বৃহৎ প্রতিবেশী ও আন্তর্জাতিক শক্তির মাঝখানে যখন অপেক্ষাকৃত দুর্বল রাষ্ট্র

fec-image

কোন প্রকার নৈতিক যুক্তিতে একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশে অন্য দেশের দখলদারিত্ব সমর্থন করা যায় না। সে কারণেই, ইউক্রেনে চলমান রাশিয়ান আগ্রাসন সমর্থন অথবা ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার পক্ষে যাবে এমন কোন শব্দ লিখতে আমিও আন্তরিকভাবে রাজি না। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী পশ্চিমাদের তৈরি বিশ্বব্যবস্থা ও নিকট অতীত বিবেচনা করে লিখলে আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে প্রতিটি শব্দ ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার পক্ষে লিখতে হবে! সেই ১৯৬২ সালে কিউবায় সোভিয়েত মিসাইল মোতায়েন প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ পর্যালোচনা করলেই প্রতিটি শব্দ রাশিয়ার পক্ষে লিখতে হবে! ১৯৭১ সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে আমেরিকা ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূমিকা চিন্তা করলেই প্রতিটি শব্দ রাশিয়ার পক্ষে লিখতে হবে! ফিলিস্তিনিদের উপর ইজরাইলি আগ্রাসনে আমেরিকা ভূমিকা ও পশ্চিমা সমর্থিত ইজরাইলের তথাকথিত আত্মরক্ষার বৈধ অধিকারের কথা চিন্তা করলে প্রতিটি শব্দ রাশিয়ার পক্ষে লিখতে হবে! ১৯৮২ সালে গ্রানাডায় আমেরিকার কার্যক্রম বিবেচনা করলে প্রতিটি শব্দ রাশিয়ার পক্ষে লিখতে হবে! ইরাকে নারকীয় গণহত্যায় ইউক্রেনের ভূমিকার কথা চিন্তা করলে প্রতিটি শব্দ রাশিয়ার পক্ষে লিখতে হবে! আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া, ইয়েমেন, সোমালিয়াসহ প্রায় পুরো আফ্রিকা, লেবানন ও ফিলিস্তিনের বর্তমান অবস্থার জন্য দায়ীদের কথা চিন্তা করলে প্রতিটি শব্দ রাশিয়ার পক্ষে লিখতে হবে! চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে আমাদের সর্ব নিকটের তিন প্রতিবেশী দেশের অবস্থান ও জাতীয় স্বার্থ চিন্তা করলে প্রতিটি শব্দ রাশিয়ার পক্ষে লিখতে হবে! যথাক্রমে আকাশ পথে (ভূমি বা জলপথে দূরত্ব আরো অনেক বেশি) ১১৫১২ কিলোমিটার ও ১৭২৪ কিলোমিটার দূরত্বে ইরানের সম্পূর্ণ অসামরিক উদ্দেশ্য পরিচালিত পারমাণবিক কর্মসূচি আমেরিকা ও ইজরাইলের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয় কীভাবে, সেটা চিন্তা করলে ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলা যুক্তিসংগত এবং বৈধ বলতে হবে।

রাশিয়ার ইউক্রেনে হামলা সরাসরি বৈধ না বলে যেমনটা পরোক্ষভাবে টুইটারে লিখেছেন কার্গিল যুদ্ধের ভারতীয় সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) ভেদ প্রকাশ মালিক, ‘রাশিয়া বনাম ন্যাটো। ১৯৮৯ সালে ইউরোপের ১৬টি দেশ ন্যাটো সদস্য ছিল। এটার সম্প্রসারণ অব্যাহত আছে, আজকে ন্যাটো সদস্য সংখ্যা ৩০, ইউক্রেনসহ আরো ৫টি দেশ ন্যাটো সদস্য হতে আগ্রহী, এটা কোনো আশ্চর্যের বিষয় নয়। মার্কিন নেতৃত্বাধীন এই জোট কর্তৃক রাশিয়া নিজেকে হুমকির সম্মুখীন মনে করছে।’ সার্বিক বিবেচনায় বিশ্বের দ্বিতীয় পরাশক্তি রাশিয়ার ইউক্রেনে হামলা বৈধ না বললেও প্রচলিত বিশ্ব ব্যবস্থায় কোনভাবেই অযৌক্তিক বলা যায় না।

কেন এই যুদ্ধ?

