেতে থাকে, তখন দেশের ভেতরে থেকে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ চাওয়া মানে হলো শত্রুর হাতে নিজের ঘরের চাবি তুলে দেওয়া। এই কৌশলটি মূলত একটি আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অংশ, যার উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশকে একটি অস্থিতিশীল রাষ্ট্রে পরিণত করা। বর্তমানে ইউপিডিএফ-জেএসএস এর ৪ টি সংগঠনের পাশাপাশি মগ লিবারেশন পার্টি-এমএলপি ও আরাকান আর্মির সশস্ত্র মহড়া আর কেএনএফ-এর ব্যাংক ডাকাতি—সবই একটি জায়গায় গিয়ে একই সুতোয় গাঁথা।
‘আদিবাসী’ কার্ড ও আন্তর্জাতিক আইনের ফাঁদ
ষড়যন্ত্রের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হলো ‘আদিবাসী’ তকমা। এর আগেও আমি আমার ‘আদিবাসী স্বীকৃতির দাবি কার স্বার্থে’, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের নৃ-গোষ্ঠীগুলো আদিবাসী না অভিবাসী: ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ’, ‘পাহাড়ে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নেও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দ্বিচারিতা’ এবং ‘গণমাধ্যম কমিশনের প্রতিবেদনে আদিবাসী: রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতার বিরুদ্ধে উস্কানি’ প্রবন্ধে তথ্য-প্রমাণসহ দেখিয়েছি যে, এই দাবিটি নিছক সাংস্কৃতিক পরিচয়ের দাবি নয়। এটি একটি আন্তর্জাতিক আইনি ফাঁদ। জাতিসংঘের ২০০৭ সালের ঘোষণাপত্র অনুযায়ী ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতি পাওয়ার অর্থ হলো ‘আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার’ বা ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে আলাদা রাষ্ট্র গঠনের বৈধতা লাভ করা। ফলে আমাদের সংবিধানে নৃগোষ্ঠীগুলোকে যথাযথ সম্মান দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সুশীলরা সচেতনভাবে ‘আদিবাসী’ শব্দের জন্য উন্মাদনা তৈরি করছেন যাতে কালক্রমে তারা আন্তর্জাতিক আদালতে গিয়ে বাংলাদেশের অখণ্ডতাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে।
পাহাড় নিয়ে ষড়যন্ত্রের জালটি আরও স্পষ্ট হয় যখন আমরা দেখি ঢাকার একদল তথাকথিত সুশীল ও স্বার্থান্বেষী মহল আন্তর্জাতিক আইনের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে রাষ্ট্রকে বিভ্রান্ত করছে। আইএলও (আইএলও) কনভেনশন ১০৭ ও ১৬৯-এর শিরোনামেই ‘আদিবাসী’ (ইনডিজিনাস্) ও ‘উপজাতি’ (ট্রাইবাল) শব্দ দুটি আলাদাভাবে উল্লেখ থাকলেও বাংলাদেশের এই মতলববাজ বুদ্ধিজীবীরা অত্যন্ত সুকৌশলে ‘উপজাতি’ বা ‘ট্রাইবাল’ সংজ্ঞাটি চেপে গিয়ে কেবল ‘আদিবাসী’ পরিচয়টি প্রতিষ্ঠা করতে মরিয়া। অথচ আইএলও কনভেনশন ১৬৯-এর আর্টিকল ১(ক) অনুযায়ী—যাদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা জাতীয় সম্প্রদায়ের অন্য অংশ থেকে আলাদা এবং যারা নিজস্ব ঐতিহ্য ও আইন দ্বারা পরিচালিত, তারাই ‘উপজাতি’। পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা, মারমা ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলো আভিধানিক ও আইনিভাবে এই সংজ্ঞার আওতাভুক্ত। কিন্তু ষড়যন্ত্রকারীরা কেন তাদের ‘আদিবাসী’ বানাতে চায়? কারণ, ‘আদিবাসী’ তকমাটি জুটলে তারা আর্টিকল ১(খ) অনুযায়ী ‘প্রি-কলোনিয়াল’ বা এই ভূখণ্ড দখলের পূর্ববর্তী বাসিন্দা হিসেবে স্বীকৃতি পাবে, যা কালক্রমে তাদের ভূমির