`পাহাড়ে বাড়ছে হত্যাকাণ্ড’

fec-image

পার্বত্য চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে। কোথায় কখন কার লাশ পড়ে সেই ভয়-আতঙ্কই যেন তাড়া করে ফিরছে পাহাড়ের মানুষকে। সম্প্রতি পাহাড়ে আবারও বেড়েছে খুন-গুম-হত্যা। প্রতিনিয়ত রক্তে রঞ্জিত হচ্ছে সবুজ পাহাড়।

সর্বশেষ গত বুধবার ২৪ ফেব্রুয়ারি রাঙামাটির বাঘাইছড়িতে সরকারি অফিসে ঢুকে সমর বিজয়া চাকমা (৩৮) নামে এক ইউপি মেম্বারকে গুলি করে হত্যা করেছে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা। প্রতিপক্ষ দলের হওয়ায় জেএসএস (সন্তু) গ্রুপের সদস্যরা গুলি করে তাকে হত্যা করেছে বলে স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে উপজাতীয় সশস্ত্র গ্রুপগুলো প্রকাশ্যে একের পর এক হত্যাকাণ্ড করে যাচ্ছে। এ রকম প্রকাশ্যে হত্যাকাণ্ড সম্পূর্ণ পরিকল্পিত যা শুধুই কোন একজনকে হত্যা করা বা থামিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে নয়। এই রকম একেকটি প্রকাশ্যে হত্যা অর্থ এলাকার সকল মানুষের মাঝে আতঙ্ক তৈরি করে আধিপত্য অর্জনই এদের উদ্দেশ্য। তারা সাধারণ মানুষকে ভীতির মাঝে রেখে পার্বত্যাঞ্চলে একক আধিপত্য বিস্তার করতে চায়, যার মূল উদ্দেশ্য হলো তাদের মনের সুপ্ত বাসনা স্বাধীন জুম্মল্যান্ড এর বাস্তবায়ন। অবিলম্বে এসব অস্ত্রধারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করে পাহাড়ে শান্তি ফিরিয়ে আনা উচিত বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীরপ্রতীক বলেন, তিন কারণে পাহাড়ে হত্যাসহ অন্যান্য অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। মিয়ানমারের আরাকান ও বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা সমস্যা, ভারতের ত্রিপুরার রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ঢাকার বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির সম্পর্ক রয়েছে। প্রায় ৩২ বছর যাবত পার্বত্য চট্টগ্রামে অনির্বাচিত সরকার চলছে। পাহাড়ে অশান্তি সৃষ্টির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করা সম্ভব হলে উচ্চ বিলাষি সন্ত্রাসীরা স্বর্গরাজ্য তৈরি করতে চায়।

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালের ৩ মে নানিয়ারচর উপজেলা চেয়ারম্যান শক্তিমান চাকমাকে উপজেলা পরিষদ কার্যালয় প্রাঙ্গণে খুন করে পালিয়েছিল জেএসএস (সন্তু) দলের সন্ত্রাসীরা। এছাড়াও ২২ ফেব্রুয়ারি বান্দরবান সদরস্থ রাজভিলা ইউনিয়নের জামছড়ি বাজারে জেএসএস (সন্তু) দলের একদল সন্ত্রাসী রাজভিলা ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগ সভাপতি বাচানু মারমাকে গুলি করে প্রকাশ্যে হত্যা করে এবং গত ১ এপ্রিল কাপ্তাই উপজেলার ৩নং চিৎমরম ইউনিয়নের ওয়ার্ড যুবলীগ এর ভাইস চেয়ারম্যান উসুইপ্রু মারমাকে জেএসএস (সন্তু) দলের সন্ত্রাসীরা বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে গুলি করে হত্যা করে।

চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আনোয়ার হোসেন বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলার (বান্দরবার, খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটি) অধিকাংশ এলাকাই খুবই দুর্গম। যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত কঠিন। এ কারণে হত্যাসহ কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে হত্যা, চাঁদাবাজি ও অন্যান্য অপরাধের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে পুলিশ সক্রিয় রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

মানবাধিকার ও পাহাড়ের বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা বলছেন, পাহাড় অশান্ত হওয়ার প্রধান কারণ হলো কতৃত্ববাদ। পাহাড়ের নিয়ন্ত্রণ নিতে মরিয়া এখন চারটি গ্রুপ। আর এদের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বিভিন্ন মহলের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়। এই চারটি দলের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব চলতেই থাকে। যত দিন যাচ্ছে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। পাহাড়ে আঞ্চলিক চারটি দল থাকলেও তারা দুইভাগে বিভক্ত। চুক্তির পক্ষের সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) এবং চুক্তিবিরোধী প্রসীত খীসার নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) এখন এক হয়ে কাজ করছে। সুধাসিন্ধু খীসার নেতৃত্বাধীন জেএসএস (এমএন লারমা) এবং শ্যামল কান্তি চাকমার নেতৃত্বাধীন ইউপিডিএফকে (গণতান্ত্রিক) এক হয়ে কাজ করছে বলে মনে করেন তারা।

দীর্ঘদিন ধরে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে কাজ করছেন একটি সংস্থার এমন একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, শান্তিচুক্তির পর চার সংগঠন সৃষ্টির মাধ্যমে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রতিনিয়ত তিন পার্বত্য জেলায় ঘটছে খুনের ঘটনা। মূলত আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এসব ঘটনা ঘটে থাকে। যে এলাকা যার নিয়ন্ত্রণে থাকবে, সে এলাকার চাঁদাও যাবে সেই সংগঠনের তহবিলে। এতে সংগঠনকে আরও বেশি স্বাচ্ছন্দ্যে চালানো সম্ভব হয়। এজন্য চাঁদার স্পট ঠিক রাখতেই সেসব স্থানে চলে খুনোখুনির ঘটনা।

পার্বত্য চট্টগ্রামের একটি দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, শান্তিচুক্তির পর পাহাড়ে শান্তির সুবাতাস বইতে শুরু করলেও এক বছরের মাথায় চুক্তির বিরোধিতা করে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে গঠিত হয় ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। এরপরই ফের শুরু হয় পাহাড়ে রক্তের খেলা।

২০০৭ সালে জনসংহতি সমিতি থেকে বেরিয়ে রূপায়ণ দেওয়ান-সুধাসিন্ধু খীসাদের নেতৃত্বে আত্মপ্রকাশ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (এম এন লারমা)। এতদিন এ দুই সংগঠন অনেকটা এক হয়ে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতির বিরুদ্ধে আন্দোলন করে গেলেও পরে আত্মপ্রকাশ করে পাহাড়ের চতুর্থ আঞ্চলিক সশস্ত্র দল ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক)। এই চার সংগঠনের ক্ষমতা ও আধিপত্যের দ্বন্দ্বের কারণে আবারও অশান্ত হয়ে উঠেছে পাহাড়। মূলত পাহাড়ের আঞ্চলিক দলগুলোর মধ্যে আধিপত্য ও চাঁদাবাজির এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়েই বৈরিতা।

সূত্র: ইনকিলাব

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: পাহাড়, হত্যাকাণ্ড
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

20 − nineteen =

আরও পড়ুন