প্রদীপের নির্যাতনের শিকার সাংবাদিক ফরিদ ঠিকানাবিহীন

fec-image

জাতীয় দৈনিক আমাদের সময়, বাংলাদেশ বেতারসহ প্রায় দুই দশকের সাংবাদিকতায়, দেশ মাটি ও মানুষের জন্য অনেক লিখেছেন ফরিদুল মোস্তফা খান। মাদক, ঘুষ, দুর্নীতি ও সমাজের অনিয়ম অবিচারের বিরুদ্ধে ছিলেন আপোষহীন।

পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন ও মজলুম অসহায় বঞ্ছিত মানুষের জন্য ছিলেন বলিষ্ঠ কন্ঠস্বর। শত অভাব সীমাবদ্ধতা ও প্রতিকূল পরিস্থিতির মাঝেও কারো তাঁবেদারি না করে, প্রতিনিয়ত হামলা, মামলা গুম খুনের হুমকি তাকে কোন দিন দমাতে পারেনি সত্য প্রকাশ থেকে। ফলে পেশাগত জীবনে রাস্ট্রীয় দান অনুদান এবং সাহায্য সহযোগিতা কোন দিন পাননি। তিনি বরং টেকনাফের-কক্সবাজারের বহুল বিতর্কীত সাবেক ওসি ফরিদ উদ্দিন খন্দকার (বর্তমানে বরিশাল) ও মেজর সিনহা খুনের আসামি প্রদীপদের টাকা না দিলে ক্রস ফয়ার এবং জমজমাট মাদক ব্যবসা, বেপরোয়া ঘুষ-দুর্নীতি, ধর্ষণসহ হরেক অপকর্মের গোমর ফাঁস করে, কক্সবাজারে তিনটি এবং টেকনাফে তিনটিসহ ছয়টি সাজানো মামলার শিকার হয়ে ১১ মাস পাঁচদিন জেল খেটেছেন।

এর আগে প্রদীপের লালিত মাদক সন্ত্রাসীরা কারাগারের ভেতরে বাহিরে গুলি করে হত্যা, খাবারে বিষ প্রয়োগ ভুল চিকিৎসাসহ হরেক কায়দায় অন্যায়ের প্রতিবাদী মেধাবী এই সাংবাদিককে মধ্যযুগীয় নির্যাতন করে ক্ষান্ত হননি নিঃস্ব করে দিয়েছে তার পরিবারকে।

জীবনের শেষ সহায় সম্বল ভিটে বাড়ি বিক্রি এবং ধারকর্জ করে জেল থেকে বের হয়ে, জেলা সদর হাসপাতালে কাতরাচ্ছেন তিনি। চিকিৎসা শেষে স্ত্রী সন্তান ও মা বোনদের নিয়ে কোথায় বসতি করবেন, সেই ঠিকানাও এখন নেই।

কক্সবাজার থেকে প্রকাশিত পাঠক নন্দিত দৈনিক কক্সবাজার বাণী ও জনতার বাণী পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক কারা নির্যাতিত এই সাংবাদিক জীবনের নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।

তার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত সকল মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার, মাথা গুজার ঠাঁই নিশ্চিত, পেশাগত কাজে প্রধানমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট উপর মহলের সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন সাংবাদিক ফরিদ।

তিনি বলেছেন, অস্ত্র, মাদকসহ এতোগুলো মিথ্যা মামলা, প্রত্যাহার, থানার রেকর্ডপত্র সংশোধন ও জড়িতের শাস্তি এবং ভিটে বাড়ি না পেলে স্ব পরিবারে তার আত্মহত্যা ছাড়া কোন পথ নেই।

তিনি দুঃখের সাথে বলেন, জাতির জনকের স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণের শত্রুদের অপকর্মের খবর প্রকাশের অপরাধে অনেক জেল জুলুমের শিকার হয়েছি। মাদক ব্যবসায়ি ও অপরাধীদের হাতে কারাগারের ভিতরে বাহিরে লাঞ্ছিত অপমানিত হয়েছি। শুধু দেশের জন্য আমার যা গেছে তা- ফিরে পাবার নয়। তবুও প্রধানমন্ত্রী তথা সরকারের পক্ষ থেকে সাধ্যমত ক্ষতিপূরণ না দিলে এই জুলুম মহান আল্লাহ ও সহ্য করবেনা।

