বাংলাদেশের অন্তবর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. ইউনূস কক্সবাজারে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক রোহিঙ্গা সম্মেলনে গতকাল ২৫ আগস্ট যে ৭টি প্রস্তাব তুলে ধরেন তার প্রথমটি হলো আর সময় নষ্ট না করে একটি বাস্তব রোডম্যাপ তৈরি। শরনার্থী রোহিঙ্গারা প্রধান উপদেষ্টা নির্দেশিত বাস্তব রোডম্যাপের অপেক্ষায় ফের দিন গুনতে শুরু করেছেন। তারা মনে করছেন, অন্তবর্তী সরকারের এই বাস্তব রোডম্যাপ ধরেই নিরাপদে ফিরতে পারবেন নিজেদের দেশে।
একটি বাস্তব রোডম্যাপ তৈরির গুরুত্ব বা প্রয়োজনীয়তার কথা ইতোপূর্বে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বিভিন্ন কূটনৈতিক মিশন ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে তুলে ধরলেও তার বাস্তবায়ন হয়নি। এতদিনে একটি রোডম্যাপ তৈরি না করে কেনো সময় নষ্ট করা হচ্ছে তা নিয়ে আটকে পড়া রোহিঙ্গা ও ক্ষতিগ্রস্ত কক্সবাজারবাসীরাও হতাশ।
গতকাল প্রধান উপদেষ্টা তাঁর ৭ দফা প্রস্তাবের শুরুতেই রোডম্যাপ সম্পর্কে বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে নিরাপদে ফিরে যেতে হবে। এ জন্য আমরা সবাইকে আহ্বান জানাবো, তাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনে একটি বাস্তব রোডম্যাপ যত দ্রুত সম্ভব তৈরি করুন। আর সময় নষ্ট না করে এখনই কাজ করতে হবে।’
অন্তবর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই এই রোডম্যাপ তৈরির কথা বলা হচ্ছে। মার্চে অন্তবর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেনও রোডম্যাপের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেছিলেন, ‘একটি রোডম্যাপের মাধ্যমে মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত নাগরিক (এফডিএমএন) অর্থাৎ রোহিঙ্গাদের রাখাইন রাজ্যে তাদের মাতৃভূমিতে প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবশ্যই পদক্ষেপ নিতে হবে। ১৭ মার্চ ২০২৫ বাংলাদেশে নবনিযুক্ত অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনার সুসান রাইল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে উপদেষ্টার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গেলে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা এ অভিমত ব্যক্ত করেন।মো. তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘অবিলম্বে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করা উচিত।’
তখন রোহিঙ্গাদের নিজ মাতৃভূমিতে দ্রুত প্রত্যাবাসনের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের আশ্বাসও দিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনা। তিনি বলেছিলেন, তার সরকার রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত। রোহিঙ্গা সংকটের অষ্টম বছর পূর্তি উপলক্ষে গতকাল ২৫ আগস্ট অস্ট্রেলিয়া কূটনৈতিক মিশন আবারও ৮টি দেশের কূটনৈতিক মিশনের সাথে যৌথ বিবৃতিতে অংশ নিয়েছে। অন্যান্য মিশনগুলো হলো যুক্তরাজ্য, কানাডা, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, সুইডেন ও সুইজারল্যান্ড।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের রোডম্যাপ বা পথ খুঁজে বের করার জন্য এই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়গুলো প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে ঢাকায় অবস্থিত তাদের কূটনৈতিক মিশন থেকে বিবৃতির মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে।
বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয় যে, ৮ বছর আগে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর কারণে রোহিঙ্গাদের ব্যাপকভাবে বাস্তুচ্যুত করা হয়েছে। ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুত বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। আমরা অন্তর্বর্তী সরকার এবং বাংলাদেশের জনগণের চলমান উদারতার জন্য গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে চাই, যারা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় ও নিরাপত্তা প্রদান করছে, নতুন আগতদের আশ্রয়, তাদের আতিথেয়তা এবং জীবন রক্ষাকারী মানবিক সহায়তা প্রদানসহ।
বাংলাদেশে অবস্থান করা রোহিঙ্গা শরণার্থীরা তাদের বাড়িতে ফিরে যেতে চায়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় প্রত্যাবাসনের পথ খুঁজে বের করার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে সীমান্তবর্তী স্থানচ্যুতি অব্যাহত রয়েছে, রাখাইনে অনেক রোহিঙ্গা অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত রয়েছে এবং মিয়ানমারের পরিস্থিতি বর্তমানে তাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ এবং টেকসই প্রত্যাবর্তনের অনুমতি দেয় না। এ পরিস্থিতিতে কেবল তাদের বাস্তুচ্যুতির মূল কারণ মোকাবিলা করেই সমাধান করা যেতে পারে। যার জন্য একটি শান্তিপূর্ণ এবং স্থিতিশীল মিয়ানমার প্রয়োজন।
বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, আমরা স্বীকার করি যে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তনের জন্য একটি সময়সীমা এখনো নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি এবং সব পক্ষকে একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরির প্রচেষ্টাকে সমর্থন করার জরুরি প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিচ্ছি। আমরা সামরিক শাসন এবং অন্যান্য সশস্ত্র পক্ষের দ্বারা সংঘটিত ক্রমবর্ধমান সহিংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের নিন্দা জানাই।
সব সহিংসতা অবিলম্বে বন্ধ করার এবং নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন মানবিক প্রবেশাধিকারের জন্য আমাদের আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করি। আমরা সামরিক শাসনকে অন্যায়ভাবে আটক হওয়াদের মুক্তি দেওয়ার জন্য আমাদের আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করি। আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘন এবং অন্যান্য গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য জবাবদিহিতার আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টাকে সমর্থনে আমরা দৃঢ়ভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে আসন্ন উচ্চ-স্তরের সম্মেলনসহ মিয়ানমারের পরিস্থিতি এবং বাংলাদেশে সম্পর্কিত মানবিক সংকটের ওপর মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করার জন্য বাংলাদেশ সরকার এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাব। আমরা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য আরও টেকসই সমাধানের পক্ষে, যেমন- রোহিঙ্গাদের জন্য স্বনির্ভরতা বৃদ্ধি করা, বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক তহবিল হ্রাসের আলোকে, একইসঙ্গে শরণার্থীদের মিয়ানমারে প্রত্যাবর্তনের জন্য প্রস্তুত করা।
আমরা রোহিঙ্গাদের অর্থপূর্ণ সম্পৃক্ততা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার গুরুত্বের ওপর জোর দিচ্ছি, যাতে তারা নিজেদের সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং বাংলাদেশে থাকাকালীন নিরাপদ, উদ্দেশ্যমূলক ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করতে সক্ষম হয়। আট বছর পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রোহিঙ্গা এবং বাংলাদেশের সঙ্গে রয়েছে। আমরা সংকটের দীর্ঘমেয়াদি টেকসই সমাধান খুঁজতে এবং এর মূল কারণগুলো সমাধান করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
