পাহাড়ে চলছে রাষ্ট্র বিরোধী চক্রের কিলিং মিশন

fec-image

একথা বলতে আর দ্বিধা নেই- “সন্ত্রাসের নিরাপদ অভয়ারণ্যের নাম পার্বত্য চট্টগ্রাম”। একটা সময় পত্রিকার শিরোনাম থাকতো- পাহাড়ে সাম্প্রদায়িক সংঘাত। দিনের পালা বদলে এখন সেটা কমে এসেছে। বর্তমান পাহাড় আলোচিত উপজাতীয় সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের আধিপত্য বিস্তার নিয়ে, নিত্য ঘটনা যাদের চাঁদাবাজি, গুম, খুন। উপজাতীয় চার সশস্ত্র  সন্ত্রাসী গ্রুপের কর্মকাণ্ডে নিরাপত্তাহীন পাহাড়, আতংকিত সাধারণ জনজীবন। তাই সাধারণ জনমনে প্রশ্ন এখন পাহাড়ের পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে? সন্ত্রাসীরা কেন এত বেপরোয়া? কোথায় তাদের শক্তির উৎস? সরকার কেন তাদের দমন করছে না?

১৯৭৩ সালে শান্তিবাহিনী গঠিত হওয়ার পর পাহাড়ে উপজাতি সংগঠনগুলো সশস্ত্র সংগ্রাম করে আসছে। তবে সেই সংগ্রামের আপাত পরিসমাপ্তি ঘটে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তির মাধ্যমে। ইতিমধ্যে সরকার শান্তিচুক্তির ৭২টি ধারার মধ্য থেকে ৪৮টি ধারা বাস্তবায়ন করেছে। অন্য ধারাগুলোর বাস্তবায়ন চলমান। একদিকে শান্তি চুক্তির বাস্তবায়ন, অন্যদিকে পাহাড়ে উপজাতীয় সশস্ত্র গ্রুপ বৃদ্ধি পেয়ে সন্ত্রাসের অভয়ারণ্য বনে যাওয়া- কিসের আলামত?

বর্তমান সরকার পাহাড়ের মানুষের কল্যাণে মেগা প্রজেক্ট হাতে নিয়ে কাজ করছে। উন্নয়ন হচ্ছে পাহাড়, উন্নত হচ্ছে জীবনযাত্রার মান। পার্বত্য উপজাতিরা এখন অহরহ দেশের প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা। এডিসি, ডিসি, উপ-সচিব, সচিব পদে রয়েছেন ডজন ডজন। শুধু তাই নয় পাহাড়ের সন্তান কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ওয়েন্টার্ন অন্টারিওর উপার্চায। হিসেব কষলে দেখা যাবে সরকারের বড় বড় পদে পাহাড়ের তিন জেলা হতে যতজন কর্মকর্তা রয়েছে দেশের বাকি ৬৩ জেলার গড় সেই তুলনায় নগণ্য। সুতরাং এতে প্রমাণিত পাহাড় পিছিয়ে নেই। তবে কেন এখনো সশস্ত্র সংঘাত?

বর্তমানে পাহাড় শাসন করছে উপজাতীয় নেতৃবৃন্দ ও প্রতিনিধি। যেমন, পাহাড়ের মন্ত্রী, এমপি, আঞ্চলিক পরিষদ, উন্নয়ন বোর্ড, তিন সার্কেল, তিন জেলা পরিষদসহ স্থানীয় পরিষদের সকল ছোট বড় সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তাদের দখলে। লিখিতভাবে স্বায়ত্ত্বশাসন না হলেও কাজে কর্মে সরকার তাদের ক্ষমতা দিয়ে রেখেছে। সুতরাং শান্তিচুক্তির পর এতো কিছু করা সত্ত্বেও পাহড়ে যদি অধিকার আদায়ের নামে উপজাতীয় সশস্ত্র গ্রুপ থাকে তবে সেটা অবশ্যই ভিন্ন কোন শক্তি ভিন্ন উদ্দেশ্য নিয়ে পরিচালিত করে আসছে। সরকার নানা কৌশলে পাহাড়ের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া সত্ত্বেও ফলাফল দেখা যাচ্ছে, পাহাড় সন্ত্রাসের স্বর্গ রাজ্য। শুধুই কি সন্ত্রাস? এ যেন ভয়ানক কিলার! এতে প্রমাণ হয় পাহাড় নিয়ে ভিন্ন কোন ষড়যন্ত্র আছে। পাহাড়ের সন্ত্রাসীর ক্ষমতা সম্পর্কে যদি বিশ্লেষন করি তবে মাত্র দু্ই বছরের ব্যবধানে ব্যতিক্রমি কিছু উদাহরণ নেয়া যেতে পারে:

