বাংলাদেশ সেনাবাহিনী: পাহাড়ের অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে বিশ্ব শান্তির অগ্রকপোত

http://parbattanews.com/wp-content/uploads/2013/05/521560_250397518401000_451937334_n.jpg

আজ বিশ্ব শান্তিরক্ষা দিবস

পার্বত্য নিউজ ডেস্ক:

গল্পটারর শুরু সত্তর দশকের শেষার্ধে। নিজ দেশের এক দশমাংশ ভূখণ্ড বিদেশী ষড়যন্ত্রে পরিচালিত বিচ্ছিন্নতাবাদের আঘাত থেকে রক্ষা করা, জাতিগত দাঙ্গার হাত থেকে নিজ দেশের মানুষের নিরাপত্তা বিধান, অনগ্রসর এলাকায় উন্নয়ন ও অগ্রগতির আলোর মশাল প্রজ্জলনের মিশন নিয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে পাঠানো হয়েছিল দূর্গম, বিপদ সঙ্কুল, মৃত্যু উপত্যকা পার্বত্য চট্টগ্রামে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তার প্রশিক্ষণ, দক্ষতা ও সেবা ও শান্তিরক্ষা কার্যক্রম দিয়ে একদিকে অশান্ত পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তির অভয় পরিবেশ সৃষ্টি করে, অন্যদিকে সেবা ও শান্তির মিশনে সেখানে উন্নতি ও অগ্রগতির আলোয় উদ্ভাসিত করে। অনেক ঘামে, অনেক শ্রমে, এমনকি বহু জীবনের বিনিময়েও দেশের সার্বভৌমত্বক অটুট রাখতে শান্তি ও সেবার মিশন থেকে বিরত হয়নি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। যার প্রমাণ, আজও বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ পার্বত্য চট্টগ্রাম। যার প্রমাণ এক সময়ের বাংলাদেশের সবচেয়ে দূর্গম ও অনিরাপদ পার্বত্য চট্টগ্রাম আজ পর্যটকদের প্রবল আকর্ষণীয় স্থান।

ফলে তাদের সেই সাফল্যের সংবাদ দেশের গণ্ডি পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে আন্তর্জাতিক মহলেও।  অশান্ত বিশ্বের কোণে কোণে শান্তির কপোত হওয়ার ডাক আসে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীও বাংলাদেশের সংবিধান ও সরকরের সম্মতিতে দেশে অর্জিত অভিজ্ঞতা বিশ্বের বুকে ছড়িয়ে দিতে এগিয়ে যায়। পার্বত্য চট্টগ্রামে অর্জিত শান্তিরক্ষা ও সেবার অভিজ্ঞতা, দক্ষতা, দীক্ষা কাজে লাগিয়ে জয়লাভ করে বিশ্ববাসীর মন। ফলে বাংলাদেশ আজ বিশ্বের বুকে সবচয়ে বড় আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী সরবরাহকারী দেশ। তারপরও এ মাসে আরো ৬০০ নতুন সৈন্য সরবরাহের আহ্বান এসেছে জাতিসংঘের কাছ থেকে। সে আরেক গল্প। শুরুটা ১৯৮৮ সালে।

শান্তিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশ সব সময়ই বিশ্ব নিরাপত্তা ও শান্তিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ দেশের সংবিধানকে সামনে রেখেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সব সময় বিশ্বশান্তি ও সংহতি জোরদার করার লক্ষ্যে জাতিসংঘের প্রতিটি ডাকে সাড়া দিয়ে আসছে।

বাংলাদেশের শান্তিরক্ষা মিশনের সদস্যদের পদচিহ্ন সারা বিশ্বে। পূর্ব তিমুর থেকে হাইতি, ক্রোয়েশিয়া থেকে নামিবিয়া, এমনকি শীতার্ত ইউরোপ থেকে উষ্ণ পূর্ব এশিয়া এবং সাহারার মরুপ্রান্তরেও এ দেশের শান্তিরক্ষীরা বিচরণ করেছেন। দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় কাজ করছেন এ দেশের সেনারা।

শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ১৯৮৮ সাল থেকে। ওই বছর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১৫ জন অফিসার জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন ইরান-ইরাক (UNIMOG)-এ সামরিক পর্যবেক্ষক হিসেবে মিশন সম্পন্ন করেন। এরপর অতি অল্প সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ সুনামের সঙ্গে জাতিসংঘের সবচেয়ে বেশি সেনা প্রদানকারী দেশের স্বীকৃতি লাভ করে। বিশ্বের ৪০টি শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এক লাখ সাত হাজার ৪৮৭ জন সদস্য অংশ নেন।

শান্তিরক্ষা মিশনে সেনা মোতায়েনের সংখ্যার বিচারে প্রায় এক যুগ ধরেই বাংলাদেশ শীর্ষ চারটি দেশের মধ্যে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে। বর্তমানে ছয় হাজার ১৬৩ জন সেনা শান্তিরক্ষী নিয়ে বাংলাদেশ শীর্ষ অবস্থানে আছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বর্তমানে সাতটি দেশে চলমান সাতটি শান্তিরক্ষা মিশনে নিয়োজিত। প্রতিটি মিশনে এ দেশের নারী অফিসাররা উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় অংশ নিচ্ছেন।

বাংলাদেশি সেনা শন্তিরক্ষীদের অর্জন
২৫ বছর ধরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা নীল হেলমেট মাথায় নিয়ে প্রচণ্ড সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অসামান্য সাফল্যের ইতিহাস তৈরি করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো_

ক. সাবেক যুগোস্লাভিয়া : ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী বাহিনী বিহাচে (Bihac) পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। এমনকি বসনীয় ও ক্রোয়াট বাহিনী দ্বারা বেশ কয়েক সপ্তাহ অবরুদ্ধ থাকার পরও বাংলাদেশি সেনা সদস্যরা বিহাচে দৃঢ়তা ও সততার সঙ্গে তাঁদের অর্পিত দায়িত্ব পালন করে জাতিসংঘের ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন রাখতে সমর্থ হন।

খ. সোমালিয়া : ১৯৯৫ সালে সোমালিয়ায় জাতিসংঘের মিশন ইউনোসোম (UNOSOM) জটিল অবস্থার সম্মুখীন হয়। তখনো বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী বাহিনীর সদস্যরা তাঁদের সাহস ও মনোবলের মাধ্যমে শান্তি মিশন শেষ হওয়া পর্যন্ত জাতিসংঘের বেসামরিক কর্মীদের এবং অন্যান্য সামরিক কন্টিনজেন্টের জন্য নিরাপদ প্রস্থানের পরিবেশ নিশ্চিত করেন।

গ. কঙ্গো প্রজাতন্ত্র : ২০০৩ সালে যখন ব্যাপক ও বিস্তৃত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে কঙ্গোর ইতুরি প্রদেশে হাজার হাজার মানুষ মারা যায়, তখন বাংলাদেশের শান্তিরক্ষী বাহিনীর সদস্যরা তৎক্ষণাৎ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সচেষ্ট হন। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ কঙ্গোর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সেনা অভিযানকে সাফল্যমণ্ডিত করে। গত ৬ জানুয়ারি মামবাসা অঞ্চলে বিদ্রোহীদের (মাই মাই সিমবা) প্রতিহত করে এবং মামবাসা শহর থেকে বিতাড়ন করায় ফোর্স কমান্ডার বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের ভূয়সী প্রশংসা করেন। কঙ্গোর সরকারি বাহিনীকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ প্রদানের বিষয়টি সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে।

ঘ. ইউনোসি (আইভরি কোস্ট) : আইভরি কোস্টে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন-পরবর্তী উদ্ভূত পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে সবচেয়ে গোলযোগপূর্ণ এলাকা আবিদজান, ডালোয়া, মান এবং বহুল আলোচিত গালফ হোটেলে অবস্থানরত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রেসিডেন্ট আলাসান ওয়াতারার নিরাপত্তার দায়িত্বে সাফল্যের সঙ্গে নিয়োজিত ছিলেন। আবিদজানে নিয়োজিত বাংলাদেশি কন্টিনজেন্টগুলো বিভিন্ন দেশের দূতাবাসের ৬০ জনেরও বেশি কূটনীতিককে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার দায়িত্বও সফলভাবে সম্পন্ন করে। ফোর্স সদর দপ্তরের সামরিক ও বেসামরিক সব সদস্যের নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্বও সাফল্যের সঙ্গে নিশ্চিত করেন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা।

