`ভূমির জন্য আদিবাসীদের ওপর সহিংসতা বাড়ছে’

kk

কাপেং ফাউন্ডেশনের মানবাধিকার প্রতিবেদন

পার্থ শঙ্কর সাহা |        

“বান্দরবানের বাদুরঝিরি গ্রামটি নিরুপদ্রবই ছিল। জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বাইশারি ইউনিয়নের এ গ্রামে ১৫টি পরিবারের বাস। সবাই জুম চাষি, জাতিতে চাক। বাইশারি থেকে হাঁটা ছাড়া এ গ্রামে যাওয়ার উপায় নেই। যেতে লাগে অন্তত তিন ঘণ্টা। কিন্তু এই দুর্গম গ্রামটিতেও শুরু হলো অত্যাচার। ২০১৩ সালের ১৯ মার্চ ভূমি দখলকারীদের হামলায় সব কটি পরিবার গ্রাম ছেড়ে বাইশারি চলে আসে। ভূমি গ্রাসকারী ব্যক্তিদের দৃষ্টি চাকদের বসতবাড়ি এবং বন্দোবস্ত পাওয়া প্রায় ১০০ একর জমির ওপর।
চাকদের ঘরছাড়া হওয়ার ঘটনা পত্রিকায় লেখালেখি হলে পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়ের একজন উপসচিবের নেতৃত্বে তদন্ত হয়। প্রশাসনের সহযোগিতায় ফিরে যায় গ্রামের মানুষ। কিন্তু আবার এই গ্রামের মানুষেরা ভূমিদস্যুদের ভয়ে বাইশারি চলে এসেছে ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে।
গ্রামের লাইজ্যা অং চাক (৫৫) মুঠোফোনে জানান, ‘এখন আর গ্রামে যেতে পারি না। বাঙালিরা ভয় দেখায়। জমি বিক্রি না করলে মেরে ফেলবে।’

পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসীদের ভূমি দখলের এটি একটি উদাহরণ। পাহাড়ে এমন ঘটনা নতুন নয়। কিন্তু ২০১৩ সালে ভূমি দখল হয়েছে ব্যাপকহারে, অন্তত আগের দুই বছরের তুলনায়। আর এ সময় ভূমিকে কেন্দ্র দেশজুড়েই আদিবাসীদের ওপর নিপীড়নও বেড়েছে।
আদিবাসীদের মানবাধিকার সংগঠন কাপেং ফাউন্ডেশন তাদের মানবাধিকার প্রতিবেদন ২০১৩-তে এ বিষয় তুলে ধরেছে। সংগঠনটি বলছে, রাজনৈতিক সহিংসতার বছর ২০১৩ সালে আদিবাসীদের সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতিও ছিল নাজুক।
কাপেং ২০০৭ সাল থেকে আদিবাসীদের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে আসছে। সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সমন্বয়ক হিরন মিত্র চাকমা বলেন, নিজস্ব অনুসন্ধান এবং পত্রিকার প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করেই মানবাধিকার প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। আগামীকাল মঙ্গলবার এই প্রতিবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হওয়ার কথা রয়েছে।

কাপেংয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভূমি বিরোধের জের ধরে ২০১৩ সালে ২৬টি পরিবার তাদের ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদ হয়েছে। ২০১১ সালে উচ্ছেদের কোনো ঘটনা ঘটেনি। তবে ২০১২ সালে ১৩টি পরিবার উচ্ছেদ হয়েছিল। তিন বছরে সব কটি উচ্ছেদের ঘটনাই ঘটেছে পার্বত্য চট্টগ্রামে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছর আদিবাসীদের তিন হাজার ৮২৬ একর জমি দখল করা হয়েছে। এর মধ্যে সমতলে দখল হওয়া জমির পরিমাণ ৩৪ একর, বাকিটা পার্বত্য চট্টগ্রামে।
পার্বত্য চুক্তি মেনে ভূমি বিরোধ সমাধান না করা এবং আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতির বিষয়ে রাষ্ট্রের নেতিবাচক অবস্থানের কারণেই পার্বত্য এলাকায় ভূমি বিরোধ বেড়ে যাচ্ছে বলে মনে করেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান।

মানবাধিকার প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০১৩ সালে ভূমিকেন্দ্রিক সহিংসতায় সারা দেশে নিগৃহীত ও আহত হয়েছেন ৪১ জন। আগের দুই বছরের তুলনায় এই সমস্যা বেড়ে গেছে। ২০১২ সালে এ ধরনের ঘটনা ছিল ২৭; ২০১১ সালে ২১টি।
ভূমিসংক্রান্ত বিরোধের কারণে উচ্ছেদের হুমকি দেওয়ার প্রবণতাও বেড়েছে বহুগুণ। দেশে গত বছর এমন হুমকির শিকার হয়েছে এক হাজার ৬২টি পরিবার। এর মধ্যে এক হাজার ৩৮টিই পার্বত্য চট্টগ্রামে।
সহিংসতার সবচেয়ে বড় ঘটনা ঘটে গত বছরের ৩ আগস্ট খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গার তাইংন্দংয়ে। বাঙালি অপহরণের গুজব ছড়িয়ে ছয়টি পাহাড়ি গ্রাম সেদিন পুড়িয়ে ফেলা হয়। ঘটনার পর ৪০০ পাহাড়ি পরিবারের প্রায় দুই হাজার মানুষ ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সীমান্তে গিয়ে আশ্রয় নেয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, এলাকাটিতে পাহাড়িদের ভূমি দখলের জন্যই সুপরিকল্পিতভাবে ঘটনাটি ঘটানো হয়।

তবে ভূমিকেন্দ্রিক সহিংসতা বেড়ে যাচ্ছে তা মনে করেন না পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর। তিনি বলেন, ‘টুকটাক কিছু ঘটনা ঘটতে পারে। এটা ভীত হওয়ার মতো কিছু নয়।’
কাপেংয়ের প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, ভূমির পাশাপাশি গত বছরে আদিবাসী নারীদের ওপর নিপীড়নও চলেছে। ধর্ষণ, হত্যা, শারীরিক নিগ্রহ, ধর্ষণচেষ্টা ও অপহরণের ৬৭টি ঘটনা ঘটেছে ২০১৩ সালে। আগের বছর এ ধরনের ঘটনা ঘটেছিল ৭৫টি। গত বছরের সংঘটিত ১৫টি ধর্ষণের ঘটনার মধ্যে ১১টিই ঘটেছে পার্বত্য চট্টগ্রামে। চারটি সমতলে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যেসব আদিবাসী নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, এর মধ্যে ৬৯ শতাংশের বয়স ১৮ বছরের নিচে। আর নিপীড়নকারীদের ৮৯ শতাংশই বাঙালি বসতি স্থাপনকারী।”

সূত্র: প্রথম আলো

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

3 − 2 =

আরও পড়ুন