অনেকের নিশ্চই মনে আছে রাঙ্গামাটি জেলাধীন বাঘাইছড়ি উপজেলার সেভেন মার্ডারের কথা? ২০১৯ সালের ১৮ মার্চ উপজেলা পরিষদ নির্বাচন চলছিল। নির্বাচনের দিন শান্তিপূর্ণভাবে ভোট গ্রহণ শেষে ফেরার পথে বাঘাইছড়ি-দিঘিনালা সড়কের ৯ কিলো নামক স্থানে নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করা কর্মকর্তার গাড়িতে হামলা চালিয়ে কমপক্ষে ৭ জনকে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা।

এই ঘটনার আগের বছর রাঙ্গামাটি জেলার আরেক উপজেলা, নানিয়ারচর উপজেলা চেয়ারম্যান এডভোকেট শক্তিমান চাকমাকে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। অর্থাৎ ২০১৮ সালের ৩ মে তারিখ বেলা ১১টার দিকে উপজেলা পরিষদ চত্ত্বরের বাসভবন থেকে মোটরসাইকেলে পরিষদ কার্যালয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। উপজেলা পরিষদ কার্যালয় হতে মাত্র ২০০ গজ দুরে দু’জন অস্ত্রধারী তাকে গুলি করে। তখন মোটরসাইকেল থেকে তিনি পড়ে যান। এসময় একজন অস্ত্রধারীরা কাছে গিয়ে তাকে গুলি করে পালিয়ে যায়। আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

উপজেলা চেয়ারম্যান এডভোকেট শক্তিমান চাকমা নিহতের পরদিন (৪মে) তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগ দিতে ১২ জন নেতা কর্মীসহ নানিয়ারচর যাচ্ছিলেন তপন জ্যোতি চাকমা ওরফে বর্মা। যাওয়ার পথে সশস্ত্র গ্রুপ বেতছড়ি নামক এলাকায় তাদের মাইক্রোবাসে ব্রাশ ফায়ার চালায়। এতে ঘটনাস্থলে বর্মাসহ ৫ জন নিহত হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আঞ্চলিক দলগুলোর সংঘাতে ২০১৪ থেকে ২০২০ পর্যন্ত গত ৭ বছরে পাহাড়ি তিন জেলায় খুন হয়েছেন ৩৮৩ জন। এর মধ্যে ২৬৩ জন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর আর ১২০ জন বাঙালি। এ ছাড়া অপহরণের শিকার হওয়া ৫৪০ জনের মধ্যে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ৩৭১ জন ও বাঙালি ১৬৯ জন। চাঁদাবাজিও হচ্ছে বছরে প্রায় ৩৭৫ কোটি টাকা। গত এক বছরেই খুন হয়েছেন ২৬ জন। এ সময়ে সাজেক ও রাজস্থলীতে সেনাটহলে পৃথক দুই হামলার ঘটনায় রাজস্থলীতে এক সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন। সর্বশেষ গত ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ তারিখ দুপুরে বাঘাইছড়ি উপজেলায় উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্সের ২য় তলায় প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার অফিসে ঢুকে কর্মকর্তার সামনে আলাপরত অবস্থায় ইউপি সদস্য সমর বিজয় চাকমাকে হত্যা করেছে উপজাতীয় সসস্ত্র সন্ত্রাসীরা।

