পাহাড়ের নিরাপত্তার জন্য অপেক্ষা সীমান্ত সড়কের

fec-image

পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তাগত অনেক সমস্যারই সমাধান হবে সীমান্ত সড়ক নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে। ভারত ও মিয়ানমারের সীমান্তসংলগ্ন পার্বত্য জেলাগুলোতে এ প্রকল্পের প্রথম ধাপে ৩১৭ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ শেষ হওয়ার কথা আগামী ৩০ জুনের মধ্যে। এতে যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নের মাধ্যমে নিরাপত্তা জোরদার হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা, রাঙামাটির জুরাইছড়ি, বড়কল ও রাজস্থলি উপজেলা, কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলা এবং খাগড়াছড়ির বাঘাইছড়ি উপজেলার প্রান্ত দিয়ে সড়কটি নির্মাণ করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, এসংক্রান্ত প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছিল ২০১৮ সালের মার্চে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায়। প্রকল্পটি সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্যাটালিয়নের মাধ্যমে বাস্তবায়ন হচ্ছে। প্রথম ধাপ ও অন্যান্য ধাপ মিলিয়ে মোট এক হাজার ৩৬ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ হবে প্রকল্পটিতে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে এক লাখ ৬৯ হাজার ৯৮৪ কোটি ৯২ লাখ টাকা। ১০ বছরে এর কাজ শেষ হওয়ার কথা।

তবে সওজ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আসমা আক্তার জাহান বলেন, ‘প্রকল্পটি কিছুটা রিভাইজ (সংশোধন) হচ্ছে। কাজের নির্ধারিত সময়ের পরিবর্তন হতে পারে।’

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পার্বত্য জেলাগুলোতে ৫৪০ কিলোমিটার সীমান্ত আছে। এসব সীমান্ত দিয়ে চোরাচালান, অবৈধ অস্ত্র ও মাদকের ব্যবসা, এমনকি মানবপাচারও হয়। ওই সব অপরাধ ঠেকাতে এবং সীমান্তে সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সীমান্ত সড়ক নির্মাণ করছে সরকার। এতে নিরাপত্তা সুরক্ষিত হওয়া ছাড়াও নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে উঠবে।

গত ১৫ অক্টোবর বান্দবানের থানচিতে পুলিশের থানা ভবন উদ্বোধন করতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান সড়কটির গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, এটি হলে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিনিয়োগ বাড়বে।

পাহাড়ের সাধারণ মানুষের ধারণা, এই সীমান্ত সড়ক এই অঞ্চলের অস্থিরতা কমাতে, সন্ত্রাসী কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণে আনতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র জানায়, পার্বত্যাঞ্চলের সীমান্তের কিছু অরক্ষিত এলাকা বিভিন্ন অপরাধের প্রবেশদ্বারে পরিণত হয়েছে। এই পথ দিয়ে অবাধে আসছে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, গ্রেনেড, একে-৪৭ রাইফেল, গোলাবারুদসহ আগ্নেয়াস্ত্রের চালান। একই সঙ্গে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকের চালানও আসছে।

দুর্গমতার কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সেখানে নিয়মিত টহল দিতে পারে না। সেখানে দ্রুত পৌঁছানোও অনেক ক্ষেত্রে সম্ভব হয় না। সে কারণে ওই অরক্ষিত সীমান্ত দিয়ে বিনা বাধায় আসছে অস্ত্র ও মাদক। পাহাড়ের সশস্ত্র সংগঠনগুলোর কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। এ বাস্তবতায় সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বান্দরবানে। এ জেলার সঙ্গে পাশের দেশের ২৮ কিলোমিটার সীমান্ত অরক্ষিত। পাহাড় ও গহিন অরণ্যে কোনো যোগাযোগব্যবস্থা না থাকার কারণে পাহারাও নেই। ফলে এ এলাকাটি হয়ে উঠেছে অস্ত্র সংগ্রহের প্রধান রুট। রোহিঙ্গা সংকটের কারণে এ সীমান্ত এলাকা স্পর্শকাতর হিসেবে চিহ্নিতও। এ রকম অবস্থায় পাহাড়ের সশস্ত্র সংগঠনগুলোও এখানে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে তৎপর। বান্দরবানের এ পরিস্থিতির কারণে অন্য দুই পার্বত্য জেলাও নিরাপদ নয়।

গত ২৯ নভেম্বর খাগড়াছড়িসংলগ্ন রাঙামাটির বাঘাইছড়ি থানার অস্ত্র উদ্ধার প্রসঙ্গে আইএসপিআর গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে জানায়, থানার দুর্গম ভুয়াছড়ি এলাকায় কিছু আঞ্চলিক সন্ত্রাসী দলের কার্যক্রম বেড়েছে। দুর্গমতার সুযোগ নিয়ে আঞ্চলিক সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো সংগঠিত হচ্ছে। খাগড়াছড়ির পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আব্দুল আজিজ এ প্রসঙ্গে বলেন, অঘটনের কোনো খবর পেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সেখানে পৌঁছে যায়। তবে ভূখণ্ডগত বৈশিষ্ট্যের কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সব এলাকায় দ্রুত পৌঁছতে পারে না।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুসারে ২০১৮ সালের শুরু থেকে গত অক্টোবর পর্যন্ত পাহাড়ে আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর মধ্যে আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজিসহ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জেরে ৩৭৬ জন নিহত এবং ৯৭৪ জন আহত হয়েছে। অপহৃত হয়েছে ৫৩৮ জন। এই সাত বছরে গুলিবিনিময়ের ঘটনা ঘটেছে ২১৭ বার। উপজাতি সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার হয়েছে এক হাজার ৫৯৬ জন। ৬২২টি গোলাবারুদ এবং ১০ হাজার ১০১টি গুলি উদ্ধার করা হয়েছে।

সূত্র: কালের কণ্ঠ

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

twenty + 15 =

আরও পড়ুন