ঙ. আনমিস (দক্ষিণ সুদান) : দক্ষিণ সুদানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জুবা অঞ্চলে নিয়োজিত বাংলাদেশি কন্টিনজেন্টগুলো তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে জাতিসংঘ আয়োজিত গণভোট সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন করে। এটি দক্ষিণ সুদানের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে বিশেষ অবদান রেখেছে।

চ. আনমিল (লাইবেরিয়া) : আইভরি কোস্টের গোলযোগপূর্ণ পরিস্থিতি চলাকালে লাইবেরিয়ায় নিয়োজিত বাংলাদেশি কন্টিনজেন্টগুলো প্রত্যক্ষভাবে শরণার্থী পরিস্থিতি মোকাবিলায় সীমান্ত অঞ্চলে নিয়োজিত ছিল। শরণার্থী নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশি কন্টিনজেন্ট বুটুও নামক স্থানে একটি নতুন ক্যাম্পও স্থাপন করে। সামগ্রিকভাবে লাইবেরিয়ার আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট উন্নয়নে বাংলাদেশ প্রত্যক্ষ ভূমিকা রেখে চলেছে। বিশেষ করে কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও প্রকৌশল সহায়তায় বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের ইতিবাচক ভূমিকা স্থানীয় জনগণ ও সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে। এ ছাড়া লাইবেরিয়ার সেনাবাহিনীকে বাংলাদেশ ব্যানইঞ্জিনিয়ার কম্পানির প্রশিক্ষণের বিষয়টি ওই দেশের সরকার বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে।

. অন্যান্য : এ ছাড়া মোজাম্বিক, সিয়েরা লিয়ন, লাইবেরিয়া, হাইতি, পূর্ব তিমুর প্রভৃতি দেশেও শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা ঈর্ষণীয় সাফল্য দেখিয়েছেন।

বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের স্বীকৃতি
বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের অবদান আজ সারা বিশ্বে স্বীকৃত। জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান বলেছেন, `জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ হলো একটি আদর্শ বা মডেল সদস্য। বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যে নেতৃত্বসম্পন্ন। এ দেশ দীর্ঘদিন ধরে জাতিসংঘের বিভিন্ন শান্তিরক্ষা ও মানবিক কর্মকাণ্ডে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখে চলেছে।`

বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা ইরিত্রিয়া, অ্যাঙ্গোলা ও সুদানে মাইন নিষ্ক্রিয়করণ, সোমালিয়ায় উদ্বাস্তুদের নিরাপদে স্থানান্তর এবং সিয়েরা লিয়নে স্কুল ও চিকিৎসাসেবা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় কাজ করেছেন।

জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন সুদানের দক্ষিণাঞ্চল পরিদর্শনকালে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের উদ্দেশে বলেছেন, `বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা সুদানে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যে মহৎ কাজ করছে, তার প্রতি রইল আমার গভীর শ্রদ্ধা।`

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শান্তিরক্ষীদের এই সাফল্য ও স্বীকৃতির পেছনে আছে শৃঙ্খলা ও পেশাগত দক্ষতা। এ ছাড়া দায়িত্ব পালনে নিরপেক্ষতা এবং জাতিসংঘের অর্পিত দায়িত্ব ও সব ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা অনুশীলনের কারণে বাংলাদেশিরা বিশ্বময় স্বীকৃত। বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা স্বাগতিক দেশের সঙ্গে আন্তরিক সম্পর্ক বজায় রাখতে চেষ্টা করেন। এটি শুধু তাঁদের দায়িত্ব পালনে সাহায্যই করে না, মানুষের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক বজায় রাখতেও সাহায্য করে। সিয়েরা লিয়নে বাংলাদেশের নামে একটি রাস্তার নামকরণ এবং বাংলাকে দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে ঘোষণা দেওয়া এ দেশের শান্তিরক্ষীদের প্রতি দেশটির সেনাবাহিনীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।

