পাহাড়ে নতুন নতুন উদ্যোক্তার হাতছানিতে সৃজিত ড্রাগন ফুলে-ফলে সুশোভিত মানিকছড়ির বাগান

fec-image

বেটা কেরোটিন ও ভিটামিন সি’ সমৃদ্ধ ক্যাকটাস জাতীয় সুস্বাদু ও উচ্চ ফলনশীল ফসল ড্রাগন চাষে বেশ সফলতা দেখিয়েছে মানিকছড়ির একাধিক উদ্যোক্তা। প্রভাষক থেকে ড্রাগন চাষে নিজেকে আত্মনিয়োগ করা উদ্যোক্তাদের সফলতায় পাহাড়ে ড্রাগন চাষে পুঁজি বিনিয়োগ করেছে নতুন নতুন বাগান মালিক ও উদ্যোক্তারা। এখানকার উঁচু-নীচু টিলা, বাড়ির ছাদেও এখন শোভা পাচ্ছে সবুজ ডগায় লাল ফলে নজরকাড়া ড্রাগন আর ড্রাগন। ফুলে-ফলে সুশোভিত এখানকার প্রতিটি সৃজিত বাগান। ডগায় ডগায় ঝুঁলে থাকা ড্রাগান এখন বাজারজাত শুরু করেছে বাগান মালিকরা।

উপজেলা কৃষি অফিস ও উদ্যোক্তা সূত্রে জানা গেছে, ক্যাকটাস জাতীয় বৃক্ষ ড্রাগন মূলত ‘বেটা কেরোটিন ও ভিটামিন সি’ সমৃদ্ধ সুস্বাদু ও উচ্চ ফলনশীল একটি ফসল। শাঁস গাঢ় গোলাপি রংয়ের রসালো প্রতিটি ড্রাগন ফলে টিএসএস ১৩.২২% এবং খাদ্যোপযোগী ৮১%। বেটা কেরোটিন ১২.০৬% মিলিমাইক্রো গ্রাম ও ভিটামিন সি’ ৪১.২৭ মিলিগ্রাম পুষ্টিসমৃদ্ধ এই ফলটি চাষাবাদ এবং বাজারজাতে দিন দিন জনপ্রিয়তা বাড়ছে। চট্টগ্রাম অঞ্চলে মূলত ২০০৪ সালে ঐতিহ্যবাহী ‘হালদা ভেলি’র পরিচালক খ্যাতিমান চা শিল্পের সফল উদ্যোক্তা নাদের খান এর হাত ধরে ড্রাগন চাষ এবং ফল বাজারজাত শুরু হয় । তিনি পার্শ্ববর্তী দেশ থাইল্যান্ড থেকে প্রশিক্ষিত কর্মী এনে ড্রাগন চাষ শুরু করেন।

ডিপ্লোমা কৃষিবিদ ও উপ-সহকারী অঞ্জন কুমার নাথ এর তথ্যমতে, অঙ্গজ উপায়ে বংশবিস্তার করা ড্রাগন চারা রোপনের এক বছরের মধ্যে ফল আসতে শুরু করে। ভালো পরিচর্যা পেলে টানা ৩০ বছর ফল দিতে থাকে প্রতিটি গাছ। বছরে কমপক্ষে ৫/৬ বার ফলন আসে গাছে। ৩-৫ বছর বয়সী প্রতি গাছ বছরে কমপক্ষে ৯-১৫টি ফল ধরবে এবং ফলের ওজন হবে ৩.২০ গ্রাম। এভাবে বছরে হেক্টর প্রতি ফল আসবে কমপক্ষে ২০/২৫ মে.টন। ড্রাগন সাধারণত এপ্রিল মাসের শেষ নাগাদ ফুল আসে। আর ফুল রাতের বেলা ফোটে। গাছে ফুল আসার ২০-২৫ দিন পর ফল পাকতে শুরু করে। সে অনুযায়ী জুন মাসের শুরুতে বাজারে পাকা ড্রাগন ফল বেচা-বিক্রি শুরু হয়।

উপজেলায় একাধিক বাগান মালিক, একাধিক শখিন উদ্যোক্তার পাশাপাশি ব্যক্তি পর্যায়েও অনেকে এখন পাহাড়ে-সমতলে এমনকি ছাদেও ড্রাগন চাষ করছে। চট্টগ্রামের একজন শিল্পপতির মহৎ উদ্যোগের হাতছানিতে আজ চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের পরতে পরতে উদীয়মান ও শিক্ষিত যুবকরা এগিয়ে এসেছেন এই লাভজনক ফসল ড্রাগন চাষে। শত ভাগ সফলতা থাকায় এখন আর থেমে নেই কেউ ড্রাগন সৃজনে।

ফটিকছড়ি’র ‘গুলতাজ মেমোরিয়াল কলেজ’র হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক ও সংবাদকর্মী সৈয়দ মুহাম্মদ মাসুদ ও ব্যবসায়িক পার্টনার মো. দেলোয়ার হোসেন ‘জনি’ মানিকছড়ি উপজেলায় প্রথম ২০১৪ সালের শেষ দিকে ৩ একর টিলা ভূমিতে এম.জে এগ্রো ফার্ম নামের একটি যৌথ প্রকল্পে ১ হাজার পিলারে ৪ হাজার ড্রাগন চারা রোপন করেন। এর পর ওদের আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। এই উদ্যোক্তার বাগানের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে নিজস্ব পদ্ধতিতে বার্মি কম্পোস্ট, জৈব সার ও বোর্দো মিক্সার তৈরি ও বাগানে যথাযথ প্রয়োগে গাছ ও ফলের গুণগতমান খুবই ভালো হচ্ছে।

