বাংলাদেশের শিশুদের ডায়রিয়ার চিকিৎসায় বহুল ব্যবহৃত একটি প্রোবায়োটিক সম্পূরক তার আমদানিকারকের জন্য হয়েছে অস্বাভাবিক মুনাফার উৎস—কিন্তু তা পণ্যের চিকিৎসাগত গুণের কারণে নয়, বরং নিয়ন্ত্রণ বিধিমালার ফাঁক-ফোকরের কারণে।
কোম্পানিটির কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত এক হুইসেলব্লোয়ারের অভিযোগ, ওষুধটিকে ‘খাদ্য সম্পূরক’ (ফুড সাপ্লিমেন্ট) হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করে আদায় করা হচ্ছে ৬০০ শতাংশ মুনাফা।
বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের সাবেক এই কর্মীর তোলা অভিযোগ দেশের স্বাস্থ্যসেবা বাজারের এক অস্পষ্ট কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খাতের ওপর যেখানে চিকিৎসার উপকরণ শিশুদের সবচেয়ে সাধারণ ও ঝুঁকিপূর্ণ রোগগুলোর একটি — ডায়রিয়া।
এই ঘটনার কেন্দ্রে রয়েছে ইতালির-তৈরি প্রোবায়োটিক ‘এন্টারোজার্মিনা ওরাল সাসপেনশন’। বাংলাদেশে এটি আমদানি করে সিনোভিয়া ফার্মা পিএলসি— যা বেক্সিমকো গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান। পণ্যটিকে ফার্মাসিউটিক্যাল ওষুধ হিসেবে নিবন্ধন না করে (যে শ্রেণিতে মূল্যনিয়ন্ত্রণ ও কঠোর তদারকি প্রযোজ্য), কোম্পানিটি একে খাদ্য সম্পূরক হিসেবে বাজারজাত করে, কারণ এক্ষেত্রে ন নীতিমালা শিথিল এবং সরকারি হস্তক্ষেপও ন্যূনতম।
শিল্পবিশ্লেষক ও হুইসেলব্লোয়ারের মতে, এই শ্রেণীবিভাগই এর খুচরা মূল্যকে প্রায় নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাড়ানোর সুযোগ করে দিয়েছে।
হুইসেলব্লোয়ারের প্রদত্ত আমদানি নথি, শুল্ক ও ব্যাংকিং কাগজপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, এন্টারোজার্মিনার ঘোষিত আমদানি মূল্য প্রতি প্যাকেট ১ ডলারেরও কম। ১০টি ভায়ালের একটি বাক্সের মূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ০.৭৮ মার্কিন সেন্ট , যা বাংলাদেশের টাকায় প্রায় ৯৭ টাকা। অথচ এই প্যাকেটই দেশের বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে ৭০০ টাকায় (প্রতি ভায়াল ৭০ টাকা হিসেবে)।
ওই সাবেক কর্মীর ভাষ্যমতে, গত দুই বছরে খুচরা দাম ৫০০ থেকে বেড়ে ৭০০ টাকা হয়েছে—অর্থাৎ ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে—কিন্তু ভোক্তা বা স্বাস্থ্য সেবাদাতাদের কাছে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা বা সরকারি বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়নি।
হুইসেলব্লোয়ার বলেন, “যেহেতু পণ্যটি খাদ্য সম্পূরক হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ এবং মূল্য-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার বাইরে, তাই আমদানিকারক ৬০০ শতাংশের বেশি মুনাফা ধরে রাখতে পেরেছে।”
প্রসঙ্গত, এন্টারোজার্মিনায় রয়েছে ‘ব্যাসিলস ক্লসি’ (Bacillus clausii) ব্যাকটেরিয়ার স্পোর, যা চিকিৎসকরা পরিপাকতন্ত্রের নানা সমস্যায়—বিশেষ করে শিশু ডায়রিয়ায়—প্রচুর পরিমাণে প্রেসক্রাইব করেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে শিশুদের জন্য উপযোগী তরল প্রোবায়োটিকের সংখ্যা সীমিত হওয়ায় পণ্যটি অস্বাভাবিকভাবে লাভজনক এবং অপব্যবহারের ঝুঁকিও রয়েছে।
এছাড়াও, শুধু মূল্যই নয়, আমদানি প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়েও উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। বাংলাদেশের ড্রাগস অ্যান্ড কসমেটিকস আইন ২০২৩ অনুযায়ী, খাদ্য সম্পূরক আমদানির জন্য ফ্রি-সেল সনদ, বিশ্লেষণ সনদ (সিওএ), উৎপাদন নথি ও স্থিতিশীলতার তথ্য (স্ট্যাবিলিটি ডেটা) জমা দিতে হয়। হুইসেলব্লোয়ারের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে এই বাধ্যতামূলক কাগজপত্রের বিস্তারিত নিয়ন্ত্রকদের কাছে জমা দেওয়া হয়নি।
আরও উদ্বেগের বিষয়, ২০২২ সালে মাত্র এক বছরের মেয়াদে দেওয়া একটি অনুমোদনের ভিত্তিতেই সিনোভিয়া এখনও পণ্য আমদানি করে চলেছে। শিল্পসংশ্লিষ্টরা জানান, ফার্মাসিউটিক্যাল আমদানির জন্য ‘নো-অবজেকশন সার্টিফিকেট’ সাধারণত আরও স্বল্প মেয়াদে (প্রায় ছয় মাস) দেওয়া হয়, যদিও পণ্য ও কর্তৃপক্ষ ভেদে শর্ত ভিন্ন হতে পারে।
হুইসেলব্লোয়ার আরও উল্লেখ করেন, এন্টারোজার্মিনার স্থানীয় বিকল্প প্রোবায়োটিক ইতোমধ্যে বাংলাদেশে উৎপাদিত হচ্ছে। তাঁর যুক্তি, একবার দেশীয় সমতুল্য পণ্য পাওয়া গেলে আমদানি করা প্রস্তুত পণ্যের ওপর কঠোর তদারকি হওয়া উচিত।
এন্টারোজার্মিনা ঘিরে গুরুতর আরো অভিযোগ এর শুল্ক মূল্যায়নকে ঘিরে। হুইসেলব্লোয়ার জানান, ২০২২ সালেই শুল্ক কর্মকর্তারা এন্টারোজার্মিনার ঘোষিত চালান মূল্য (ইনভয়েস ভ্যালু) নিয়ে প্রশ্ন তোলেন—যা ইঙ্গিত দেয়, আমদানিকারক আন্ডার-ইনভয়েসিং (কম দাম দেখানো) করছে কি না। কর্মকর্তারা মত দেন, পাইকারি ক্রয়মূল্যের মাপকাঠিতেও প্রতি প্যাকেটের ঘোষিত দাম অযৌক্তিকভাবে কম।
এক্ষেত্রে ঘোষিত দাম ও প্রকৃত দামের ব্যবধান আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরেও নিষ্পত্তি হওয়ার সুযোগ রয়েছে—যা প্রমাণিত হলে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা বিধিমালা ও মানিলন্ডারিংবিরোধী কাঠামো লঙ্ঘনের ঘটনাও ঘটে থাকতে পারে।
সম্প্রতি বাংলা আউটলুকে প্রকাশিত এ বিষয়ক প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস, সিনোভিয়া ফার্মা কিংবা ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর কেউই বারবার মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।
উৎস : জুলকারনাইন সায়েরের ফেইসবুক পোস্ট থেকে।
