parbattanews

ভূরাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ এশিয়া নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন

বর্তমান ভূরাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ এশিয়া নীতিতে একটি বড় ধরনের গুণগত পরিবর্তন দৃশ্যমান হচ্ছে। আল জাজিরায় প্রকাশিত কেন্টাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রভাষক নাজমুস সাকিবের ‘ইন সাউথ এশিয়া, আমেরিকা হ্যাজ স্টপড আস্কিং ইন্ডিয়া ফর পারমিশন’ (দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের অনুমতি নেওয়া বন্ধ করেছে আমেরিকা) শীর্ষক নিবন্ধে তেমনটাই বলা হয়েছে।

লেখক নাজমুস সাকিব তার আলোচনা শুরু করেছেন মার্কিন সামরিক বাহিনীর একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করে। সম্প্রতি মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর (পেন্টাগন) তাদের ‘ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ড’-এর নাম পরিবর্তন করে আগের নাম ‘প্যাসিফিক কমান্ড’-এ ফিরে গেছে। প্রথম ট্রাম্প প্রশাসনের সময় ২০১৮ সালে ভারতের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব প্রদর্শন এবং চীনকে মোকাবিলার অংশ হিসেবে ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরকে একটি একক কৌশলগত ক্ষেত্র বিবেচনা করে এই অঞ্চলের কমান্ডের নামে ‘ইন্দো’ শব্দটি যুক্ত করা হয়েছিল। তৎকালীন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাটিস একে বলিউড থেকে হলিউড এবং পেঙ্গুইন থেকে মেরু ভালুকের সংযোগ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।

কিন্তু নাজমুস সাকিব মনে করেন, ভূরাজনীতিতে কোনো নামই কেবল নাম নয়; এটি একটি সুনির্দিষ্ট সংকেত এবং কৌশলগত অবস্থানের বহিঃপ্রকাশ। এই নাম পরিবর্তনের মাধ্যমে ওয়াশিংটন মূলত ভারতীয় প্রভাবের বলয় থেকে কিছুটা দূরত্ব তৈরির এবং দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন কৌশলগত সমীকরণ গড়ার বার্তা দিচ্ছে। ভারতের পার্লামেন্ট সদস্য শশী থারুর এই পরিবর্তনকে ‘কোয়াড’-এর কফিনে আরেকটি পেরেক হিসেবে অভিহিত করে যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার এই উদ্বেগ পরিবর্তনের গভীরতাকেই প্রমাণ করে।