বর্তমানে দেড় হাজার পিলারে ড্রাগন গাছে ডগায়, ডগায় ঝুঁলে আছে ফুল-ফলে সুশোভিত ড্রাগন। বাগানের প্রতিটি গাছেই এখন কম-বেশি ফুল-ফল বিগত সময়ের চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে শোভা পাচ্ছে। এ বছর চার হাজার গাছ থেকে কমপক্ষে ১০ মে.টন ফল উত্তোলন সম্ভব হবে।

পাহাড়ের এই দুই সফল উদ্যোক্তার অগ্রযাত্রা দেখে জনপদের পরতে পরতে শোভা পাচ্ছে ড্রাগন ফলের সুশোভিত বাগান। সফল উদ্যোক্তা সৈয়দ মুহাম্মদ মাসুদ বলেন, এমবিএ শেষ করে কলেজে প্রভাষকের পাশাপাশি চট্টগ্রাম তথা দেশের অহংকার হালদা ভেলি’র স্বপ্নদস্টা মো. নাদের খান এর ড্রাগন চাষ, চাষ পদ্ধতি দেখে বিদেশী ফল চাষাবাদে আমি উদ্ভুদ্ধ হই। নাদের খান চা শিল্পের পাশাপাশি ২০০৪ সালে বিদেশী ফল ড্রাগন চাষ করে এ অঞ্চলে চমক সৃষ্টি করেন। তাঁর সৃজিত বাগানে ক্যাকটাস জাতীয় সুস্বাদু ও উচ্চ ফলনশীল এই ফলের স্বাদ এবং গুণ সর্ম্পকে জানতে পেরে আমরা দুই বন্ধু মিলে মানিকছড়ির গাড়ীটানা এলাকায় ৩ একর জায়গায় সম্পূর্ণ ড্রাগন সৃজন করি। উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-সহকারী অঞ্জন কুমার নাথ এর পরামর্শে নিজস্ব বাগানে তৈরিকৃত বার্মি কম্পোস্ট, জৈব সার ও বোর্দো মিক্সার বাগানে যথাযথ প্রয়োগে আমরা ব্যাপক সফলতা পেয়েছি। গাছ ও ফলের গুণগতমান খুবই ভালো হচ্ছে। এ বছর চার হাজার গাছে একযোগে ফুল-ফল আসছে। আশা করছি ১০ মে. টনের অধিক ফল বিক্রি করতে সক্ষম হবো। প্রতি টন ড্রাগন কমপক্ষে ৩ লক্ষ টাকা হিসেবে আমার এ বছর আয় হবে প্রায় ২৪ লক্ষ টাকা।

উপজেলার বড়বিলস্থ গ্রীণ ফার্ম এগ্রো নেটওয়ার্ক নামক একটি যৌথ প্রতিষ্ঠান প্রায় ৫একর টিলা ভূমিতে ১৪জন বন্ধু শখের বসে চাষ করেছেন ২ হাজার পিলার ড্রাগন। সেখানে গেলে কথা হয় বাগানের মূল উদ্যোক্তা কৃষিবিদ মো. সাইফুল ইসলাম এর সাথে। তিনি জানালেন, ড্রাগন চাষে সফলতার গল্প। এ যেন ভাগ্যের চাকা পরিবর্তনে নতুন সিঁড়ি! তার মতে যে কোন যুবক নিজের পরিবর্তন চাইলে পাহাড়ের সবুজ অরণ্যে পরিকল্পিত চাষাবাদে নিজেকে বদলে দিতে পারে এবং একটু পরিশ্রমি হলে কেবল ড্রাগন সৃজন করেই দেশের অর্থনীতিতে অবদানসহ নিজেকে পরিবর্তন করা সহজ। লাল, হলুদ, কালো ও গোলাপীসহ সাত/আট রকম কালারের ড্রাগন চাষ শুরু করেছি। তাই আমাদের বাগানের ড্রাগন এখন রাঙ্গামাটি ও মহালছড়ির পাহাড়েও শোভা পাচ্ছে! এছাড়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ‘কর্নেল’ বাগানেও এ বছর প্রায় ২০শতক জায়গা জুড়ে ড্রাগনের চাষ করা হয়েছে। এসব শৌখিন উদ্যোক্তাদের আগ্রহ দেখাদেখিতে উপজেলঅর অনেক বাসাবাড়ির ছাদেও ড্রাগন চাষ শুরু করেছে অনেকে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হাসিনুর রহমান এ প্রসঙ্গে বলেন, বেটা কেরোটিন ও ভিটামিন সি’ সমৃদ্ধ ক্যাকটাস জাতীয় ফল অত্যান্ত সুস্বাদু ও উচ্চ ফলনশীল ফসল। বর্তমানে উপজেলার ৫হেক্টর ভূমিতে ড্রাগনের চাষ হয়েছে। এই বছর প্রায় দেড় হেক্টর জমিতে ফুল-ফল আসছে। রোগ-বালাই ও কম পুঁজিতে অধিক লাভবান হওয়ার সুযোগ থাকায় প্রতিনিয়ত পাহাড়ে ড্রাগন চাষ জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। আমার তৃণমূলে এসব লাভবান ও পুষ্টিগুনে সমৃদ্ধ ড্রাগন সৃজনে নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে কাজ করছি।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

2 × 1 =

আরও পড়ুন