শান্তিরক্ষায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ত্যাগ

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শান্তিরক্ষীরা বিদেশের মাটিতে শত্রুর সামনে কখনোই মাথা নত করেননি কিংবা বিপদের মুখে বা সংকটময় পরিবেশে পিছু হটেননি। এ দেশের শান্তিরক্ষীরা জীবনঝুঁকির মধ্যেও জটিল ও বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে কাজ করে থাকেন।

এ পর্যন্ত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৯১ জন শান্তিরক্ষী বিশ্বশান্তি রক্ষায় প্রাণ উৎসর্গ করেছেন। ১৩৯ জন শান্তির জন্য লড়াই করতে গিয়ে বিভিন্নভাবে আহত হয়েছেন। শান্তিরক্ষায় কাজ করতে গিয়ে এ দেশের সেনাবাহিনীর সদস্যরা নানা বিপদের সম্মুখীন হলেও তা কখনো তাঁদের মনোবল ভাঙতে পারেনি।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কঠোর পরিশ্রম ও পেশাগত দক্ষতার ফলে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য লাভ করেছে। জাতিসংঘের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে এ দেশ পক্ষপাতহীনভাবে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় সক্ষম। দক্ষতা ও অদম্য মনোবল নিয়ে এ দেশের শান্তিরক্ষীরা শান্তি ও নিরাপত্তার যে নীতি প্রতিষ্ঠা করেছেন, তা সর্বজনবিদিত হয়ে থাকবে। সর্বোপরি এ দেশের সেনাবাহিনীর শান্তিরক্ষা সদস্যদের মহান আত্মত্যাগ বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ দেশকে উৎসাহ ও শক্তি জুগিয়ে যাবে।

বাংলাদেশ নৌবাহিনী : ২০০৫ সালে সুদানে ইউএনএমআইএসএস মিশনের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ফোর্স রিভারাইন ইউনিটকে (বিএএনএফআরইউ) একটি স্বতন্ত্র ইউনিট হিসেবে মোতায়েন করা হয়। ইউএনআইএফআইএলের আওতায় ফর্মড মেরিটাইম টাস্কফোর্সের (এফএমটিএফ) অংশ হিসেবে ২০১০ সালে লেবাননে বিএনএস ওসমান ও বিএনএস মধুমতী মোতায়েন করা হয়। জাহাজগুলো এক বছর সাফল্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন শেষে তাদের কাজের মেয়াদ আরো এক বছর বাড়ানো হয়। জাতিসংঘের ২৫টি শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে (ইউএনপিকেও) এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ নৌবাহিনীর এক হাজার ৫১৬ জন অফিসার ও নাবিক অংশ নিয়েছেন। বর্তমানে আটটি ইউএনপিকেওতে ৫২৬ জন অফিসার ও নাবিক পর্যবেক্ষক, এসও ও কন্টিনজেন্ট সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের একমাত্র রিভারাইন ইউনিট হলো বিএএনএফআরইউ। এর ঘাঁটি মালকালে অবস্থিত। এটি স্থলবাহিনীকে সহযোগিতা ছাড়াও কারিগরি সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমকে সহায়তার জন্য আবিদজানে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর আরেকটি কম্পোনেন্ট মোতায়েন আছে। ন্যাটো ও ইউরোপীয় মেরিটাইম ব্যবস্থার সঙ্গে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর অফিসার ও নাবিকদের দ্রুত খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতার কারণে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে তাঁদের দক্ষতার আরো প্রমাণ মিলেছে।

