বর্ষ বরণে পাহাড়ি জনপদে ছুটছে পর্যটকরা : হোটেল-মোটেল কোথাও সিট না থাকায় পর্যটকদের শেষ ঠিকানা উপজাতীয়দের বসত-বাড়ি

khagrachari-tourist-story-pic
এম. সাইফুর রহমান, খাগড়াছড়ি : অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রাণকেন্দ্র খাগড়াছড়ি। এখানে পাহাড়, ঝর্ণা, নদী, নীল আকাশ মিলেমিশে একাকার। এখানকার প্রকৃতির নির্মল ¯পটগুলোতে দেশি বিদেশি পর্যটকরা ছুটে আসছেন। সবুজে ঘেরা পাহাড়ি এ জনপদ এখন পর্যটকদের পদভারে মুখরিত। নববর্ষ উপলক্ষে আগাম শহরের হোটেল-মোটেল, রেস্ট হাউস এবং গেস্টহাউসগুলো অনেক আগেই বুকিং হয়ে গেছে। কোথাও সিট না পেয়ে পর্যটকদের শেষ ঠিকানা উপজাতীয়দের বসত-বাড়ি। অজানা অচেনা অতিথির আশ্রয় মিলছে তাদের ঐতিহ্যবাহী মাচাং ঘরে। আর পাহাড়িদের অতিথি আপ্যায়নে আগন্তুকরাও মুগ্ধ। সবমিলে খাগড়াছড়ির ছায়া ঢাকা মায়া ভরা গ্রামগুলোতে এখন প্রতিদিন বসছে পাহাড়ি-বাঙালির মিলন মেলা।

কোথায় যাবেন : খাগড়াছড়ির পর্যটন স্পটগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য স্পট হচ্ছে- খাগড়াছড়ি জেলা শহরের অদূরেই অবস্থিত আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্র। এ পাহাড় চূড়ায় বসে এক পলকে পুরো খাগড়াছড়ি শহরের অপরূপ দৃশ্য অবলোকন করা যাবে। আপনার কাছে মনে হবে, আপনি নেপালের রাজধানী কাঠমুন্ডুতে অবস্থান করছেন। কারণ খাগড়াছড়ির মতই নেপাল শহরটি পাহাড় ঘেরা নির্মল পরিবেশে অবস্থিত। আলুটিলা পাহাড়ের নিচেই সিঁড়ি বেয়ে নেমে দেখতে পাবেন রহস্যময় গুহা। যেখানে মশাল জ্বালিয়ে যেতে হয়। এর এক প্রান্ত দিয়ে প্রবেশ করে অন্য প্রান্ত দিয়ে বেরিয়ে আসার পথে আপনাকে নিয়ে যাবে রহস্যময় অন্য কোন ভুবনে। এ গুহার নিচে স্বচ্ছ পানির ফোয়ারা, মাথার কাছে বাদুরের ঝাক আরও কত কিছুৃ। আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্র থেকে মাত্র ৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত রিছাং ঝর্ণা, এই ঝর্ণাধারা অনবরত বইছে, আর হাতছানিতে আপনাকেই ডাকছে। এখানে গোসলটাও সেরে নিতে পারেন।

অনুমতি সাপেক্ষে শহরের উপকন্ঠে অবস্থিত সেনাবাহিনীর রিজিয়ন কর্তৃক সৃষ্ট গিরী সোভা  হ্রদকে ঘিরে গড়ে ওঠা নান্দনিক সাজে সজ্জিত নতুন পর্যটন কেন্দ্র সত্যি আপনাকে অন্য ভুবনে নিয়ে যাবে। খাগড়াছড়ি জেলা শহর থেকে মাত্র ১২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত দেবতা পুকুর, পথে দেখা মিলবে পাহাড়ে পাহাড়ে উপজাতিদের সৃজিত জুম ধানের ক্ষেত, এখানে আসার পথে মারমা, ত্রিপুরা ও চাকমা উপজাতিদের ঐতিহ্যবাহী ও বৈচিত্র্যময় জীবনধারা দেখা যাবে, শহরের প্রবেশমুখে রয়েছে নব নির্মিত আনসার ও ভিডিপির নান্দনিকতার ছোঁয়ায় উদ্ভাসিত হেরিটেজ পার্ক, এখানে বসে এঁকে বেঁকে বয়ে যাওয়া চেঙ্গি নদী, ঢেউ তোলা উঁচু পাহাড়, দূরের নীল আকাশে সাদা মেঘের খেলা দেখার অপূর্ব সুযোগ রয়েছে। যা পর্যটকদের জন্য নতুন সংযোজন।

খাগড়াছড়ি শহরের মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে কৃষি গবেষণা কেন্দ্র্রকে ঘিরে হরেক রঙের ফুল, ফলদ, বনজ ও ভেষজ বাগান, পাহাড়ের পাদদেশে রয়েছে ছোট্ট একটি হ্রদ ও লোহার ব্রিজ। খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলা থেকে একটু ভিতরে রয়েছে এশিয়া উপমহাদেশের অন্যতম বৃহত্তর বৌদ্ধমূর্তি। এই মূর্তিকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা বিশাল আয়তনের অরণ্য কুটির আপনাকে নিয়ে যাবে চীন, জাপান, কোরিয়ার মত মঙ্গোলীয়ান কোন এক দেশের বুড্ডিস জগতে। জেলা শহরের অদূরে পড়ন্ত বিকেলের সৌন্দর্য উপভোগের স্থান নিউজিল্যান্ড। নিউজিল্যান্ডের কাছাকাছি এসে রিকসা ছেড়ে দিয়ে পায়ে হেঁটে আসা অথবা বসে আড্ডা দেওয়া সত্যিই বিস্ময়কর। এছাড়াও পানছড়ি উপজেলা শহর থেকে মাত্র ১২ কিলোমিটার দূরে রয়েছে তবলছড়ি ঝর্ণাটিলা। এখানে একটি পাহাড় ছড়ায় ছোট বড় পাথরের উপর দিয়ে প্রবাহমান স্বচ্ছ পানি, কয়েকটি ঝর্ণা ও বিরাশি টিলার গায়ে আদা-হলুদ, কচু, বিভিন্ন সবজিসহ জুম চাষ দেখার সুযোগটি বেশ ব্যতিক্রম। এখানে গামারি, সেগুনসহ বিভিন্ন ফলদ, বনজ পাহাড়ে হরেক রকম পাখ-পাখালি ছাড়াও বন্য শুকুর, বন্য বানর, বন্য হরিণের হাক-ডাক আনাগোনার দৃশ্যটিও কি কম ব্যতিক্রম?

এছাড়াও খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলা শহর থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে তৈদুছড়া নামে একটি বিশাল ঝর্ণা আবিস্কৃত হয়েছে। যা দেশের সবচেয়ে বড় ঝর্ণা বলা হচ্ছে। তবে এখনই এ ঝর্ণায় যাওয়ার পরিবেশ তৈরি হয়নি। এদিকে মাটিরাঙ্গার ১০ মাইল এলাকায় রয়েছে শতবর্শী বটবৃক্ষ, রামগড়ে বিডিআরের জন্মস্থানকে ঘিরে গড়ে ওঠা নতুন ঝুলন্ত ব্রিজ ও লেক দেখার মত একটি স্থান। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রামগড় উপজেলা শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ছোট্ট পাহাড়ি ফেনী নদীর ওপারেই ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সাভ্রুম অঞ্চল অবস্থিত। যা কাঁটা তাঁরের বেড়া দ্বারা পরিবেষ্টিত। দেশের মানচিত্রে গ্রথিত ও প্রায় চিকন একটি দাগের মত সংযুক্ত স্থানটিই হচ্ছে রামগড়। এই রামগড় সীমান্ত ঘেষে রয়েছে বিশাল আকারের একটি চা বাগান, সেখানেও আপনারা হারিয়ে যেতে পারেন। যে কোন সময়ে, যে কোন মূহুর্তে।

কীভাবে যাবেন : রাজধানী ঢাকার কমলাপুর, সায়েদাবাদ, ফকিরাপুল, কলাবাগান থেকে সরাসরি বাস খাগড়াছড়ি আসে। এস আলম, সৌদিয়া, শান্তি পরিবহন ও শ্যামলী বাসযোগে খাগড়াছড়ি আসতে ভাড়া লাগবে ৫০০-৫৫০ টাকা। অভ্যন্তরীণভাবে পাহাড়ি পথে ঘোরাঘুরির জন্য চাঁদের গাড়ি (জিপ) সবচেয়ে ভালো। খোলা গাড়িতে বসে প্রকৃতিও দেখা হবে, সেই সাথে ছবিও তোলা যাবে। তাছাড়া এক জিপে ২০জন উঠলেও সমস্যা নেই, ভাড়াও অনেক কম। এছাড়া মাইক্রোবাস, প্রাইভেট কার সবই পাওয়া যাবে। এখন খাগড়াছড়ি শহরে ঘোরার জন্য অসংখ্য বেটারি চালিত দুষণমুক্ত টমটম গাড়িতো রয়েছেই।

কোথায় থাকবেন : আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্রের খুব কাছে পাহাড় চূড়ায় নব নির্মিত ইমাং রির্সোস এন্ড নেচারাল রেস্টুরেন্ট ডবল কক্ষ নন এসি ১২০০ টাকা, সিঙ্গেল নন এসি ১০০০ টাকা, ডবল এসি রুম ১৮০০ টাকা। শহরের প্রবেশমুখে চেঙ্গী নদীর পারে অবস্থিত পর্যটন মোটেলের ডবল রুম নন এসি ১০৫০ টাকা, ডবল এসি রুম ১৫০০ টাকা, ভিআইপি সুইট রুম ২৫০০ টাকা। এছাড়া আরও কম মূল্যে খাগড়াছড়ি বাজার এলাকায় রয়েছে হোটেল আল-মাসুদ, হোটেল লবিয়ত, হোটেল ফোর স্টারসহ অনেকগুলো হোটেল।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

One Reply to “বর্ষ বরণে পাহাড়ি জনপদে ছুটছে পর্যটকরা : হোটেল-মোটেল কোথাও সিট না থাকায় পর্যটকদের শেষ ঠিকানা উপজাতীয়দের বসত-বাড়ি”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

3 + four =

আরও পড়ুন