parbattanews

বোমা ফাটিয়ে ভিডিও ধারণ করে ব্যাকগ্রাউন্ডে দিয়েছেন আইএস’র সঙ্গীত

ছবি সংগৃহীত।

গভীর রাতে চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। নির্জন এক গ্রামীণ পাকা রাস্তায় ছুটে চলেছে একটি মোটরসাইকেল। পেছনে আরেকটি মোটরসাইকেলে বসে কাঁপা হাতে সামনের দৃশ্য ধারণ করছেন অন্য একজন। হঠাৎ থেমে গেল বাইকগুলো। এবার অন্ধকারের মধ্যে আবছা দেখা গেল একজন যুবক পাকা রাস্তায় কিছু একটায় আগুন ধরানোর চেষ্টা করছেন। মুহূর্তেই অগ্নিসংযোগ ঘটলো ওই বস্তুতে। দৌড়ে পেছন দিকে এলেন যুবকটি। ওদিকে ওই অগ্নিসংযোগকৃত বস্তুটিতে দেখা যাচ্ছে একটি সলতের মতো জিনিস জ্বলে উঠেছে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই অন্ধকার ভেদ করে একটি বড় অগ্নি কুণ্ডলি। সাথে বিকট আওয়াজ হলো। একটি বোমা বিস্ফোরিত হয়েছে। ভিডিওতে একটা পজ এলো। এবং পরের দৃশ্যেই দেখা গেল আরেকটি বস্তুর সাথে যুক্ত সলতে-তে আগুন ধরিয়ে গেঞ্জি পরা যুবক (যার চেহারা দেখা যায় না) দৌড়ে পেছনে আসছেন। এবং মুহুর্তের মধ্যেই পরপর দুটি অগ্নি কুণ্ডলি জ্বলে উঠলো, সাথে দুটি বড় বিস্ফোরণের শব্দ। এরপর স্লো মোশনে এই তিনটি বিস্ফোরণ আবারও দেখানো হলো ভিডিওতে।

ভিডিওর শুরু থেকেই ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজছে একটি আরবি ভাষার সঙ্গীত। যার প্রথম শব্দগুলো হলো, ‘মাউকিবুন নুরী দা’আনা’। এই সঙ্গীতটি আইসিস বা আইএস বা দায়েশ নামে পরিচিত আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের অফিসিয়াল মিডিয়া উইং থেকে রিলিজ করা একটি রণসঙ্গীত।

স্লো মোশনের দৃশ্যটি শেষ হওয়ার পরপরই ভিডিওর ব্যাকগ্রাউন্ডে একটি কণ্ঠ ভেসে ওঠে, “সেই! আল্লাহু আকবার!” এরপর আরও কয়েকটি বাক্য বলেছেন তিনি। যদিও সেগুলো সঙ্গীতের আওয়াজে এবং অন্যান্য ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েজের কারণে স্পষ্ট বুঝা যায় না।

পরের দৃশ্যে ক্যামেরাপার্সন রাস্তার একটু ডান দিকে ক্যামেরা ঘুরান। ভেসে ওঠে শাহ আমানত সাবিরের হাস্যোজ্জ্বল চেহারা। মাথায় সাদাকালো পাগড়ি, গায়ে কালো গেঞ্জি ও বোতাম খোলা শার্ট। ডান হাতের মধ্যমা উঁচিয়ে ক্যামেরার দিকে তাকে বললেন, “হে কুফফাররা”। এরপর বাম হাতে থাকা ধারালো লম্বা একটি দা ডান হাতে নিয়ে বাক্য সম্পূর্ণ করলেন, “তোমরা জেনে রাখো, দ্রুতই আমরা তোমাদের ওপর বজ্রের মতো আঘাতের জন্য (অথবা ‘আসার জন্য’) প্রস্তুতি নিচ্ছি। ইউনূস তুই তৈরি থাক! দেখা হবে ইনশাআল্লাহ! তাকবীর!”