পৃথিবীর মানচিত্রে রাশিয়া অনেক বড় এবং বিশাল সমুদ্রসীমা থাকলেও বাণিজ্যের জন্য ক্রিমিয়া উপদ্বীপ ও কৃষ্ণ সাগর রাশিয়ার জন্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কৃষ্ণ সাগর ব্যতীত রাশিয়ার জন্য কোনো উষ্ণ জলের বন্দর নেই, তাই সোভিয়েত বিভক্তির পর রাশিয়া মূলত ইউক্রেন থেকে ক্রিমিয়া উপদ্বীপের কিছু অংশ লিজ নিয়ে সুষ্ঠুভাবে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। এখন যদি ইউক্রেন পর্যায়ক্রমে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটোতে যোগদান করে তাহলে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ইউক্রেন, রোমানিয়া ও তুরস্ককে ব্যবহার করে রাশিয়াকে বিশ্ব বাণিজ্য হতে আলাদা করে ফেলা সম্ভব। ২০১৩ সালের শেষেরদিকে ইউক্রেনের European Association Agreement-এ যোগদানের প্রস্তাবের পরিবর্তে রাশিয়ার সাথে গভীর সম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহী ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইয়ানোকভিচকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয় পশ্চিমা মদদপুষ্ট তথাকথিত Euromaidan আন্দোলনের মাধ্যমে। ইউক্রেনে গৃহযুদ্ধের মতো পরিস্থিতিতে উপনীত হলে ইয়ানোকভিচ বিরোধীদের সাথে আলোচনা করে ক্ষমতা ছেড়ে প্রাণ বাঁচিয়ে রাশিয়ায় নির্বাসনে চলে যান। এর পর ইউক্রেনে শুরু হয় রুশভাষীদের উপর অবর্ণনীয় অত্যাচার, রুশ অধ্যুষিত ডনবাস ও লুহানেস্ককে রাশিয়া সহায়তা দিতে থাকলে শুরু হয় তুমুল গৃহযুদ্ধ, এমনকি সেই সময় পলায়নপর প্রেসিডেন্ট ইয়োনকভিচের গাড়ি লক্ষ্য করেও গুলি চালানো হয়। এরই ধারাবাহিকতায় দুশ্চিন্তাগ্রস্ত রাশিয়া মূলত রুশভাষী অধ্যুষিত ক্রিমিয়া উপদ্বীপ ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে দখল করে নেয় এবং মার্চে আনুষ্ঠানিকভাবে রাশিয়ার সাথে সংযুক্তির ঘোষণা দেয়। লক্ষণীয় বিষয় হলো, রাশিয়ার ক্রিমিয়া দখলে কোনো প্রকার প্রাণহানি ঘটেনি, ইউক্রেনীয় সৈন্যরা বিনাযুদ্ধে আত্মসমর্পণ করে বা স্বেচ্ছায় রাশিয়ান পাসপোর্ট গ্রহণ করে এবং রুশভাষী ক্রিমিয়া অধিবাসীরা রাশিয়ার সাথে যুক্ত হতে পেরে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে। এর ফলে ইউক্রেনজুড়ে রুশভাষী সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচার বাড়তে থাকে, রুশ মদদপুষ্ট ডনবাস ও লুহানেস্কের সাথে ইউক্রেনীয় আর্মির তুমুল সংঘর্ষ চলমান থাকে, সংঘর্ষের ভয়াবহতা এতো বেশি ছিল যে ২০১৪ সালের জুনে নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডাম হতে কুয়ালালামপুরগামী মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ১৭ রুশপন্থী বিদ্রোহীদের ছোঁড়া বাক ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে বিধ্বস্ত হয়ে ২৯৮ জনের প্রাণহানি ঘটে। পরবর্তীতে বিবিধ শান্তি আলোচনার মাধ্যমে সংঘর্ষের মাত্রা কমে আসলেও মূলত রুশপন্থী বিদ্রোহী এবং ইউক্রেনীয় আর্মির মধ্যে সংঘর্ষ ও পাল্টাপাল্টি গোলাবর্ষণ চলমান ছিল। এর ফলে, ইউক্রেনের অন্যান্য অংশে সংখ্যালঘু রুশভাষীদের অবস্থা হয়ে যায় সংকটাপন্ন।

ক্রিমিয়া উপদ্বীপ দখলের পর রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন একটি সাক্ষাৎকার প্রদান করেন, যার সারমর্ম ছিলো, ‘আমেরিকানরা তাদের স্বার্থের জন্য কাজ করে, স্বার্থ রক্ষার জন্য তাঁরা কঠোর নীতি ও কূটনীতি অনুসরণ করে, বিশ্বব্যাপী আমেরিকার সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। বলা হচ্ছে, রাশিয়া ন্যাটোর প্রতি আগ্রাসী, কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে রাশিয়া ন্যাটোর কোনো দেশকে আক্রমণ করেনি, রাশিয়া ন্যাটোর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে না, বরং ন্যাটো রাশিয়ার দিকে এগিয়ে আসছে। যদি ইউক্রেন ন্যাটোতে যোগ দেয় তাহলে কোনো এক সময় তাঁরা সামরিকভাবে ক্রিমিয়া ফেরত নিতে চাইবে। কিন্তু রাশিয়ার নিকট বিশ্বের সবচেয়ে অত্যাধুনিক পারমাণবিক অস্ত্রের মজুদ রয়েছে, এভাবে ন্যাটোর সম্প্রসারণ ঘটতে থাকলে সবার ইচ্ছার বিরুদ্ধে সংঘর্ষে জড়িয়ে যেতে হবে এবং যেখানে কোনো বিজয়ী থাকবে না।

