প্রেক্ষিত শান্তিচুক্তি

বান্দরবানে সংঘাত এবং উন্নয়ন দু’টিই বাড়ছে

fec-image

২ ডিসেম্বর ২০২০ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ২৩ বছর পূর্ণ হচ্ছে। ১৯৯৭ সালের এই দিনে দীর্ঘ প্রায় তিন দশক ধরে সশস্ত্র সংগ্রামের পর তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সাথে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি ঐতিহাসিক এই চুক্তি স্বাক্ষর করে। এর মধ্য দিয়ে শান্তির সুবাতাস বইতে শুরু করেছিল পাহাড়ে। জীবনযাত্রায় আসে ব্যাপক পরিবর্তন। অন্য দুটি জেলার ন্যায় বান্দরবানের প্রত্যন্ত এলাকায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পর্যটন, কৃষি, যোগাযোগসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন হয়েছে। বেশ কয়েকবছর বান্দরবানের মানুষ শান্তিতে বসবাস করেছে। তবে গত তিন বছর ধরে সম্প্রীতির বান্দরবানে চারটি সশস্ত্র গ্রুপের মধ্যে অস্ত্রের মহড়া চলছে। পাহাড়ে আধিপত্য ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে হচ্ছে খুন-খারাবি।

এরপরও চুক্তির নানা শর্ত বাস্তবায়িত হয়েছে। সরকারের দাবি চুক্তির অধিকাংশ ধারা বাস্তবায়ন করা হয়েছে। অশান্ত পরিস্থিতির মাঝেও বান্দরবানে গেল ২৩ বছরে বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয়ে অভাবনীয় উন্নয়ন হয়েছে।

বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের ছয় বারের এমপি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিংয়ের হাত ধরে গেল ১০ বছরে অন্তত ১০ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ হয়েছে বান্দরবানে। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড, এলজিইডি, জেলা পরিষদ, জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও গণপূর্ত, সড়ক ও জনপথ, শিক্ষা প্রকৌশল বিভাগের অধীনে এসব উন্নয়ন কাজ সম্পাদিত হয়েছে।

বিশেষ করে বান্দরবানে উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে ১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে পিটিআই ভবন, ২৮ কোটি টাকার নার্সিং ইনস্টিটিউট, ৭ কোটি টাকা ব্যয়ে অরুণ সারকী টাউন হল, আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগার, বান্দরবান বিশ্ববিদ্যালয়, বান্দরবান সরকারি কলেজের একাডেমিক ভবন, থানচি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ভবন, রুমা কলেজ রোয়াংছড়ি কলেজের ভবন নির্মাণ, জেলা পরিষদে ন্যাস্ত বিভাগের জন্য অফিস ভবন, কনফারেন্স হল নির্মাণ, দুর্গম এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য উপজেলাগুলোতে ছাত্রাবাস নির্মাণ, স্টেডিয়ামের গ্যালারি নির্মাণ, প্রায় ২৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত রুমা সাঙ্গু সেতু, ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে থানচি সাঙ্গু সেতু, অসংখ্য গার্ডার ব্রিজ নির্মাণ, থানচি উপজেলা পরিষদ ভবন, জেলার ৬ উপজেলায় ফায়ার সার্ভিস স্টেশন, তিন উপজেলায় প্রায় ২১ কোটি টাকা ব্যয়ে থানা ভবন নির্মাণ, পুলিশ অফিসার্স মেম ৪ কোটি ২৬ লাখ টাকা।

এছাড়াও সেনাবাহিনীর অধীনে সাড়ে ১২০ কোটি টাকা ব্যয়ে থানচি-আলীকদম সড়ক নির্মাণ, ২ কোটি টাকা ব্যয়ে থানচি-বলিপাড়া রাস্তা নির্মাণ, ১ কোটি টাকা ব্যয়ে থানচি-রুমা-বগালেক সংযোগ সড়ক নির্মাণ, থানছি ও রুমা উপজেলায় প্রায় ১৯ কোটি টাকা ব্যয়ে উপজেলা কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণ।

জেলার ৩৩ ইউনিয়নের মধ্যে ৮২৮.৬৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ১০টি ইউপি পরিষদের কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণ, কৃষি উন্নয়নে শীলক খালের উপরে ৫.৭৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ২৮ মি. দীর্ঘ রাবার ড্যাম নির্মাণ করা হয়।

জেলায় অসংখ্য কমিউনিটি ক্লিনিক, মন্দির, মসজিদ, গির্জা, ক্যায়াং, প্রাণিসম্পদ বিভাগে সাড়ে ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে কয়েকটি ভবন এবং নির্মাণ করা হয়েছে ২টি পৌরসভা ভবন। সরকারিকরণ করা হয়েছে জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি হাজী এম এ কালাম ডিগ্রি কলেজ, লামা মাতামুহুরী ডিগ্রি কলেজ ও রুমা ডিগ্রি কলেজসহ বেশ কয়েকটি স্কুল। অন্যদিকে আলীকদমের রোয়াম্ভু ও নয়াপাড়া বিদ্যুৎ লাইন সংযোজন, ৯ কোটি ৪৭ লাখ টাকা ব্যায়ে আলীকদম পানি শোধনাগার নির্মাণসহ অসংখ্য উন্নয়ন কাজ শেষ করা হয়েছে। ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে থানচি উপজেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ শুধু থানচি নয়, জেলাবাসীর জন্য এক ঐতিহাসিক ঘটনা। ২০১৫ থেকে ১৭ সালের মধ্যে ২ হাজার ৩৬০ জনকে সোলার প্যানেল বিতরণ করা হয়, যা এখনও অব্যাহত আছে।

বান্দরবান-রাঙামাটি সড়কের পুলপাড়া এলাকায় ৯ কোটি ১১ লাখ টাকা ব্যয়ে গার্ডার সেতু ও প্রায় ২ কোটি টাকা ব্যয়ে শহরের নীলাচল সড়কে মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স নির্মাণ। রোয়াংছড়ির থেকে রুমা উপজেলা পর্যন্ত ৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে (জিওবি অর্থে) পল্লী উন্নয়ন সড়ক নির্মাণ করা হবে। ৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে বান্দরবান সদর হাসপাতাল ১০০ শয্যা থেকে ২৫০ শয্যায় উন্নতীকরণ, আলীকদম-জানালীপাড়া-কুরুকপাতা ঝিড়ি পোয়ামুহুরী সড়ক ৩৭৬ কোটি ও থানচি-রেমাক্রি-মদক-লিক্রি সড়ক প্রায় ৪৭০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ কাজ চলমান আছে। বান্দরবান শহরের জজ কোর্ট থেকে সাঙ্গু সেতু পর্যন্ত বড় ড্রেন নির্মাণ। প্রায় ২শ’ কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হবে বান্দরবান-কেরানীহাট সড়ক।

এই প্রসঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড বান্দরবান ইউনিটের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু বিন মো. ইয়াছির আরাফাত বলেন, পার্বত্যমন্ত্রীর নির্দেশনায় বান্দরবানের দুর্গম এলাকার মানুষের জীবনমান উন্নয়নে প্রতিটি গ্রামে উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে। উন্নয়নের এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত আছে।

এদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিং এমপি বলেছেন, পার্বত্যাঞ্চলকে আজকের উন্নয়ন, শান্তি, সম্প্রীতির জায়গায় নিয়ে এসেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। চুক্তির অধিকাংশ ধারা বাস্তবায়ন করা হয়েছে। আরো কিছু ধারা আছে তাও পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন হবে।

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: পার্বত্য চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বাইশ বছর, বান্দরবান
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

fifteen + 4 =

আরও পড়ুন