সাবিরের সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে ক্যামেরাপার্সনও ‘ইনশাআল্লাহ’ এবং ‘তাকবীর’ বলে স্লোগান দিলেন। এরপর অন্ধকার রাস্তায় হেঁটে হেঁটে স্লোগান দিতে দিতে আগাচ্ছেন তারা।

ভিডিওতে আবারও পজ। নতুন দৃশ্যে দেখা গেল একটি ঘরের ফ্লোরে বসে আছেন সাবির ও তার সঙ্গে থাকা অন্তত ৩ জন ব্যক্তি এবং তাদের একজন উচ্চস্বরে পবিত্র কোরআনের সুরা নিসা থেকে জিহাদ বিষয়ক একটি আয়াত তিলাওয়াত করছেন।

২ মিনিট ২৩ সেকেন্ডের এই ভিডিওটি শাহ আমানত সাবিরের মোবাইল থেকে উদ্ধার করেছেন গোয়েন্দারা। সামাজিক মাধ্যমে ভিডিওর একাংশ ইতোমধ্যে গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে প্রকাশ করেছেন সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের। দ্য ডিসেন্ট পূর্ণ ভিডিওটি সংগ্রহ করে দেখেছে।

গত ৫ জুলাই ফাতাহ কম্ব্যাট সিস্টেম নামের ‘একটি ইসলামী’ মার্শাল আর্ট প্রতিষ্ঠানের পরিচালক শাহ আমানত সাবিরসহ ওই সংগঠনের সাথে জড়িত আরও ৫জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

পুলিশ ও একাধিক গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে, উগ্রবাদে জড়িত থাকার সন্দেহে তাদের আটক করা হয়েছে। আটক করে আদালতে তোলা হলে তাদের ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত।

জিজ্ঞাসাবাদে সাবির জানিয়েছেন, আলোচ্য ভিডিও তার সহযোগীরা ধারণ করেছিলেন এবং এটির ব্যাকগ্রাউন্ডে আইএস’র সঙ্গীত তারাই যুক্ত করে বিদেশে কারো কাছে পাঠিয়েছেন। তবে ভিডিওটি ঠিক কত তারিখে, কোন জায়গায় ধারণ করা হয়েছে এবং বিদেশে কাদের কাছে এটির কপি পাঠানো হয়েছে সেসব প্রশ্নের উত্তর এখন সংবাদমাধ্যমকে দিতে সম্মত হননি গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। যদিও, সাবিরের কণ্ঠে ‘ইউনূস তুই তৈরি থাক!’– হুশিয়ারি থেকে অনুমান করা যায় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এটি ধারণ করা হয়ে থাকতে পারে।

আইএসপন্থী সাবিরসারিয়ানাম দিয়ে ডাকাতি করার স্বীকারোক্তি দিয়েছেন

গ্রেফতারের পর রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের সময় অন্যান্য তথ্য দেয়ার পাশাপাশি সাবির একটি ডাকাতির ঘটনায় অংশ নেয়ার তথ্য জানিয়েছেন। দ্য ডিসেন্ট জিজ্ঞাসাবাদ সংক্রান্ত কিছু অভ্যন্তরীণ ম্যাটেরিয়াল দেখেছে যেখানে সাবির ২০২৫ সালে যশোর এলাকায় একটি ডাকাতিতে অংশ নেয়ার ঘটনা সাবলীলভাবে বর্ণনা করেছেন এবং এর পেছনে নিজেদের ‘ধর্মীয় ব্যাখ্যা’ উপস্থাপন করেছেন। নিজেদের পরিভাষায় তিনি এটিকে ‘সারিয়া’ বলে অভিহিত করেছেন।

গোয়েন্দাদের জিজ্ঞাসাবাদের সাবির বলেছেন, “সারিয়া একটি আরবি পরিভাষা। এর অর্থ হইতেসে অভিযান। ছোট অভিযান। সারিয়ার মূল ইতিহাস আসছে বদরের আগের ইতিহাস থেকে। যেমন বদরের আগে সাহাবারা অমুসলিমদের যে বাণিজ্যিক কাফেলা, এটা লুট করতো। কিন্তু এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট আছে। সেটা হচ্ছে যার-তার উপর সারিয়া করা জায়েজ নাই, সারিয়া কোন মুসলিমের উপর হইতে পারবে না। সারিয়া হইতে হবে এমন লোকের উপর যে মুসলিমদের ক্ষতি করতেছে, মুসলিমদের উপর যারা আক্রোশ রাখে, হামলার উদ্দেশ্য রাখে এমন লোকের উপর করা যাবে। এবং সারিয়ার আরো উসূল আছে, সেটা হইলো, সারিয়া অত্যন্ত অভাবে পড়লে করা যাবে, সাহাবারা অত্যন্ত অভাবে না পড়লে সারিয়া করেনি। ওই যে পরের ক্রাইটেরিয়া, তাদের উপর করতে হবে যারা ইসলামের ক্ষতি করে।”

