ভারতের ধুবড়ি সেনাঘাঁটি : ‘ফরওয়ার্ড ডিফেন্স’ নাকি মনস্তাত্ত্বিক সংকেত?


বাংলাদেশের সীমান্ত থেকে মাত্র ৩০ কিলোমিটার দূরে ভারতের নতুন সেনাঘাঁটি “লাসিত বরফুকান” স্থাপনের সিদ্ধান্তকে অনেকেই আসামের অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন বা সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার হিসেবে দেখছেন। কিন্তু আসলেই কি এটি নিছক একটি প্রশাসনিক পদক্ষেপ নাকি একটি ‘ফরওয়ার্ড ডিফেন্স সিগন্যাল’, যা দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষমতার ভারসাম্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
এই পদক্ষেপকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করলে যেমন অযথা উত্তেজনা তৈরি হতে পারে, তেমনি একে অবহেলা করাও হতে পারে আত্মঘাতী। কারণ ইতিহাস বলে যে, রাষ্ট্র সময়মতো প্রতিক্রিয়া জানায় না, সে রাষ্ট্রকেই পরে “ভূরাজনৈতিক চিপ” হয়ে থাকতে হয়।
১️। কৌশলগত প্রেক্ষাপট: ভারতের ‘ইস্টার্ন থিয়েটার’র পুনর্গঠন
ধুবড়ি অঞ্চল ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের অংশ এবং এটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল শিলিগুড়ি করিডোর বা তথাকথিত “চিকেন’স নেক” থেকে মাত্র ৯০ কি.মি. দূরে। এই সরু করিডরই ভারতের মূল ভূখণ্ডকে ৭টি উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যের সঙ্গে যুক্ত রাখে। অতএব, ধুবড়িতে একটি সামরিক ঘাঁটি স্থাপন মানে হচ্ছে ভারতের ‘কন্টিজেন্সি রেস্পন্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার’ তৈরি করা, যাতে এই করিডর বা এর দক্ষিণ প্রান্তে কোনো অস্থিরতা দেখা দিলে দ্রুত সামরিক পদক্ষেপ নেয়া যায়। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো ঘাঁটিতে মোতায়েন করা হচ্ছে একটি স্পেশাল ফোর্সেস (প্যারা-এসএফ) ইউনিট ও প্রায় ১ হাজার ৫০০ সৈন্য, যা সম্পূর্ণভাবে আক্রমণাত্মক প্রকৃতির ফোর্স। সীমান্ত থেকে মাত্র ৩০ কিমি দূরত্বে এই ধরনের বাহিনী মানে, বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল এখন ভারতের “ইন্টেলিজেন্স, সার্ভেইল্যান্স, রেকনিসেন্স এনভেলপ”র মধ্যে চলে এসেছে।
২️। ভূরাজনৈতিক পাঠ, ইতিহাস যা শেখায়
সামরিক ইতিহাস প্রমাণ করে “ফরোয়ার্ড বেইজ” প্রায়শই পরে আক্রমণের “লঞ্চিং প্যাড” হিসেবেই ব্যবহৃত হয়েছে। রাশিয়া ২০১৪ সালে ক্রিমিয়ায় যে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেছিল, তা প্রথমে “ডিফেন্সিভ” হিসেবে ঘোষিত হলেও কয়েক মাসের মধ্যে সেটিই হয়ে ওঠে মূল আক্রমণাত্মক কেন্দ্র। চীন ২০২০ সালে গালওয়ান উপত্যকায় ‘টেম্পোরারি লজিস্টিক হাব’ তৈরি করেছিল; পরে দেখা গেছে, সেই হাব থেকেই সংঘাতের সূচনা হয়েছিল। ভারতের এই নতুন ঘাঁটি কি একই ধরনের প্রস্তুতির সংকেত বহন করছে?—বিশেষ করে যখন দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা নীতিতে ‘প্রতিবেশীর উপর নজরদারি’ একটি প্রাতিষ্ঠানিক কৌশলে পরিণত হচ্ছে।
৩️। আন্তর্জাতিক রীতি, ৩০ কিলোমিটারের মধ্যে সেনাঘাঁটি স্থাপন কতটা গ্রহণযোগ্য?