সাবেক পেশাদার কৌতুক অভিনেতা জন্মগতভাবে ইহুদি ভলোদিমির জেলেনস্কি ২০১৯ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে ইউক্রেনের পশ্চিমাদের সাথে মাখামাখি ও ন্যাটোতে যোগদানের দাবি চরমভাবে ফুঁসে ওঠে, উগ্র ইউক্রেনীয় জাতীয়তাবাদের মারাত্মক উত্থান ঘটে। পশ্চিমাদের মদদে রাশিয়া বিরোধী বক্তব্য ও ক্রিমিয়া ফেরত নেওয়ার দাবি জোরালো হতে থাকে। রাজনীতিতে নবীন জেলেনস্কি ইউক্রেনকে ন্যাটোতে যুক্ত করার অজুহাত হিসেবে ন্যাটোতে যুক্ত হতে না পারলে জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে প্রয়োজনে পুনরায় পারমাণবিক অস্ত্রধর হওয়ার আগ্রহও প্রকাশ করেন! এর মাধ্যমে মূলত তিনি পশ্চিমাদের অতি মদদে অনভিজ্ঞ জেলেনস্কি নিজের অজান্তেই রাশিয়ার লাল দাগ অতিক্রম করে ফেলেন। বাস্তবতা হলো, রাশিয়া হামলা শুরুর পর ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি হাড়েহাড়ে টের পেয়েছেন, মুখে যা কিছু বলুক না কেন, একেবারে দেয়ালে পিঠ ঠেকে না গেলে অহেতুক আমেরিকান প্রেসিডেন্টও বাস্তবে কখনো রাশিয়ার দেওয়া লাল দাগ অতিক্রম করবেন না। এছাড়াও রাশিয়ার ক্রিমিয়া দখলের পর ইউক্রেন নর্থ ক্রাইমিয়ান কেনালের উপর একটি বাঁধ নির্মাণ করে পানির প্রবাহ প্রায় ৮৫ শতাংশ কমিয়ে দেয়। রাশিয়ার বারংবার অনুরোধ স্বত্বেও ইউক্রেন পানির প্রবাহ বাড়ায়নি, রাশিয়া ইউক্রেনকে ইউরোপীয় আদালতে নিয়ে গিয়েও প্রয়োজনীয় পানি না পাওয়াও এই আক্রমণের অন্যতম একটি পরোক্ষ কারণ।

রাষ্ট্র হিসেবে ইউক্রেন

ইউক্রেন প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ, আয়তন ছয় লক্ষ বর্গকিলোমিটারে ঊর্ধ্বে। অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগতভাবে সমৃদ্ধ এই দেশ গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ার ইনডেক্স মোতাবেক বিশ্বের ২২তম সামরিক শক্তি (কানাডার উপরে)। ইউক্রেনের সৈন্য সংখ্যা মতান্তরে ২০০০০০-৩৬১০০০, যারা সবাই অত্যাধুনিক সমরাস্ত্রে সজ্জিত এবং প্রত্যক্ষভাবে আমেরিকাসহ পশ্চিমা দেশসমূহের সামরিক প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র সহায়তা প্রাপ্ত। প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির রয়েছে পশ্চিমা অর্থায়নে সৃষ্ট ব্যক্তিগত উগ্রবাদী মিলিশিয়া বাহিনী, যারা ইউক্রেন সশস্ত্র বাহিনীর পরিবর্তে সরাসরি জেলেনস্কির হুকুম পালন করে। বিশ্বের সামরিক সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি রপ্তানি কারক দেশগুলোর মধ্যে ইউক্রেনও একটি। ২০১০-২০ এর মধ্যে ইউক্রেন প্রায় ৪৬টি দেশের নিকট সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানি করে। ইউক্রেন থেকে যারা সামরিক সরঞ্জাম কিনেছে তার মধ্যে রয়েছে চীন, ভারত, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড, মায়ানমার, বাংলাদেশ, এমনকি রাশিয়াও। ভারতের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি ডেস্ট্রয়ার কলকাতা ক্লাস, বিশাখাপত্তম ক্লাস এবং ফ্রিগেড তালওয়ার ক্লাসের টারবাইন ইউক্রেন থেকে আমদানিকৃত। ইউক্রেন ট্যাংক, সামরিক বিমানের খুচরা ও আপগ্রেডেশন যন্ত্রাংশ, ভারী সামরিক যানবাহনসহ বিবিধ সামরিক সরঞ্জাম ও অস্ত্র রপ্তানি করে থাকে। সামরিক সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি রপ্তানির পাশাপাশি বিশ্বের গম রপ্তানিকারক শীর্ষ স্থানীয় দেশ ইউক্রেন। ২০০৩ সালে শুরু হওয়া মার্কিন নেতৃত্বাধীন ইরাক আগ্রাসনে ইউক্রেন ৫০০০-এর অধিক সৈন্য প্রেরণ করে সাধারণ ইরাকি হত্যা ও ইরাক ধ্বংস-লুটের নারকীয় উৎসবে অংশগ্রহণ করে এবং ২০২১ সালের মে মাসে ইজরাইল কর্তৃক পরিচালিত গাজা আগ্রাসনে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি দখলদার ইজরাইলের পক্ষাবলম্বন করেন। ইউক্রেনে উগ্র সাম্প্রদায়িকতা বিদ্যমান, রাশিয়ার হামলা শুরু হওয়ার পর হতে রাশিয়ার পক্ষাবলম্বনের অভিযোগ এনে ইউক্রেনে চলছে নির্বিচারে সংখ্যালঘু রুশভাষী গণহত্যা, যা নিরেপক্ষ রুশভাষীদেরকেও বাধ্য করছে রাশিয়ার পক্ষ নিতে। যদিও রুশভাষীদের প্রতি বৈষম্য ও অত্যাচার গত আট বছর ধরে মারাত্মক আকারে চলমান, রাশিয়ার আক্রমণের পর হতে সেটা গণহত্যায় রূপ নিয়েছে।

ইউক্রেনে সামরিক হামলায় রাশিয়ান উদ্দেশ্যসমূহ

ইউক্রেনে সামরিক হামলার প্রধান রাশিয়ান উদ্দেশ্য হলো ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন যোগদান রুখতে ইউক্রেনের বর্তমান সরকারকে হটিয়ে রুশপন্থী সরকার ক্ষমতায় বসানো। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন কর্তৃক বর্তমান সরকারকে হটিয়ে ইউক্রেন সেনাবাহিনীকে ক্ষমতা হাতে নেওয়ার আহ্বান এবং জাতিসংঘের রুশ স্থায়ী প্রতিনিধির বক্তব্য থেকে বিষয়টি একদম পরিষ্কার। এছাড়াও অন্যান্য উল্লেখযোগ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে, ক্রিমিয়া রাশিয়ার অংশ দাবির স্বীকৃতি আদায়, ইউক্রেনকে পারমাণবিক শক্তিধর হওয়া রুখতে চেরনোবিল পারমাণবিক প্লান্টের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ, নর্থ ক্রাইমিয়ান কেনালের বাঁধ ধ্বংস করা এবং রুশভাষীদের নির্বিচারে হত্যার একটি উপযুক্ত প্রতিশোধ নেওয়া। আক্রমণ শুরুর দিনই রুশ সেনারা নর্থ ক্রাইমিয়ান কেনালের উপর নির্মিত বাঁধ উড়িয়ে দিয়েছে এবং তৃতীয় দিনে চেরনোবিল পারমাণবিক প্লান্টের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। এখন প্রধান উদ্দেশ্যসহ অন্যসব উদ্দেশ্য পূরণে চতুর্দিক থেকে ঘিরে রাজধানী কিয়েভের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধ শুরুর আগে অসংখ্যবার নিরাপত্তা নিশ্চয়তা হিসেবে রাশিয়া ইউক্রেনের ন্যাটোতে যোগ না দেওয়ার অঙ্গীকারনামা দাবি করে আসছিল। কিন্তু তাতে পশ্চিমা মদদপুষ্ট ইউক্রেন সরকার বারংবার অস্বীকৃতি জানায় এবং যুদ্ধের পঞ্চম দিনেও বেলারুশের মধ্যস্ততায় অনুষ্ঠিত আলোচনায় ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ রুশ দাবিসমূহ মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

যুদ্ধ পরিস্থিতি ও সম্ভাব্য ফলাফল

যে কোন যুদ্ধের আক্রমণে আক্রমণকারী শক্তি কমপক্ষে ১ঃ৩ আধিপত্য নিয়ে আক্রমণের চেষ্টা করে। অবশ্য নিকটতম অতীতে আমেরিকার প্রতিটি আক্রমণে আমেরিকা ও ন্যাটো দেশগুলো একত্রিত হয়ে প্রায় ১ঃ১০০০ আধিপত্য নিয়ে হায়েনার দলের মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছিল আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া ও সিরিয়ার সাধারণ জনগণের উপর। রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণে ইউক্রেনীয় সশস্ত্রবাহিনীর শক্তির বিচারে সেই সূত্রটি যে অনুসরণ করা হয়নি, সেটা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান। খোদ আমেরিকার পর্যবেক্ষণ মোতাবেক, ইউক্রেনে রাশিয়ার তাঁর সামরিক শক্তির এক তৃতীয়াংশ নিয়োগ করেছে এবং যুদ্ধের পঞ্চম দিন নাগাদ ইউক্রেন সীমান্তে জমায়েত অর্ধেকেরও কম সৈন্য যুদ্ধ ক্ষেত্রে প্রবেশ করেছে। গত দুই দশকে আক্রমণ বলতে আমেরিকা-ইজরাইল ও ন্যাটো প্রতিষ্ঠিত নিয়ম হচ্ছে কোনো প্রকার বিচার-বিবেচনা ছাড়াই দৈনিক হাজার হাজার বোমা ফেলে একটি শহর বা দেশেকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া এবং প্রতিদিন অগণিত সাধারণ মানুষ হত্যা করার পর লক্ষ লক্ষ মানুষকে গৃহহীন করে ঐ শহর বা দেশে প্রবেশ করা। যা আসলে যুদ্ধ নয়, পরিষ্কার অর্থেই গণহত্যা। পশ্চিমা মিডিয়ার প্রদত্ত তথ্য ও ভিডিও মোতাবেক, সাধারণ ইউক্রেনীয়রা রুশ ট্যাংকের গতিরোধ এবং রুশ সৈন্যদের তীব্র ভৎ্সনা করার পরও রুশ সেনারা তাদের কোনো ক্ষতি করছে না! পশ্চিমা মিডিয়া এটা ইউক্রেনীয়দের বীরত্ব ও মনোবল বললেও বাস্তবে এটা হলো রুশ সৈন্যদের চরম পেশাদারিত্ব এবং যুদ্ধ আইনের প্রতি শ্রদ্ধা। রুশ সৈন্যদের অভিযানের স্বরূপ দেখলেই বুঝা যায়, তারা যুদ্ধের শুরুতেই ইউক্রেনের মারাত্মক ক্ষতি করতে ইচ্ছুক ছিল না, তারা ক্রিমিয়া দখলের মতো বিনা যুদ্ধে বড় অর্জন বা ইউক্রেনীয় সশস্ত্রবাহিনীর মধ্যে ভাঙ্গনের ধরবে ও স্বল্প প্রতিরোধের মুখোমুখি হবে বলে আশা করেছে। যুদ্ধের শুরুতে রুশ সৈন্যদের ইউক্রেনীয় অবকাঠামো ধ্বংস, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ধ্বংস, তথ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ধ্বংস, পানি সরবরাহ ও খাদ্য গুদাম ধ্বংসের মতো ঘৃণ্য কৌশল অবলম্বন করতে দেখা যায়নি।

তবে যুদ্ধ শুরুর সাথে সাথে রুশ সৈন্যরা যুদ্ধ ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিস্থিতি দেখতে পেয়েছে, মার্কিন আগাম সতর্কতার কারণে পুরো ইউক্রেনীয় বাহিনী বসতি এলাকার যুদ্ধ (Urban Warfare) প্রতিরক্ষায় অবস্থান করছে, রুশ লজিস্টিক পরিকল্পনায় ত্রুটির কারণে রুশ বাহিনীকে বহু সাঁজোয়া যান পিছনে ফেলে যেতে হয়েছে ও দেখা দিয়েছে জ্বালানি সংকট, ইউক্রেনীয় সশস্ত্র বাহিনী ও জনগণের নিকট হতেও কল্পনার চেয়ে বহুগুণ বেশি প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর প্রত্যক্ষ গোয়েন্দা এবং সামরিক সহায়তার কারণে রুশ বাহিনীকে ইউক্রেনীয় প্রতিরোধ মোকাবেলা করে যথেষ্ট ক্ষয়ক্ষতি মেনে নিয়ে সামনে এগোতে হচ্ছে। বর্তমানে অধিকাংশ রুশ মিডিয়াকে ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব ও গুগল হতে বহিষ্কারের কারণে যুদ্ধ সম্পর্কিত উভয় পাশের সংবাদ পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়েছে। পশ্চিমা মিডিয়ার দাবি মোতাবেক না হলেও রুশ বাহিনীকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণের ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে এটা নিশ্চিত।

পশ্চিমা মিডিয়ার অধিকাংশ ভিডিও পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে রুশ সেনাদের পিছনে ফেলে যাওয়া সৈন্য বিহীন রুশ সমরাস্ত্র ধ্বংস করে বিজয় আনন্দ করছে ইউক্রেনীয়রা, এমনকি একজন কৃষককে ট্র্যাক্টর দিয়ে টেনে রুশ গ্রাউন্ড টু এয়ার মিসাইল সিস্টেম বাড়ি নিয়ে আসতেও দেখা গেছে। ইউক্রেনীয় সরকার কর্তৃক সাধারণ জনগণের মধ্যে অস্ত্র বিতরণ করে পরিস্থিতি আরো জটিল করে তুলেছে। এর ফলে যতই সময় গড়াচ্ছে রুশ বাহিনী ততো বেশি আগ্রাসী ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছে। ইউক্রেনীয়দের প্রতিরোধ প্রশংসনীয় হলেও যুদ্ধের বাস্তবতা পশ্চিমা মিডিয়ার দাবি মোতাবেক ততটা সত্যিও না। যেমন স্নেক দ্বীপে ১৩ জন ইউক্রেনীয় নাবিকের আত্মসমর্পণের পরিবর্তে যুদ্ধ করে মৃত্যু বরণ বা কিয়েভের ভূত বা অসংখ্য রুশ বিমান ধ্বংসের দাবি ইতোমধ্যে মিথ্যা প্রমাণিত হওয়া শুরু হয়েছে খোদ পশ্চিমা মিডিয়াতে। কারণ, একই পশ্চিমা মিডিয়া দাবি করছে, অজ্ঞাত কারণে রুশ বিমান বাহিনী তাদের তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো শক্তিই যুদ্ধের প্রথম পাঁচ দিনে প্রয়োগ করেনি। এর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, নিজস্ব শক্তিশালী এয়ার ডিফেন্সের সাথে সমন্বিত আক্রমণ ট্রেনিংয়ের অভাবে ফ্রেন্ডলি ফায়ারে হতাহতের ভয়, সিরিয়ায় রাশিয়ান মোতায়েনের কারণে গাইডেড মিউনিশনের অভাব, রাত্রিকালীন আক্রমণ সক্ষমতার ঘাটতি, যুদ্ধে যে কোনো ন্যাটো সংযুক্তি বা যুক্তরাষ্ট্রের সংযুক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য শক্তি মজুদ রাখা এবং যুদ্ধ খরচ কমানো ও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে গোলাবারুদ উৎপাদনে প্রভাব পড়বে বিধায় গাইডেড গোলাবারুদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করা। নিরপেক্ষভাবে বললে, এক তৃতীয়াংশ রুশ শক্তির মোকাবেলায় পশ্চিমা মদদপুষ্ট মাঝারি মানের সামরিক শক্তি ইউক্রেনের নাভিশ্বাস উঠে গেছে প্রথম পাঁচ দিনে।

অন্যদিকে International Legion of Territorial Defense of Ukraine গঠন করে বিদেশি নাগরিকদের রুশদের বিরুদ্ধে লড়তে আসার জন্য ইউক্রেনীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিমিত্রি কুলেভার আহ্বান থেকে এটাও একদম স্পষ্ট যে, এর ফলে পশ্চিমা দেশগুলোর যুদ্ধাসক্ত অবসরপ্রাপ্ত স্পেশাল ফোর্স সদস্য ও ভাড়াটে খুনিদের আগমন ঘটবে ইউক্রেনে এবং রাশিয়াও যদি প্রাইভেট মার্সেনারি ব্যবহার শুরু করে তাহলে পরিস্থিতি সমাধানের অযোগ্য হয়ে পড়তে পারে। ইউক্রেন আক্রমণে রাশিয়া এখন পর্যন্ত অনেকটা দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের যুদ্ধ কৌশলে এগোচ্ছে, কালিবর মিসাইল ব্যতীত কোনো অতি অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র এখনো তেমন একটা ব্যবহার করেনি, যেটা সিরিয়ায় অবস্থিত রুশ বাহিনীর কার্যক্রমেরও প্রায় সম্পূর্ণ বিপরীত। রুশ কম্ব্যাট ড্রোন, লয়টারিং মিউনিশন, হাইপারসনিক মিসাইল, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার, আনম্যানেড গ্রাউন্ড ভেহিক্যালস ও সারফেস ভেহিক্যালসের মতো সমরাস্ত্র এখনো ব্যবহৃত হয়নি। রুশ নৌ শক্তির উল্লেখ্যযোগ্য ব্যবহারের কোনো ঘটনাও প্রথম পাঁচ দিনে ঘটেনি।

আফগান যুদ্ধ ব্যতীত ইতিহাসের কোথাও রুশদের হেরে যাওয়া বা সম্পূর্ণ পিছনে হটার নজির নেই। প্রতিপক্ষের চেয়ে বহুগুণ বেশি ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করে হলেও লক্ষ্য অর্জন হলো রুশ বাহিনীর ঐতিহ্য। এই জন্যই বলা হয়ে থাকে, ‘সামরিক ইতিহাসের প্রথম পাঠ হলো রাশিয়ার সাথে ঝামেলায় না জড়ানো।’ যুদ্ধের কূটনৈতিক ফলাফল নিয়ে এখনই মন্তব্য করা যাচ্ছে না, তবে সার্বিক পরিস্থিতি ও শক্তিমত্তার বিচারে এই যুদ্ধে ইউক্রেনে সম্ভাবনা অতীব ক্ষীণ, যেহেতু ব্যাপক পরিমাণের ক্ষয়ক্ষতিও কখনো রুশদের সাথে যুদ্ধের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে না। ইউক্রেনের সুবিধা হলো, তারাও মূলতঃ রুশ ও পুরো পশ্চিমা বিশ্ব তাদের সাহায্য করছে। কিন্তু ইউক্রেন যতই অনমনীয় হবে, পুতিন ততই শক্তি প্রয়োগের মাত্রা বাড়াবেন। পশ্চিমারা বেশি নাক গলালে পুতিন পারমাণবিক হামলা চালাতেও পিছপা হবেন না (আশা করছি তেমন হওয়ার আগেই যেন সকল পক্ষ একটি কূটনৈতিক সমাধানে পৌঁছাতে পারে!)। গোয়েন্দা তথ্য মোতাবেক, যুক্তরাষ্ট্র আগাম সতর্ক বাণী দিলেও পুতিনের ইউক্রেন আক্রমণ পুরো বিশ্ব ও ইউরোপকে হতভম্ব করে দিয়েছে। তোড়জোড় দেখে মনে হচ্ছে লক্ষ লক্ষ উন্মাদ ভাল্লুক পুরো পশ্চিমা বিশ্বকে তাড়া করেছে ও আরো কয়েক কোটি শরীর গরম করছে এবং তাদের পিছনে রয়েছে ঠান্ডা মাথার ড্রাগনের পাল, যারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে ও উন্মাদ ভাল্লুক দিক নির্দেশনা দিচ্ছে। এখনই যদি সবাই এক হতে না পারে তাহলে সামনে মহা বিপদ! অর্থাৎ রাশিয়ার যুদ্ধ ইউক্রেনের সাথে শুরু হলেও মূল যুদ্ধ হচ্ছে পশ্চিমাদের সাথে। মাঝখানে এক জোকারের অদূরদর্শিতায় সাধারণ ইউক্রেনীয়রা এখন যে কোন সময় গোলার আঘাতে মৃত্যুর প্রহর গুনছে!

পশ্চিমাদের অন্তরে লুকিয়ে থাকা ঘৃণ্য বর্ণবাদ, যুদ্ধের বৈশ্বিক প্রভাব এবং শিক্ষা

পুতিনের ইউক্রেন আক্রমণের প্রভাবে পশ্চিমাদের শিরায় শিরায় লুকিয়ে থাকা ঘৃণ্যতম বর্ণবাদ ফুটে ওঠেছে চরমভাবে। যুদ্ধ পরিস্থিতির সংবাদ পরিবেশকালীন এরকম সংকটাপন্ন অবস্থার মধ্যেও নগ্ন বর্ণবাদের বহিঃপ্রকাশ দেখে হতবাক পুরো বিশ্ব! বিবিসি, সিবিএস নিউজ, দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ, ফরাসী চ্যানেল আইটিবি ও বিএমএফ টিভি, আল জাজিরার সংবাদে পশ্চিমা সাংবাদিক ও অফিশিয়ালগণ উগড়ে দিয়েছেন মারাত্মক সব বর্ণবাদী মন্তব্য! তন্মধ্যে ইউক্রেনের ডেপুটি চিফ প্রসিকিউটর ডেভিড সাকভেরেলিডজের বিবিসি সাক্ষাৎকারে করা মন্তব্যটি ছিল সবচেয়ে নিকৃষ্টতম, তিনি বলেন, ‘আমার জন্য এটা খুবই মর্মান্তিক, কারণ আমি দেখছি, নীল চোখ ওয়ালা এবং স্বর্ণকেশী ইউরোপীয়দের হত্যা করা হচ্ছে’ (অর্থাৎ যতো খুশি ততো কৃষ্ণাঙ্গ ও এশীয় হত্যায় তার কোন সমস্যা নেই বা ইরাকি, আফগান, সিরীয়, ফিলিস্তিনি, ইয়েমেনিদের হত্যা যথার্থ!)। উল্লেখ্য যে সিবিএস নিউজের সাংবাদিক চারলি ডি’আগাটা লাইভ কভারেজে তার করা বর্ণবাদী মন্তব্যের জন্য অন্য আরেকটি লাইভ কভারেজে ক্ষমা চেয়েছেন। শরণার্থী নিয়ে সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে একজন বুলগেরিয়ান অফিশিয়াল বলেছেন, ইউক্রেনীয়রা শরণার্থী নন, তারা ইউরোপীয়, তাদের জন্য সম্মানের সহিত সব ব্যবস্থা করা হবে। অথচ, পশ্চিমাদেরসৃষ্ট যুদ্ধের ফলে উদ্বাস্তু এশীয়দের সহজে ইউরোপের কোথাও ঢুকতে দেওয়া হয় না! জীবন বাজি রেখে কেউ ঢুকলেও মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়! ইউক্রেন হতে পলায়নপর আফ্রিকান ছাত্রদের ইউরোপীয় দেশসমূহে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না, দেশে ফিরতে সীমান্তে ভিড় করা ভারতীয় এক ছাত্রকে ক্যামেরার সামনে লাথি মেরেছে ইউক্রেনীয় বর্ডার পুলিশ অফিসার।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের বৈশ্বিক প্রভাব নিয়ে এখনই পরিপূর্ণ মন্তব্য করা কঠিন। তবে ইতোমধ্যে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে এর প্রভাব পড়েছে, যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিম দেশগুলো ৬০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল রিজার্ভ হতে বাজারে ছাড়ার পরিকল্পনা করছে, পুরো ইউরোপে গ্যাসের দাম আকাশচুম্বী। রাশিয়ার সাথে সকল প্রকার অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করছে পশ্চিমারা, রাশিয়াকে আন্তর্জাতিক অর্থ লেনদেন ব্যবস্থা ‘সুইফট’, ক্রীড়া সংস্থা ফিফা ও উয়েফা হতে বাদ দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র স্মরণকালের মারাত্মক সব নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রাশিয়াকে আন্তর্জাতিক অর্থনীতি হতে বিছিন্ন করার ঘোষণা দিয়েছে। রাশিয়ার মতো পরাশক্তি এবং অন্যতম তেল উৎপাদনকারী দেশের উপর নিষেধাজ্ঞার প্রভাব অবশ্যই পড়বে স্বর্ণ ও ক্রিপ্টোকারেন্সির বাজারে। চীন রাশিয়ান গম আমদানির উপর সকল জটিলতা প্রত্যাহার করে রাশিয়ান অর্থনীতি টিকিয়ে রাখার প্রচেষ্টার ইঙ্গিত দিচ্ছে, পাকিস্তানও রাশিয়ান গম ক্রয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। প্রাথমিকভাবে রাশিয়ার উপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিতে কোভিড-১৯ এর মতো আরেকটি বড় ধাক্কা আসার আশংকা করা হচ্ছে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে এই যুদ্ধের ফলে ইউরোপীয় দেশসমূহের ক্ষতি হবে অনেক বেশি, অন্যদিকে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। চীনের লাভও নেহাত কম হবে না। সঠিকভাবে সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে ডলারের পরিবর্তে ডিজিটাল ইউয়ানের বৈশ্বিক অর্থ ব্যবস্থা চালু করাও সম্ভব তাদের পক্ষে। তবে রাশিয়া থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে যদি সুযোগ বুঝে চীনও তাইওয়ান দখল করতে চায় বা ইরান যদি সরাসরি ইয়েমেন যুদ্ধে জড়িয়ে যায়, তাহলে হয়তো তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে!

রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ সবার চোখে আবারও আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, কোনো ক্ষুদ্র দেশ বৃহৎ প্রতিবেশী ও আন্তর্জাতিক শক্তির সাথে সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে সমন্বয় বজায় রাখতে ব্যর্থ হলে চরম মূল্য দিতে হবে এবং পশ্চিমারা কখনো কারো সত্যিকারের বন্ধু না। পশ্চিমাদের পছন্দসই গণতন্ত্র বা নেতৃত্বই একটি ক্ষুদ্র দেশের জন্য শেষ কথা নয়। যেমনটা গত এপ্রিলে চায়নিজ স্টেট কাউন্সিলর এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বলেছিলেন, ‘Democracy is not Coca-Cola that promises the same taste everywhere in the world.’

  • লেখক: প্রতিরক্ষা বিষয়ক তথ্য সংগ্রাহক

লেখকের আরো লেখা পড়ুন

মেটাভার্স কী এবং মেটাভার্স বিশ্বে কী পরিবর্তন আনতে চলেছে

পার্বত্য চট্টগ্রামের ইনসার্জেন্সি মোকাবিলায় আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

5 − 1 =

আরও পড়ুন