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে যশোরে কমল বিশ্বাস নামে একজন হিন্দু ব্যক্তির ইজিবাইক সাবির ও তার সহযোগীরা মিলে ডাকাতি করেছিলেন বলে অভিযোগ করেছেন কমল। এ বিষয়ে গত বছরই যশোর কোতয়ালী মডেল থানায় জিডি করেছিলেন তিনি। পাশাপাশি সাবির ও তার সহযোগীরা ৫ জুলাই গ্রেফতার হওয়ার পর তিনি একটি মামলাও দায়ের করেছেন সাবিরকে প্রধান আসামি করে।

এ বিষয়ে রিমান্ড জিজ্ঞাসাবাদে সাবির তাদের ডাকাতির পক্ষে যুক্তি হাজির করে বলেন, “ওই সময় বেশ অভাবে ছিলাম। অভাবের সময় সারিয়া জায়েজ হয়। সারিয়া করতে হলে মুসলিম হইলে তো হবেই না, অমুসলিম হইলেও হবে না, ইসলামের ক্ষতি করতে হবে। তো আমরা কনফার্মলি জানি ইস্কন ইসলামের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করতেছে। এবং কমল দে সক্রিয় ইস্কনের সদস্য। সে নিয়মিত ইস্কনের আশ্রমে যায়। তার অনেক গুপ্ত বিষয় আছে। তার অনেক সম্পদ আছে কিন্তু সে ইজিবাইক চালায়। এটা সাধারণ কোন বিষয় না। আমাদের সন্দেহ যে সে র’ এর এজেন্ট। এজন্য তাকে টার্গেট করা হয়। তার ইনফরমেশন পাইসিলাম আবু উসামা ফয়সালের কাছে। তার বাড়ির পাশে যেহেতু। ওই সময় অনেক অভাবে ছিলাম, বাসা ভাড়াও দিতে পারছিলাম না। এর মধ্যে আবু উসামা বলল ভাই সারিয়ার বিষয়ে কী করা যায়। আমি বললাম যে সারিয়া করতে গেলে তো প্রপার লোক লাগবে। সে বললো যে এরকম কমল দে আছে বাড়ির পাশে। আশ্রমে যাতায়াত করে, ব্যাপক সম্পদ আছে, ইজিবাইক চালায়। এরপর ওকে টার্গেট করা হয়।”

প্রসঙ্গত, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলো কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে নানা ধরণের পদ্ধতি অবলম্বন করে থাকে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ডাকাতি, ছিনতাই, কিডন্যাপ করে মুক্তিপণ আদায়, চোরাচালান, লুট, নেশাদ্রব্যের ব্যবসা ইত্যাদি। সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলো ডাকাতি ও ছিনতাইকে ‘সারিয়া’ বলে আখ্যা দেয়। বাংলাদেশে কোন কোন জঙ্গি সংগঠনের সদস্যরাও অর্থ সংগ্রহের জন্য ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের পদ্ধতি অবলম্বন করে থাকে।

কমল বিশ্বাস দ্য ডিসেন্টকে জানিয়েছেন, গত বছর সেপ্টেম্বর মাসে এক রাতে তার বাড়ির পাশের ফয়সাল নামের একজন তাকে ইজিবাইকসহ এক জায়গায় নিয়ে যায়। সেখানে কয়েকজন মুখোশ পরা যুবক তাকে মারধর করে অস্ত্রের মুখে ইজিবাইকটি ছিনিয়ে নিয়ে যায়। সেসময় কমল বিশ্বাস থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন।

গোয়েন্দাদের জিজ্ঞাসাবাদে সাবির ফয়সালের নাম বার বার ‘আবু উসামা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এবং এক পর্যায়ে নিশ্চিত করেছেন এই ফয়সাল ওরফে আবু উসামা তার সাথে ডাকাতিতে ছিলেন।

