বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের মর্যাদা আসলে কী?

fec-image

ধরা যাক, মেয়েটির নাম নুর বেগম।

১৯৯২ সালে পরিবারের সঙ্গে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল মেয়েটি। এরপর রোহিঙ্গা ক্যাম্পেই তার বড় হয়ে ওঠা।

পড়াশোনায় ভালো এই মেয়েটি প্রথমে ক্যাম্পের স্কুলে, পড়ে কক্সবাজারের স্থানীয় একটি স্কুলে পড়াশোনা করে। সেই সঙ্গে কিছু সামাজিক সংগঠনের সঙ্গেও সক্রিয় হয়ে ওঠে। কিন্তু এ সময় তার রোহিঙ্গা পরিচয় শুধু ঘনিষ্ঠ কয়েকজনই জানতো।

স্কুল-কলেজের লেখাপড়া শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শুরু হওয়ার পর একদিন জানা যায়, মেয়েটি রোহিঙ্গা। আর সম্প্রতি রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের স্কুল কলেজে পড়াশোনা করতে না দেয়ারও একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

এ নিয়ে পত্রপত্রিকায় লেখালেখির পর মেয়েটিকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাময়িক বহিষ্কার করেছে কর্তৃপক্ষ।

কিন্তু বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের আসল মর্যাদা কি? তারা কি শরণার্থী, নাকি শুধুই আশ্রয়প্রত্যাশী? তাদের অধিকার আসলে কতটা আছে?

শরণার্থী মর্যাদা
শরণার্থীদের মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করতে ১৯৫১ সালে জাতিসংঘ একটি কনভেনশন গ্রহণ করে, যা ১৯৬৭ সালের প্রটোকল হিসাবে সংশোধিত হয়।

কিন্তু বাংলাদেশ ওই কনভেনশনে স্বাক্ষর করেনি।

ফলে বিশ্বব্যাপী শরণার্থীদের জন্য যেসব অধিকার বা সুবিধা নিশ্চিত করতে হয়, সেগুলো করার জন্য বাংলাদেশের সরকারের ওপর বাধ্যবাধকতা নেই।

তবে ওই কনভেনশনে স্বাক্ষর না করলেও বেশ কয়েকটি মানবাধিকার সনদে স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ – এবং সে কারণে দেশটি আশ্রয় প্রত্যাশীদের অনেকগুলো অধিকার নিশ্চিত করতে বাধ্য, বলছেন শরণার্থী ও অভিবাসী বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর।

”শরণার্থী কনভেনশনে একটা আন্তর্জাতিক দায়দায়িত্ব থাকে, সেখানে সরকারের বেশ কিছু অধিকার নিশ্চিত করতে বাধ্যবাধকতা থাকে। কেউ আশ্রয়প্রার্থী হলে পুরোপুরি শরণার্থী বিষয়ে সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত তার দায়িত্ব নিতেও সরকার বাধ্য থাকে। কিন্তু শরণার্থী মর্যাদা দেয়া না হলে সরকার এসব দায়িত্ব পালন এড়িয়ে যেতে পারে” – তিনি বলছেন।

বাংলাদেশে এক্ষেত্রে যাবতীয় সিদ্ধান্ত নেয়া হয় ফরেনার্স অ্যাক্ট অনুসারে। বাংলাদেশে শরণার্থীদের ব্যাপারে কোন আইন নেই।

শরণার্থীদের ব্যাপারে নির্দিষ্ট আইন ও বিধিবিধান জারির আবেদন জানিয়ে ২০১৭ সালে সেপ্টেম্বর মাসে হাইকোর্টে নিদের্শনা চেয়ে রিট পিটিশন করেছিলেন একজন আইনজীবী। তবে সেই রিটের এখনো রায় হয়নি।

কর্মকর্তারা বলছেন, বিহারী জনগোষ্ঠী আর রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ঘটনা ছাড়া বাংলাদেশে শরণার্থী হিসাবে আবেদনের খুব একটা নজীর নেই।

জাতিসংঘের সহায়তায় একসময় আটকে পড়া পাকিস্তানীদের ক্ষেত্রে শরণার্থী মর্যাদা দেয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে অবশ্য তাদের বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেয়া হয়।

রোহিঙ্গারা কী শরণার্থী?
তবে সনদে স্বাক্ষর না করলেও ১৯৯২ সালে যে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে এসেছিলেন, প্রথম দফার তাদের মধ্যে প্রায় ৩০ হাজার রোহিঙ্গাকে শরণার্থী মর্যাদা দেয়া হয়েছিল। এই কার্যক্রমে সহায়তা করে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা। এদেরকে কক্সবাজারের দু’টি ক্যাম্পে রাখা হয়।

তবে এর কিছুদিন পরেই আরো দুই লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেন – কিন্তু তাদেরকে আর শরণার্থী মর্যাদা দেয়া হয়নি।

সরকারি দু’টি ক্যাম্পের বাইরে আশেপাশে ঘর বানিয়ে তারা বসবাস করতে শুরু করেন।

২০১৭ সালের অগাস্টের পর যে প্রায় আট লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে তাদেরকে ‘বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিক’ বলে বর্ণনা করছে সরকার। তাদের শরণার্থী মর্যাদা দেয়া হয়নি।