উল্লেখিত ঘটনাসমূহ তুলে ধরলাম এই জন্য যে, পাহাড়ের অন্য সকল হত্যাকাণ্ড থেকে এই চারটি হত্যাকাণ্ড আমার কাছে ব্যতিক্রম মনে হয়েছে। বর্তমানে সন্ত্রাসীরা চাঁদাবাজির জন্য এলাকা দখল নিয়ে লড়াই করছে। আবার, চাঁদা না দিলে সন্ত্রাসীরা সাধারণ মানুষ অপহরণ, গুম এবং অনাদায়ে সর্বশেষ খুন করছে। চাঁদাবাজির হালট দখল নিয়ে লড়াই এবং চাঁদাবাজির জন্য গুম, খুন যেখানে নিত্য সেখানে উপরোক্ত চারটি ঘটনা আমার কাছে আলাদা মনে হয়েছে। আলাদা এই জন্য যে, এই ঘটনা ঘটানো সাধারণ কোন সন্ত্রাসী সংগঠন এবং সাধারণ কোন খুনির পক্ষে সম্ভব নয়। অবশ্যই এই হত্যাকাণ্ডে যারা জরিত তারা পেশাদার এবং অত্যন্ত চৌকষ কিলার। যাদের পেছনে রয়েছে অদৃশ্য কোন দেশ বিরোধী অপশক্তি।

উপজেলা পরিষদ চত্ত্বরে উপজেলা চেয়ারম্যান হত্যা, উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্সের ২য় তলায় প্রবেশ করে কর্মকর্তার অফিসে ঢুকে কর্মকর্তার সামনে বসা একজন ইউপি সদস্যকে হত্যা- প্রমাণ করে এরা সাধারণ কোন চক্রের সদস্য নয়। অবশ্যই এদের পেছনে শক্ত খুঁটি রয়েছে। যে খুঁটি তাদের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাত থেকে আগলে রাখছে। বর্মা হত্যা এবং বা্ঘাইছড়ির সেভেন মার্ডার প্রমাণ করে খুনিরা সাধারণ প্রশিক্ষিত নয়। অবশ্যই তাদের স্পেশাল প্রশিক্ষণ রয়েছে। চলন্ত গাড়িতে দূর হতে হামলা চালিয়ে মানুষ হত্যা একমাত্র প্রশিক্ষিত খুনি ছাড়া সম্ভব নয়।

আমরা জানি বর্তমানে পাহড়ে উপজাতিদের চারটি সশস্ত্র গ্রুপ রয়েছে। একদল আরেক দলকে আক্রমণ করে আসছে। নিহত হলে জানা যায়, তিনি ঐ গ্রুপের সদস্য। কিন্তু হত্যাকারি কে সেটা জানা যায় না। দায় এড়াতে প্রতিটি দল বক্তব্য দিয়ে থাকেন তাদের কোন সশস্ত্র গ্রুপ নেই, নেই তাদের অবৈধ অস্ত্র। তাদের বক্তব্যে পাহাড়ে যারা সন্ত্রাসী কাজ পরিচালনা করছে তারা তাদের কেউ নন। মৃত ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় আছে, কিন্তু কে হত্যা করল তা ওপেন হয়েও সিক্রেট। হত্যা হয়, হত্যার পর আসামী গ্রেফতার হয়। কিন্তু, বিচার হয় না। পাহাড়ে এত এত হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হল, একজন হত্যাকারীকে দেখা যায়নি যার দৃশ্যমান বিচার হয়েছে। বিচারবিহীন হত্যাকাণ্ডের ফলে অপরাধীরা হয়ে উঠছে বেপরোয়া। সন্তু লারমা, প্রসিত খীসা, এমএন লারমা গ্রুপ যদি হত্যাকাণ্ডে জড়িত না হয়, তবে যারা করছে তাদের কেন প্রশাসন নির্মূল করতে পারছে না? আর যদি তারাই সন্ত্রাসীদের গডফাদার হয়ে থাকেন, তবে তাদের বিচার করতে রাষ্ট্রের সমস্যা কোথায়?

