পাহাড়ের মানুষের বাড়তি আয়ের উৎস ফুলঝাড়ু

fec-image

পাহাড়ে বিকল্প আয়ের উৎস হয়ে উঠেছে ফুলঝাড়ু। পাহাড়ের প্রায় প্রতিটি বাড়ির বাসিন্দারা এখন ব্যস্ত হয়ে আছেন ফুলঝাড়ু সংগ্রহ ও শুকিয়ে নেবার কাজে। সকাল সকাল বেরিয়ে পড়েন কোনাল ত্রিপুরা, আপ্রুসি মার্মা, রিনা, ত্রিদিবরা। দিনভর পাহাড়ে ঘুরে তুলে আনেন গুচ্ছ গুচ্ছ ফুল। ৭-১০টি ফুলে একটি আঁটি। আর এমন একটি আঁটি বাজারে বিক্রি হয় ১৩ থেকে ১৫ টাকায়। এভাবেই ১০০ আঁটি ফুলঝাড়ু বিক্রি হচ্ছে ১৩০০ থেকে ১৫০০ টাকায়। সপ্তাহে ১০০ আঁটি ফুলঝাড়ু সংগ্রহ করতে পারে অনেকেই এমনটাই জানিয়েছেন লক্ষ্মীছড়ির এলাকার বাসিন্দা মানিক ত্রিপুরা

তিনি জানান, অনেকেই এক মৌসুমে পাহাড় থেকে সংগ্রহ করা ফুলঝাড়ু বিক্রি করে আয় করে ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকা। তার মতে পুঁজি দিয়ে কৃষি কাজের চেয়ে বিনা পুঁজিতে বছরে চার মাস ফুলঝাড়ু সংগ্রহে অধিকতর লাভজনক।পাহাড়ি জুমিয়া পরিবারের নারীরাও জুমচাষের কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে পাহাড় থেকে ফুল ঝাড়ু তৈরি করে স্থানীয় বাজারগুলোতে বিক্রি করে নিয়মিত। স্থানীয় পাহাড়ি নারীরা সংসারে বাড়তি আয়ের পথ হিসেবে এটিকে বেছে নিয়েছে।

সাধারণত ফুলঝাড়ু গাছ বাংলাদেশে খাড়া পাহাড়ের ঢালে, বনজঙ্গলে জন্মে। নদীর তীরের বালুমাটিতে, আদ্র খাড়া গিরিখাতের কিনারেও ভালো জন্মে। এই গাছগুলো অপেক্ষাকৃত কম উর্বর জমিতে এবং মারজিনাল ল্যান্ডেও হয়। বাংলাদেশে পূর্বাঞ্চলীয় পাহাডড়ি এলাকায় এই গাছ সহজলভ্য। বাংলাদেশে ফুলঝাড়ু গাছের চাষ করার প্রয়োজন পড়ে না, পাহাড়ি অঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে জন্মায় এই গাছ। রাইজোম থেকে নতুন গাছ জন্মায় মে অথবা জুন মাসের দিকে। কাণ্ডসহ শাখান্বিত পুষ্পমঞ্জুরী ঝাড়ু হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পুষ্পমঞ্জুরী ম্যাচিউর করলে ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত শুরু হয় ফুল সংগ্রহ করা। শীতের সময়ে ফুল সবুজ রঙের থাকে। এরপর বসন্তে এই মঞ্জুরী বাদামী বর্ণ ধারন করে ধীরে ধীরে। তারপর ফুল কেটে ঝাড়ু বানানো হয়। বনের পাশে, নদীর ধারে, নিবিড় অরন্যে এবং পাহাড়ের ঢালে এই গাছগুলোকে বেশ সুন্দর দেখা যায়।

খাগড়াছড়ির পানছড়ি, দীঘিনালা, মাটিরাঙ্গা, গুইমারা, লক্ষ্মীছড়ি ও পাশের জেলা রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি ও সাজেকের বিভিন্ন এলাকা থেকে ফুলঝাড়ু সংগ্রহ করা হয়। বাংলাদেশে এই ফুলঝাড়ু বিক্রি করে চলে সহস্রাধিক পরিবার। পাহাড়ে ফুলঝাড়ুর চাহিদা বাড়ছে দিনদিন, কারণ অন্যান্য ঝাড়ুর চেয়ে এটি সহজে ব্যবহার করা যায় এবং বেশি কার্যকরী। দেশের সব জায়গায় এই ফুলের ঝাড়ু বেশ ব্যবহার হয়। এই ঝাড়ুগুলো দেখতে সুন্দর, দাম কম এবং টেকে বেশিদিন। পাহাড়ি এলাকার শিশুরাও বড়দের মতো এই গাছ থেকে ঝাড়ু বানাতে বেশ দক্ষ হয়ে উঠেছে। এই সমস্ত এলাকায় সপ্তাহে গড়ে ২ থেকে ৩ লাখ টাকার ফুলঝাড়ু বিক্রি হয়। ফুলঝাড়ু বিক্রির মাধ্যমে বন বিভাগের রাজস্ব আয়ও হয়েছে।