বাংলাদেশ বিমানবাহিনী : ১৯৯৩ সালে বসনিয়া-হার্জেগোভিনায় ইউএনপিআরওএফওআরে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হয়। এরপর ১৯৯৫ সালে ইউনিকমে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী হেলিকপ্টারসহ অংশ নেয়। আট বছর ধরে ওই অভিযান অব্যাহত ছিল। ২০০৩ সালে পূর্ব তিমুরে ইউএনএমআইএসইটিতে বিমানবাহিনীর আরো একটি কন্টিনজেন্ট মোতায়েন করা হয়। অত্যন্ত ভিন্ন পরিবেশ সত্ত্বেও বিমানবাহিনীর শান্তিরক্ষীরা সাফল্যের সঙ্গে বিশ্বশান্তি রক্ষায় সহায়তা করেন। ২০০৩ সালে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী এমওএনইউসিতে পাঁচটি এমআই-১৭ হেলিকপ্টার এবং প্রয়োজনীয় সামগ্রীসহ এয়ারফিল্ড সার্ভিসেস কন্টিনজেন্ট পাঠায়। এরপর ২০০৯ ও ২০১০ সালে শাদে তিনটি বেল-২১২ হেলিকপ্টারসহ একটি এয়ার কন্টিনজেন্ট এবং মুভমেন্ট কন্ট্রোল প্লাটুন পাঠানো হয়। ২০১১ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত ২১টি দেশে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর দুই হাজার ৬৫৯ জন সদস্য সাফল্যের সঙ্গে দায়িত্ব সম্পন্ন করেন। বিমানবাহিনীর তিনজন সদস্যের সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ ও অনেকে আহত হওয়ার পরও বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সংকল্প আরো দৃঢ় হয়েছে।

বাংলাদেশ পুলিশ : ১৯৮৯ সাল থেকে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অন্যান্য বাহিনীর পাশাপাশি বাংলাদেশ পুলিশের সদস্যরা অংশ নিচ্ছেন। নির্বাহী ও পর্যবেক্ষণ মিশনে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি এ দেশের পুলিশ সদস্যরা বিভিন্ন জটিল দায়িত্ব সাফল্যের সঙ্গে পালন করেছেন। নিরাপত্তা রক্ষার পাশাপাশি টেকসই পুলিশ ব্যবস্থা উন্নয়ন, স্থানীয় তদন্তকারীদের উৎসাহিত করতে সহায়তা, মানুষের জন্য ঝুঁকি প্রশমন ছিল তাঁদের অন্যতম কাজ। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে এ পর্যন্ত মোট সাত হাজার ৫২২ জন পুলিশ সদস্য অংশ নিয়েছেন। বর্তমানে ৯টি মিশনে দুই হাজার ৫৩ জন পুলিশ সদস্য মোতায়েন আছেন।

উল্লেখযোগ্য অবদান রাখার জন্য বাংলাদেশের পুলিশ সদস্যদের চাহিদা বাড়ছে। বাংলাদেশের পুলিশ সদস্যদের সাফল্যের কারণে ২০১৪ সালের মধ্যে জাতিসংঘ তার শান্তিরক্ষা মিশনগুলোতে বাংলাদেশি নারী পুলিশ সদস্যের সংখ্যা ২০ শতাংশ বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করছে।

রেমিট্যান্স প্রবাহ

শান্তিরক্ষী পাঠিয়ে বাংলাদেশ এ পর্যন্ত ১০৯ কোটি ৪৬ লাখ ৯৭ হাজার ৬১৯ দশমিক ৯০ ডলার এবং বিভিন্ন ইকুইপমেন্ট পাঠিয়ে ৪৫ কোটি ৭২ লাখ সাত হাজার ২৫৬ দশমিক ৪০ ডলার আয় করেছে। জাতিসংঘ সদর দপ্তরে দায়িত্ব পালনকারী পর্যবেক্ষকদের আয় এই হিসাবের বাইরে। মিলিটারি কন্টিনজেন্টগুলোর অন্যান্য বেতন ও ভাতা সরাসরি সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে। সরকারই তা শান্তিরক্ষীদের মধ্যে বিতরণ করেছে। ২০১০-১১ অর্থবছরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ট্রুপস ও ইকুইপমেন্ট খরচ হিসেবে ১১ হাজার ২৯৫ দশমিক ৯১ মিলিয়ন ডলার পেয়েছে। তবে সেনাবাহিনীর ক্রয় (প্রকিউরমেন্ট) বাজেটের মাত্র ২১.৫৫ শতাংশ অর্থাৎ পাঁচ হাজার ৩০০ মিলিয়ন টাকা ওভারসিস অপারেশন খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