সদ্য বাঘাইছড়ি উপজেলার পিআইও অফিসে ইউপি সদস্যকে হত্যা পার্বত্য সচেতন মহল হতাশ। কি করে সম্ভব এই হত্যাকাণ্ড? এই হত্যাকাণ্ড প্রমাণ করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গোয়েন্দা সংস্থা যদি পাতায় পাতায় থাকে তবে উপজাতীয় সসস্ত্র সন্ত্রাসীদের গোয়েন্দা রয়েছে শিরায় শিরায়। পাহাড়ের প্রতিটি সরকারি বেসরকারি অফিস উপজাতীয় সন্ত্রাসীদের দখলে। অফিসের কর্মকর্তা , নতুবা কর্মচারী সশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রুপের সোর্স হিসেবে কাজ করছে। ছাত্রজীবনে এসকল ব্যক্তিবর্গ ঐসব সন্ত্রাসী সংগঠনের ছাত্র সংগঠনের সাথে জড়িত ছিলো। পরবর্তীকালে উপজাতীয় কোটা নিয়ে সরকারী চাকরিতে প্রবশে করলেও তাদের মাথা থেকে জুম্মল্যান্ডের ভূত নামেনি।

প্রকল্প বাস্তবায়নে কারা কাজ করছে, কখন বিল পরিশোধ করা হচ্ছে, বিল কত, সকল তথ্য মোট কথা টেন্ডার হওয়ার পূর্বে সকল তথ্য সন্ত্রাসীদের হাতে পৌঁছে যাচ্ছে। সেই তথ্যের আলোকে সন্ত্রাসীরা কাজ করছে। আপনি সোনালী ব্যাংক থেকে কত টাকা উত্তোলন করছেন সেই তথ্য পৌঁছে যায় সন্ত্রাসীদের হাতে। পাহাড়ের সমস্ত অফিসে তাদের একছত্র প্রভাব থাকায় সাধারণ পার্বত্যবাসীর ব্যক্তিগত ডকুমেন্টস সন্ত্রাসীদের হাতের মুঠোয়। সমর বিজয় চাকমা কোনদিন অফিসে আসবেন, কখন, কোথায় আছেন সেই তথ্য যদি সন্ত্রাসীদের না থাকতো তবে কখনোই এমন হত্যাকাণ্ড ঘটত না। সেকারণে সরকারি বেসরকারি সকল সন্দেহজনক উপজাতীয় কর্মকর্তা কর্মাচারীর প্রতি নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করছি। মূলতঃ তাদের কারণে সরকারি অফিস আজ নিরাপত্তাহীন।

সর্বশেষ কথা হল পাহাড় বর্তমানে আগের মতো নেই। এখানে জেএসএস, ইউপিডিএফ কোন সমস্যা নয়। সমস্যা হল জেএসএস, ইউপিডিএফ এর রক্ষকগণ। যাদের কারণে উপজাতিরা বাংলাদেশ বিরোধী হতে শুরু করেছে। বিদেশের মাটিতে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ নিয়ে, বিদেশী অস্ত্র পাহাড়ে অনুপ্রবেশ ঘটানো এবং সেই অবৈধ অস্ত্রের মাধ্যমে এভাবে নিয়মিত হত্যাকাণ্ড পরিচালনায় অবশ্যই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্রের বহিঃপ্রকাশ। এমতাবস্থায় পাহড়ে শুধুমাত্র অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার জরুরী নয়, জরুরী বৈদেশিক চক্রান্ত ও তাদের মদদপুষ্ট সন্ত্রাসীদের চিরতরে নির্মূল করা। মূলতঃ বৈদেশিক চক্রান্তকারীদের পৃষ্ঠপোষকতার ফলেই পার্বত্য সন্ত্রাসীরা এতোটা বেপরোয়া।

♦ লেখক- রাঙামাটি থেকে

 

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: খুন, পাহাড়ী সন্ত্রাসী, পাহাড়ে সন্ত্রাস
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

1 × two =

আরও পড়ুন