যদিও আন্তর্জাতিক আইনে সীমান্ত থেকে কত দূরে সেনাঘাঁটি স্থাপন করা যাবে সে ব্যাপারে কিছু বলা নেই। তবে “কনফিডেন্স বিল্ডিং মেজারস” বা সিবিএম অনুযায়ী ১৯৯৩ ও ১৯৯৬ সালের ভারত–চীন চুক্তি মতে তারা সীমান্ত থেকে ২০ কিমি ব্যাসার্ধে কোনো নতুন আক্রমনাত্বক অবকাঠামো নির্মান কিংবা ভারী যুদ্ধাস্ত্র মোতায়েন করতে পারে না।
বাংলাদেশ–ভারতের ১৯৭৫ সালের সীমান্ত চুক্তি ও ২০১১ সালের প্রোটোকলে “বন্ধুসুলভ সীমান্ত ব্যবস্থাপনা (ফ্রেন্ডলি বর্ডার ম্যানেজমেন্ট)”-এর কথা বলা আছে, কিন্তু ঘাঁটির দূরত্ব বা অস্ত্রের ধরন নিয়ে কোনো স্পষ্ট নিয়ম নেই।
অতএব, ভারতের এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক প্রথার ধূসর অঞ্চলে (গ্রে জোন) অবস্থান করছে, যেখানে আইন ভাঙা না হলেও “উদ্বেগ সৃষ্টি” নিশ্চিতভাবে হচ্ছে।
৪️। বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়া, কৌশলগত সংযমই সবচেয়ে বড় অস্ত্র
এই পরিস্থিতিতে আবেগ নয়, বুদ্ধিমত্তা ও তথ্যনির্ভর কূটনীতি দরকার।
ক. কূটনৈতিক পদক্ষেপ
অবিলম্বে উক্ত ঘাঁটির উদ্দেশ্য, অপারেশনাল ক্ষমতা ও অস্ত্রের প্রকৃতি সম্পর্কে স্পষ্ট ব্যাখ্যা চেয়ে ভারতের হাইকমিশনে একটি ‘ফর্মাল নোট অফ কন্সার্ন’ পাঠানো উচিত। এর সঙ্গে ভারত–চীনের সিবিএম মডেলের মত করে একটি “পারস্পরিক স্বচ্ছতার প্রস্তাবনা (মিউচ্যুয়াল ট্রান্সপারেন্সি প্রপ্রোজল)” টেবিলে রাখা যেতে পারে, যেন উভয় দেশ নতুন ঘাঁটি স্থাপনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট দূরত্ব মেনে চলে।
খ. সামরিক গোয়েন্দা ও প্রযুক্তিগত নজরদারি
সীমান্তে অযথা সেনা বৃদ্ধি না করে, বরং ড্রোন, বর্ডার রাডার ও নাইট ভিশন রেকোনিসেন্সের মত প্রযুক্তিনির্ভর যৌথ নজরদারি ও তথ্য বিনিময়ের ক্ষমতা বাড়ানো উচিত।
গ. বহুপাক্ষিক কূটনীতি
বাংলাদেশ বিমসটেক ও সার্ক প্ল্যাটফর্মে সীমান্তজুড়ে ভারতের এহেন সামরিকায়নের প্রেক্ষিতে একটি নিরপেক্ষ ‘ইম্প্যাক্ট এসেস্মেন্ট’ এর দাবী তুলতে পারে। এতে আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের অবস্থানকে ‘ডিফেন্সিভ কিন্তু সতর্ক’ হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে।
৫। সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ, আঞ্চলিক ভারসাম্যের নতুন অধ্যায়
২০২৫ সালে হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের সামরিক ও প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন প্রক্রিয়া দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে। ভারতের এই হঠাৎ ‘ফরোয়ার্ড ডেপ্লয়মেন্ট’ সেই প্রেক্ষাপটেই প্রশ্ন জাগায়- বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান সামরিক সক্ষমতাই কি ভারতের উদ্বেগের কারণ?
যদি তা-ই হয়, তবে এটি দক্ষিণ এশীয় নিরাপত্তা নীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো, যেখানে ছোট রাষ্ট্রগুলো নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় আত্মনির্ভরতার পথে হাঁটছে, আর বৃহৎ রাষ্ট্রগুলো কৌশলগত বেষ্টন তৈরি করছে।
সতর্কতা মানেই প্রতিরোধ
ভারতের এই নতুন সামরিক ঘাঁটি স্থাপন হয়ত কোনো “যুদ্ধ প্রস্তুতি” নয়, কিন্তু এটি নিশ্চিতভাবেই একটি কৌশলগত (জিওস্ট্র্যাটেজিক) বার্তা। বাংলাদেশের কাজ হলো সেই বার্তা অনুবাদ করা, এবং ভাবাবেগের বশবর্তী না হয়ে সঠিক তথ্যনির্ভর আত্মবিশ্বাসের সাথে কূটনৈতিকভাবে অগ্রসর হওয়া। বাংলাদেশের উচিত নীরব না থেকে, বরং শান্ত অথচ দৃঢ়ভাবে ভারত ও বহির্বিশ্বকে জানানো যে, আমরা সীমান্তে শান্তি চাই; ত্রাস কিংবা সন্ত্রাস নয়।
লেখক : নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক।

