তিনি বলেন, আমি জানি প্রধানমন্ত্রী বিশ্ব মানবতার’ মা বিদেশীদের ও চোখের পানি মুছেন। তিনি নিশ্চয়ই আমি ও আমার পরিবারের প্রতি মাদক ব্যবসায়ী প্রদীপ বাহিনীর ঘটে যাওয়া জুলুমের বিচার, মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার, জড়িতদের শাস্তি, পরিবারের মাথা গুজার ঠাঁই, চিকিৎসাসহ পেশাগত সব প্রকার সহযোগিতা দ্রুত বাস্তবায়ন করে গণমাধ্যমের প্রতি নিজের অবস্থান পরিস্কার করবেন।

জানা গেছে, টেকনাফের বরখাস্ত ওসি প্রদীপকে নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করায় স্থানীয় সাংবাদিক ফরিদুল মোস্তফা খানকে বিদেশি মদ, ইয়াবা ও অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার দেখিয়ে ছয়টি মামলা করেছিল পুলিশ।

দীর্ঘ ১১ মাস ৫ দিন কারাভোগের পর গত বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) জামিনে মুক্ত হন ফরিদুল।

বর্তমানে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। ওসি প্রদীপের নির্যাতনে চোখ হারাতে বসেছেন এই সাংবাদিক।

মজলুম সাংবাদিক ফরিদুল মোস্তফা জানান, কারাগারে থাকার সময় ওসি প্রদীপ তাকে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যার চেষ্টা করেছিল। এছাড়া ভুল চিকিৎসা ও খাবারে বিষ প্রয়োগে হত্যা করতে চেয়েছিল। কিন্তু কারাগারের কর্মকর্তাদের তৎপরতায় প্রদীপ সফল হয়নি।

তাছাড়া ফরিদুলকে আটকের পর ওসি প্রদীপ ক্রসফায়ারের হত্যার চেষ্টাও করেছিল। কিন্তু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন নজরদারিতে তা পারেনি।

গত বছরের ২৪ জুন ‘টেকনাফে আইনশৃঙ্খলার অবনতি, এবং পরের দিন ‘টাকা না দিলে ক্রসফায়ার দেন টেকনাফের ওসি শিরোনামে দুটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। যেখানে মাদক নির্মূলের নামে ওসি প্রদীপের মাদক ও ক্রসফায়ার বাণিজ্যের করেছেন বলে প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়।

এছাড়া প্রতিবেদনে কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেনের নামও তুলে ধরা হয়। বিশেষ করে নিরীহ মানুষকে কিভাবে ধরে এনে হত্যা করা হতো সেই বিষয়েও তথ্য দেন। এ কারণে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন তার ওপর ক্ষিপ্ত হয়। এরপর ঢাকা থেকে বিনা ওয়ারেন্টে ফরিদুলকে ধরে আনা হয়। চালানো হয় অমানবিক নির্যাতন।

নিজের (ওসি প্রদীপের) পালিত তিনজন মাদক ব্যবসায়ী ও একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে বাদী করে অস্ত্র ও মাদক আইনে ছয়টি মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়। এরপর তিনি ১১ মাস কারাগারে ছিলেন।

গত ৩১ জুলাই রাতে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর এলাকায় এপিবিএনের চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে নিহত হন মেজর (অব.) সিনহা রাশেদ খান। এরপর বিষয়টি দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়।

ঘটনার পর নিহতের বড় বোন বাদী হয়ে আদালতে একটি মামলা করেন। সেই মামলা টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার সাহা, বাহারছড়া ফাঁড়ির ইনচার্জ লিয়াকত আলীসহ নয়জনকে আসামি করা হয়। এরপর সাত অভিযুক্ত পুলিশ সদস্য আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। পরে তাদেরকে বরখাস্ত করা হয়।

এছাড়া পৃথক অভিযানে র‌্যাব-পুলিশের সাক্ষী তিনজন ও এপিবিএনের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করে। বর্তমানে তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে র‌্যাব।

মেজর সিনহা হত্যাকান্ডের পরই ওসি প্রদীপসহ কক্সবাজার পুলিশের অনেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ গণমাধ্যমে উঠে আসে। তাদের হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এমন অনেকে লোমহর্ষক বর্ণনা দেন। অনেকের মতো ওসি প্রদীপের নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন সাংবাদিক ফরিদুল মোস্তফা।

আটকের পর পরিবার কী জেলা পুলিশের কাছে গিয়েছিল এবং স্থানীয় সাংবাদিক নেতারা কী ভূমিকা রেখেছিল জানতে চাইলে সাংবাদিক ফরিদুল মোস্তফা বলেন, ‘দেশের সকল প্রিন্ট ও ইলেকট্রিক মিডিয়ার সাংবাদিকদের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারীসহ বিভিন্ন মহল বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন। না হয় ওরা কবেই আমাকে ক্রসফায়ার দিয়ে মেরে ফেলত।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

9 + four =

আরও পড়ুন