পাহাড়ের ফুলঝাড়ুর চাহিদা বাড়ছে দিনদিন। কারণ অন্যান্য ঝাড়ুর চেয়ে এটি সহজে ব্যবহার করা যায়। দেখতে সুন্দর, টিকে বেশিদিন ও দামে কম। খাগড়াছড়ি পৌর বাস টার্মিনালের পাশে বিশাল খোলা মাঠ। সেখানেই স্থানীয় বাজার ও বিভিন্ন পাহাড়ি পল্লী থেকে সংগ্রহ করা ফুলঝাড়ু সারিবদ্ধভাবে শুকানো হচ্ছে। শুকানো শেষেই এসব ফুলঝাড়ু পাইকারের হাত ধরে যাবে দেশের সমতলের বিভিন্ন জেলায়।

লক্ষ্মীছড়ির পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর বিনিময় ত্রিপুরা, মালতি ত্রিপুরা পাহাড়ে ঘুরে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো ফুলঝাড়ু সংগ্রহ করে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করেন। এ থেকেই চলে তাদের সন্তানের লেখাপড়ার খরচসহ সংসারের যাবতীয় ব্যয়। এদের মতোই পাহাড়ের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর অনেকেরই আয়ের অন্যতম উৎস ফুলঝাড়ু।

সম্প্রতি এ পেশার সঙ্গে বাঙালি জনগোষ্ঠীর লোকজনও জড়িয়ে পড়েছেন। সময়ের ব্যবধানে পাহাড়ের ফুলঝাড়ুতে সমৃদ্ধ হচ্ছে পাহাড়ের অর্থনীতি। এক হাত দুই হাত করে পাহাড়ের ফুলঝাড়ু রফতানি হচ্ছে নোয়াখালী, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, ঢাকা ও টাঙ্গাইলের মতো বড় বড় শহরে। সমতলের জেলাগুলোতে পাহাড়ের ফুলঝাড়ুর কদরও অনেক বেশি বলে জানিয়েছেন খাগড়াছড়িতে আসা পাইকাররা।

খাগড়াছড়ির আড়তদার সুকমল বলেন, ফুলঝাড়ু পাহাড়ের মানুষের বাড়তি আয়ের পথ খুলে দিয়েছে। অনেকেই গভীর জঙ্গল থেকে ফুলঝাড়ু সংগ্রহ করে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করেন। আবার অনেক আড়তদার বা পাইকার তাদের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা ফুলঝাড়ু কিনেন।

জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসরত পাহাড়ি-বাঙালিদের কাছ থেকে পাইকারি দামে উল ফুল কিনে এনে রোদে শুকিয়ে ঝাড়ুর আঁটি বানিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন হাট-বাজারগুলোতে সরবরাহ করছেন কয়েকজন ব্যবসায়ী। বাজারে প্রতি হাজার ঝাড়ু ফুলের শলাকা সাড়ে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায় বেচা-কেনা হচ্ছে। প্রতিদিন একজন শ্রমজীবী মানুষ পাহাড় থেকে এক থেকে দেড় হাজার পর্যন্ত উল ফুলের শলাকা কেটে সংগ্রহ করে করতে পারে।

ঝাড়ু ফুল ব্যবসায়ী মোহাম্মদ শাহ আলম জানান, দীর্ঘ ২১ বছর ধরে পাহাড়ের নিম্ন আয়ের লোকজনদের কাছ থেকে পাইকারি দরে ঝাড়ু ফুলের আঁটি কিনে ট্রাকে করে চট্টগ্রাম-ঢাকায় নিয়ে বিক্রি করেন। তার অধীনে দু‘শতাধিক নারী-পুরুষ শ্রমিক উল ফুল রোদে শুকানো এবং ঝাড়ুর আঁটি বানানোর কাজে নিয়োজিত রয়েছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া গেলে পাহাড়ের মানুষের আর্থিক সংকট নিরসনে ঝাড়ু ফুল শিল্প সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারবে।

ঝাড়ু তৈরির শ্রমিক মাসুমা আক্তার, সালমা খাতুনসহ কয়েকজন বলেন, ‘পাহাড় থেকে সংগ্রহ করা ঝাড়ু ফুলের আঁটি তৈরির কাজ করেন তারা। প্রতিদিন আঁটি বানিয়ে দেড়শ থেকে আড়াইশ টাকা পর্যন্ত পান তারা। এই টাকা দিয়ে তাদের সংসার মোটামুটি চলে। ছেলে-মেয়ের লেখাপড়ার খরচ চালাতে কাজে লাগে।

এ ব্যাপারে খাগড়াছড়ি রেঞ্জ কর্মকর্তা, বাবুরাম চাকমা বলেন, ‘পাহাড়ে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো উলফুল ঝাড়ু হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের পিছিয়ে পড়া পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর আর্থিক সংকট নিরসনে ঝাড়ু ফুল ক্ষুদ্র কুটির শিল্প সহায়ক ভূমিকা রাখছে। ঝাড়ু ফুল বিক্রি করে খাগড়াছড়িতে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন দরিদ্র শ্রমজীবী মানুষরা এবং সরকারের বার্ষিক রাজস্ব আয় হচ্ছে ৪০ থেক ৫০ লক্ষ টাকা।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

four × three =

আরও পড়ুন