একচ্ছত্র মালিকানা এবং ‘আত্মনিয়ন্ত্রণ’-এর নামে আলাদা রাষ্ট্র গঠনের আইনি হাতিয়ার দেবে। যেখানে বিশ্বজুড়ে মাত্র ২৩টি দেশ এই বিপজ্জনক কনভেনশন ১৬৯ অনুমোদন করেছে এবং এমনকি নেপাল ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার কোনো দেশই এতে স্বাক্ষর করেনি। এমনকি শুধু বাংলাদেশই নয় প্রতিবেশি ও নিকট প্রতিবেশি ভারত, পাকিস্তান, চীন, শ্রীলঙ্কাসহ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া কেউ স্বাক্ষর করেনি। সেখানে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে আইনি মরণফাঁদে ফেলতে সুশীলদের এই ‘আদিবাসী’ প্রীতি মূলত একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রটি রাষ্ট্রদ্রোহিতা ছাড়া আর কিছুই নয়।
আঞ্চলিক পরিষদ: এক রাষ্ট্রে দ্বৈত কাঠামোর প্রশাসনিক আত্মঘাত
পাহাড়ের শাসনব্যবস্থাকে রাষ্ট্রের মূল কাঠামো থেকে বিচ্ছিন্ন করার এক সুক্ষ্ম প্রশাসনিক চক্রান্ত চলছে। ইতিপূর্বে দৈনিক নয়া দিগন্তে প্রকাশিত ‘পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদ: একক রাষ্ট্রে দ্বৈত কাঠামো’ প্রবন্ধে বিশ্লেষণ করেছি যে, কীভাবে একটি এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রে সমান্তরাল শাসনব্যবস্থা কায়েম করা হচ্ছে। আঞ্চলিক পরিষদকে এমন সব ক্ষমতা দেওয়ার দাবি তোলা হয়, যা মূলত কেন্দ্রীয় সরকারের কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করে। এই দ্বৈত কাঠামো পাহাড়ের বাঙালিদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক বানিয়ে রেখেছে। শুধু তাই নয়, তাদের ‘কথিত অ-উপজাতি’ হিসেবে চিহ্নিত করে পরিচয় মুছে দেয়ারমত ভয়ঙ্কর কাজ করেছে রাষ্ট্রীয় মদদে।
একটি দেশের ভেতরে যখন দুটি ভিন্ন আইন বা শাসনব্যবস্থা প্রবর্তনের চেষ্টা করা হয়, তখন সেই রাষ্ট্রের অখণ্ডতা বেশিদিন টিকে থাকে না। এই কাঠামোগত দুর্বলতাকেই কাজে লাগিয়ে সুশীলরা আজ জাতিসংঘের হস্তক্ষেপের ক্ষেত্র প্রস্তুত করছেন।
উদ্বাস্তু সমস্যা ও জাতিগত নিধনের নীলনকশা
পাহাড়ের ট্র্যাজেডির সবচেয়ে বড় শিকার হলো ‘বাতির নিচে অন্ধকর’ এরমত সেখানে বসবাসরত বাঙালিরা। সবাই সেখানকার নৃগোষ্ঠী বা উপজাতির দিকে দৃষ্টি দিতে গিয়ে স্থানীয় বাঙালিদের নির্দয় ভাবে এড়িয়ে যান। ফলে সেখানে নানাভাবে নিগৃহ হতে থাকে বাঙালিরা। যা ‘৬১ হাজার উদ্বাস্তু পার্বত্য বাঙালির অধিকার নিয়ে ছিনিমিনি’ এবং ‘পাহাড়ের শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু পুনর্বাসন টাস্কফোর্সের কাজ কি?’ নিবন্ধে স্পষ্ট করেছি যে, পাহাড়ের উদ্বাস্তু সমস্যাকে সিলেক্টিভ বা একপাক্ষিক বানিয়ে রাখা হয়েছে। যেখানে উপজাতীয় শরণার্থীদের পুনর্বাসনে রাষ্ট্র ও এনজিওগুলো শতকোটি টাকা ঢালছে, সেখানে ভূমিপুত্র বাঙালিদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করে ‘গুচ্ছগ্রামে’ অমানবিক জীবন কাটাতে বাধ্য করা হচ্ছে। ষড়যন্ত্রকারীরা চায় পাহাড় থেকে বাঙালিদের সম্পূর্ণ উচ্ছেদ করতে। তারা প্রচার করে যে বাঙালিরা ‘সেটলার’ বা বহিরাগত। অথচ এই ভূমি আমাদের পূর্বপুরুষদের। স্পষ্টত চট্টগ্রাম জেলা থেকে প্রশাসনিক সবিধা নিতে ব্রিটিশ রাজ পার্বত্য চট্টগ্রাম সৃষ্টি করে। যার সূত্রধরে স্বাধীনতারপর খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি এবং বান্দরবান নামে জেলা সৃষ্টি হয়। কিন্তু পুরো এলাকাটি নিঃসন্দেহে চট্টগ্রামেরই অংশ।