সাবিরের আটকের পর মুক্তির দাবিতে অনলাইনে ক্যাম্পেইন

৫ জুলাই শাহ আমান সাবির এবং তার সহযোগীদেরকে যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশ গ্রেফতার করার পর তাদের মুক্তির দাবিতে সক্রিয় ক্যাম্পেইন শুরু করা হয় উগ্রপন্থী হিসেবে পরিচিত বিভিন্ন ফেসবুক আইডি থেকে। তাদের অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, প্রকাশ্যে মার্শাল আর্ট শিখানো কিভাবে উগ্রবাদ হতে পারে? তাদের দাবি, নিছক আত্মরক্ষার কৌশল হিসেবে মার্শাল আর্ট শেখাতেন সাবির ও তার সহযোগীরা।

মীর ফরহাদ নামের একজন লিখেছেন, “ছেলেটা মার্শাল আর্ট শেখায়, গোপনে কোন কাজ করে না, যা করে দিনের স্পষ্ট আলোতে করে, প্রত্যেকটা মুভমেন্ট সোশাল মিডিয়াতে শেয়ার করে, দেশবিরোধী কোন কিছুতে যুক্ত কিনা তার প্রমাণ Zulkarnain Saer মত বাঘা ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টও দিতে পারেনি। ওর একটায় অপরাধ, দাড়ি-টুপি রেখে মার্শাল আর্ট শিখানো।”

মীর ফরহাদ আরও লিখেছেন, “এইদেশের রন্ধে রন্ধে ইসলামবিদ্বেষ, দাঁড়ি টুপি থাকলে মামলায় ২২বছর জেল খাটার পরেও ফাঁসির রায় হবে আর দাঁড়িটুপি না থাকলে একই মামলায় আপনি খালাস পেয়ে মন্ত্রী হবেন। আপনাদের দাঁড়িটুপিতে এত সমস্যা হলে স্পষ্ট বলে দেন, এই দেশে যে দাঁড়িটুপি ইউজ করবে তাদেরকে নিধন করা হবে, হুদাই মুনাফিকি করার কি দরকার?”

আল মাহমুদ হাসান নামের একজন লিখেছেন, “তিতুমীরের জমিনে রঠা সঙ্গীত প্রাকটিস বৈধ, অ/বৈ/ধ লীগের অ স্ত্রসহ মহড়াও বৈধ। কিন্তু আত্মরক্ষার মার্শাল আর্ট শেখা /বৈ/! খুলনার ছেলে শাহ্ আমানত সাবির ওনার অপ রাধঃ ১) ছেলে-মেয়েদের এক করে মাখামাখি করে মার্শাল আর্ট শেখায় না। ২) মার্শাল আর্টে মিউজিক আর নো%রা উন্মা দনা আনে না। ) ইসলামপন্থী আদর্শ লালন করে। মুখে দাঁড়ি রাখে। ) তার মার্শাল আর্টের লক্ষ্য ছিলো গভীর রাতে  গ্ন হয়ে চলা মেয়েদের অধিকার রক্ষা না, বরং ইসলামপন্থীদের আত্মরক্ষা। ৫) মার্শাল আর্টের নামে অবাধ মেলামেশা ও ইসলাম বিরোধী কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকতো।”

বিভিন্ন সময়ে ‘শাতিম’ ও ‘ইসলামবিদ্বেষী’ আখ্যা দিয়ে হত্যার পক্ষে উস্কানি দেয়ার ঘটনায় অভিযুক্ত আতাউর রহমান বিক্রমপুরী ফেসবুকে পোস্ট করে দাবি করেন, ফাতাহ কম্ব্যাট সিস্টেম এর দু’জন শিক্ষার্থীকে আটক করার পর তার পরামর্শেই শাহ্ আমানত সাবির থানায় যায়। এবং এরপর পুলিশ তাকে আটক করে। বিক্রমপুরী আরও দাবি করেন শাহ্ আমানত সাবিরের সাথে তার বিভিন্ন সময় যোগাযোগ হতো। পাশাপাশি তিনি তাদের মুক্তি চেয়ে একাধিক পোস্ট করেন। এর আগে উগ্রবাদী প্রচারণায় জড়িত থাকার অভিযোগে গত বছরের ডিসেম্বরে পুলিশের হাতে আতাউর রহমান বিক্রমপুরী আটক হওয়ার পর তার মুক্তির দাবি শাহ্ আমানত সাবির অনলাইনে সরব ছিলেন।