কূটনীতিতে শান্তিরক্ষীদের ভূমিকা

বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা বিশ্বের সর্বত্র দক্ষতা ও পেশাদারির সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরিতে সাহায্য করছেন এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদারে ভূমিকা রাখছেন। শান্তিরক্ষা কূটনীতি এখন জাতীয় কূটনীতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

১৯৭১ সালের পর থেকে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী যুদ্ধের মুখোমুখি হয়নি। তাই এ দেশের সশস্ত্র বাহিনীগুলোর বিদেশে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার গুরুত্ব কাছে অনেক। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে `ব্যাটলফিল্ড অপারেটিং সিস্টেম`-এর আওতায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে জনবল নিয়োগ করা হয়। বিভিন্ন দেশে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশিদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা বাড়ছে।

সংঘাত-পরবর্তী শান্তি বিনির্মাণ ও উন্নয়ন

সংঘাতের সময়ের মতো সংঘাত-পরবর্তী সময়েও শান্তি প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়নে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতার কারণে এ দেশকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশি বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক দক্ষিণ সুদানে বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছে। ব্র্যাকের মতো বাংলাদেশি অন্যান্য উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানকে দক্ষিণ সুদান সরকার ওই দেশে স্বাগত জানাতে পারে। ভারত, পাকিস্তান, চীন, জাপান, মিসরের মতো দেশগুলো দক্ষিণ সুদানের বাজারে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় জোর প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে।

জাতিসংঘের সঙ্গে ব্যবসার সুযোগ : শান্তিরক্ষা কার্যক্রম ও জাতিসংঘের অন্যান্য উদ্যোগের জন্য বাংলাদেশ বছরে ১৪০০ কোটি ডলারের পণ্য ও সেবা বিক্রির আদেশ পেতে পারে। তবে এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে বাংলাদেশি কম্পানিগুলোকে জাতিসংঘের নীতি ও ক্রয়ব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে হবে। বর্তমানে মাত্র দুটি বাংলাদেশি কম্পানি জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচিকে (ইউএনডিপি) পণ্য সরবরাহ করে থাকে।

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রম
১৯৪৫ সালের ২৬ জুন যুক্তরাষ্ট্রের সানফ্রান্সিসকোতে স্বাক্ষরিত জাতিসংঘ সনদের মূল উদ্দেশ্য ছিল ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করা এবং বিশ্বে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের কথা ওই সনদে সরাসরি বলা হয়নি। তবে তাতে বলা হয়েছিল, আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের জন্য নিরাপত্তা পরিষদ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নিতে পারবে। জাতিসংঘ সনদের ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম অনুচ্ছেদে এর আইনি ভিত্তি পাওয়া যায়। জাতিসংঘ সনদের ষষ্ঠ অনুচ্ছেদে `বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান`, সপ্তম অনুচ্ছেদে `শান্তি, শান্তিভঙ্গ ও আগ্রাসনের ব্যাপারে ব্যবস্থা`র কথা বলা হয়েছে। জাতিসংঘ সনদের অষ্টম অনুচ্ছেদে আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় আঞ্চলিক ব্যবস্থা ও বিভিন্ন সংস্থাকে সম্পৃক্ত করার প্রসঙ্গ রয়েছে।

