নওয়াজ, বেনজীর, থাকসিন ইতিহাসের নজির ঘুরিয়ে দিলেন তারেক রহমান



রাজনৈতিক জীবনে কারাদণ্ড ও নির্বাসন খুব স্বাভাবিক একটি ঘটনা। বিশ্বের অনেক নেতাকেই নানা কারণে তাদের রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন সময়ে কারাগারে ও নির্বাসনে কাটাতে হয়েছে। অনেকেই দীর্ঘ কারাভোগ বা নির্বাসন শেষে পুনরায় রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে পেরেছেন এবং অনেকেই আর কখনো রাষ্ট্র ক্ষমতায় ফিরে আসতে পারেননি। সাম্প্রতিক ইতিহাসে এশিয়ার তিন আলোচিত রাজনৈতিক চরিত্র পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো, নেওয়াজ শরীফ তাদের সর্বশেষ নির্বাসন থেকে ফিরে আর রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে পারেননি। এই তালিকায় আরো রয়েছেন থাইল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রা। এই তিনজন তাদের রাজনৈতিক জীবনের সর্বশেষ নির্বাসন থেকে দেশে ফিরতে পারলেও রাষ্ট্র ক্ষমতা ফিরতে পারেননি। সেই বিচারে উজ্জ্বল ব্যতিক্রম বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি উল্লেখিত তিনজনের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের মুখ ঘুরিয়ে দিয়ে দীর্ঘ ১৮ বছর নির্বাসিত জীবন পার করে দেশে ফিরে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে পেরেছেন।
বেনজির ভুট্টো, নওয়াজ শরীফ ও থাকসিন সিনাওয়াত্রা যেটা পারেননি, তারেক রহমান সেটা পেরেছেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো সর্বশেষ নির্বাসন থেকে ফিরে নির্বাচনী জনসভায় গুপ্তহত্যার শিকার হয়েছিলেন। নির্বাচনে তাঁর দল জয়লাভ করলেও তিনি ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে পারেননি স্বাভাবিক কারণে। দেশটির আরেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ দেশে ফিরে নির্বাচনে জয়ী হলেও সামরিক বাহিনী ও জোট শরীকদের অপ্রকাশ্য ও প্রকাশ্য আপত্তিতে প্রধানমন্ত্রীর পদে আসীন হতে পারেননি। অন্যদিকে থাইল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রার একাধিকবার জয়লাভ করলেও তিনি ক্ষমতায় যেতে পারেননি। বর্তমানে দেশে ফিরে এসে বর্তমানে কারা ভোগ করছেন।
মুসলিম বিশ্বের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী ছিলেন পাকিস্তানের বেনজির ভুট্টো। ১৯৯৭ সালের নির্বাচনে তিনি হেরে যাওয়ার পর সুইজারল্যান্ডের একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে ১৯৯৯ সালে বেনজির ও তাঁর স্বামী আসিফ আলী জারদারিকে পাঁচ বছরের জেল ও ৮৬ লাখ ডলার জরিমানা করে পাকিস্তানের একটি আদালত। পরে উচ্চ আদালত এই রায়কে পক্ষপাতদুষ্ট হিসেবে রায় দেয়। আট বছরের স্বেচ্ছা নির্বাসন কাটিয়ে ২০০৭ এর অক্টোবরে বেনজির পাকিস্তানে প্রত্যাবর্তন করেন। দেশে ফিরে নির্বাচনী প্রচারণায় ঝাঁপিয়ে পড়েন বেনজির ভুট্টো। সেসময় তিনি ও তার দল পাকিস্তানে জনপ্রিয়তার শীর্ষে অবস্থান করছিল।
২০০৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর রাওয়ালপিন্ডির এক নির্বাচনী সমাবেশ শেষে সভাস্থল ত্যাগ করার পর গাড়িতে আরোহণের পর মুহূর্তে আত্মঘাতী হামলায় নিহত হন বেনজীর ভুট্টো। আত্মঘাতী হামলাকারী প্রথমে তার ঘাড়ে গুলি করে এবং পরবর্তীতে আত্মঘাতী বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। তিনি শহীদ হন। সে নির্বাচনে তার দল ব্যাপকভাবে জয়লাভ করলে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন ইউসুফ রাজা গিলানি। বেনজির ভুট্টোর স্বামী আসিফ আলী জারদারি প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
তৃতীয় মেয়াদের পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন নওয়াজ শরীফ ২০১৩ সালে। ২০১৭ সালে পানামা পেপারস মামলায় সুপ্রিম কোর্টের রায়ে অযোগ্য ঘোষিত হওয়ার পর তিনি পদত্যাগ করেন। ২০১৮ সালে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট নওয়াজকে সরকারি পদে থাকার জন্য অযোগ্য ঘোষণা করে এবং জবাবদিহিতা আদালত তাকে দশ বছরের কারাদণ্ড দেয়। ২০১৯ সালে তিনি জামিনে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান। চার সপ্তাহের মধ্যে দেশে ফিরে আসতে ব্যর্থ হওয়ায় পাকিস্তানের একটি আদালত তাকে পলাতক ঘোষণা করে; তবে, পরে ইসলামাবাদ হাইকোর্ট অ্যাভেনফিল্ড এবং আল-আজিজিয়া মামলায় তাকে প্রতিরক্ষামূলক জামিন দেয়।
২০২৩ সালে চার বছর নির্বাসনের পর তিনি পাকিস্তানে ফিরে আসেন এবং পরবর্তীতে ইসলামাবাদ হাইকোর্ট অ্যাভেনফিল্ড এবং আল-আজিজিয়া স্টিল মিলস মামলা থেকে খালাস পান। তিনি ২০২৪ সালে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হলেও এবং তার দলের নেতৃত্বাধীন জোট সরকার গঠন করলেও নওয়াজ শরীফ প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে বসতে পারেননি। প্রকাশ্যে জোট শরিকদের আপত্তি, অপ্রকাশ্যে সামরিক বাহিনীর আপত্তির মুখে নওয়াজের পরিবর্তে তার ছোট ভাই শাহাবাজ শরীফ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন।