অথচ, সুশীলরা যখন এনজিও-র এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে কেবল ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের মানবাধিকারের কথা বলেন এবং উদ্বাস্তু বাঙালিদের মানবেতর জীবনের ওপর নিশ্চুপ থাকেন, তখন বুঝতে হবে তারা একটি ‘এথনিক ক্লিনজিং’ বা জাতিগত নিধনের চিত্রনাট্যে অভিনয় করছেন।
বুদ্ধিবৃত্তিক ষড়যন্ত্র ও সুশীলদের রাষ্ট্রদ্রোহিতা
বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো বুদ্ধিজীবীদের একটি অংশের প্রকাশ্য রাষ্ট্রবিরোধী অবস্থান। গত ১৩ নভেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকে যা বলা হয়েছে, তা সরাসরি রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল।
বিদ্রোহের উস্কানি: একটি শীর্ষস্থানীয় জাতীয় পত্রিকার সিনিয়র সাংবাদিক যখন ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বলেন- পাহাড়ের উপজাতিদের একমাত্র উপায় হলো বিদ্রোহ করা, তখন তিনি মূলত গৃহযুদ্ধের উস্কানি দিচ্ছেন।
সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মিথ্যাচার: বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন বা বিভাগীয় প্রধানদের মতো উচ্চপদে থেকে যখন নিজ দেশের সেনাবাহিনীকে এবং স্থানীয় বাঙালিদের ‘গণহত্যাকারী’, ‘ধর্ষক’ ও ‘লুটপাটকারী’ হিসেবে চিত্রায়িত করেন, তখন বুঝতে হবে এই বুদ্ধিবৃত্তিক সন্ত্রাসীরা সরাসরি বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার এবং বিভিন্ন দেশের পেইড এজেন্ট হিসেবে কাজ করছেন।
আন্তর্জাতিক লবিং: ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায় ও বার্মিজ বংশোদ্ভূত তার দ্বিতীয় স্ত্রীর ইয়েন ইয়েস’র ‘ইস্ট তিমুর মিশন’ আজ আর গোপন কোনো বিষয় নয়। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছে প্রতিনিয়ত দেশের বিরুদ্ধে নালিশ করা এবং স্যাটেলাইট প্রযুক্তি (যেমন স্টারলিংক) ব্যবহারের মাধ্যমে দুর্গম পাহাড়ে বসে বিদেশি প্রভুদের সাথে যোগাযোগ রাখা—সবই একটি বৃহৎ পরিকল্পনার অংশ।
অস্ত্র ও মাদকের অর্থনীতি: সন্ত্রাসবাদের বিশাল সাম্রাজ্য
পাহাড়ের এই বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন কোনো আদর্শিক লড়াই নয়, বরং এটি একটি বিশাল অপরাধ সাম্রাজ্যের অংশ। সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জেএসএস হোক বা ইউপিডিএফ—এরা আজ কেবল রাজনৈতিক দল নয়, বরং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে হত্যা, অপহরণ, চাঁদাবাজি, মাদক ও অস্ত্রের বিশাল অর্থনীতির অংশীদার।
মিজোরামের আদালতের নথি প্রমাণ করে যে, পাহাড়ের এই সশস্ত্র গ্রুপগুলো সীমান্তের ওপার থেকে শতকোটি টাকার মাদকের কারবার নিয়ন্ত্রণ করছে। চাঁদাবাজির অর্থের পাশাপাশি এই বিষাক্ত মাদকের অর্থের বিনিময়ে কেনা ভারী অস্ত্র দিয়েই তারা আমাদের সার্বভৌমত্ব এবং বীর সেনাবাহিনীকে টার্গেট করছে। অথচ ঢাকার সুশীলরা এই সন্ত্রাসীদের ‘মানবাধিকার’-এর চাদরে ঢেকে রাখছেন।
আমরা অনেকেই ভাবি পাহাড়ে সন্ত্রাসীরা চলে কীভাবে? উত্তর মিলেছে ভারতের মিজোরামের জেলা ও দায়রা আদালতের নথিপত্রে। মিজোরামে একটি চাঞ্চল্যকর মাদক কারবারের ঘটনায় সন্তু লারমা নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি-জেএসএস (সন্তু)- এর সংশ্লিষ্টতার জোরালো অভিযোগ উঠেছে। জেলা ও দায়রা আদালতের নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০২৪-২০২৫ সালে এই চক্রে জড়িত থাকার অভিযোগে অন্তত ১১ জন চাকমা নাগরিককে নারকোটিক ড্রাগস অ্যান্ড সাইকোট্রপিক সাবস্ট্যান্সেস অ্যাক্ট (এনডিপিএস), ১৯৮৫-এর অধীনে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ভারতে।
আদালতের কেস স্ট্যাটাস অনুযায়ী, গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে রয়েছেন বারণ চাকমা, ড্যানিয়েল চাকমা, ডিম্পু চাকমা, লোতিকা চাকমা, নুঙাং চাকমা, সনাতন চাকমা, দিবন তং সাঙ্গ্যা এবং সঞ্চিত চাকমা। এর বাইরেও দুটি বিশাল মাদকের চালান আটকের তথ্য পাওয়া গেছে, যা এই চক্রের ভয়াবহতা প্রমাণ করে। গত বছরের (২০২৫) ১৯ জুন সপ্না চাকমা ও পুনসুর চাকমাকে ১০.৪৩ কোটি টাকা মূল্যের মাদকসহ আটক করা হয়। এরপর ২১ আগস্ট শান্তি জিবন চাকমা ও বৃষধন চাকমাকে ১.২ কোটি টাকার মাদকসহ আটক করা হয়। আইজল পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে, খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটির সীমান্ত এলাকায় জব্দ হওয়া মাদকের চালানের পেছনে জেএসএস’র একটি বহুতর বিশিষ্ট নেটওয়ার্ক কাজ করছে।
অভিযোগ রয়েছে, জেএসএস শুধু মাদক নয়, গরু, কসমেটিকস, বার্মিজ সিগারেট এবং অ্যালকোহলসহ বিভিন্ন পণ্যের চোরাচালানেও ব্যাপকভাবে জড়িত। মাদক পাচারের এই বিশাল অর্থের ওপর নির্ভরশীল নেটওয়ার্কটি স্থানীয় সমাজে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
জেগে ওঠার এখনই সময়
আজ সময় এসেছে এই মুখোশধারী বুদ্ধিবৃত্তিক মীরজাফরদের চিনে নেওয়ার এবং পাহাড়ের অখণ্ডতা রক্ষায় দেশপ্রেমিক জনতাকে সোচ্চার হওয়ার। পাহাড় আমাদের অহংকার, পাহাড় আমাদের মানচিত্রের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। কোনো এনজিও-র তহবিল বা সুশীলদের প্রোপাগান্ডায় আমরা আমাদের রক্তে কেনা মানচিত্র ছিঁড়তে দেব না।
করণীয়:
১. পাহাড়ের সাধারণ নিরস্ত্র উপজাতি বা নৃগোষ্ঠী এবং সকল বাঙালির নিরাপত্তা ও উপজাতি উদ্বাস্তুদের সাথে ৬১ হাজার বাঙালি উদ্বাস্তুদেরও যথাযথ পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে।
২. আঞ্চলিক পরিষদের একপাক্ষিক ও বৈষম্যমূলক ক্ষমতার অবসান ঘটিয়ে সংবিধানের মূল ধারার সাথে পাহাড়কে সম্পৃক্ত করতে হবে।
৩. যেসব বুদ্ধিজীবী ও সুশীলরা প্রকাশ্য রাষ্ট্রদ্রোহিতায় লিপ্ত, তাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।
৪. সীমান্তে নিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের দমনে সেনাবাহিনীর সক্ষমতা আরও বাড়াতে হবে। এবং
৫. পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির (কথিত শান্তি চুক্তি) সংবিধানের সাথে সাঙ্ঘর্ষিক এবং বিভিন্ন জাতিসত্ত্বার সাথে বৈসম্যমূলক ধারাগুলো বাতিল এবং সংস্কার করার ব্যবস্থা নেয়া।
ভুলে গেলে চলবে না- পাহাড় তথা পার্বত্য চট্টগ্রাম আমাদের অস্তিত্ব। এই মাটি আমাদের পূর্বপুরুষের রক্তের বিনিময়ে কেনা। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে ১নং সেক্টরের বীর মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করে প্রাণ দিয়েছেন। একজন বীর শ্রেষ্টসহ অনেক বীর যোদ্ধা শহীদ হয়েছেন এই পাহাড়কে হানাদার মুক্ত করতে গিয়ে। মনে রাখতে হবে- দেশপ্রেমিক জনতা আজ জাগ্রত, আর ষড়যন্ত্রকারীদের পরাজয় নিশ্চিত।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

