শাহ আমানত সাবিরকে গ্রেফতারের পর তার পক্ষে সাফাইমূলক পোস্টে আতাউর রহমান বিক্রমপুরী লিখেছেন, “সে তার সকল কার্যক্রম রাষ্ট্রের নিয়ম মেনে প্রকাশ্যেই পরিচালনা করে আসছিল। আমার জানামতে, রাষ্ট্রের কোন আইন সে ভঙ্গ করেনি। এরপরেও ইসলামিক বেশভূষার কারণে সে ইন্ডিয়ান মিডিয়ার অপপ্রচারের শিকার হলে সংবাদ সম্মেলন করে সবকিছু ক্লিয়ার করে।”

এই পোস্ট আসিফ আদনান নামক একজন অনলাইন এক্টিভিস্ট তার প্রোফাইলে শেয়ার করেছিলেন। যদিও পরে তিনি সেটি ডিলিট করে দিয়েছেন। অন্যদিকে ৭ জুলাই সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের সাবিরের বোমা বিস্ফোরণে ভিডিও প্রকাশ করার পর ৮ জুলাই আতাউর রহমান বিক্রমপুরী নতুন এক পোস্টে তার আগের অবস্থান থেকে সরে এসেছেন এবং সাবিরের বিরুদ্ধে তার সাথে ‘প্রতারণা’র অভিযোগ তুলে যথাযথ বিচার চেয়েছেন।

সাবিরের বোমা বিস্ফোরণে ভিডিও প্রকাশের কতিপয় পরিচিত অনলাইন এক্টিভিস্ট নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে সাবিরকে ‘ভিকটিম’ হিসেবে উপস্থাপন করে ক্যাম্পেইন চালানো হচ্ছে। আতাউর রহমান বিক্রমপুরী এই বিষয়ে তার অবস্থান পরিবর্তন করায় তাকেও ‘গণতান্ত্রিক শায়েখ’ বলে কটাক্ষ করে পোস্ট করছেন সাবিরের অনুসারীরা।

ফেসবুকে যা করতেন সাবির

শাহ আমানত সাবিরের পরিচালিত ফাতাহ কম্ব্যাট সিস্টেম এর অন্তত তিনটি শাখা ছিল বলে জানা গেছে। সেগুলো ছিল খুলনা, চাঁদপুর ও ঢাকায়।

দ্য ডিসেন্ট শাহ্ আমানত সাবিরের ব্যক্তিগত আইডি ও তার ফাতাহ কম্ব্যাট সিস্টেম এর ফেসবুক পেইজের কন্টেন্ট বিশ্লেষণ করে দেখার চেষ্টা করেছে।

এতে দেখা যায়, সাবির প্রায়ই গণতন্ত্রকে কুফরি ব্যবস্থা আখ্যা দিয়ে পোস্ট করতেন। সম্প্রতি আফগানিস্তানের সাথে মিল রেখে ঈদুল ফিতর পালন করে আলোচিত হোন।

সাবির বিভিন্ন পোস্টে তার সংগঠনকে বিশ্বের ‘প্রথম শিরকমুক্ত, কুফরমুক্ত, মিউজিকমুক্ত এবং পরিপূর্ণ শরিয়াহভিত্তিক ইসলামী মার্শাল আর্ট’ হিসেবে দাবি করেছেন।

যেমন এক ফেসবুক পোস্টে তিনি লিখেছেন, “ফাতাহ কম্ব্যাট সিস্টেম শুধুমাত্র একটি মার্শাল আর্ট নয়; এটি বাস্তবধর্মী আত্মরক্ষার একটি পূর্ণাঙ্গ প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা, যা ইসলামী আকীদাহ, নৈতিকতা ও শরিয়াহর সীমারেখাকে সম্মান করে গড়ে তোলা হয়েছে। বর্তমান সময়ে আত্মরক্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন। তাই FCS-এ শেখানো হয় বাস্তব পরিস্থিতিতে নিজেকে, পরিবারকে এবং নিরপরাধ মানুষকে রক্ষা করার কার্যকর আত্মরক্ষার কৌশল।”

এছাড়া ফাতাহ কম্ব্যাট সিস্টেমের অনুশীলনের বিভিন্ন ভিডিওর ব্যাকগ্রাউন্ডে আরবি গান জুড়ে দিতে দেখা যায়। এসব গানে জিহাদ ও খেলাফত অর্জনের জন্য যুদ্ধ ও জীবন দানের ব্যাপারে উৎসাহিত করা হয়েছে।

যেমন একটি গানের অনুবাদ এমন: “নিশ্চয়ই আমি এমন এক খিলাফতের আশা করি, যা পৃথিবীকে উজ্জ্বল আলোয় রাঙিয়ে দেবে। যা (উম্মাহর) ছন্নছাড়া ও বিক্ষিপ্ত শক্তিকে একত্রিত করবে এবং পৃথিবীকে আলোকময় ভোরে ভরিয়ে দেবে।.. হে প্রজন্মের যুবকেরা! জেগে ওঠো, প্রস্ফুটিত করো এক মুক্ত প্রভাত। এবং উড্ডীন করো কালো পতাকাগুলো, (রক্ত) ঢেলে দিতে বিন্দুমাত্র ভয় পেয়ো না… তাওহীদের পতাকা মর্যাদার আকাশে পতপত করে উড়বে এবং আমাদের মাঝে নতুন আশার সঞ্চার করবে—আমরা টুকরো টুকরো ও দলউপদলে বিভক্ত হয়ে যাওয়ার পর।”

আরেকটি গানের অনুবাদ: “সত্যের সেই হৃত গৌরব, কর্তৃত্ব ও রাজত্বকে পুনরায় ফিরিয়ে আনো, আর ধূলিসাৎ করে দাও শত্রু বাহিনীর সুরক্ষিত ঘাঁটি ও দুর্গসমূহ।… কেননা আমরা এমন এক সৈন্যদল, যাদের রয়েছে এক সুমহান লক্ষ্য; একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির তরে আমরা জেগে উঠেছি হেদায়েতের আলো ছড়িয়ে দিতে।.. আমাদের তীক্ষ্ণ তরবারির আঘাতে আমরা মৃত্যুর হরেক রূপ ফুটিয়ে তুলব এবং শত্রুকে আস্বাদন করাব আমাদের প্রচণ্ড শক্তির লেলিহান শিখা। কারণ আমরা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি—বিজয় ও গৌরব আমাদের দিকেই অপলক আকুলতায় তাকিয়ে আছে, তরবারির মুহুর্মুহু ঝলকানি আর বল্লমের তীব্র আঘাতের মধ্য থেকে।”

আরেকটি গানের অনুবাদ- “হে দ্বীনের গর্জনকারী সিংহদল! হে জিহাদের অবিনাশী প্রতীক!আজ জেগে ওঠো এমন এক যুগে—যখন অনারবরা আরবদের ওপর কর্তৃত্ব করছে। এমন এক কাল—যখন নারীরা রাজত্ব করছে, আর একদল নির্বোধ, হীন ও বামনসদৃশ অযোগ্য ব্যক্তি মানবজাতির নেতৃত্ব দিচ্ছে।… আমার দ্বীনের দীপ্ত তরবারি সগৌরবে উন্নত হয়েছিল সুউচ্চ পর্বতশৃঙ্গে, মাইলের পর মাইল ধূ ধূ মরুপ্রান্তরে, অতল সমুদ্রে এবং বিস্তীর্ণ উপত্যকায়। তারা সত্যবিমুখ কাফেরদের এমনভাবে পরাস্ত ও পদানত করেছিলেন যে, সেই শত্রুরা লাঞ্ছনার চাদর গায়ে জড়িয়ে গবাদিপশুর মতো মস্তক অবনত করে পথ চলত।”

সাবিরের ভিডিওতে ব্যবহার করা অধিকাংশ ব্যাকগ্রাউন্ড সঙ্গীত আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইসিস ব্যবহার করতো। ‘আলহামদুলিল্লাহ আল্লান্নাসরু’ ও ‘মাওকিবুন নূর’ নামে অন্তত দুটি গানের ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া গেছে যেগুলো আইএসের অফিসিয়াল মিডিয়া ‘আজনাদ’ এ ব্যবহার করা হয়েছে।

উৎস : দ্য ডিসেন্ট ( ৮ জুলাই ২০২৬ )
লেখক :  হাসান আল মাহমুদ

Exit mobile version