১৯ সেপ্টেম্বর ২০০৬ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানে থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয় । তাঁর দলকে অবৈধ ঘোষণা করা হয় এবং তাঁকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে নিষিদ্ধ করা হয়। থাকসিন ১৫ বছর ধরে স্ব-আরোপিত নির্বাসনে ছিলেন। ২০১১ সালে তাঁর দল পিউ থাই পার্টি নির্বাচনে বিপুলভাবে জয়লাভ করে। এই জয় লাভের পেছনে থাকসিনের বিপুল ভূমিকা থাকলেও তিনি দেশে ফিরে ক্ষমতা গ্রহণ করতে পারেননি। এমনকি এই জয়লাভের পর তাঁর নিজের বোন ইংলাক সিনাওয়াত্রা প্রধানমন্ত্রীর পদে বসে অনেক চেষ্টা করেও তাকে নিরাপদে দেশে ফেরাতে পারেননি।
থাকসিন দেশে ফিরে আসেন ২০২৩ সালের আগস্ট মাসে। ২০২৪ সালে থাকসিনের মেয়ে পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রা দেশটির প্রধানমন্ত্রী হন। আলোচনা রয়েছে, উল্লেখিত দুজনই থাকসিনকে ক্ষমতায় ফেরানোর চেষ্টার কারণে ক্ষমতাকচ্যুত হতে হয়েছে। ২০২৩ সালের ২২ আগস্ট থাইল্যান্ডে ফিরে আসেন এবং থাকসিনকে তাৎক্ষণিকভাবে হেফাজতে নেওয়া হয়। ২০২৪ সালে তাঁকে প্যারোল এবং ক্ষমা করা হয়, কিন্তু পরে ২০২৫ সালে সুপ্রিমকোর্ট তাকে ১ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করতে বাধ্য করে। বর্তমানে তিনিও কারাদণ্ড ভোগ করছেন। চলতি বছর এই কারাদণ্ডের মেয়াদ শেষ হলে তিনি মুক্তি পেতে পারেন।
তবে উল্লেখিত তিন নেতা তাদের সর্বশেষ পর্যায়ে নির্বাসন থেকে দেশে ফিরে রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত না হতে পারলেও বেনজির ভুট্টো এবং নেওয়াজ শরীফ তাদের রাজনৈতিক জীবনে একবার করে নির্বাসন থেকে ফিরে পুনরায় রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। এছাড়াও ভিন্ন ভিন্ন সময়ে অং সং সুচি, আয়তুল্লা রুহুল্লাহ খোমিনীসহ বেশ কিছু নেতা নির্বাসন থেকে ফিরে পুনরায় রাষ্ট্রক্ষমতা ফিরে পেয়েছিলেন। তবে মিয়ানমারের প্রধানমন্ত্রী অং সান সুচি সামরিক অভ্যুত্থানের ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দেশটিতে দীর্ঘ সময় ধরে অন্তরীণ রয়েছেন। বর্তমানে তাঁর অবস্থা কেউ জানে না। তিনি বেঁচে আছেন নাকি মরে গেছেন এ প্রশ্ন ইতিমধ্যেই দেশটির অভ্যন্তরে ও তাঁর আত্মীয়-স্বজনের পক্ষ থেকে তোলা হয়েছে।
বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘ওয়ান ইলেভেন’ নামক একটি তৎকালীন সেনা সমর্থিত ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে ২০০৭ সালের ৭ মার্চ গ্রেপ্তার হন। কারাগারে তাঁর উপরে অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়। এই নির্যাতনে তিনি মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। ২০০৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর তিনি জামিনে মুক্ত হন। এর ৮ দিন পর ১১ই সেপ্টেম্বর অনেকটা ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করে তাঁকে চিকিৎসার নামে বিমানে তুলে লন্ডনে পাঠিয়ে দেয় তৎকালীন সেনাসমর্থিত ফখরুদ্দিন-মইনুদ্দিন সরকার। এরপর ফখরুদ্দিন মইনুদ্দিনের অন্তর্বর্তী সরকার নিজেদের সেফ এক্সিট নিশ্চিত করতে একটি পাতানো নির্বাচনের মাধ্যমে ২০০৮ সালে শেখ হাসিনাকে রাষ্ট্র ক্ষমতায় নিয়ে আসে।
রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর শেখ হাসিনা তারেক রহমানের নামে একের পর এক মিথ্যা মামলা দিয়ে ও সাজানো বিচারের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড এবং আজীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে। ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার এক অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। এই অভ্যুত্থানে নির্বাসনে থেকেও তারেক রহমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। অবশেষে ২০২৫ সালের ২৫ অক্টোবর ১৮ বছর পর স্ত্রী ও কন্যা সহ দেশে ফিরে আসেন।
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনে নেতৃত্ব দিয়ে তার দলকে ভূমিধস বিজয় এনে দেন। এর ৫ দিন পর ১৭ই ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন তারেক রহমান। এর মধ্যে দিয়ে এশিয়ার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক নির্বাসন ইতিহাসের নজির ঘুরিয়ে দিতে সক্ষম হন তিনি।
লেখক : সাংবাদিক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
