তবে গণমাধ্যম ও দেশি বিদেশি বেসরকারি সংস্থাগুলো এদের শরণার্থী বলেই বর্ণনা করে থাকে।

এছাড়া বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর পাকিস্তানকে সমর্থনকারী যে বিহারি জনগোষ্ঠীর সদস্যদের একসময় ‘শরণার্থী’ হিসাবে বিবেচনা করা হলেও, পরবর্তীতে তাদের বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেয়া হয়েছে।

শরণার্থী মর্যাদা থাকা কতটা জরুরি
আসিফ মুনীর বলছেন, ”শরণার্থী মর্যাদার ব্যাপারটা আসলে একটা স্বীকৃতি দেয়া যে, তুমি তোমার দেশে বিপদে আছো, সেখানে যেতো পারছো না, তাই তোমাকে এখানে থাকতে দেয়া হলো। যখন আপনি কাউকে থাকতে দেবেন, তখন তো তার দরকারি চাহিদাগুলো, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আবাসন ইত্যাদি সুবিধাও আপনাকে দিতে হবে।”

কিন্তু বাংলাদেশের সরকার চায় না যে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে থেকে যাক। এ কারণেই এই ইস্যুতে সরকার শরণার্থী মর্যাদা দিতে চায় না বলে তিনি মনে করেন।

”যে টার্ম সরকার ব্যবহার করছে, ‘বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত নাগরিক’ – এটি ব্যবহারের ফলে তাদের ফেরত পাঠানোর একটি চাপ থাকবে। বাংলাদেশ তাদের আশ্রয় দিলেও তাদের স্থায়ীভাবে থাকার পরিবেশ তৈরিতে আগ্রহী নয়।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিন বলছেন, বাংলাদেশের সংবিধান কিন্তু বিদেশী নাগরিকদের দায়িত্ব নেয়ার কথা বলে না।

”আগে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, এই দশ লাখের বেশি মানুষকে আমরা দেশের মেইনস্ট্রিমে মিশিয়ে নিতে চাই কিনা, নাকি তাদের মিয়ানমারে, তাদের দেশে ফেরত পাঠাতে চাই। এখন যদি তাদের এখানে পড়াশোনার সব ব্যবস্থা করে দেয়া হয়, নাগরিকদের মতো সব সুযোগ সুবিধা দেয়া হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই তারা আর নিজেদের দেশে ফেরত যেতে চাইবেন না।”

”কিন্তু সেই সঙ্গে তাদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের ব্যাপারটিও নিশ্চিত করা দরকার। সেজন্য ক্যাম্পের ভেতরেই তাদের উপযুক্ত ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে” – বলছেন লাইলুফার ইয়াসমিন।

শরণার্থী বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বলছেন, ”সমস্যা হলো, এই সংকট অনেক দিন ধরে চললেও আমাদের কোন দীর্ঘমেয়াদি কর্মকৌশল নেই। যেহেতু খুব তাড়াতাড়ি সবাইকে ফেরত পাঠানোর সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না, ক্যাম্পেও অনেক শিশুকিশোর বড় হচ্ছে। তাদের একেবারে অশিক্ষিত করে রাখাও ঠিক হবে না।”

তাই তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন ইত্যাদি বিবেচনায় রেখে এখনই একটি কর্মপরিকল্পনা ঠিক করা উচিত বলে তিনি মনে করেন।

শরণার্থী হলে কী সুবিধা পাওয়া যাবে?
আন্তর্জাতিক অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বলছেন, মালয়েশিয়ায় যে রোহিঙ্গারা শরণার্থী মর্যাদা পেয়েছেন, তাদের একটা কার্ড ইস্যু করা হয়। সেটি দেখিয়ে তারা সেখানে কাজ করতে পারেন, পড়াশোনা করতে পারেন, যদিও স্থানীয় বাসিন্দাদের তুলনায় কিছুটা পার্থক্য থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে বিষয়টা তেমন নয়।

”বাংলাদেশের সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দারা সেখানকার স্কুলে ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়াশোনা করতে পারে। এর বেশি পড়ার অনুমতি তাদের নেই। আবার ক্যাম্পের বাইরে চাকরি বা কাজের সুযোগ নেই। যাতায়াতের ক্ষেত্রেও সবসময় পাস বা অনুমতির দরকার হয়।”

জেনেভা ক্যাম্পে যেসব আটকে পড়া পাকিস্তানি ছিলেন, তাদের জাতিসংঘের সহায়তায় অর্থ ও খাদ্য সহায়তা দেয়া হতো। পরবর্তীতে অবশ্য তারা স্থানীয় চাকরি ও ব্যবসায় জড়িত হয়ে যান।

যে রোহিঙ্গাদের শরণার্থী হিসাবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল, তাদের মধ্যে কয়েকশোজন তৃতীয় দেশে বসবাসের সুযোগ পান।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনের অতিরিক্ত কমিশনার মোঃ: মিজানুর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলছেন, ”দুই ধরণের রোহিঙ্গা এখানে রয়েছেন। কিছু রোহিঙ্গার শরণার্থী মর্যাদা আছে, বাকিদের নেই। যদিও সবাই হয়তো তাদের শরণার্থী বলছেন, কিন্তু কনভেনশনের হিসাবে সবাই শরণার্থী নন। তবে সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে সেটা আর আলাদা বলার সুযোগ নেই। ”

তিনি বলেন, ”শরণার্থী হিসাবে যে অধিকারগুলো পাওয়ার কথা, সেটা এখন সবাই সমানভাবে পাচ্ছেন। সুতরাং তাদের মধ্যে আমরা সুযোগ-সুবিধার খুব একটা পার্থক্য দেখতে পাই না।”

শরণার্থী থাকা-না-থাকার পার্থক্য

খাবার:

সরকার ও বেসরকারি সংস্থার তত্ত্বাবধানে রোহিঙ্গাদের পরিবার প্রতি খাবার, পানি ও পারিবারিক দরকারি সব সামগ্রী সরবরাহ করা হয়। এক্ষেত্রে শরণার্থী মর্যাদা থাকা-না-থাকার কোন পার্থক্য করা হয়না।

আবাসন:

শরণার্থী হিসাবে তালিকাভুক্ত ৩০ হাজার রোহিঙ্গা রেজিস্টার্ড দু’টি ক্যাম্পে বসবাস করেন। তবে এর বাইরে অসংখ্য ক্যাম্পে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা রয়েছেন। এসব ক্যাম্পও সরকারিভাবে পরিচালনা করা হয়।

শিক্ষা:

কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে যে বিষয়গুলো জানা গেল, একটা সময়ে রোহিঙ্গারা স্থানীয় স্কুল-কলেজে পড়াশোনা করতে পারতেন। কিন্তু সম্প্রতি এক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করে সরকার।

তবে স্থানীয় সাংবাদিকরা বলছেন, কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের অনেক স্কুল-কলেজে রোহিঙ্গা ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করছে। তাদের অনেকে রোহিঙ্গা পরিচয় ব্যবহার করছেন, কিন্তু বেশিরভাগই মিথ্যা পরিচয় ব্যবহার করে পড়াশোনা করছেন।

আরআরআরসির কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে দু’টি রেজিস্টার্ড রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ক্লাস সেভেন পর্যন্ত পড়তে পারেন। অন্য ক্যাম্পগুলোয় প্রচলিত স্কুল না থাকলেও কিছু লার্নিং সেন্টার রয়েছে, যেগুলো বেসরকারি সংস্থাগুলো পরিচালনা করে। এর বাইরে কয়েকটি মাদ্রাসা রয়েছে।

সরকারের তরফ থেকে কিছুদিন আগে কক্সবাজারের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে, ক্যাম্পের বাইরের কোন স্কুলে যেন রোহিঙ্গা শিশু বা শিক্ষার্থীদের ভর্তি করা না হয়। আগে যাদের ভর্তি করা হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

সম্প্রতি কক্সবাজারের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন রোহিঙ্গা ছাত্রীর এরকম পড়াশোনার খবর প্রকাশ হওয়ার পর তাকে সাময়িক বহিষ্কার করেছে কর্তৃপক্ষ।

অন্য দেশে বসবাস:

শরণার্থী হিসাবে তালিকাভুক্ত কয়েকশো ব্যক্তিকে তৃতীয় কয়েকটি দেশ গ্রহণ করেছে। যদিও অনেক বছর ধরে সেই কার্যক্রম বন্ধ আছে।

বিয়ে:

বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কয়েক দফায় প্রজ্ঞাপন জারি করে করে বলা হয় যে, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কোন সদস্যকে বাংলাদেশি কেউ বিয়ে করতে পারবেন না। সর্বশেষ ২০১৭ সালের ২৫ অক্টোবর এরকম প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।

বিশেষ করে কক্সবাজার, বান্দরবান ও রাঙ্গামাটির কাজী অফিসগুলোতে নির্দেশনা জারি করা হয়, যেন তারা এরকম বিয়ে না করান। এরকম বিয়ের কারণে বেশ কয়েকজনকে জরিমানাও করা হয়।

চিকিৎসা:

যদিও রোহিঙ্গা ক্যাম্পের প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য ক্যাম্পের ভেতরেই সরকারি-বেসরকারি ব্যবস্থা রয়েছে। তবে জরুরি ক্ষেত্রে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে বাধা নেই বলে জানিয়েছেন আরআরআরসির কর্মকর্তা মিজানুর রহমান।

যাতায়াত:

শরণার্থী মর্যাদা থাকুক আর নাই থাকুক, রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পের বাইরে যেতে হলে পাস বা অনুমতি নেয়ার বিধান রয়েছে। তবে এই বিষয়টি এখনো খুব কড়াকড়িভাবে নজরদারি করা হয় না বলে কর্মকর্তারা বলছেন।

কাজের সুবিধা:

বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পের বাইরে কাজ করার অনুমতি নেই। যদিও অনেকেই গোপনে এমনটা করছেন বলে জানা যায়।

সূত্র: বিবিসি

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

19 + sixteen =

আরও পড়ুন