নিবন্ধকারের মতে, এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক রাজনীতিতে। দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকার নীতিতে দক্ষিণ এশিয়া বলতে মূলত ভারতকেই বোঝানো হতো। যেখানে পাকিস্তানকে একটি সমস্যা, বাংলাদেশকে তৈরি পোশাক কারখানা ও উন্নয়ন প্রকল্প এবং নেপালকে ভারতের অধীনস্থ একটি বাফার স্টেট হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু ওয়াশিংটন এখন এই পুরনো মানসিক মানচিত্রটি পুনর্লিখনের কাজ শুরু করেছে। আমেরিকা এখন স্পষ্টভাবেই এই অঞ্চলে ভারতকে তাদের একমাত্র ‘সাবকন্ট্রাক্টর’ বা প্রতিনিধি হিসেবে বিবেচনা করার নীতি থেকে সরে আসছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমে যাচ্ছে?যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমে যাচ্ছে?
এর ফলে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলো– যেমন পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও নেপাল এখন আর ভারতের আঞ্চলিক নীতির অংশ হিসেবে নয়, বরং নিজস্ব সার্বভৌম সত্তা, স্বার্থ ও কৌশলগত গুরুত্ব নিয়ে সরাসরি ওয়াশিংটনের সাথে যোগাযোগের সুযোগ পাচ্ছে। লেখক একে একটি ব্যবসায়িক লেনদেনের সাথে তুলনা করেছেন। নাজমুস সাকিব বলেছেন, মধ্যস্বত্বভোগী বা দালাল বাদ দিয়ে সরাসরি প্রধান পক্ষের সাথে লেনদেন করা উভয় পক্ষের জন্যই বেশি লাভজনক। তবে এই আঞ্চলিক দেশগুলো যে আমেরিকার অন্ধ মিত্রে পরিণত হচ্ছে তা নয়, বরং তারা একবিংশ শতাব্দীর উপযোগী একটি ‘লেনদেনভিত্তিক’ সম্পর্কে জড়াচ্ছে। যেখানে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করে তারা একই সাথে চীন, রাশিয়া ও ভারতের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখার স্বাধীনতা উপভোগ করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গির পেছনে কিছু বাস্তব অর্থনৈতিক ও কৌশলগত কারণ রয়েছে বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে। মার্কিন নীতিনির্ধারকেরা এখন ভারতকে কেবল একটি কৌশলগত অংশীদার হিসেবেই দেখছেন না, বরং একটি উদীয়মান বাণিজ্যিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবেও বিবেচনা করছেন। বিশেষ করে ফার্মাসিউটিক্যালস, তথ্যপ্রযুক্তি, ইলেকট্রনিক্স পন্য এবং সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে ভারতের উচ্চাভিলাষ মার্কিন কোম্পানিগুলোর জন্য ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে চীনকে অবাধে বাণিজ্যের সুযোগ দিয়েছিল এবং পরবর্তীতে চীন যেভাবে আমেরিকার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, ওয়াশিংটন ভারতের ক্ষেত্রে সেই একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করতে চায় না। মার্কিন নীতিনির্ধারকদের মূল লক্ষ্য হলো দক্ষিণ এশিয়ায় যেন কোনো একটি একক শক্তির– তা সে ভারতই হোক না কেন– একচেটিয়া আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত না হয়। তারা এই অঞ্চলে একটি বহুমাত্রিক ও ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করতে চায়, যা ভারতের এতদিনের ‘আঞ্চলিক ভেটো’ বা একক সিদ্ধান্তের ক্ষমতার অবসান ঘটাচ্ছে। এই নীতির অংশ হিসেবেই যুক্তরাষ্ট্র এখন দিল্লির উদ্বেগ অগ্রাহ্য করে মিয়ানমার ইস্যুতে এমন সব পদক্ষেপ নিচ্ছে যা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করে। একই সাথে বেইজিংয়ের সাথেও একটি সমঝোতার পথ খুঁজছে।

কঠিন বাস্তবতার মুখে দক্ষিণ এশিয়ার জেন-জি বিপ্লবগুলোকঠিন বাস্তবতার মুখে দক্ষিণ এশিয়ার জেন-জি বিপ্লবগুলো
পাকিস্তানের ক্ষেত্রে আমেরিকার এই নীতি পরিবর্তনের চিত্রটি অত্যন্ত স্পষ্ট। বহু বছর ধরে মার্কিন-পাকিস্তান সম্পর্ক কেবল সন্ত্রাসবাদ দমনের একটি চক্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু বর্তমানে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসীম মুনিরের নেতৃত্বে দেশটির কূটনৈতিক তৎপরতা এই সমীকরণ বদলে দিয়েছে। পাকিস্তান এখন নিজেকে উপসাগরীয় অঞ্চলের পুঁজি, আমেরিকান প্রযুক্তি এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের খনিজ-নির্ভর অর্থনীতির মধ্যে একটি কৌশলগত সেতু হিসেবে উপস্থাপন করছে।

বিশেষ করে রেকো ডিক-এর মতো খনিগুলোতে থাকা ট্রিলিয়ন ডলার মূল্যের তামা ও স্বর্ণের বিশাল মজুদকে পাকিস্তান চীনের সরবরাহ চেইনের বিকল্প হিসেবে আমেরিকার সামনে তুলে ধরেছে। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলের সাথে সরাসরি সামরিক যোগাযোগের মাধ্যমে পাকিস্তান বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মিকে (বিএলএ) আমেরিকার সন্ত্রাসী তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। একই সাথে ১৯ শতাংশ শুল্ক সুবিধা আদায় করেছে। এর মাধ্যমে পাকিস্তান একদিকে চীনের সাথে গভীর সম্পর্ক ধরে রাখছে। অন্যদিকে খনিজ, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে আমেরিকার সাথেও একটি বাস্তবমুখী সম্পর্ক গড়ে তুলছে।

নিবন্ধের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান বর্তমান মার্কিন নীতির জন্য আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গোপসাগরের উপকূলে অবস্থিত ১৭ কোটি মানুষের এই দেশটিকে দীর্ঘদিন ধরে ওয়াশিংটন কেবল সাহায্যনির্ভর বা ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগের চশমা দিয়ে দেখেছে। কিন্তু বর্তমানে একটি অর্থনৈতিকভাবে আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশ মার্কিন বিনিয়োগ, জ্বালানি চুক্তি এবং প্রযুক্তিগত অংশীদারিত্বের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। যা ভারতের একক প্রভাবের বলয়কে সংকুচিত করছে।

এশিয়ার দেশগুলোর নজর কেন আর্কটিকের সমুদ্রপথের দিকে?এশিয়ার দেশগুলোর নজর কেন আর্কটিকের সমুদ্রপথের দিকে?
মিয়ানমারে চলমান সংকট এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রবেশদ্বারে বাংলাদেশের এই অবস্থানকে যুক্তরাষ্ট্র অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছে। মিয়ানমারে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বা একটি নিরাপদ অঞ্চল প্রতিষ্ঠার জন্য যদি জাতিসংঘ বা নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে কোনো মানবিক হস্তক্ষেপ করা হয়, তবে তা এই অঞ্চলে চীন, ভারত এবং মিয়ানমারের মধ্যকার অক্ষকে দুর্বল করতে যুক্তরাষ্ট্রকে বড় ধরনের সুবিধা দেবে। একই সাথে এটি ঢাকাকে ভারতের প্রভাব বলয় থেকে বের করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব পুনঃপ্রতিষ্ঠায় সাহায্য করবে।

আল জাজিরার এই বিশ্লেষণটি দেখায় যে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের একক আধিপত্যের দিন ফুরিয়ে আসছে। যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে পুরোপুরি বর্জন করছে না– তারা এখনো ভারতের বিশাল বাজার, নৌবাহিনী এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতের মেধাকে ব্যবহার করতে চায়। তবে সম্পর্কের মধ্যকার সেই পুরনো ‘রোমান্টিকতা’ বা অন্ধ আনুগত্যের জায়গাটি এখন একটি বাস্তবসম্মত অংশীদারিত্বে রূপ নিয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়া এখন একটি ব্যস্ত বাজারের মতো হয়ে উঠেছে। যেখানে প্রতিটি রাজধানী নিজস্ব স্বার্থ অনুযায়ী আলাদা আলাদা চুক্তি করছে। পাকিস্তান খনিজের বিনিময়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে। আবার বাংলাদেশ অন্যান্য দেশের সাথে সম্পর্ক নষ্ট না করেই আমেরিকার সাথে যোগাযোগ বাড়াচ্ছে। পেন্টাগন যখন তাদের কমান্ডের নাম থেকে ‘ইন্দো’ শব্দটি বাদ দিয়েছে, তখন তারা মূলত তৃণমূলে ঘটে যাওয়া এই বাস্তব পরিবর্তনটিকেই আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বর্তমানের এই বহুমুখী বিশ্বে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব তারই থাকবে যে একসাথে সবচেয়ে বেশি সম্পর্ক বজায় রাখার দক্ষতা দেখাতে পারবে। আর দক্ষিণ এশিয়ার এই জনবহুল দাবার বোর্ডে এখন ঠিক সেই খেলাই শুরু হয়েছে।

Exit mobile version