স্নায়ু যুদ্ধের সময় পরাশক্তিগুলোর আগ্রহ ছিল ভিন্ন। জাতিসংঘের অনেক যৌথ উদ্যোগ তাদের ভেটোর কারণে আটকে গেছে। ১৯৯০-এর দশকে শীতল যুদ্ধের অবসানের পর বিশ্বরাজনীতি বদলাতে শুরু করে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ৫৯৮ নম্বর প্রস্তাব পাস করে। সেখানে ভেটো ক্ষমতাসম্পন্ন পাঁচটি দেশই ইরান ও ইরাকের মধ্যে আট বছরের যুদ্ধের অবসান ঘটাতে সম্মত হয়। ১৯৯০ সালের আগস্ট মাসে কুয়েত সংকট নতুন অধ্যায়ের দ্বিতীয় পর্বের সূচনা ঘটায়। সে সময় নিরাপত্তা পরিষদ প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ সনদের সপ্তম অনুচ্ছেদ ব্যবহার করে এক সদস্য রাষ্ট্রের ওপর আরেক সদস্য রাষ্ট্রের আগ্রাসন মোকাবিলার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে নিরাপত্তা পরিষদ নিজে ওই উদ্যোগ নেয়নি। সেটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে স্বেচ্ছায় যোগ দেওয়া একটি জোটের অ্যাডহক সিদ্ধান্ত।

কুয়েত সংকটের পর ইরাকের অভ্যন্তরীণ সংকটকে জাতিসংঘ সনদের সপ্তম অনুচ্ছেদের আওতায় এনে ইরাক সরকারের নিপীড়নকে `আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার প্রতি হুমকি` হিসেবে অভিহিত করার সুযোগ হয়। তবে কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ সংকটের জন্য জাতিসংঘ সনদের সপ্তম অনুচ্ছেদ ব্যবহার করে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি বিতর্কহীন ছিল না। আজ পর্যন্ত ওই উদ্যোগের ব্যাপারে কোনো আন্তর্জাতিক ঐকমত্য নেই।

সাম্প্রতিক সময়ে শান্তিরক্ষা কার্যক্রম
সাম্প্রতিক সময়ে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে সামরিক, পুলিশ এবং বেসামরিক সদস্যরাও থাকেন। রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে সরকার, বেসরকারি সংস্থা ও স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি শান্তিরক্ষীরা জরুরি ত্রাণ পৌঁছানো, স্থানান্তর, বিদ্রোহীদের নিরস্ত্রীকরণ, সামাজিক পুনর্মিলন, নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং টেকসই উন্নয়নকে উৎসাহিত করার ম্যান্ডেট নিয়ে কাজ করে থাকেন। সোমালিয়া, কম্বোডিয়া ও সাবেক যুগোস্লাভিয়ায় পরিচালিত শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক বাহিনীর তিন ধরনের তৎপরতা দেখা গেছে। এর একটি হলো জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রম। অন্য দু’টি হলো জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন ছাড়া আগ্রহী দেশগুলোর জোটের উদ্যোগ (ইরাক, আফগানিস্তান) এবং জাতিসংঘের অনুমোদন থাকলেও জাতিসংঘের পরিবর্তে অন্য কারো নেতৃত্বে উদ্যোগ।

আফগানিস্তানে আইএএসএফ, সোমালিয়া ও দারফুরে আফ্রিকান ইউনিয়ন এবং শাদে ইউরোপীয় ইউনিয়নের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমকে জাতিসংঘ অনুমোদন দিলেও নেতৃত্বে নেই।

১৯৯০ সাল থেকে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বেসামরিক সদস্যদের অন্তর্ভুক্তি বাড়ছে। ফলে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রম অনেক এজেন্সির সমন্বয়ে বহুমুখী ও জটিল রূপ পেয়েছে।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

One Reply to “বাংলাদেশ সেনাবাহিনী: পাহাড়ের অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে বিশ্ব শান্তির অগ্রকপোত”

  1. থাকি ভারতীয় হিস্যার বাংলায়। পশ্চিমবঙ্গে।কিন্তু আমি আগে তো বাঙ্গালী। আবহমান বাংলার একজন। আপনাদের সাফল্যে গৌরব বোধ করি। আপনাদের কথাটি লিখতে কলম কেঁপে যাচ্ছে। বৃহত্তর অর্থে এ সাফল্য আমারও। বাংলাদেশ স্বমহিমায় উদিত হোক।আমরহই প্রাণিত।তথ্য সমৃদ্ধ লেখাটির জন্য ধন্যবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন