বিপ্লবের বারুদ ভরা শব্দ ও স্লোগানগুলো বাঁচিয়ে রাখতে হবে

fec-image

 

অর্থবোধক শব্দকে ভাষা বলা হয়। সে কারণে ভাষাবাচক শব্দ কেবল একটি অর্থ বহন করে না। এর সাথে একটি জাতির ইতিহাস, সংস্কৃতি, সংগ্রাম, আত্মপরিচয়, আন্দোলন সহ অনেক কিছু বহন করতে পারে। তাই এ ধরনের শব্দ কখনো কখনো একটি জাতির পথ নির্দেশক হয়ে ওঠে, কখনো ক্ষমতার পট পরিবর্তনের নিয়ামক হয়ে যায়।

আমাদের ভাষা আন্দোলন, স্বাধীকার আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, ৭৫ এর সিপাহী জনতার বিপ্লব, নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান এবং ৩৬ জুলাই এর ফ্যাসিবাদবিরোধী গণ অভ্যুত্থানে এরকম কিছু শব্দের ব্যবহার আমরা দেখেছি। এমনকি কোটাবিরোধী আন্দোলন ও নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনেও কিছু শব্দমালা ও স্লোগান ব্যাপক জনপ্রিয় হতে দেখেছি। সম্প্রতি জুলাই আন্দোলনে বহুল ব্যবহৃত এ ধরনের কিছু শব্দ ও স্লোগান নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে আন্দোলন মুখর স্লোগানে বহুল ব্যবহৃত ও জনপ্রিয় আরবি, উর্দু ও ফার্সি শব্দগুলো নিয়েই নতুন করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনা ছড়িয়ে পড়েছে। এবং ক্রমান্বয়ে তা মন্ত্রিসভায় পৌঁছে গিয়েছে। ‘আজাদী’, ‘গোলামী,’ ‘ইনকিলাব’, ‘জিন্দাবাদ’, ‘ইনসাফ’, ‘ফায়সালা’, ‘মজলুম’- এই জাতীয় শব্দগুলো নিয়েই তাদের আপত্তি। যারা আপত্তি জানিয়েছেন তারা এসব শব্দকে পাকিস্তানি সাম্প্রদায়িক ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ট্যাগ লাগিয়ে আপত্তি তুলছেন। বাস্তবতা হচ্ছে, এসব শব্দ বহুকাল ধরেই বাংলাদেশে বহুল ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বাংলাদেশের একসময়ের অত্যন্ত জনপ্রিয় পত্রিকা দৈনিক আজাদ ১৯৩৬ সালে কোলকাতায় প্রকাশিত হয়। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী এ পত্রিকাটি ১৯৪৭-এ ভারত বিভাগের পর ঢাকায় স্থানান্তরিত হয়ে পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম দৈনিক হিসেবে প্রকাশের মর্যাদা লাভ করে। মাওলানা আকরম খাঁ, আবুল কালাম শামসুদ্দিনের মত প্রথিতযশা বিখ্যাত ব্যক্তিগণ এ পত্রিকায় সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। দৈনিক আজাদী এখনো চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত এবং বহুল জনপ্রিয় পত্রিকা। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দানকারী পত্রিকা ছিল দৈনিক ইত্তেফাক। এটি এখনো বাংলাদেশে অত্যন্ত জনপ্রিয় পত্রিকা। এছাড়াও মিল্লাত নামে আরেকটি পত্রিকা একসময় বাংলাদেশের বহুল জনপ্রিয় ছিল। আশির দশকের মাঝামাঝি প্রকাশিত দৈনিক ইনকিলাব এক সময় বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং সর্বাধিক প্রচারিত পত্রিকা ছিল। গ্রামে-গঞ্জে পাঠক নন্দিত এ পত্রিকার প্রভাব ছিল অপরিসীম। ইত্তেফাক শব্দের অর্থ ঘটনা, ঐকমত্য, চুক্তি এবং ইনকিলাব শব্দের অর্থ বিপ্লব বা সংগ্রাম। এসব শব্দ নিয়ে যদি কারো আপত্তি থাকতো তাহলে পত্রিকাগুলো এত জনপ্রিয় হতে পারত না।

আজকের বাংলা ভাষা খ্রিষ্টীয় সপ্তম-অষ্টম শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে প্রাকৃত ও মগধী ভাষা থেকে উৎপত্তি লাভ করে। বাংলা ভাষার প্রাচীন গ্রন্থ চর্যাপদ খ্রিষ্টীয় দশম ও একাদশ শতাব্দীতে রচিত। পরিবর্তনের এই সময়ে বাংলা ভাষা বিপুল পরিমাণ সংস্কৃত শব্দ তার ভাণ্ডারে আত্তীকরণ করে। মূলত বৌদ্ধ পাল রাজাদের আমলেই বাংলা ভাষার ভিত্তি রচিত হয়। কিন্তু হিন্দু শাসকদের দৃষ্টিতে বাংলা ভাষা স্থানীয় নিচু শ্রেণীর মানুষের ভাষা, ‘পক্ষীদের ভাষা’ বিবেচিত হয়। তারা এ ভাষায় ধর্মগ্রন্থ রচনা ও পাঠ নিষিদ্ধ করে। এমনকি এ ভাষায় ধর্মগ্রন্থ পাঠ করলে তাকে রৌরব নামক নরকে নিক্ষিপ্ত হবে বলেও বিধান দেয়া হয়। তবে মধ্যযুগে মুসলিম শাসকরা বাংলা ভাষার বিস্তারে ব্যাপক পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান শুরু করে। তারা আরবি ও ফার্সি জনপ্রিয় গ্রন্থগুলো বাংলা ভাষায় অনুবাদ করে প্রকাশ করতে শুরু করলে অনুবাদকদের হাত ধরে বাংলা ভাষায় আরবি ও ফার্সি শব্দ আত্তীকৃত হতে শুরু করে। এ বিপুল আরবি ও ফার্সি ভাষা আত্তীকরণ এবং সেই সাথে সংস্কৃত শব্দের মেলবন্ধন মিলে একটি স্বতন্ত্র ভাষারূপে বাংলার আত্মপ্রকাশ ঘটে। সকল ভাষাতাত্বিকদের মতে, বাংলা যে একটি স্বতন্ত্র ভাষারূপে টিকে গেছে এর মূল অবদান মধ্যযুগের মুসলিম শাসকগণ।

ইংরেজ শাসনামলে বাংলা ভাষা আধুনিক রূপলাভ করে। ভাষার ইতিহাসে দেখা যায়, বাংলা ভাষার কথ্যরূপ বা গদ্যরূপ মূলত ইংরেজ শাসনামলে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। তবে এটি সাহিত্যচর্চার বা ভাষা বিকাশের উদ্দেশ্যে পরিচালিত ছিল না। এটি মূলত ছিল, ইউরোপীয় ক্রিশ্চিয়ান চার্চ ও বাইবেল সোসাইটির ধর্ম প্রচারের লক্ষ্যে পরিচালিত একটি উদ্যোগ যেটি বাংলা ভাষায় ক্রিশ্চান ধর্মীয় পুস্তক প্রকাশের লক্ষ্যে পরিচালিত হয়। ইংল্যান্ডের ব্যাপটিস্ট মিশনারি সোসাইটির প্রতিনিধি উইলিয়াম কেরি স্থানীয় মানুষের কাছে তাদের বোধগম্য ভাষায় খ্রিস্ট ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে বাংলা ভাষাকে বেছে নেন। ১৮০০ সালের ১৮ মার্চ পশ্চিমবঙ্গের শ্রীরামপুর মিশন টেস্ট থেকে প্রথমবার বাংলা নিউ টেস্টামেন্টের প্রুফ শীট ছাপা হয়। পরবর্তী ৩২ বছরে এখানে ৪৫টি ভাষায় ২ লাখ বারো হাজার এ বই ছাপা হয়। এ পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, বাইবেলের বাংলা অনুবাদ কোনো ভাষা সেবা বা সাহিত্যচর্চা ছিল না। এটি ছিল বিদেশি শাসনের ছায়ায় পরিচালিত এক সুপরিকল্পিত অনুপ্রবেশ। তারাই ইতিহাসে ঢুকিয়ে দেয় উইলিয়াম কেরি বাংলা গদ্যের জনক। অথচ বাংলা গদ্য ভাষায় রচিত প্রথম পুস্তকের নাম রাজাবলী। খ্রিষ্টীয় একাদশ বা দ্বাদশ শতকে ত্রিপুরার রাজসভায় এটি রচিত হয়।

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বাংলা ভাষায় ধুমকেতুর মতো আবির্ভূত হন কাজী নজরুল ইসলাম। বিভিন্ন ভাষায় প্রবল দক্ষতা থাকার কারণে তার রচনায় আরবি, ফার্সি, উর্দু, টার্কি, সংস্কৃত ও ইংরেজি শব্দের বহুল ব্যবহার দেখা যায়। কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্য বাংলাভাষী মানুষের কাছে ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়তা পাওয়ায় তার ব্যবহৃত শব্দগুলো ধীরে ধীরে বাংলা ভাষী মানুষের মুখে ব্যবহৃত ভাষা হিসেবে উচ্চারিত হতে থাকে এবং একসময় তা বাংলা অভিধানে ঢুকে পড়ে। এমনকি সেসময় কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যে ‘খুন’, ‘শহীদ’ বা ফারসি-আরবি শব্দের ব্যাপক ও নতুন ধরনের ব্যবহার নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও আপত্তি বা সমালোচনা করেছিলেন। ‘খুন’ শব্দটির ব্যবহারে আপত্তি জানিয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, শব্দটি শুনলেই কেমন বীভৎস বা অপ্রীতিকর মনে হয়। পরবর্তীকালে ফররুখ আহমদ ও আল মাহমুদের মতো প্রমুখ কবিগণও আরবী, ফারসি, তুর্কি শব্দ ব্যবহার করেছিলেন। বাংলা ভাষার এ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস থেকে দেখা যায়, এ ভাষা কেবল মানুষের মনের ভাব প্রকাশের লক্ষ্যেই বিকশিত হয়নি। এর সাথে নানা ধর্মীয়, রাজনৈতিক, শাসনতান্ত্রিক ও ভূখ-গত পরিবর্তনের ইতিহাস জড়িত রয়েছে। ধর্মীয় ব্যাপারটি আরো স্পষ্ট করে বোঝা যায় পার্শ্ববর্তী ভারতীয় নাগাল্যান্ড রাজ্যের দিকে তাকালে। বেশ কয়েকটি জনজাতি অধ্যুষিত এই রাজ্যে উনবিংশ শতাব্দীর সপ্তম দশকে এডওয়ার্ড উইন্টার ক্লার্ক এক ক্রিশ্চিয়ান মিশনারির আবির্ভাব ঘটে। ধর্ম প্রচারের লক্ষ্যে তিনি স্থানীয় ভাষায় ক্রিশ্চিয়ান ধর্মীয় পুস্তক প্রকাশ শুরু করেন। তার এই প্রচেষ্টায় ১৮৭২ সালে নাগাল্যান্ডে মাত্র ৯ জন মানুষ ক্রিশ্চিয়ান ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়। আজ এই রাজ্যের শতকরা ৮৮ ভাগ মানুষ ক্রিশ্চিয়ান।

বিশ্বের বুকে ভাষার জন্য রক্ত দেয়া একমাত্র জাতি বাঙালি। ১৯৫২ সালে ভাষার আন্দোলনে প্রাণ দিয়েছেন সালাম, বরকত, রফিক, শফিক। এদের সবার নাম আরবি ভাষা থেকে নেয়া। এমনকি ভাষা আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা সংগঠন তমদ্দুন মজলিস শব্দটিও বাংলা ভাষা নয়। এসব নিয়ে আমাদের দেশে কোন বিতর্ক ছিল না।

ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানটি বাঙালি স্বাধীনতাকামী ও বিপ্লবীদের মুখে মুখে উচ্চারিত হতো। স্বাধিকার আন্দোলন হয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানটি ছিল সবচেয়ে জনপ্রিয় স্লোগান। কিন্তু আওয়ামী লীগ একসময় এই স্লোগানটিকে তাদের দলীয় স্লোগানে রূপ দেয়। ফলে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি হয়েও অনেক রাজনৈতিক দল এই স্লোগানটি এড়িয়ে চলতে শুরু করে। হাসিনা তার ফ্যাসিবাদী শাসনামলকে বৈধতা দিতে কিছু জনপ্রিয় শব্দ, স্লোগান, দর্শন ও রাজনীতিকে সম্পূর্ণরূপে দলীয় মোড়ক লাগিয়ে দেশবাসীর উপরে চাপিয়ে দেয়। এবং প্রতিপক্ষকে দমনের হাতিয়ার হিসেবে এই সমস্ত শব্দ স্লোগান ও দর্শনকে তাদের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেয়। এই সমস্ত জনপ্রিয় স্লোগান, চেতনা, দর্শন ও রাজনীতিবিরোধী বলে ট্যাগ লাগিয়ে ভিন্নমতের উপর গুম, খুন, জুলুম পরিচালনা করে। ফলে একসময়ের অত্যন্ত জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য শব্দ স্লোগান চেতনা ও দর্শনের প্রতি মানুষ ত্যক্ত বিরক্ত হয়ে পড়ে। মানুষ দেখতে পায়, ফ্যাসিস্ট শাসক এই সমস্ত শব্দ, চেতনা, দর্শন ও রাজনীতি ব্যবহার করে তাদের উপর নিপীড়ন ও নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে, লুটপাটের বৈধতা আদায় করছে, গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করছে।

আধিপত্যবাদী শক্তির কাছে বাংলাদেশকে একটি করদ রাজ্যে পরিণত করার লক্ষ্যে এই সমস্ত চেতনাকে ব্যবহার করা হচ্ছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মবিশ্বাস, চর্চা ও আকাক্সক্ষাকে সাম্প্রদায়িকতার লেবেল লাগিয়ে দমন করা হচ্ছে। ফলে এগুলো প্রতি ধীরে ধীরে তাদেরকে বিদ্রোহী করে তোলে। তারা প্রতিবাদী ক্ষোভ প্রকাশ ও বিদ্রোহের স্ফুলিঙ্গ জ্বালাতে বারুদ হিসেবে নতুন শব্দমালা সামনে নিয়ে আসে। এভাবেই ৩৬ জুলাই আন্দোলনে জয় বাংলার পরিবর্তে ‘ইনকিলাব- জিন্দাবাদ, ‘গোলামী না আজাদী- আজাদী আজাদী’ স্লোগানগুলো ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে বারুদ হয়ে জ্বলে ওঠে। আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের জনপ্রিয় স্লোগান‘পিন্ডি না ঢাকা- ঢাকা, ঢাকা’ স্লোগানটি দলীয়করণ করে জনগণের উপর দিল্লীর দাসত্ব চাপিয়ে দেয়ার প্রতিবাদে জুলাই বিপ্লবীরা ‘দিল্লি না ঢাকা- ঢাকা, ঢাকা’ কাউন্টার স্লোগান হিসেবে সামনে নিয়ে আসে। মানুষের এই ক্ষোভ এতটাই তীব্র ছিল যে, রাজপথের এই স্লোগানে অশ্লীল গালিগালাজও ফ্যাসিবাদকে অস্বীকার করার হাতিয়ার হয়ে ওঠে।

এগুলো কেবলমাত্র একটি স্লোগান ছিল না, ফ্যাসিবাদী রক্ত চক্ষুকে অস্বীকারকারী চেতনার বারুদ। এগুলো কেবল শব্দ ছিল না, বিদেশি আধিপত্যের বিরুদ্ধে সার্বভৌমত্ব রক্ষাকারী জানবাজ আন্দোলনকারীদের বরাভয়দানকারী হাতিয়ার ছিল। এগুলো কোন ধুলি মাখা ইতিহাস ছিল না। সদ্য পৃষ্ঠা ওল্টানো এ ইতিহাসের শরীর থেকে এখনো ঝরে পড়ছে আবু সাঈদ, ওয়াসিম, মুগ্ধদের টকটকে লাল রক্ত। হাজারো শহীদ ও লাখো বিপ্লবীদের গগন বিদারী এই স্লোগানের অনুরণন এখনো রাজপথ থেকে সম্পূর্ণ মিলিয়ে যায়নি। মনে হয় কান পাতলে এখনো শোনা যাবে ‘বুকের ভেতর দারুণ ঝড়- বুক পেতেছি গুলি কর’ কিম্বা কোথাও শোনা যাবে ‘পানি লাগবে- পানি?’।

অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনকভাবে অভ্যুত্থানের পর গণমানুষের মুখে মুখে ফেরা এসব স্লোগানকে আবার নতুন করে দলীয় রাজনীতির বৃত্তে বন্দী করা হলো। আওয়ামী লীগ যেভাবে তাদের ফ্যাসিবাদী শাসনকে বৈধতা দিতে মুক্তিযুদ্ধের জনপ্রিয় স্লোগান শব্দ ও চেতনাকে মোড়ক হিসাবে ব্যবহার করেছে, ঠিক তেমনি কোন কোন শক্তি তাদের ক্লেদাক্ত অতীতকে ধামাচাপা দিতে ৩৬ জুলাই বিপ্লবের চেতনা এবং ব্রান্ড হয়ে ওঠা স্লোগান ও শব্দগুলোকে একাত্তরের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেয়।

ফলে একাত্তরের স্বাধীনতার বিপক্ষে নতুন স্বাধীনতা, মুক্তিযোদ্ধার বিপরীতে জুলাইযোদ্ধা, বাংলাদেশ ২.০ প্রভৃতি নতুন ধারণা সামনে নিয়ে আসা হয়। একাত্তরের থেকে ৩৬ জুলাইকে উজ্জ্বল করে দেখানোর চেষ্টা চলে, যাতে একাত্তরের মলিন ইতিহাসকে চাপা দেয়া যায়। কোথাও ১৬ ডিসেম্বরের পরিবর্তে নতুন বিজয় দিবসের তালাশ শুরু হয়ে যায়। ডাকসুতে শুরু হয় একের পর এক কাওয়ালী সন্ধ্যা। বাংলার চিরায়ত বাউল, জারি, সারি, পল্লীগীতি ঢাকা পড়ে যায়।

এতে করে স্বাধীনতার চেতনায় উজ্জীবিত যে জনগণ ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে জীবন বাজি রেখে রাস্তায় নেমেছিল তারাও চমকে ওঠে। কেননা ফ্যাসিবাদ বিরোধী লড়াই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী ছিল না। বরং মুক্তিযুদ্ধের যে মূল চেতনা আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে মাথানত না করা, মানুষের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা ও অধিকার- সেটা ফিরে পাওয়ার লক্ষ্যেই ৩৬ জুলাই আন্দোলন পরিচালিত হয়েছিল। একাত্তরে পিন্ডির আধিপত্যের বিরুদ্ধে মানুষ যেমন স্লোগান দিয়েছিল ‘পিন্ডি না ঢাকা- ঢাকা ঢাকা’, ৩৬ জুলাইয়ে একই মানুষ ভারতীয় দাসত্ব থেকে মুক্তি পেতে স্লোগান দিয়েছিল ‘দিল্লি না ঢাকা- ঢাকা ঢাকা।’ এদেশের মানুষ ৪৭ এ দিল্লির দাসত্ব মেনে নেয় নি, ৭১ এ পিন্ডির দাসত্বও মেনে নেয় নি। তাই ৩৬ জুলাইয়ে আবার দিল্লির দাসত্ব মেনে নেয়ার কোন কারণ তাদের ছিল না। কিন্তু আওয়ামী আমলের ভারতীয় তারকাদের স্রোতের পরিবর্তে যখন অন্তর্বর্তী আমলে পাকিস্তানি তারকাদের ঢেউ ঢাকায় উঠলে ওঠে অথচ দেশীয় শিল্পীরা উপেক্ষিত হয়, তখন দিল্লি- পিন্ডির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো ঢাকা কেন্দ্রিক মানুষরা চমকে যায়, ফিরে তাকায়। আর এই সুযোগটাই গ্রহণ করে পতিত ফ্যাসিবাদ ও তাদের প্রভু শক্তি।

জুলাইয়ের চেতনাকে এভাবে কুক্ষিগত করার কারণে এবং বিশেষ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত করার কারণে পতিত ফ্যাসিবাদী শক্তি এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকরা ৩৬ জুলাইকে প্রগতিবিরুদ্ধ, প্রতিক্রিয়াশীল, সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী, পাকিস্তানপন্থী ট্যাগ লাগিয়ে তাদের দিল্লিপন্থী, ধর্মনিরপেক্ষ ও তথাকথিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ব্যবসা পুনরায় শুরু করার মঞ্চ প্রস্তুতিতে মাঠে নেমে পড়ে। সেই মঞ্চ তৈরীর লক্ষ্যেই ৩৬ জুলাই আন্দোলনের চেতনা ভরা, রক্তে স্নাত স্লোগান ও শব্দগুলোর শরীরে প্রতিক্রিয়াশীলতার ট্যাগ লাগানোর জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারণা শুরু করে। কেননা তারা জানে, যতদিন এই দেশের মানুষের ভেতরে জুলাইয়ের চেতনা আগুন জ্বালাবে, জুলাইয়ের খুন থেকে রক্ত ঝরবে, ততদিন ফ্যাসিবাদ ও আধিপত্যবাদ পুনরায় ফিরে আসতে পারবে না। তাই এই আগুন নেভাতে হবে। এই রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে হবে। কাজেই আজকে যে আজাদী, ইনকিলাব, ইনসাফ, মজলুম শব্দগুলোকে প্রতিক্রিয়াশীল সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী পাকিস্তানপন্থী মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী ট্যাগ লাগানো হচ্ছে এগুলো মূলত জুলাইয়ের চেতনাকে মানুষের হৃদয় থেকে মুছে দেয়ার লক্ষ্যে পরিচালিত সুগভীর ষড়যন্ত্রের অংশবিশেষ। এটা এমন সুমিষ্ট মোড়কে আবরিত যে খুব সচেতন না হলে এড়িয়ে যাওয়া কঠিন। সে কারণে যে দলের নেতা নিজেই তার বক্তৃতায় একাধিকবার নিজেকে মজলুম বলেছেন, ইনকিলাব-জিন্দাবাদ বলেছেন, যে দলের রাজনীতি শুরু হয়েছে বাংলাদেশ-জিন্দাবাদ স্লোগান দিয়ে, যে দলের ইশতেহারের মুখবন্ধে ইনসাফ শব্দটি রয়েছে, সেই দলেরও কোন কোন নেতা ইতিমধ্যেই এই সুগার কোটেড বটিকা গলধঃকরণ করে ফেলেছেন।

আমাদের জাতীয় ইতিহাসের অন্যতম নায়ক এ কে ফজলুল হককে শের এ বাংলা, মাওলানা ভাসানীকে মজলুম জননেতা উপাধিতে জনগণ ডাকতে ভালোবাসে। আমাদের গর্বের প্রায় সকল জাতীয় নেতার পরিচিত নাম বিদেশি শব্দে। এদেশের ৯৯% মানুষের নামে ধর্মীয় শব্দের ব্যবহার রয়েছে যা বিদেশি শব্দ বা শব্দের অপভ্রংশ। এ নিয়ে কারো আপত্তি ছিল না কোনদিন। আজকে যে আপত্তি তোলা হচ্ছে এটি বিশেষ উদ্দেশ্যে, মূলত পতিত ফ্যাসিবাদ ও আধিপত্যবাদকে যৌক্তিক করে তোলার গভীর অভিসন্ধির অংশবিশেষ। তাই যারা দিল্লি, পিন্ডি, ওয়াশিংটন, বেইজিং, মস্কো- সকল ধরনের আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে- বাংলাদেশপন্থী, যারা ফ্যাসিবাদ বিরোধী, গণতন্ত্রকামী তাদের জন্য আমাদের জাতীয় ইতিহাসের স্বর্ণালী অধ্যায়গুলোর চেতনা ও সাক্ষ্য বহনকারী সকল স্লোগান ও শব্দগুলো বাঁচিয়ে রাখা অত্যন্ত জরুরি। কেননা অনাগত ফ্যাসিবাদ ও আধিপত্যবাদ রুখতে এ শব্দগুলোই আমাদের চেতনায় বারুদ হয়ে জ্বলবে।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও গবেষক।

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: প্রবন্ধ, মেহেদী হাসান পলাশ, স্লোগান
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন